রাজশাহী বিভাগের বিভিন্ন এলাকায় উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে হামের সংক্রমণ। মার্চের দ্বিতীয় সপ্তাহ থেকে শনিবার (৪ এপ্রিল) পর্যন্ত রাজশাহী মেডিকেল কলেজ (রামেক) হাসপাতালে হামের উপসর্গ নিয়ে অন্তত ৩৮ জন শিশু মারা গেছেন।
রাজশাহী বিভাগীয় পরিচালকের কার্যালয়ের দেওয়া তথ্যমতে, মার্চের দ্বিতীয় সপ্তাহ থেকে শনিবার পর্যন্ত বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) বিভাগের বিভিন্ন হাসপাতালে হামের উপসর্গ নিয়ে ভর্তি হওয়া ৫২০ জনের নমুনা সংগ্রহ করে ১৪৩ জনের শরীরে হামের উপস্থিতি পাওয়া গেছে। সেই হিসেবে রাজশাহী বিভাগে মোট পরীক্ষার প্রায় ৩৫ শতাংশ (৩৪ দশমিক ৭০ শতাংশ) শিশু হামে আক্রান্ত।
বর্তমানে হাম পজিটিভ কিংবা উপসর্গ নিয়ে বিভাগের বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন ২৮৯ জন রোগী। যেসব এলাকায় একাধিক রোগী শনাক্ত হচ্ছে, সেসব এলাকাকে প্রাদুর্ভাব এলাকা হিসেবে চিহ্নিত করেছে স্বাস্থ্য বিভাগ। এ পর্যন্ত বিভাগে এমন ২৬টি এলাকা শনাক্ত করা হয়েছে। এর মধ্যে পাবনায় সর্বোচ্চ ১০টি এলাকা থেকে হাম ছড়াচ্ছে। রাজশাহীর ছয়টি এলাকায় সংক্রমণ পাওয়া গেছে, যার পাঁচটি রাজশাহী মহানগরের ভেতরে। এছাড়া নওগাঁয় পাঁচটি, চাঁপাইনবাবগঞ্জে তিনটি এবং নাটোর ও সিরাজগঞ্জে একটি করে এলাকা আক্রান্ত হয়েছে। স্বাস্থ্য বিভাগ আশঙ্কা করছে, প্রাদুর্ভাবের এলাকা আরও বাড়তে পারে।
রাজশাহী বিভাগীয় স্বাস্থ্য পরিচালক ডা. হাবিবুর রহমান বলেন, যেসব এলাকায় একাধিক রোগী পাওয়া গেছে, সেগুলোকে আউটব্রেক হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে এবং সেসব এলাকায় টিকাদানে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হবে।
রোগীর চাপ সামলাতে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ (রামেক) হাসপাতাল ইতিমধ্যে বিশেষ প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে।
হাসপাতালের মুখপাত্র ডা. শংকর কুমার বিশ্বাস বলেন, হাসপাতালে ৪০ শয্যার একটি হাম আইসোলেশন ওয়ার্ড চালু করা হয়েছে। এছাড়া শিশু ওয়ার্ড ও মেডিসিন বিভাগে আলাদা আইসোলেশন কর্নার করা হয়েছে। রোগী আরও বাড়লে প্রয়োজনে একটি শিশু ওয়ার্ডকে পুরোপুরি আইসোলেশন ওয়ার্ডে রূপান্তর করা হবে।
হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, গত কয়েক দিনে রোগীর সংখ্যা ধারাবাহিকভাবে বেড়েছে। ২৯ মার্চ ৯৩ জন থেকে বৃহস্পতিবার তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৩২ জনে। শুক্রবার রামেক হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিল ১৩০ জন শিশু। শনিবার হাসপাতালে ১৪৯ জন শিশুকে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে।
গত ২৪ ঘণ্টায় ৩ শিশুকে চিকিৎসা শেষে ছুটি দেওয়া হয়েছে এবং মারা গেছে তিনজন। এ নিয়ে মার্চের দ্বিতীয় সপ্তাহ থেকে এখন পর্যন্ত ৩৮ জন শিশু মারা যায়। শিশুদের জন্য নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রের (পিআইসিইউ) শয্যা ১২ থেকে বাড়িয়ে ১৮ করা হয়েছে। এর মধ্যে ১২টি শয্যা হাম আক্রান্ত শিশুদের জন্য নির্ধারিত। এছাড়া গুরুতর রোগীদের চিকিৎসায় বিকল্প হিসেবে হার্ট ফাউন্ডেশনেও পাঠানো হচ্ছে। বর্তমানে হাসপাতালের আইসিইউতে ১২জন চিকিৎসাধীন রয়েছেন।
শনিবার বিকেলে সরেজমিনে দেখা গেছে, হাসপাতালের ১০ ও ২৪ নম্বর ওয়ার্ডে আইসোলেশন কর্নার চালু করা হয়েছে। সেখানে আক্রান্তদের চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে।
হাম উপসর্গ নিয়ে চাঁপাইনবাবগঞ্জ থেকে আসা এক শিশুর মা আনিছা বলেন, গত দুই দিন থেকে হাসপাতালে এসেছি। কিন্তু রোগীর চাপ বেশি হওয়ায় এখানে ভালো চিকিৎসা মিলছে না। কিন্তু কিছু করার নেই। ছেলের প্রাণ ভিক্ষার জন্য এসেছি, সেহেতু থাকতেই হবে।
অন্য এক শিশুর বাবা রফিকুল ইসলাম বলেন, মেয়ের প্রথমে জ্বর ছিল। বুঝতে পারিনি। এখন পুরো গায়ে লালচে দাগ। মেয়ের অবস্থা খুবই খারাপ। এখন মেয়ের অবস্থা আল্লার ওপর ছেড়ে দিয়েছি।
এদিকে, হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রোগীদের মধ্যে শিশুর পাশাপাশি প্রাপ্তবয়স্কদের উপস্থিতিও দেখা যাচ্ছে। চিকিৎসকদের মতে, হামের সংক্রমণ শুধু শিশুদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই, বড়দের মধ্যেও ছড়িয়ে পড়ছে। শনিবার সাতজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ হামের উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি রয়েছেন।
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সরকার রোববার (৫ এপ্রিল) থেকে দেশব্যাপী টিকাদান কর্মসূচি শুরু করতে যাচ্ছে। রাজশাহীতে নতুন টিকা না এলেও পূর্বে মজুত থাকা ৩৮ হাজার ৫৯০ ডোজ টিকা দিয়েই রোববার কার্যক্রম শুরু হবে।
জেলার সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচির (ইপিআই) সুপারিনটেনডেন্ট কস্তুরি বেগম জানান, ২০২৪ সালে ৯ মাস বয়সে ৫৬ হাজার ৪৯০ জন শিশু প্রথম ডোজ এবং ১৫ মাসে ৫৫ হাজার ৫০৩ জন দ্বিতীয় ডোজ টিকা পেয়েছে। ২০২৫ সালে প্রথম ডোজ পেয়েছে ৫৯ হাজার ২৫৯ জন এবং দ্বিতীয় ডোজ পেয়েছে ৫৮ হাজার ৩০২ জন শিশু।
হাসপাতালের আইসোলেশন সেন্টারে দেখা গেছে, চিকিৎসা নিতে আসা বেশিরভাগ শিশুর বয়স ৬ মাসের কম। আর ৬৫ শতাংশ শিশু ৯ মাসের আগেই আক্রান্ত হয়েছে।
স্বাস্থ্য বিভাগ জানিয়েছে, আগে ৯ মাস ও ১৫ মাস বয়সে টিকা দেওয়া হলেও এবার ৬ মাস বয়সী শিশুদেরও টিকার আওতায় আনা হচ্ছে। তবে বর্তমানে হাসপাতালে ভর্তি বেশিরভাগ শিশুর বয়স ৬ মাসের কম হওয়ায় উদ্বেগ থেকেই যাচ্ছে।
এ বিষয়ে রাজশাহী বিভাগীয় স্বাস্থ্য পরিচালক ডা. হাবিবুর রহমান বলেন, টিকা প্রয়োগের মাধ্যমে সংক্রমণ কমানো সম্ভব হলে ছোট শিশুদেরও ঝুঁকি কমে আসবে। করোনার মতো পরিস্থিতি তৈরি হবে না বলেও আশাবাদ ব্যক্ত করেন তিনি।