২৫ কোটি টাকার আশ্রয়ণের অধিকাংশ বাড়িতেই ঝুলছে তালা
দুই পুকুর পাড়জুড়ে দিনাজপুরের ফুলবাড়ী উপজেলার আলাদিপুর ইউনিয়নের বাসুদেবপুর আশ্রয়নের ১৬৫ বাড়ি শোভাবর্ধন করছে। সত্তরোর্ধ বয়স আব্দুর রশিদ কাজিপুকুরের দক্ষিণ পাড়ে ১১টি বাড়ির মধ্যে একা বসবাস করেন। ভয়ে পরিবার নিয়ে বসবাস করতে তার বুক কাঁপে। পালতে পারেন না গবাদিপশু, হাঁস-মুরগি। ভয় কাটাতে বছরের বেশি সময় অনেককে ধরাধরি করেও কাউকেও বসবাস করাতে পারেননি। তার বাড়ি ছিল কুড়িগ্রাম জেলার উলিপুরে। স্থানীয় একটি বেসরকারি কোম্পানিতে চাকরি করতে এসে আশ্রয়ণের বাড়ি নিয়ে থেকে গেছেন। তার পাশের বাড়িগুলোতে যাতে পরিবার আসে সেজন্য জনৈক প্রতিনিধিকে ৪০০ টাকা হাত খরচাও দিয়েছেন, কাজ হয়নি। বাড়িগুলোতে লোক না থাকায় সরকারি বরাদ্দের টিউবয়েলগুলো বেশিরভাগ চুরি হয়ে গেছে। আর কিছুদিন গেলে হয়তো ঘরের টিনসহ অন্যান্য জিনিসগুলোও চুরি হওয়া শুরু হবে। দিনাজপুরের ফুলবাড়ী উপজেলার আশ্রয়ণের ঘরগুলো এখন ফাঁকা, অধিকাংশ ঘরেই ঝুলছে তালা। কেউ বিশেষ সুবিধা পাওয়ার জন্য ঘর নিলেও এখন থাকেন আগের বাড়িতেই। তাইতো তালা দিয়ে রেখেছেন বিশেষ ভাবে পাওয়া এই বাড়ি। উদ্দেশ্য ছিল গৃহহীনদের পুনর্বাসন, কিন্তু বাস্তবে অধিকাংশ বাড়িতে থাকে না মানুষ। জানা যা
দুই পুকুর পাড়জুড়ে দিনাজপুরের ফুলবাড়ী উপজেলার আলাদিপুর ইউনিয়নের বাসুদেবপুর আশ্রয়নের ১৬৫ বাড়ি শোভাবর্ধন করছে। সত্তরোর্ধ বয়স আব্দুর রশিদ কাজিপুকুরের দক্ষিণ পাড়ে ১১টি বাড়ির মধ্যে একা বসবাস করেন। ভয়ে পরিবার নিয়ে বসবাস করতে তার বুক কাঁপে। পালতে পারেন না গবাদিপশু, হাঁস-মুরগি।
ভয় কাটাতে বছরের বেশি সময় অনেককে ধরাধরি করেও কাউকেও বসবাস করাতে পারেননি। তার বাড়ি ছিল কুড়িগ্রাম জেলার উলিপুরে। স্থানীয় একটি বেসরকারি কোম্পানিতে চাকরি করতে এসে আশ্রয়ণের বাড়ি নিয়ে থেকে গেছেন। তার পাশের বাড়িগুলোতে যাতে পরিবার আসে সেজন্য জনৈক প্রতিনিধিকে ৪০০ টাকা হাত খরচাও দিয়েছেন, কাজ হয়নি।
বাড়িগুলোতে লোক না থাকায় সরকারি বরাদ্দের টিউবয়েলগুলো বেশিরভাগ চুরি হয়ে গেছে। আর কিছুদিন গেলে হয়তো ঘরের টিনসহ অন্যান্য জিনিসগুলোও চুরি হওয়া শুরু হবে।
দিনাজপুরের ফুলবাড়ী উপজেলার আশ্রয়ণের ঘরগুলো এখন ফাঁকা, অধিকাংশ ঘরেই ঝুলছে তালা। কেউ বিশেষ সুবিধা পাওয়ার জন্য ঘর নিলেও এখন থাকেন আগের বাড়িতেই। তাইতো তালা দিয়ে রেখেছেন বিশেষ ভাবে পাওয়া এই বাড়ি। উদ্দেশ্য ছিল গৃহহীনদের পুনর্বাসন, কিন্তু বাস্তবে অধিকাংশ বাড়িতে থাকে না মানুষ।
জানা যায়, বিগত সরকারের আমলে “আশ্রয়ণ প্রকল্প”এর আওতায় ফুলবাড়ী উপজেলার ৭টি ইউনিয়নে চার ধাপে নির্মিত হয়েছিল মোট ১ হাজার ২৭০টি বাড়ি। যার জন্য ব্যয় হয় ২৫ কোটি ৫ লাখ ৩৭ হাজার টাকা।
প্রকল্পের আওতায় প্রতিটি ভূমিহীন পরিবারকে দুই শতক জমির ওপর দুই কক্ষবিশিষ্ট আধাপাকা ঘর বরাদ্দ দেওয়া হয়েছিল। প্রথম পর্যায়ে প্রতিটি ঘরের ব্যয় ধরা হয়েছিল ১ লাখ ৭১ হাজার টাকা, দ্বিতীয় পর্যায়ে ১ লাখ ৯০ হাজার, তৃতীয় পর্যায়ে ২ লাখ ৬৪ হাজার ৫০০ এবং চতুর্থ পর্যায়ে ২ লাখ ৮৪ হাজার টাকা। এভাবে চার ধাপে নির্মিত ঘরগুলো এখন অযত্নে পড়ে আছে।
উপজেলার আলাদীপুর ইউনিয়নের বাসুদেবপুর গ্রামে ১৬৫টি বাড়ি নির্মিত হয়েছে। এরমধ্যে মাত্র ৫২টি পরিবার বসবাস করছে, বাকিগুলোতে ঝুলছে তালা। সেখানকার বাসিন্দারা বলছেন, আশ্রয়ণগুলোতে ভিক্ষুক, শ্রমিক ও দিনমজুর শ্রেণির লোক থাকায়, এখানে থাকলে কোনো কাজ পাওয়া যায় না। তাই কাজের জন্য পূর্বের জায়গায় কোনোমতে অবস্থান করে কর্ম করে জীবন চালাতে হচ্ছে।
এ ছাড়াও আশ্রয়ণ গ্রাম থেকে মূল সড়কে যাওয়ার রাস্তা নেই। যা আছে তা কাঁচা ও কাদাময়, বিশেষ করে বর্ষায় চলাচলে অযোগ্য হয়ে পড়ে। নেই ধর্মীয় উপাসনালয়। তাই অনেকেই বরাদ্দ পেলেও এখানে থাকতে আগ্রহী হচ্ছেন না।
স্থানীয়দের অভিযোগ, ঘর বরাদ্দে স্বজনপ্রীতি, রাজনৈতিক প্রভাব ও অনিয়ম হয়েছে। অনেকেই ঘর বরাদ্দ নিয়েও অন্যত্র বসবাস করছেন; কেউ কেউ ঘর অন্যের কাছে দেখাশোনার জন্য দিয়ে গেছেন। ফলে কিছু ঘরে হাঁস-মুরগি বা গরু-ছাগল পালন ছাড়া আর কোনো ব্যবহার নেই। বরাদ্দ পাওয়া বেশিরভাগ পরিবার সেখানে থাকে না।
অভিযোগ উঠেছে, ঘর বরাদ্দ দেওয়ার সময় সঠিক যাচাই-বাছাই না করা। নির্মাণের পর নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণের অভাব। প্রকল্পের স্থানগুলোতে যাতায়াত ও জীবিকার পর্যাপ্ত সুযোগ-সুবিধা না থাকা। অনেক প্রকল্পে মসজিদ নেই, সুপেয় পানির সমস্যা এবং জীবিকার ব্যবস্থা নেই, যা বাসিন্দাদের জীবনযাপনকে আরও কঠিন করে তুলেছে।
আশ্রয়ন প্রকল্প ঘিরে গড়ে তোলা সমবায় সমিতির সদস্য ইসমাইল হোসেনের ছেলে হানিফ শেখ, হাফিজুল ইসলাম ও জাকির হোসেন বলেন, ১৬৫টি ঘরের মধ্যে প্রায় ১১৫টি খালি। মালিক আছে, কিন্তু তারা আসেন না।
আশ্রয়নের বাসিন্দা মানিক মিয়া বলেন, এখানে বিভিন্ন এলাকার মানুষ বাড়ি পেয়েছে। তবে অনেকে স্থায়ীভাবে থাকতে চায় না। রাস্তা ও মসজিদ নেই। এ ছাড়া এখানে কোনো কাজ নেই তাই অনেক কষ্ট হয়। আশ্রয়ণগুলোতে শ্রমিক ও দিনমজুর শ্রেণির লোক থাকায় কামলা দিতে বা রিকশাভ্যান চালাতে দূরে যেতে হয়, তাই তারা আগের বাড়িতেই কোনোমতে থাকেন।
সরেজমিনে উপজেলার সবচেয়ে বড় আশ্রয়ণ গ্রাম খয়েরবাড়ী ইউনিয়নের বালুপাড়া আবাসনে দেখা যায়, মোট ২৪৪টি বাড়ি নির্মিত হয়েছে। বর্তমানে বসবাস করছেন ১০৭টি ঘরের মানুষ। অন্যগুলো ফাঁকা অবস্থায় পড়ে রয়েছে।
আশ্রয়ণের বাসিন্দা মহসিনা ও আমজাদ বলেন, অনেকেই ফুলবাড়ী পৌর এলাকার মানুষ, এখানে কোনো কাজ না থাকায় তারা থাকেন না। মাঝে মাঝে এসে ঘর দেখে যান।
বালুপাড়া আবাসনের এক বাসিন্দা নাম না প্রকাশের শর্তে বলেন, এই আবাসনের ২৪৪টি বাড়ির মধ্যে প্রায় ১০৭টি বাসিন্দা থাকলেও এরমধ্যে অনেক বাড়ির মূল মালিক নেই। বাড়িগুলোর মধ্যে কিছু বাড়ি ৫ থেকে ১০ হাজার টাকায় গোপনে বিক্রি বা হস্তান্তর হয়েছে। আবার কেউ কেউ বছরে একবার এসে দখল নিশ্চিত করে চলে যান। নিরাপত্তাহীনতার আশঙ্কায়ও অনেকে সেখানে থাকতে চান না।
আশ্রয়ণের অন্য বাসিন্দা জিয়াউর ও বিষা বলেন, আমাদের এখানে রাস্তার সমস্যা। বর্ষায় চলাচলে অনেক সমস্যা হয়। এ ছাড়া বেশকিছু পানির টিউবয়েল নষ্ট হয়ে পড়ে আছে। কাজকর্ম নেই, এমন অনেক সমস্যার কারণে এখানে বসবাস করে না।
অন্যান্য আশ্রয়ণেও একই চিত্র। উপজেলার কাজিহাল ইউনিয়নের পুকুরি মোড় আবাসনে ৮টি বাড়ির মধ্যে মাত্র ৩টিতে পরিবার বসবাস করছে। এলুয়াড়ী ইউনিয়নের শিবপুর আশ্রয়ণ প্রকল্পের ৩৪টি ঘরের মধ্যে ৫টিতে মানুষ থাকেন, বাকিগুলো ফাঁকা।
বাসিন্দারা জানান, কেউ কেউ মৌসুমভিত্তিক কাজের জন্য ঢাকাসহ অন্যান্য এলাকায় চলে যান, আবার ফিরে আসেন।
সচেতন মহল বলছেন, দূর থেকে রঙিন ছাদের এই ঘরগুলো দেখলে মনে হলেও এখন বাস্তবে এগুলো অব্যবহৃত, ফাঁকা ও তালাবদ্ধ। ২৫ কোটি টাকার এই প্রকল্প এখন অব্যবস্থাপনা ও অবহেলার প্রতীক হয়ে দাঁড়িয়েছে।
উপজেলার খয়েরবাড়ী ইউনিয়ন পরিষদের প্যানেল চেয়াম্যান শামীম হোসেন বলেন, আমার জানা মতে আশ্রয়ণ প্রকল্পের ঘরগুলোতে অনেকেই বসবাস করেন না। কেউ অন্যত্র কাজ করেন, অন্যকে থাকার জন্য দিয়ে চলে গেছে।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আহমেদ হাছান বলেন, এ বিষয়ে দ্রুত সময়ের মধ্যে উপজেলার সকল আশ্রয়ণ পরিদর্শন করা হবে। বাস্তব সমস্যাগুলো সরেজমিন দেখে প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হবে।
What's Your Reaction?