যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডা অঙ্গরাজ্য থেকে ঐতিহাসিক আর্টেমিস-২ মহাকাশ মিশনের উৎক্ষেপণ সফলভাবে শেষ হয়েছে। এই অভিযানের মাধ্যমে চারজন নভোচারী চাঁদের চারপাশ প্রদক্ষিণের এক ঐতিহাসিক যাত্রায় শামিল হলেন, যা গত ৫৩ বছরের মধ্যে মানুষের প্রথম নিম্ন-পৃথিবী কক্ষপথ ছাড়িয়ে মহাকাশে পাড়ি জমানোর নজির।
স্থানীয় সময় বুধবার (১ মার্চ) ও বাংলাদেশ সময় বৃহস্পতিবার (২ এপ্রিল) ভোরে যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডার কেনেডি স্পেস সেন্টার থেকে এই মিশনটি শুরু হয়। এটি মার্কিন মহাকাশ সংস্থা নাসার মানুষকে পুনরায় চাঁদে ফিরিয়ে নেওয়া এবং ভবিষ্যতে মঙ্গলে নভোচারী পাঠানোর পরিকল্পনার একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ।
১৯৭২ সালে অ্যাপোলো-১৭ মিশনের পর এই প্রথম কোনো মানুষ চাঁদের পথে রওনা হচ্ছে। ফ্লোরিডার কেপ ক্যানাভেরালে অবস্থিত নাসার কেনেডি স্পেস সেন্টার থেকে ৩২ তলা উচ্চতার একটি রকেট মহাকাশে যাত্রা শুরু করে। এই মাহেন্দ্রক্ষণটি দেখার জন্য সেখানে হাজার হাজার মানুষ সমবেত হয়েছিলেন।
আর্টেমিস-২ মিশনের চারজন সদস্য হলেন—নাসার নভোচারী রিড ওয়াইজম্যান, ভিক্টর গ্লোভার ও ক্রিস্টিনা কচ, এবং কানাডিয়ান স্পেস এজেন্সির নভোচারী জেরেমি হ্যানসেন। তারা চাঁদের চারপাশে প্রায় ১০ দিনের এক অভিযানে রয়েছেন, যা মানুষকে কয়েক দশকের মধ্যে মহাকাশের সবচেয়ে দূরবর্তী স্থানে নিয়ে যাবে।
এই রুদ্ধশ্বাস অভিযানে ওরিয়ন মহাকাশযানের প্রতিটি সিস্টেম নিখুঁতভাবে পরীক্ষা করা হবে, যা ভবিষ্যতে চাঁদে স্থায়ী ঘাঁটি ও মঙ্গল অভিযানের পথ সহজ করবে।
আর্টেমিস-২ মিশনের উৎক্ষেপণ পরিচালক চার্লি ব্ল্যাকওয়েল-থম্পসন তাদের উদ্দেশ্যে বলেন, ‘এই ঐতিহাসিক মিশনে আপনারা সঙ্গে নিয়ে যাচ্ছেন আর্টেমিস টিমের প্রাণশক্তি, আমেরিকান জনতা ও বিশ্বজুড়ে আমাদের অংশীদারদের সাহসী মনোবল এবং একটি নতুন প্রজন্মের আশা ও স্বপ্ন। শুভকামনা, আর্টেমিস ২। এগিয়ে চলো।’
উড্ডয়নের পাঁচ মিনিট পর কমান্ডার ওয়াইজম্যান ক্যাপসুল থেকে তাদের লক্ষ্যবস্তু দেখে বলেন, ‘আমরা একটি সুন্দর চন্দ্রোদয় দেখতে পাচ্ছি, আমরা ঠিক সেদিকেই এগিয়ে চলেছি।’
উৎক্ষেপণের কয়েক ঘণ্টা আগে চরম উত্তেজনা
উৎক্ষেপণের কয়েক ঘণ্টা আগে যখন রকেটে হাইড্রোজেন জ্বালানি ভরা শুরু হয়, তখন চরম উত্তেজনা বিরাজ করছিল। এটি একটি অত্যন্ত সংবেদনশীল পর্যায়, কারণ চলতি বছরের শুরুতে একটি কাউন্টডাউন পরীক্ষার সময় এই ধাপে বিপজ্জনকভাবে জ্বালানি লিক হয়েছিল, যার ফলে উৎক্ষেপণ দীর্ঘসময় পিছিয়ে যায়।
নাসার স্বস্তির বিষয় হলো, এবার বড় ধরনের কোনো হাইড্রোজেন লিক ধরা পড়েনি। লঞ্চ টিম সফলভাবে স্পেস লঞ্চ সিস্টেম রকেটে ৭ লাখ গ্যালনেরও বেশি (২৬ লাখ লিটার) জ্বালানি লোড করে। এই মসৃণ অপারেশনটিই আর্টেমিস ২ ক্রুদের রকেটে আরোহণের পথ প্রশস্ত করে দেয়।
উৎক্ষেপণের আগে নাসাকে বেশ কিছু প্রযুক্তিগত সমস্যাও সমাধান করতে হয়েছে, তবে সেগুলো উৎক্ষেপণে কোনো বিলম্ব ঘটায়নি। এর মধ্যে একটি সমস্যা ছিল রকেটের ‘ফ্লাইট-টার্মিনেশন সিস্টেম’-এ সিগন্যাল পৌঁছানো নিয়ে। এই সিস্টেমটি মূলত এমনভাবে ডিজাইন করা হয়েছে যাতে রকেট যদি লক্ষ্যচ্যুত হয়ে জনবসতিপূর্ণ এলাকার জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়ায়, তবে এটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে রকেটটি ধ্বংস করে দেবে।
নাসার মতে, সেই সমস্যাটি দ্রুত সমাধান করা হয়েছিল। এছাড়াও ইঞ্জিনিয়াররা ওরিয়ন ক্যাপসুলের ‘লঞ্চ-অ্যাবোর্ট সিস্টেম’-এর একটি ব্যাটারি নিয়ে কাজ করেছিলেন যার তাপমাত্রা প্রত্যাশিত সীমার বাইরে ছিল। তবে সমস্যাটি ঠিক করা হয় এবং তা উৎক্ষেপণে কোনো বাধা সৃষ্টি করেনি।