হাঁসের বাচ্চা ফুটিয়ে স্বাবলম্বী পুরো গ্রাম

১৯৯৭ সালের এক অন্ধকার রাত। চারদিকে বিদ্যুৎহীন নিঝুম পরিবেশ। সেই রাতে একটি হারিকেন আর কিছু ধানের তুষ নিয়ে এক অভিনব পরীক্ষায় বসেছিলেন সিরাজগঞ্জের তাড়াশ উপজেলার নওগাঁ ইউনিয়নের প্রত্যন্ত মহেশরৌহালী গ্রামের শাহ আলম। লক্ষ্য ছিল-কৃত্রিম উপায়ে হাঁসের ডিম থেকে বাচ্চা ফোটানো। শাহ আলমের সেইদিনের একটি সাহসী উদ্ভাবন আজ শুধু তার ভাগ্যই নয়, পুরো গ্রামকে বদলে দিয়েছে। একসময়ের অবহেলিত গ্রামটি আজ পরিণত হয়েছে দেশের অন্যতম প্রধান ও সর্ববৃহৎ হাঁসের বাচ্চার আড়তে। শাহ আলম জাগো নিউজকে বলেন, ‘শুরুর গল্পটা মোটেও সহজ ছিল না। তার হাত ধরেই মহেশরৌহালী গ্রামে সর্বপ্রথম তুষ পদ্ধতিতে হাঁসের বাচ্চা ফোটানো শুরু হয়। এরপর প্রযুক্তির ছোঁয়ায় এই শিল্প বৈপ্লবিক পরিবর্তন আসে। কালের বিবর্তনে তুষ আর হারিকেনের জায়গা দখল করেছে আধুনিক বৈদ্যুতিক ইনকিউবেটর (বাচ্চা ফোটানোর মেশিন)।’ বর্তমানে মহেশরৌহালী গ্রামের ঘরে ঘরে গড়ে উঠেছে বাণিজ্যিকভাবে হাঁসের বাচ্চা ফোটানোর হ্যাচারি। গ্রামটিতে এখন প্রতিদিন আধুনিক ইনকিউবেটরের সাহায্যে ফুটছে ১২-১৫ লাখ হাঁসের বাচ্চা। তাদের দাবি সরকারি পৃষ্টপোষকতা পেলে এ সংখ্যা আরও কয়েকগুণ বড়বে। আরও পড়ুন কৃষি

হাঁসের বাচ্চা ফুটিয়ে স্বাবলম্বী পুরো গ্রাম

১৯৯৭ সালের এক অন্ধকার রাত। চারদিকে বিদ্যুৎহীন নিঝুম পরিবেশ। সেই রাতে একটি হারিকেন আর কিছু ধানের তুষ নিয়ে এক অভিনব পরীক্ষায় বসেছিলেন সিরাজগঞ্জের তাড়াশ উপজেলার নওগাঁ ইউনিয়নের প্রত্যন্ত মহেশরৌহালী গ্রামের শাহ আলম। লক্ষ্য ছিল-কৃত্রিম উপায়ে হাঁসের ডিম থেকে বাচ্চা ফোটানো। শাহ আলমের সেইদিনের একটি সাহসী উদ্ভাবন আজ শুধু তার ভাগ্যই নয়, পুরো গ্রামকে বদলে দিয়েছে। একসময়ের অবহেলিত গ্রামটি আজ পরিণত হয়েছে দেশের অন্যতম প্রধান ও সর্ববৃহৎ হাঁসের বাচ্চার আড়তে।

শাহ আলম জাগো নিউজকে বলেন, ‘শুরুর গল্পটা মোটেও সহজ ছিল না। তার হাত ধরেই মহেশরৌহালী গ্রামে সর্বপ্রথম তুষ পদ্ধতিতে হাঁসের বাচ্চা ফোটানো শুরু হয়। এরপর প্রযুক্তির ছোঁয়ায় এই শিল্প বৈপ্লবিক পরিবর্তন আসে। কালের বিবর্তনে তুষ আর হারিকেনের জায়গা দখল করেছে আধুনিক বৈদ্যুতিক ইনকিউবেটর (বাচ্চা ফোটানোর মেশিন)।’

jagoবর্তমানে মহেশরৌহালী গ্রামের ঘরে ঘরে গড়ে উঠেছে বাণিজ্যিকভাবে হাঁসের বাচ্চা ফোটানোর হ্যাচারি। গ্রামটিতে এখন প্রতিদিন আধুনিক ইনকিউবেটরের সাহায্যে ফুটছে ১২-১৫ লাখ হাঁসের বাচ্চা। তাদের দাবি সরকারি পৃষ্টপোষকতা পেলে এ সংখ্যা আরও কয়েকগুণ বড়বে।

উপজেলা প্রাণিসম্পদ বিভাগ বলছে, হাঁসের বাচ্চা ফুটোনোর ওপর ভিত্তি করে মহেশরৌহালীর পুরো গ্রামের অর্থনীতিতে এক বিশাল জোয়ার এসেছে। শুধু হাঁসের বাচ্চার ব্যবসার কারণে গ্রামে বেকারত্ব বলতে এখন আর কিছুই নেই। পুরুষদের পাশাপাশি ঘরের নারীরাও এই কাজে সমানভাবে সহযোগিতা করছেন।

স্থানীয় আব্দুস সালাম জাগো নিউজকে বলেন, ‘মহেশরৌহালী গ্রামের সব পরিবার হাঁস পালন ও হাঁসের বাচ্চা ফোটানোর পেশায় জড়িত। এ পেশা দিয়েই তারা জীবিকা নির্বাহ করে। গ্রামের নারী-পুরুষদের ডিম সংগ্রহ, গ্রেডিং করা, ইনকিউবেটরে দেওয়া এবং বাচ্চা ফুটে বের হওয়ার পর সেগুলোর যত্ন নেওয়া-সব মিলিয়ে দিন-রাত চলে ব্যস্ততা। অথচ এক সময়ে তাদের নুন আনতে পান্তা ফুরাত। বর্তমানে গ্রামটি হাঁসের গ্রাম হিসেবে পরিচিতি লাভ করেছে। গ্রামের কর্মক্ষম সব নারী-পুরুষ সকাল থেকে রাত পর্যন্ত থাকেন হাঁসের কাজে ব্যস্ত। উৎপাদিত লাখ লাখ হাঁসের বাচ্চা স্থানীয় চাহিদা পূরণ করে যাচ্ছে দেশের বিভিন্ন জেলার খামারগুলোতে।’

জামাল উদ্দিন নামে এক হ্যাচারি মালিক বলেন, ‘এই গ্রামের খাকি ক্যাম্পবেল, বেইজিং ও ইন্ডিয়ান রানারসহ বিভিন্ন জাতের হাঁসের বাচ্চার মান অত্যন্ত ভালো হওয়ায় দেশজুড়ে ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। প্রতিদিন কিশোরগঞ্জের হাওর অঞ্চল, নেত্রকোনা, সুনামগঞ্জ, সিলেট, বরিশাল এবং উত্তরবঙ্গের বিভিন্ন জেলা থেকে পাইকাররা গাড়ি নিয়ে বাচ্চা নিতে ছুটে আসে। বাচ্চাগুলো বিশেষ খাঁচায় ভরে সরবরাহ করা হয়।’

jagonewsতিনি আরও জানান, প্রথমে ৫০ হাজার টাকা ব্যয়ে একটি ছোট ইনকিউবেটর কিনেছিলেন তিনি। পরে সফলতা আসায় ৭ হাজার ও ১২ হাজার হাঁসের বাচ্চা ফোটানোর ক্ষমতাসম্পন্ন দুটি বড় ইনকিউবেটর স্থাপন করেন, যাতে খরচ হয়েছে প্রায় ৫ লাখ টাকা। বর্তমানে প্রতিটি হাঁসের বাচ্চা উৎপাদনে খরচ হয় ৩৫ থেকে ৪০ টাকা এবং বিক্রি হয় ৮০ থেকে ৯০ টাকায়। মাসে প্রায় ৩০ হাজার হাঁসের বাচ্চা উৎপাদন করে তিনি আয় করছেন প্রায় সাড়ে ৩ লাখ টাকা। তবে তার এ ব্যবসা বড় হলেও মাঝে মাঝে ডিমের দাম অতিরিক্ত বেড়ে গেলে তাদের লোকসানের মুখে পড়তে হয়।

সম্ভাবনাময় এই ব্যবসার প্রসারে ভ্যাক্সিন থেকে শুরু করে অন্যান্য প্রযুক্তিগত সহযোগিতা করা হচ্ছে বলে জানিয়েছেন জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. একেএম আনোয়ারুল হক। তিনি বলেন, ‘গ্রামটির বেশিরভাগ মানুষ হাঁসের বাচ্চা ফোটানোর সঙ্গে জড়িত। মাঠ পর্যায়ে আমরা তাদের নিয়মিত পরামর্শ ও প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করেছি। তবে স্বল্পসুদে ঋণ পেলে তারা আরও ব্যবসার প্রসার ঘটাতে পারবে।’

এম এ মালেক/কেএসকে

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow