উত্তরাঞ্চলের প্রবেশদ্বার সিরাজগঞ্জ। ১৯৯৮ সালে যমুনা সেতু উদ্বোধনের পর এ জেলার ওপর দিয়ে রাজধানী ঢাকার সঙ্গে রাজশাহী, রংপুর ও খুলনা বিভাগের ২২ জেলার সরাসরি সংযোগ স্থাপিত হয়। আর সিরাজগঞ্জের হাটিকুমরুল গোলচত্বর হয়ে ওঠে চারটি গুরুত্বপূর্ণ মহাসড়কের মিলনস্থল। ঢাকা-পাবনা, ঢাকা-রাজশাহী ও ঢাকা-রংপুর মহাসড়কের সংযোগস্থল হয় হাটিকুমরুল।
সময়ের সঙ্গে সঙ্গে যমুনা সেতু পশ্চিম সংযোগ সড়ক ও হাটিকুমরুল গোলচত্বর এলাকায় বাড়তে থাকে গাড়ির চাপ। অতিরিক্ত যানবাহনের চাপে যানজট-দুর্ঘটনাসহ নানা দুর্ভোগে উত্তরাঞ্চলবাসীর গলার কাঁটা হয়ে পড়ে এ মহাসড়কটি।
বিশেষ করে ঈদ এলেই হাটিকুমরুল গোলচত্বর ও যমুনা সেতু পশ্চিম মহাসড়ক ঘিরে ঘরমুখো মানুষের ভোগান্তির অন্ত থাকে না। ঈদের ছুটিতে প্রতিদিন প্রায় ৫০ হাজার যানবাহন পারাপার হয়। ফলে হাজার লাখ লাখ মানুষকে যানজট আর দুর্ঘটনার ঝুঁকি নিয়ে এ রুটেই গন্তব্যে যেতে হতো।
উত্তরাঞ্চলবাসীর দুর্ভোগ লাঘবে যুগান্তকারী পদক্ষেপ নেয় সরকার। হাটিকুমরুল গোলচত্বর এলাকায় দেশের সর্বাধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর হাটিকুমরুল ইন্টারচেইঞ্জ প্রকল্প বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত নেয়।
৭৩৮ কোটি টাকা ব্যয়ের এ প্রকল্পটি ২০২১ সালে অনুমোদিত হলেও জমি অধিগ্রহণ ২০২৩ সালের জুন মাসে। জমি অধিগ্রহণ শেষে চায়না ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান সিআরবিসি (চায়না রেলওয়ে ব্রিজ করপোরেশন) আধুনিক ইন্টারচেইঞ্জ নির্মাণকাজ শুরু করে।
প্রকল্পের কর্মকর্তা ও প্রকৌশলীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, হাটিকুমরুল ইন্টারচেইঞ্জ প্রকল্পে থাকবে আলাদা ৬টি র্যাম্প। উত্তর-দক্ষিণমুখী ও ঢাকামুখী যানবাহন চলবে ভিন্ন ভিন্ন র্যাম্প দিয়ে। কোনো গাড়ি বিপরীতমুখী গাড়িকে সাইড দিতে হবে না। এছাড়া নীচ দিয়ে একটি গ্রাউন্ড রোড থাকবে। যেখান দিয়ে ধীরগতির যানবাহন চলবে।
সাসেক-২ প্রকল্পের ওয়ার্ক প্যাকেজ-১৩ এর অধীনে আন্তর্জাতিক মানের হাটিকুমরুল ইন্টারচেঞ্জটি নির্মাণের পলে চারটি রুট থেকে আসা যানবাহন নিরবচ্ছিন্নভাবে চলবে। কোনো গাড়িকে সাইড দিতে হবে না। এছাড়াও থ্রি-হুইলার যানবাহন ও সাধারণ জনগণের নিরাপদে চলাচলের ফুটপাত ও একাধিক আন্ডারপাস তৈরি করা হয়েছে।
প্রকল্পের কর্মকর্তারা বলেন, ২০২১ সালে শুরু হওয়া প্রকল্পটি ২০২৪ সালের মধ্যে শেষ হওয়ার কথা থাকলেও জমি অধিগ্রহণে দেরি হওয়ায় কারণে মেয়াদ বর্ধিত করে ২০২৬ সালের আগস্ট নির্ধারণ করা হয়। পরবর্তীতে ২০২৬ সালের ডিসেম্বর মাস পর্যন্ত মেয়াদ বাড়ানো হয়। ইতোমধ্যে প্রকল্পের ৭০ শতাংশ কাজ শেষ হয়েছে। এরই সুফল পেতে শুরু করেছে জনগণ। যানজট ও দুর্ঘটনা কমে এসেছে। যমুনা সেতু পশ্চিম পার হওয়ার পর স্বাভাবিক গতি নিয়ে যাতায়াত করছে উত্তরাঞ্চলের যানবাহন।
সরেজমিনে দেখা গেছে, হাটিকুমরুল গোলচত্বর এলাকার প্রায় ৫ বর্গকিলোমিটার এলাকাজুড়ে মহাকর্মযজ্ঞ চলছে। ৪০০/৫০০ শ্রমিক দিনে ও রাতে কাজ করছে। আর এই কর্মযজ্ঞ দেখে উচ্ছ্বসিত যাত্রী, পরিবহণ শ্রমিকসহ স্থানীয় বাসিন্দারাও।
রনি, কাদের, সুমন বাবলুসহ একাধিক বাস ও ট্রাকচালকেরা উচ্ছ্বাস প্রকাশ করে বলেন, দীর্ঘদিন ধরে সিরাজগঞ্জে এসে আমরা দুর্ভোগে পড়েছি। কিন্তু সরকার ইন্টারচেইঞ্জ নির্মাণ করার ফলে আর আমাদের দেরি করতে হবে না। কোনো গাড়িকে সাইড দিতে হবে না, উপর দিয়ে দ্রুতগতিতে আমরা যাতায়াত করতে পারবো। এতে অনেক সময় বাঁচবে বলে তারা বলেন।
সাবেক সেনা সদস্য আফসার আলী বলেন, ইন্টারচেইঞ্জ নির্মাণের ফলে আমাদের এ অঞ্চলের ভাগ্যের চাকা খুলে গেছে। এলাকায় ব্যবসা-বাণিজ্য ও শিল্পের প্রসার ঘটতে শুরু করেছে।
সিরাজগঞ্জ জজ আদালতের আইনজীবী অ্যাডভোকেট এরশাদ আলী বলেন, ইন্টারচেইঞ্জ চলনবিলসহ সমগ্র উত্তরাঞ্চলের মানুষের ভাগ্য বদলে দেবে বলে আশা করি। এসব অঞ্চলের কৃষিপণ্য সহজে ঢাকাসহ সারাদেশে রপ্তানি করা যাবে। এতে কৃষক ন্যায্যমূল্য পাবে।
সিরাজগঞ্জ চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির প্রেসিডেন্ট সাইদুর রহমান বাচ্চু বলেন, ইন্টারচেইঞ্জ প্রকল্পটি উত্তরাঞ্চলের মানুষের যোগাযোগ ব্যবস্থায় একটি যুগান্তকারী একটি স্থাপনা। ইন্টারচেইঞ্জ নির্মাণ সম্পন্ন হলে সিরাজগঞ্জে শিল্পপার্ক ও ইকোনমিক জোনে শিল্পপ্রতিষ্ঠান গড়ে উঠবে। চলনবিলের শস্য ও মৎস্য সারা দেশে সহজভাবে সরবরাহ করা সম্ভব হবে।
হাটিকুমরুল ইন্টারচেইঞ্জ প্রকল্পের উপ-ব্যবস্থাপক মো. সরফরাজ হোসেন বলেন, প্রকল্প সম্পন্ন হলে জাতীয় ও আঞ্চলিক যোগাযোগ, বাণিজ্য এবং পণ্য পরিবহনের ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে। আশা করা যাচ্ছে আগামী ১৬ ডিসেম্বর ইন্টারচেঞ্জটি আনুষ্ঠানিকভাবে উদ্বোধন করা হবে।
হাটিকুমরুল হাইওয়ে থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) ইসমাইল হোসেন, ইন্টারচেইঞ্জ উত্তরাঞ্চলের মানুষের যোগাযোগ ব্যবস্থায় আমূল পরিবর্তন আনবে। ইতোমধ্যে তার সুফল পেতে শুরু করেছে মানুষ।
হাটিকুমরুল ইন্টারচেঞ্জ প্রকল্পের প্রকল্প ব্যবস্থাপক ফিরোজ আখতার বলেন, উত্তরবঙ্গের ১৬টি জেলার যানবাহনগুলোকে হাটিকুমরুলকে ক্রস করেই যেতে হয়। এর মানে দেশের ২৫ ভাগ জেলার গাড়ী এ রুটে চলাচল করে। এছাড়াও খুলনা বিভাগের বেশ কিছু যানবাহনও এ রুটে চলাচল করে। ঈদ ছাড়াও সাধারণভাবেই এ এলাকায় যানজট সৃষ্টি হতো। ঈদের সময় তো ৪/৫ ঘণ্টা করে আটকে থাকতে হতো যাত্রী সাধারণকে। ওই অবস্থা হতে উত্তরণের জন্যই ইন্টারচেইঞ্জ প্রকল্প চালু হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, ইতোমধ্যে ৭০ শতাংশ কাজ শেষ হয়েছে। আশা করছি চলতি বছরের ডিসেম্বরেই কাজ শেষ হবে। প্রকল্পের কাজ শেষ হলে ঢাকা থেকে সব জেলামুখী যানবাহনগুলো একটি অপরটির ইন্টারাপ ছাড়াই চলবে। কোনো যানবাহনকে থামতে হবে না।
ফিরোজ আখতার বলেন, আসন্ন ঈদুল আজহা উপলক্ষে আমরা ইতোমধ্যে বগুড়া-রংপুরমুখী সাময়িকভাবে লেনটি ওপেন করে দিয়েছি। এই লেনটি দিয়েই ৬০ শতাংশ গাড়ি চলাচল করে। লেনটি খুলে দেওয়ায় এখানে আর গাড়ি আটকে থাকছে না।