হাজী শরীয়তুল্লাহ
হাজী শরীয়তুল্লাহ (১৭৮১-১৮৪০) ছিলেন বাংলার ইসলামী আন্দোলনের ইতিহাসে এক অনন্য ব্যক্তিত্ব। তিনি ছিলেন ফরায়েজি আন্দোলনের প্রবর্তক, সমাজসংস্কারক, ধর্মীয় চিন্তাবিদ এবং ব্রিটিশ শাসনামলের বাংলায় মুসলমানদের ধর্মীয় পুনর্জাগরণের প্রধান পুরোধা। তার জীবন ও কর্ম বাংলার মুসলমান সমাজকে কুসংস্কার, ধর্মীয় অবহেলা ও সামাজিক অবক্ষয় থেকে ফিরিয়ে আনার গভীর প্রচেষ্টার ইতিহাস। হাজী শরীয়তুল্লাহ জন্মগ্রহণ করেন ১৭৮১ খ্রিষ্টাব্দে, তৎকালীন ফরিদপুর জেলার মাদারীপুর মহকুমার অন্তর্গত তালুকদার পরিবারে। তার পিতার নাম ছিল আবদুল জলিল তালুকদার। শৈশবেই তিনি পিতৃহারা হন এবং নানা প্রতিকূলতার মধ্য দিয়ে তার জীবন শুরু হয়। কৈশোরেই ধর্মীয় শিক্ষার প্রতি গভীর আকর্ষণ তাকে জ্ঞানের সন্ধানে দেশত্যাগে উদ্বুদ্ধ করে। অল্প বয়সেই হাজী শরীয়তুল্লাহ হজ পালনের উদ্দেশে মক্কায় যান এবং সেখানে প্রায় ১৮ বছর অবস্থান করেন। এ দীর্ঘ সময়ে তিনি মক্কা ও মদিনার খ্যাতনামা আলেমদের কাছে কোরআন, হাদিস, ফিকহ ও তাওহিদের শিক্ষা গ্রহণ করেন। বিশেষত, তিনি ওয়াহাবি ও সালাফি চিন্তাধারার প্রভাবাধীন ইসলামী ভাবধারার সঙ্গে পরিচিত হন, যদিও তার আন্দোলন ছিল সম্পূর্ণভাবে বাংলার স
হাজী শরীয়তুল্লাহ (১৭৮১-১৮৪০) ছিলেন বাংলার ইসলামী আন্দোলনের ইতিহাসে এক অনন্য ব্যক্তিত্ব। তিনি ছিলেন ফরায়েজি আন্দোলনের প্রবর্তক, সমাজসংস্কারক, ধর্মীয় চিন্তাবিদ এবং ব্রিটিশ শাসনামলের বাংলায় মুসলমানদের ধর্মীয় পুনর্জাগরণের প্রধান পুরোধা। তার জীবন ও কর্ম বাংলার মুসলমান সমাজকে কুসংস্কার, ধর্মীয় অবহেলা ও সামাজিক অবক্ষয় থেকে ফিরিয়ে আনার গভীর প্রচেষ্টার ইতিহাস।
হাজী শরীয়তুল্লাহ জন্মগ্রহণ করেন ১৭৮১ খ্রিষ্টাব্দে, তৎকালীন ফরিদপুর জেলার মাদারীপুর মহকুমার অন্তর্গত তালুকদার পরিবারে। তার পিতার নাম ছিল আবদুল জলিল তালুকদার। শৈশবেই তিনি পিতৃহারা হন এবং নানা প্রতিকূলতার মধ্য দিয়ে তার জীবন শুরু হয়। কৈশোরেই ধর্মীয় শিক্ষার প্রতি গভীর আকর্ষণ তাকে জ্ঞানের সন্ধানে দেশত্যাগে উদ্বুদ্ধ করে।
অল্প বয়সেই হাজী শরীয়তুল্লাহ হজ পালনের উদ্দেশে মক্কায় যান এবং সেখানে প্রায় ১৮ বছর অবস্থান করেন। এ দীর্ঘ সময়ে তিনি মক্কা ও মদিনার খ্যাতনামা আলেমদের কাছে কোরআন, হাদিস, ফিকহ ও তাওহিদের শিক্ষা গ্রহণ করেন। বিশেষত, তিনি ওয়াহাবি ও সালাফি চিন্তাধারার প্রভাবাধীন ইসলামী ভাবধারার সঙ্গে পরিচিত হন, যদিও তার আন্দোলন ছিল সম্পূর্ণভাবে বাংলার সামাজিক বাস্তবতার সঙ্গে সংযুক্ত। এ সময়েই তার চিন্তায় দৃঢ় হয় যে, বাংলার মুসলমান সমাজ ইসলামের মৌলিক ফরজ ও বিধান থেকে বিচ্যুত হয়ে পড়েছে।
১৮১৮ খ্রিষ্টাব্দের দিকে হাজী শরীয়তুল্লাহ বাংলায় প্রত্যাবর্তন করেন। ফিরে এসে তিনি লক্ষ করেন, মুসলমান সমাজ নানা ধরনের বিদাত, কুসংস্কার, হিন্দু আচার-অনুকরণ এবং ফরজ আমলে অবহেলায় নিমজ্জিত। নামাজ, রোজা, জাকাতের মতো মৌলিক ফরজগুলো উপেক্ষিত; অন্যদিকে শিরক ও বিদাত সমাজে ব্যাপকভাবে প্রচলিত। এ প্রেক্ষাপটে তিনি শুরু করেন ফরায়েজি আন্দোলন—যার মূল লক্ষ্য ছিল মুসলমানদের ফরজ পালনে উদ্বুদ্ধ করা এবং বিদাত বর্জনে সচেতন করা।
ফরায়েজি আন্দোলনের মূল বক্তব্য ছিল, ইসলামের ফরজ বিধান পালন করা প্রত্যেক মুসলমানের অপরিহার্য কর্তব্য। হাজী শরীয়তুল্লাহ বিশ্বাস করতেন, সমাজ সংস্কার সম্ভব নয় যতক্ষণ না ব্যক্তি তার ধর্মীয় দায়িত্ব সম্পর্কে সচেতন হয়। তিনি গ্রাম থেকে গ্রামান্তরে ঘুরে ওয়াজ-নসিহত করেন, ধর্মীয় শিক্ষা দেন এবং মুসলমানদের ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানান। তার আন্দোলন শুধু ধর্মীয় ছিল না; এটি ছিল সামাজিক ও নৈতিক পুনর্গঠনের এক প্রচেষ্টা। তবে তার এ কর্মকাণ্ড ব্রিটিশ শাসক ও নীলকরদের বিরাগভাজন হয়। ফরায়েজি আন্দোলন নীলচাষ ও কৃষকদের ওপর অত্যাচারের বিরুদ্ধেও পরোক্ষ প্রতিবাদে পরিণত হয়। অনেক জায়গায় স্থানীয় জমিদার ও নীলকররা তাকে বাধা দেয়, এমনকি নির্যাতনও করে। তবুও তিনি তার আদর্শ থেকে বিচ্যুত হননি।
১৮৪০ খ্রিষ্টাব্দে হাজী শরীয়তুল্লাহ ইন্তেকাল করেন। তার মৃত্যুর পর তার সুযোগ্য পুত্র দুদু মিয়া (মোহাম্মদউল্লাহ) ফরায়েজি আন্দোলনের নেতৃত্ব দেন এবং একে আরও সংগঠিত রূপ দেন। হাজী শরীয়তুল্লাহ বাংলার মুসলমান সমাজে যে ধর্মীয় চেতনার বীজ রোপণ করেছিলেন, তা পরবর্তী প্রজন্মে গভীর প্রভাব ফেলে।
What's Your Reaction?