অনলাইন প্রচারণায় তথ্যদূষণ, সামাজিক মাধ্যমের প্রতিক্রিয়া অপর্যাপ্ত

বাংলাদেশের ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনলাইন প্রচারণায় ব্যাপক তথ্যদূষণ ও বিভ্রান্তিকর কনটেন্টে প্রভাবিত ছিল এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমগুলোর প্রতিক্রিয়া ছিল অপর্যাপ্ত। ইউরোপীয় ইউনিয়নের নির্বাচন পর্যবেক্ষক মিশনের (ইইউ ইওএম) প্রাথমিক বিবৃতিতে এ তথ্য উল্লেখ করা হয়েছে। শনিবার (১৪ ফেব্রুয়ারি) রাজধানীর হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালে আয়োজিত ব্রিফিংয়ে নির্বাচন পর্যবেক্ষণের বিভিন্ন দিক তুলে ধরেন ইইউ নির্বাচন পর্যবেক্ষক মিশনের প্রধান ইভার্স ইজাবস এবং পার্লামেন্ট প্রতিনিধিদলের প্রধান টোমাস জেদকোভস্কি। ইইউ ইওএমের সারসংক্ষেপ প্রতিবেদনে বলা হয়, প্রায় ৫৫.৬ মিলিয়ন তরুণ ভোটারকে প্রভাবিত করতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ছিল প্রধান মাধ্যম। তবে বিপুল পরিমাণ বিভ্রান্তিকর তথ্য রাজনৈতিক বিতর্কের মান ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। দলীয় অ্যাকাউন্টগুলো নিজেদের রাজনৈতিক অ্যাজেন্ডা প্রচারের পাশাপাশি প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে আক্রমণাত্মক কনটেন্ট ছড়িয়েছে। পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, জামায়াত ও এনসিপি–সমর্থিত অ্যাকাউন্টগুলো সম্মিলিতভাবে বিএনপির তুলনায় প্রায় দশগুণ বেশি ভিউ অর্জন করেছে (১২৯ মিলিয়ন বনাম ১৩ মিলিয়ন)। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ফেসবুক ও ইউটিউব

অনলাইন প্রচারণায় তথ্যদূষণ, সামাজিক মাধ্যমের প্রতিক্রিয়া অপর্যাপ্ত

বাংলাদেশের ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনলাইন প্রচারণায় ব্যাপক তথ্যদূষণ ও বিভ্রান্তিকর কনটেন্টে প্রভাবিত ছিল এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমগুলোর প্রতিক্রিয়া ছিল অপর্যাপ্ত। ইউরোপীয় ইউনিয়নের নির্বাচন পর্যবেক্ষক মিশনের (ইইউ ইওএম) প্রাথমিক বিবৃতিতে এ তথ্য উল্লেখ করা হয়েছে।

শনিবার (১৪ ফেব্রুয়ারি) রাজধানীর হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালে আয়োজিত ব্রিফিংয়ে নির্বাচন পর্যবেক্ষণের বিভিন্ন দিক তুলে ধরেন ইইউ নির্বাচন পর্যবেক্ষক মিশনের প্রধান ইভার্স ইজাবস এবং পার্লামেন্ট প্রতিনিধিদলের প্রধান টোমাস জেদকোভস্কি।

ইইউ ইওএমের সারসংক্ষেপ প্রতিবেদনে বলা হয়, প্রায় ৫৫.৬ মিলিয়ন তরুণ ভোটারকে প্রভাবিত করতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ছিল প্রধান মাধ্যম। তবে বিপুল পরিমাণ বিভ্রান্তিকর তথ্য রাজনৈতিক বিতর্কের মান ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। দলীয় অ্যাকাউন্টগুলো নিজেদের রাজনৈতিক অ্যাজেন্ডা প্রচারের পাশাপাশি প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে আক্রমণাত্মক কনটেন্ট ছড়িয়েছে।

পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, জামায়াত ও এনসিপি–সমর্থিত অ্যাকাউন্টগুলো সম্মিলিতভাবে বিএনপির তুলনায় প্রায় দশগুণ বেশি ভিউ অর্জন করেছে (১২৯ মিলিয়ন বনাম ১৩ মিলিয়ন)।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ফেসবুক ও ইউটিউব প্রভাবশালী থাকলেও টিকটক ছিল বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ প্ল্যাটফর্ম। ট্রেন্ডিং হ্যাশট্যাগগুলো প্রায় পুরোপুরি বিএনপি ও জামায়াত–সমর্থিত রাজনৈতিক কনটেন্টের দখলে ছিল। অনলাইন আলোচনায় তীব্র মেরুকরণ দেখা গেছে এবং পাবলিক গ্রুপ ও দলীয় অ্যাকাউন্টে রাজনৈতিক কাদা ছোড়াছুড়ি ছিল ব্যাপক।

২২ জানুয়ারি থেকে এনসিপি ও জামায়াত–ঘনিষ্ঠ অ্যাকাউন্টগুলোর অন্তত এক-পঞ্চমাংশ পোস্ট বিএনপিকে হেয় করার উদ্দেশ্যে প্রকাশিত হয়েছে। এসব পোস্টে দুর্নীতি, ঋণখেলাপি ও চাঁদাবাজির অভিযোগ তুলে বিএনপিকে ‘ভারতপন্থি’ দল হিসেবে উপস্থাপন করা হয়।

অন্যদিকে, বিএনপি–ঘনিষ্ঠ অ্যাকাউন্টগুলোর নেতিবাচক পোস্টের হার তুলনামূলক কম ছিল এবং সেখানে মূলত জামায়াতের বিরুদ্ধে ধর্মীয় অনুভূতি ব্যবহারের অভিযোগ তোলা হয়েছে। ইইউ ইওএম মোট ৪০ হাজারের বেশি পোস্ট বিশ্লেষণ করেছে, যেখানে বিএনপি, এনসিপি ও জামায়াত–ঘনিষ্ঠ পোস্টের সংখ্যা প্রায় সমান ছিল।

ভুয়া তথ্য দেশ-বিদেশ থেকে ভাইরাল আকারে ছড়িয়ে পড়ে বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। পর্যবেক্ষণে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়া ২৩টি বিভাজনমূলক কনটেন্ট শনাক্ত করা হয়েছে, যেগুলোর প্রতিটিতে গড়ে প্রায় ১০ লাখ ভিউ হয়েছে। প্রধান বর্ণনাগুলো বিএনপি-জামায়াত উত্তেজনাকে কেন্দ্র করে তৈরি হয়েছে।

কয়েকটি কারসাজি করা ভাইরাল ভিডিওতে অভিযোগ করা হয়, বিএনপি প্রার্থীরা নারীদের ওপর হামলা করেছেন। এ ধরনের দাবি অন্তত এক হাজার পোস্টে পুনরাবৃত্তি হয়ে বিএনপিকে ‘নারী নির্যাতনকারী’ হিসেবে উপস্থাপন করা হয়। প্রচারণার শেষ দিকে জামায়াত-সমর্থিত অ্যাকাউন্টগুলো একই বর্ণনাকে ঘুরিয়ে জামায়াতকে ‘নারীর রক্ষক’ দল হিসেবে তুলে ধরার চেষ্টা করেছে।

আইনে নিষিদ্ধ থাকা সত্ত্বেও, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ব্যবহার করে কৃত্রিম জনসমর্থন দেখানো এবং ভোটারদের বিভ্রান্ত করার ঘটনাও শনাক্ত করা হয়েছে। ইইউ ইওএম ১৬১টি এআই-নির্মিত ভিডিও চিহ্নিত করেছে। এর মধ্যে অর্ধেকের বেশি জামায়াতের পক্ষে, প্রায় এক-পঞ্চমাংশ বিএনপির পক্ষে এবং বাকিগুলোতে রাজনীতিবিদদের ভুয়া বক্তব্য ও কণ্ঠস্বর নকল (ভয়েস ক্লোনিং) করা হয়েছে।

ডিস-ইনফরমেশন মোকাবিলায় জাতীয় পর্যায়ে বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হলেও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমগুলোর ধীর প্রতিক্রিয়া এসব উদ্যোগের ইতিবাচক প্রভাব কমিয়ে দেয় বলে প্রতিবেদনে বলা হয়। নির্বাচন কমিশনের আইনশৃঙ্খলা সেল ক্ষতিকর কনটেন্ট পর্যবেক্ষণ করেছে এবং জেলায় জেলায় পুলিশ বিভিন্ন ফেসবুক পেজ হাতে-কলমে যাচাই করেছে।

বিভিন্ন ফ্যাক্ট-চেকিং উদ্যোগ ভুয়া বর্ণনা শনাক্ত করে সন্দেহজনক অ্যাকাউন্ট চিহ্নিত করলেও সব সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম যথাযথ সাড়া দেয়নি। কেবল টিকটকের সঙ্গে নির্বাচন কমিশনের আনুষ্ঠানিক চুক্তি ছিল এবং তারা দেশভিত্তিক সহায়তা দিয়েছে। অন্যদিকে, গুগলের বাংলাদেশভিত্তিক কোনো নির্বাচন সেল ছিল না এবং মেটার নীতিগত ধীর প্রতিক্রিয়ার কারণে ভাইরাল বিভ্রান্তিমূলক কনটেন্ট দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে, যা সামগ্রিক তথ্য পরিবেশের অখণ্ডতাকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে।

জেপিআই/এমএএইচ/এএসএম

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow