অনুভবে আছে অনুভূতি, তবে ক্ষমতায় রয়েছে সীমাবদ্ধতা

আমি মানুষ। আমি আমার নিজের অনুভূতি অনুভব করি, অনুভূতি প্রকাশ করি। অনুভূতি কখনো খারাপ, কখনো ভালো। আমি উপলব্ধি করি, আমি উদাসীন হয়ে পড়ি, আমি উদ্বিগ্ন হয়ে উঠি। আমি আনন্দ বোধ করি, আনন্দে আত্মহারা হই, আনন্দে উল্লাসিত হই। কিন্তু সমাধানের ক্ষেত্রে এসে স্পষ্ট হয়ে যায় আমার সীমাবদ্ধতা। এই সীমাবদ্ধতাই আমার আমি। পুরো শরীরের যে কোনো অংশে সামান্যতম আঘাত লাগলেও আমি তা সঙ্গে সঙ্গে টের পাই। তারপর স্বাভাবিকভাবেই চেষ্টা করি সেই সমস্যার সমাধান করতে। কিন্তু ঠিক এখান থেকেই শুরু হয় আমার সীমাবদ্ধতার চ্যালেঞ্জ। কারণ অনুভব করার ক্ষমতা আমার আছে, কিন্তু সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করার ক্ষমতা আমার নেই। আমার চিন্তার বিস্তার আমাকে সৃষ্টির রহস্যের শেষ সীমা পর্যন্ত পৌঁছাতে উদ্বুদ্ধ করে। আমি জানতে চাই, এই অস্তিত্বের শেষ কোথায়, কোথা থেকে শুরু, কোথায় এর সমাপ্তি। কিন্তু জানি, কোনো এক পর্যায়ে এসে আমি থেমে যাবো। কারণ আমার জ্ঞান, ক্ষমতা এবং উপলব্ধিরও একটি সীমা আছে। কিন্তু শুধু একজনের নেই সেই সীমাবদ্ধতা, যাকে আমি মনেপ্রাণে স্রষ্টা বলে বিশ্বাস করি। কিন্তু এখানেই আরেকটি প্রশ্ন এসে দাঁড়ায়। যদি আমি মানুষ হই, তাহলে কখন আমি মানুষ থ

অনুভবে আছে অনুভূতি, তবে ক্ষমতায় রয়েছে সীমাবদ্ধতা

আমি মানুষ। আমি আমার নিজের অনুভূতি অনুভব করি, অনুভূতি প্রকাশ করি। অনুভূতি কখনো খারাপ, কখনো ভালো। আমি উপলব্ধি করি, আমি উদাসীন হয়ে পড়ি, আমি উদ্বিগ্ন হয়ে উঠি। আমি আনন্দ বোধ করি, আনন্দে আত্মহারা হই, আনন্দে উল্লাসিত হই। কিন্তু সমাধানের ক্ষেত্রে এসে স্পষ্ট হয়ে যায় আমার সীমাবদ্ধতা। এই সীমাবদ্ধতাই আমার আমি।

পুরো শরীরের যে কোনো অংশে সামান্যতম আঘাত লাগলেও আমি তা সঙ্গে সঙ্গে টের পাই। তারপর স্বাভাবিকভাবেই চেষ্টা করি সেই সমস্যার সমাধান করতে। কিন্তু ঠিক এখান থেকেই শুরু হয় আমার সীমাবদ্ধতার চ্যালেঞ্জ। কারণ অনুভব করার ক্ষমতা আমার আছে, কিন্তু সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করার ক্ষমতা আমার নেই।

আমার চিন্তার বিস্তার আমাকে সৃষ্টির রহস্যের শেষ সীমা পর্যন্ত পৌঁছাতে উদ্বুদ্ধ করে। আমি জানতে চাই, এই অস্তিত্বের শেষ কোথায়, কোথা থেকে শুরু, কোথায় এর সমাপ্তি। কিন্তু জানি, কোনো এক পর্যায়ে এসে আমি থেমে যাবো। কারণ আমার জ্ঞান, ক্ষমতা এবং উপলব্ধিরও একটি সীমা আছে। কিন্তু শুধু একজনের নেই সেই সীমাবদ্ধতা, যাকে আমি মনেপ্রাণে স্রষ্টা বলে বিশ্বাস করি।

কিন্তু এখানেই আরেকটি প্রশ্ন এসে দাঁড়ায়। যদি আমি মানুষ হই, তাহলে কখন আমি মানুষ থেকে অমানুষ হয়ে যাই এবং কেন?

আমরা মানুষ থেকে অমানুষ হয়ে যাই ঠিক তখনই, যখন অনুভূতি থাকা সত্ত্বেও আমরা অনুভব করা বন্ধ করে দিই। যখন অন্যের কষ্ট আমাদের স্পর্শ করে না, অন্যায়কে অন্যায় মনে হয় না, ক্ষমতা বিবেককে অতিক্রম করে যায়, কিংবা স্বার্থ মানবিকতাকে গ্রাস করে ফেলে। মানুষ হওয়া শুধু শরীর বা বুদ্ধির পরিচয় নয়, মানুষ হওয়া মূলত অনুভূতি, বিবেক, দায়বোধ এবং নিজের সীমাবদ্ধতা স্বীকার করার ক্ষমতার নাম।

অমানুষ আসলে কোনো আলাদা সৃষ্টি নয়। অনেক সময় অমানুষ মানুষের মধ্যেই জন্ম নেয়। যখন একজন মানুষ নিজের ক্ষমতা, ক্রোধ, লোভ, প্রতিশোধ কিংবা অহংকারকে নিয়ন্ত্রণ করতে ব্যর্থ হয়, তখন তার ভেতরের মানবিক অংশ ধীরে ধীরে ক্ষয় হতে থাকে। তখন সে অনুভব করতে পারে, কিন্তু উপলব্ধি করে না। সে দেখতে পারে, কিন্তু সত্যিকার অর্থে আর দেখে না।

তবে অমানুষেরও সীমাবদ্ধতা আছে। কারণ ধ্বংসের শক্তি যত বড়ই হোক, তা স্থায়ী নয়। মানুষের ভেতরে যেমন ভালোবাসা, সহানুভূতি ও সৃষ্টির শক্তি আছে, তেমনি আছে ধ্বংস, লোভ, হিংসা ও আধিপত্যের প্রবণতা। কেউ একে প্রবৃত্তি বলে, কেউ মনস্তত্ত্ব বলে, কেউ সামাজিক অবক্ষয় বলে, আবার কেউ আধ্যাত্মিক বিচ্যুতি বলে ব্যাখ্যা করে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সিদ্ধান্ত নেয় মানুষ নিজেই, সে নিজের ভেতরের কোন শক্তিকে বড় হতে দেবে।

সম্ভবত এই কারণেই মানুষ হওয়া এত কঠিন। কারণ মানুষ জন্মগতভাবে মানুষ হলেও, মানবিক থাকা একটি আজীবনের সাধনা।

হয়তো মানুষের সবচেয়ে বড় শক্তি তার সীমাহীন ক্ষমতায় নয়, বরং তার সীমাবদ্ধতাকে উপলব্ধি করার ক্ষমতায়। কারণ মানুষ অপূর্ণ বলেই সে প্রশ্ন করে, ভুল করে, শিখে, অনুতপ্ত হয়, ভালোবাসে। কিন্তু যখন সে নিজের সীমাবদ্ধতাকে অস্বীকার করে এবং অন্যের অস্তিত্ব, অনুভূতি বা কষ্টকে তুচ্ছ করতে শুরু করে, তখন তার ভেতরের মানুষ ধীরে ধীরে নিঃশেষ হয়ে যায়। তখন বাহ্যিকভাবে মানুষ থাকলেও, মানবিকতার জায়গায় জন্ম নেয় অমানুষ।

মানুষ সবকিছু জানতে চায়, সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করতে চায়, সব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে চায়। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তাকে মেনে নিতেই হয় যে সীমাহীন ক্ষমতা মানুষের নয়। আর হয়তো এই উপলব্ধিই মানুষকে আবার মানুষ হওয়ার পথে ফিরিয়ে আনতে পারে।

একটি ব্যাকটেরিয়া যেমন মানুষের চোখে ধরা পড়ে না ঠিক তেমনি মানুষও মহাবিশ্বের বিশালতার সামনে অদৃশ্যের মতো ক্ষুদ্র

কারণ অনুভূতি থাকা যথেষ্ট নয়, ক্ষমতা থাকাও যথেষ্ট নয়। মানুষ হওয়ার জন্য প্রয়োজন বিবেক, দায়বোধ, বিনয় এবং নিজের সীমাবদ্ধতাকে স্বীকার করার সাহস। আর সেই উপলব্ধির শেষ প্রান্তে দাঁড়িয়ে আমি আবারও ফিরে যাই সেই বিশ্বাসে, যেখানে আমি স্বীকার করি, আমার সীমা আছে, আমার অপূর্ণতা আছে, কিন্তু যাকে আমি স্রষ্টা বলে বিশ্বাস করি, তার নেই কোনো সীমাবদ্ধতা।

রহমান মৃধা, গবেষক ও লেখক, সাবেক পরিচালক, ফাইজার, সুইডেন।
[email protected]

এমআরএম

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow