৪৬ বছরে পদার্পণ, জাতীয় রপ্তানিতে ১৭ শতাংশ অবদান বেপজার

বাংলাদেশ রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ এলাকা কর্তৃপক্ষ (বেপজা) সাফল্যের ৪৫ বছর পূর্ণ করে বুধবার (১৫ এপ্রিল) ৪৬তম বছরে পদার্পণ করছে। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের অধীন এই প্রতিষ্ঠানটি শুরু থেকেই দেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতির এক অনন্য নিদর্শন স্থাপন করে আসছে। সাফল্যের ধারাবাহিকতায় সম্প্রসারণবেপজার যাত্রার সূচনা শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের এক দূরদর্শী সিদ্ধান্তের মাধ্যমে। সত্তরের দশকের শেষভাগে যুদ্ধ-পরবর্তী বাংলাদেশে বৈদেশিক বিনিয়োগ ছিল খুবই সীমিত, রপ্তানি ছিল নগণ্য, আর কৃষির বাইরে কর্মসংস্থানের সুযোগও ছিল অপ্রতুল। এই বাস্তবতায় রপ্তানিমুখী প্রবৃদ্ধির মাধ্যমে শিল্পায়নের একটি সুপরিকল্পিত কাঠামোর প্রয়োজনীয়তা অনুভূত হয়। শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের যুগান্তকারী চিন্তা থেকেই ১৯৮০ সালে ‘বেপজা আইন’ পাস হয় এবং ১৫ এপ্রিল ১৯৮১ সালে গেজেট নোটিফিকেশনের মাধ্যমে বেপজা আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু করে। ১৯৮৩ সালে বন্দরনগরী চট্টগ্রামে দেশের প্রথম ইপিজেড স্থাপনের মাধ্যমে শুরু হয় রপ্তানিমুখী উৎপাদনের বাস্তব প্রয়োগ। উত্তরা ইডিজেড/ছবি: বেপজার সৌজন্যে বিনিয়োগের নতুন সংযোজনপরবর্তীতে এই সফল মডেল সম্প্রসারিত হয়ে দেশের বিভিন্ন অঞ্চল

৪৬ বছরে পদার্পণ, জাতীয় রপ্তানিতে ১৭ শতাংশ অবদান বেপজার

বাংলাদেশ রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ এলাকা কর্তৃপক্ষ (বেপজা) সাফল্যের ৪৫ বছর পূর্ণ করে বুধবার (১৫ এপ্রিল) ৪৬তম বছরে পদার্পণ করছে। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের অধীন এই প্রতিষ্ঠানটি শুরু থেকেই দেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতির এক অনন্য নিদর্শন স্থাপন করে আসছে।

সাফল্যের ধারাবাহিকতায় সম্প্রসারণ
বেপজার যাত্রার সূচনা শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের এক দূরদর্শী সিদ্ধান্তের মাধ্যমে। সত্তরের দশকের শেষভাগে যুদ্ধ-পরবর্তী বাংলাদেশে বৈদেশিক বিনিয়োগ ছিল খুবই সীমিত, রপ্তানি ছিল নগণ্য, আর কৃষির বাইরে কর্মসংস্থানের সুযোগও ছিল অপ্রতুল। এই বাস্তবতায় রপ্তানিমুখী প্রবৃদ্ধির মাধ্যমে শিল্পায়নের একটি সুপরিকল্পিত কাঠামোর প্রয়োজনীয়তা অনুভূত হয়। শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের যুগান্তকারী চিন্তা থেকেই ১৯৮০ সালে ‘বেপজা আইন’ পাস হয় এবং ১৫ এপ্রিল ১৯৮১ সালে গেজেট নোটিফিকেশনের মাধ্যমে বেপজা আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু করে। ১৯৮৩ সালে বন্দরনগরী চট্টগ্রামে দেশের প্রথম ইপিজেড স্থাপনের মাধ্যমে শুরু হয় রপ্তানিমুখী উৎপাদনের বাস্তব প্রয়োগ।

jagonews24.comউত্তরা ইডিজেড/ছবি: বেপজার সৌজন্যে

বিনিয়োগের নতুন সংযোজন
পরবর্তীতে এই সফল মডেল সম্প্রসারিত হয়ে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বিস্তৃত হয়। ১৯৯৩ সালে ঢাকা ইপিজেড প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে রাজধানীর নিকটবর্তী অঞ্চলেও শিল্পায়নের গতি ত্বরান্বিত হয়। একই সঙ্গে অলাভজনক রাষ্ট্রায়ত্ত শিল্প প্রতিষ্ঠান তথা আদমজী জুট মিল এবং চট্টগ্রাম স্টিল মিলকে ইপিজেডে রূপান্তরের মতো কৌশলগত উদ্যোগ দেশের শিল্পখাতে নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন করে। বর্তমানে বেপজা দেশের আটটি ইপিজেড-চট্টগ্রাম, ঢাকা, মোংলা, কুমিল্লা, উত্তরা, ঈশ্বরদী, আদমজী ও কর্ণফুলী ইপিজেড এবং চট্টগ্রামের মীরসরাইয়ে বেপজা অর্থনৈতিক অঞ্চল পরিচালনা করছে। যশোর এবং পটুয়াখালী ইপিজেড স্থাপনের কাজ দ্রুতগতিতে এগিয়ে চলেছে। আরও ৩৪টি প্রতিষ্ঠান বাস্তবায়নাধীন রয়েছে।

স্বল্প জমি ব্যবহার করে উচ্চ অর্থনৈতিক ফলাফল
স্বল্প জমি ব্যবহার করে উচ্চ অর্থনৈতিক ফলাফল অর্জনে বেপজা একটি অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। মাত্র প্রায় ৩,৫৫০ একর জমি—যা দেশের মোট আয়তনের ০.০০১ শতাংশেরও কম—থেকে জাতীয় রপ্তানির প্রায় ১৫-২০ শতাংশ আসছে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে জাতীয় রপ্তানিতে বেপজা’র অবদান ছিল ১৭.০৩ শতাংশ। গত ৪৫ বছরে সংস্থাটি প্রায় ৭.২৯ বিলিয়ন মার্কিন ডলার বিনিয়োগ আকর্ষণ করেছে এবং ১২৫ বিলিয়ন ডলারের বেশি পণ্য রপ্তানি করেছে।

jagonews24.comইপিজেডের অন্তর্ভুক্ত একটি কারখানায় চলছে জুতা তৈরির কাজ/ছবি: বেপজার সৌজন্যে

কর্মসংস্থান ও নারীর ক্ষমতায়নে ভূমিকা
বর্তমানে বেপজার অধীন জোনসমূহে প্রায় ৫.৫ লাখ বাংলাদেশি নাগরিকের কর্মসংস্থান হয়েছে, যার একটি বড় অংশ নারী। কর্মসংস্থানের এই সুযোগ দেশের সামাজিক উন্নয়ন ও নারী ক্ষমতায়নেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। একই সঙ্গে ইপিজেডসমূহে প্রতি একর জমি থেকে উচ্চ অর্থনৈতিক রিটার্ন অর্জন দেশের শিল্পখাতে দক্ষ ব্যবস্থাপনার একটি উদাহরণ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

পণ্যের বৈচিত্রায়ন ও ‘মেইড ইন বাংলাদেশ’ ব্র্যান্ডিং
রপ্তানি পণ্যের বৈচিত্রায়নেও বেপজা গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে। যেখানে আগে তৈরি পোশাক খাত প্রধান ছিল, বর্তমানে ইপিজেডে উৎপাদিত পণ্যের মধ্যে রয়েছে গাড়ির যন্ত্রাংশ, ইলেকট্রনিক উপকরণ, ক্যামেরা লেন্স, বাইসাইকেল, জুতা, চশমার ফ্রেমসহ বিভিন্ন উচ্চমূল্যের পণ্য। এর ফলে ‘মেইড ইন বাংলাদেশ’ ব্র্যান্ড আন্তর্জাতিক বাজারে নতুন মাত্রা পেয়েছে।

পরিবেশবান্ধব ইপিজেড
পরিবেশবান্ধব শিল্পায়নেও বেপজা অগ্রণী ভূমিকা পালন করছে। ইপিজেডসমূহে বর্তমানে ২৭টি LEED সার্টিফায়েড সবুজ কারখানা রয়েছে, যার মধ্যে ৮টি প্লাটিনাম। কেন্দ্রীয় বর্জ্য শোধনাগার (সিইটিপি), পুনর্ব্যবহারযোগ্য পানি ব্যবস্থাপনা এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বৃদ্ধির মাধ্যমে টেকসই শিল্পায়নের একটি কার্যকর মডেল গড়ে তোলা হয়েছে। মার্চ ২০২৬ পর্যন্ত ইপিজেডসমূহে প্রায় ৩২ মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন হচ্ছে। ২০৩০ সালের মধ্যে বেপজা ইপিজেডের মোট বিদ্যুৎ চাহিদার ২৫ শতাংশ সৌরবিদ্যুৎ থেকে উৎপাদনের পরিকল্পনা করেছে।

jagonews24.comছবি: বেপজার সৌজন্যে

বিনিয়োগকারীদের কাছে আস্থার প্রতীক
বিনিয়োগকারীদের জন্য সহজ ও দ্রুত সেবা প্রদানে বেপজা দীর্ঘদিন ধরে ‘One Window Service’ মডেল অনুসরণ করে আসছে। দক্ষ ব্যবস্থাপনা, কমপ্লায়েন্স নিশ্চিতকরণ এবং নির্ভরযোগ্য সেবা প্রদানের কারণে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারীদের কাছে বেপজা একটি আস্থার প্রতীকে এবং ব্র্যান্ডে পরিণত হয়েছে।

শ্রমিক কল্যাণে বেপজার অঙ্গীকার
শ্রমিক কল্যাণেও বেপজা বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে থাকে। ইপিজেডসমূহে হাসপাতাল, ডে-কেয়ার সেন্টার ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠান স্থাপনের মাধ্যমে শ্রমিক ও তাদের পরিবারের জন্য বিভিন্ন সামাজিক সেবা নিশ্চিত করা হয়েছে। পাশাপাশি নিরাপদ কর্মপরিবেশ ও শ্রমিক অধিকার সুরক্ষায় নিয়মিত তদারকি করা হচ্ছে।

এক নজরে বেপজা
অবকাঠামো
• ইপিজেড: ৮টি
• অর্থনৈতিক অঞ্চল: ২টি
• মোট আয়তন: ৩,৫৫০.৩৩ একর
• বাস্তবায়নাধীন ইপিজেড: ২টি (যশোর, পটুয়াখালী)
• প্রস্তাবিত ইপিজেড: ২টি (রংপুর, সিরাজগঞ্জ)

শিল্প ও বিনিয়োগ
• মোট শিল্পপ্রতিষ্ঠান: ৫৬৪টি
• চালু: ৪৪৮
• বাস্তবায়নাধীন: ১১৬
• মোট বিনিয়োগ: ৭,২৯৫.৩ মিলিয়ন মার্কিন ডলার
• মোট রপ্তানি: ১,২৫,১৯২.৮১ মিলিয়ন মার্কিন ডলার
• বিনিয়োগকারী দেশ: ৩৮টি

jagonews24.comছবি: বেপজার সৌজন্যে

প্রধান বিনিয়োগকারী দেশ
চীন, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ভারত, শ্রীলঙ্কা, কানাডা, মালয়েশিয়া, জার্মানি, সিঙ্গাপুর, নেদারল্যান্ডস, পাকিস্তান, ডেনমার্ক, বাংলাদেশসহ অন্যান্য।

কর্মসংস্থান
• বাংলাদেশি: ৫,৫১,২৪৮ জন

পণ্যের বৈচিত্রায়ন
উৎপাদিত পণ্যের মধ্যে-
• তৈরি পোশাক: ৩২%
• অন্যান্য বৈচিত্রময় পণ্য: ৬৮%

জাতীয় অর্থনীতিতে অবদান (২০২৪-২৫ অর্থবছর)
• জাতীয় রপ্তানির ১৭.০৩%
• মোট এফডিআই-এর ১৯.৪৭%

jagonews24.comছবি: বেপজার সৌজন্যে

প্রতি একর জমির অবদান
• বিনিয়োগ: ৩ মিলিয়ন মার্কিন ডলার
• রপ্তানি: ৫১ মিলিয়ন মার্কিন ডলার
• কর্মসংস্থান: ২২৬ জন
• বার্ষিক রিটার্ন: ১৩.৮২ কোটি টাকা

এমএমকে/

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow