অন্নপূর্ণা বেস ক্যাম্প : স্বপ্ন, সংগ্রাম আর আগুনরঙা এক ভোরের গল্প

২৫ মার্চ ২০২৬। তারিখটা আমার জীবনে আলাদা করে লেখা থাকবে। এই দিন আমি দাঁড়িয়ে ছিলাম অন্নপূর্ণা বেস ক্যাম্পে, চারদিকে তুষারে মোড়া পাহাড়, নিঃশব্দ অথচ প্রচণ্ড শক্তিশালী এক প্রকৃতির মাঝে। এই জায়গায় পৌঁছানোটা শুধু একটা ট্রেক শেষ করা নয়, বরং নিজের ভেতরের সীমাবদ্ধতাকে ভেঙে ফেলার মতো এক অভিজ্ঞতা। আমাদের দলটা ছিল বেশ প্রাণবন্ত। আমরা ছিলাম ১০ জন ভ্রমণপিপাসু মানুষ, সঙ্গে একজন গাইড আর দুইজন পোর্টার। মোট ১৩ জনের এই দল ছয় দিনের ট্রেক শেষ করেছি। চার দিন ধরে শুধু উঠেছি, আর দুই দিন নেমেছি। কিন্তু এই হিসাবের ভেতরে যে গল্পটা আছে, সেটা অনেক বেশি গভীর। ঢাকা থেকে কাঠমান্ডু পৌঁছানোর পর প্রথম দিনটা কেটেছিল বিশ্রাম আর প্রস্তুতিতে। শহরটা এক অদ্ভুত মিশ্রণ, পুরনো আর নতুনের, ধর্ম আর দৈনন্দিন জীবনের। পরদিন কাঠমান্ডু ঘোরা, কিছু কেনাকাটা, তারপর রাতে বাসে চড়ে পোখারার দিকে রওনা। শহরের আলো ধীরে ধীরে ফিকে হয়ে এলে মনে হচ্ছিল, আমি যেন নিজের পরিচিত জীবনটা পিছনে ফেলে এক নতুন জগতে ঢুকে পড়ছি। পোখারা পৌঁছানোর পর থেকেই আসল যাত্রা শুরু। ঝিনু পর্যন্ত জিপে গিয়ে তারপর হাঁটা। প্রথম দিনই বুঝে গিয়েছিলাম, এই ট্রেক সহজ কিছু হবে না। ঝুলন্

অন্নপূর্ণা বেস ক্যাম্প : স্বপ্ন, সংগ্রাম আর আগুনরঙা এক ভোরের গল্প

২৫ মার্চ ২০২৬। তারিখটা আমার জীবনে আলাদা করে লেখা থাকবে। এই দিন আমি দাঁড়িয়ে ছিলাম অন্নপূর্ণা বেস ক্যাম্পে, চারদিকে তুষারে মোড়া পাহাড়, নিঃশব্দ অথচ প্রচণ্ড শক্তিশালী এক প্রকৃতির মাঝে। এই জায়গায় পৌঁছানোটা শুধু একটা ট্রেক শেষ করা নয়, বরং নিজের ভেতরের সীমাবদ্ধতাকে ভেঙে ফেলার মতো এক অভিজ্ঞতা।

আমাদের দলটা ছিল বেশ প্রাণবন্ত। আমরা ছিলাম ১০ জন ভ্রমণপিপাসু মানুষ, সঙ্গে একজন গাইড আর দুইজন পোর্টার। মোট ১৩ জনের এই দল ছয় দিনের ট্রেক শেষ করেছি। চার দিন ধরে শুধু উঠেছি, আর দুই দিন নেমেছি। কিন্তু এই হিসাবের ভেতরে যে গল্পটা আছে, সেটা অনেক বেশি গভীর।

ঢাকা থেকে কাঠমান্ডু পৌঁছানোর পর প্রথম দিনটা কেটেছিল বিশ্রাম আর প্রস্তুতিতে। শহরটা এক অদ্ভুত মিশ্রণ, পুরনো আর নতুনের, ধর্ম আর দৈনন্দিন জীবনের। পরদিন কাঠমান্ডু ঘোরা, কিছু কেনাকাটা, তারপর রাতে বাসে চড়ে পোখারার দিকে রওনা। শহরের আলো ধীরে ধীরে ফিকে হয়ে এলে মনে হচ্ছিল, আমি যেন নিজের পরিচিত জীবনটা পিছনে ফেলে এক নতুন জগতে ঢুকে পড়ছি।

পোখারা পৌঁছানোর পর থেকেই আসল যাত্রা শুরু। ঝিনু পর্যন্ত জিপে গিয়ে তারপর হাঁটা। প্রথম দিনই বুঝে গিয়েছিলাম, এই ট্রেক সহজ কিছু হবে না। ঝুলন্ত ব্রিজ পার হয়েছি, নিচে গর্জন করা নদী, চারপাশে সবুজ পাহাড়। হাঁটতে হাঁটতে বিকেলের দিকে পৌঁছালাম চমরং গ্রামে। পাহাড়ের গায়ে সাজানো ঘরগুলো দেখে মনে হচ্ছিল, যেন ছবির ভেতরে ঢুকে পড়েছি। সেই রাতটা ছিল শান্ত, কিন্তু ভেতরে ভেতরে আমি জানতাম, আসল চ্যালেঞ্জ সামনে।

পরদিন চমরং থেকে বাম্বুর পথে বের হলাম। এই দিনের পথটা ছিল বেশ কষ্টকর। বারবার খাড়া সিঁড়ি দিয়ে নামা, আবার ওঠা। শরীর তখনই প্রতিবাদ শুরু করেছে। দুপুরে আপার সিনুয়ায় থেমে লাঞ্চ করলাম। জায়গাটা অসাধারণ সুন্দর। মেঘগুলো এত নিচে নেমে এসেছিল যে হাত বাড়ালেই ছোঁয়া যায় মনে হচ্ছিল। কিছুক্ষণ বসে থাকার পর আবার হাঁটা শুরু। বিকেলের দিকে, প্রায় চারটার পর হঠাৎ বৃষ্টি শুরু হলো। পাহাড়ি সেই বৃষ্টিতে ভিজতে ভিজতেই আমরা এগিয়ে চললাম। দিন শেষে পৌঁছালাম বাম্বুতে। চারপাশে শুধু বাঁশ আর জঙ্গলের শব্দ। এখানে রাত কাটানোর অভিজ্ঞতা ছিল অন্যরকম, একেবারে প্রকৃতির মাঝে।

তৃতীয় দিনের পথ আরও চ্যালেঞ্জিং। বাম্বু থেকে দেউরালির দিকে যেতে যেতে পরিবেশ বদলে যেতে লাগল। সবুজ কমে গিয়ে পাথুরে, রুক্ষ একটা আবহ তৈরি হলো। পথে হিমালয়া এলাকায় লাঞ্চ করলাম। এখানে এসে প্রথমবার মনে হলো, আমরা সত্যিই হিমালয়ের গভীরে ঢুকে পড়েছি। বাতাস ঠান্ডা, নিস্তব্ধতা অন্যরকম। বিকেলের দিকে, চারটার পর আবার আবহাওয়া রূপ পাল্টাল। শুরু হলো শিলাবৃষ্টি। ছোট ছোট বরফকণাগুলো শরীরে আঘাত করছিল, পথ আরও কঠিন হয়ে উঠছিল। দেউরালিতে পৌঁছানোর পর ঠান্ডা আরও বাড়ল, আর শরীর বুঝতে শুরু করল যে আমরা উচ্চতায় উঠছি।

চতুর্থ দিনটা আমার জীবনের সবচেয়ে কঠিন দিনগুলোর একটি। সকালে দেউরালি থেকে বের হয়ে আমরা মাচাপুচারে বেস ক্যাম্পে পৌঁছালাম। সেখানে লাঞ্চ করলাম। চারপাশে শুধু বরফ আর পাহাড়। কোনো শব্দ নেই, শুধু বাতাসের হালকা শোঁ শোঁ শব্দ। এই জায়গাটা আমাকে ভেতর থেকে নীরব করে দিয়েছিল।

তারপর শুরু হলো শেষ ধাপ। মাচাপুচারে বেস ক্যাম্প থেকে অন্নপূর্ণা বেস ক্যাম্পের পথে হঠাৎ করে শুরু হলো তুষারঝড়। চারপাশ সাদা হয়ে গেল, সামনে পথ দেখা কঠিন হয়ে পড়ল। সেই তুষারঝড়ের মধ্য দিয়েই ধীরে ধীরে এগিয়ে যেতে হয়েছে। ঠান্ডা এতটাই ছিল যে হাত-পা অবশ হয়ে আসছিল। প্রতিটা পদক্ষেপ নিতে কষ্ট হচ্ছিল, কিন্তু থামার কোনো সুযোগ নেই। সেই মুহূর্তে বুঝেছিলাম, পাহাড় আপনাকে কিছুই সহজে দেবে না।

অবশেষে যখন অন্নপূর্ণা বেস ক্যাম্পে পৌঁছালাম, তখন মনে হচ্ছিল, আমি যেন নিজের এক অংশকে জয় করেছি। ক্লান্তি ছিল, কিন্তু তার চেয়েও বড় ছিল এক অদ্ভুত শান্তি। পরদিন ভোরে যে দৃশ্যটা দেখেছি, সেটা আমার জীবনের সবচেয়ে সুন্দর দৃশ্য। সূর্য ওঠার সঙ্গে সঙ্গে পাহাড়গুলো ধীরে ধীরে সোনালি হয়ে উঠল, তারপর লালচে আভা। মনে হচ্ছিল পুরো পাহাড় যেন আগুনে জ্বলছে। সেই আলোয় দাঁড়িয়ে আমি বুঝলাম, এই পৃথিবীতে এমন কিছু মুহূর্ত আছে, যা ভাষায় প্রকাশ করা যায় না, শুধু অনুভব করা যায়।

ফেরার পথটা তুলনামূলক সহজ হলেও শরীর তখন অনেক ক্লান্ত। এবিসি থেকে নেমে হিমালয়া এলাকায় আবার লাঞ্চ করলাম। এরপর বাম্বুতে রাত কাটালাম। পরের দিন চমরংয়ে লাঞ্চ করে ঝিনু হয়ে গাড়িতে পোখারা ফিরে এলাম। পরিচিত সেই পথগুলো এবার যেন অন্যরকম লাগছিল, কারণ এবার আমি জানি, আমি কোথায় গিয়েছিলাম।

এই পুরো যাত্রাটা আমার জন্য খুব ব্যক্তিগত। আমি বাংলাদেশের অনেক পাহাড়ে উঠেছি, কিন্তু অন্নপূর্ণা বেস ক্যাম্প ছিল আমার বহুদিনের স্বপ্ন। সেই স্বপ্ন পূরণ করতে গিয়ে আমি নিজের ভেতরের শক্তিটাকে নতুন করে চিনেছি।

এই জায়গায় এসে একটা কথা না বললেই নয়। আমার পেশাগত জীবন আর ব্যক্তিগত জীবনের কঠিন সময়গুলোতে যে প্রতিষ্ঠান সবসময় আমার পাশে ছিল, সেই আনোয়ার গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজের প্রতি আমি গভীরভাবে কৃতজ্ঞ। এই অর্জন আমি তাদেরকেই উৎসর্গ করছি।

শেষ পর্যন্ত, এই ট্রেক আমাকে একটা জিনিস শিখিয়েছে। স্বপ্ন যত বড়ই হোক, পথ যদি কঠিনও হয়, আপনি যদি হাঁটা বন্ধ না করেন, একদিন ঠিকই পৌঁছে যাবেন।

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow