অর্থনৈতিক নিরাপত্তা এসেছে, এখন দরকার মানসম্মত প্রশিক্ষণ ও অবকাঠামো

খেলাধুলাকে আনুষ্ঠানিকভাবে পেশা হিসেবে স্বীকৃতি দিতে দেশের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো ১২৯ জন ক্রীড়াবিদকে মাসিক ভাতার আওতায় এনেছে সরকার। সোমবার প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে এ কর্মসূচির উদ্বোধনের মধ্য দিয়ে সরকার গঠনের মাত্র দুই মাসের মধ্যে নিজেদের নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন করলেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। সদ্যসমাপ্ত সংসদ নির্বাচনে ঢাকা মহানগরীতে বিএনপির বেশিরভাগ প্রার্থী জয়লাভ করলেও পরাজিত হন দলটির অন্যতম নেতা আমিনুল হক। তবে নির্বাচনে হারলেও তাকে টেকনোক্র্যাট কোটায় ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব দেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। দলীয় সূত্রগুলোর মতে, এই নিয়োগের পেছনে প্রধান কারণ ছিল ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলনে আমিনুলের দীর্ঘ রাজনৈতিক ত্যাগ এবং দেশের ক্রীড়াঙ্গন নিয়ে তার সুস্পষ্ট রূপকল্প। জাতীয় ফুটবল দলের সাবেক এই অধিনায়ক খেলা ছেড়ে রাজনীতিতে যুক্ত হওয়ার পর ঢাকা মহানগরীতে রাজপথের আন্দোলনে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন। বিগত সরকারের সময় তিনি বারবার কারাবরণ করেন এবং হামলা-মামলা, নির্যাতনের শিকার হন। চরম প্রতিকূলতার মধ্যেও দলের প্রতি তার অবিচল আনুগত্য তারেক রহমানের দৃষ্টি আকর্ষণ করে। এর বাইরে, ক্রীড়াঙ্গনকে রাজন

অর্থনৈতিক নিরাপত্তা এসেছে, এখন দরকার মানসম্মত প্রশিক্ষণ ও অবকাঠামো

খেলাধুলাকে আনুষ্ঠানিকভাবে পেশা হিসেবে স্বীকৃতি দিতে দেশের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো ১২৯ জন ক্রীড়াবিদকে মাসিক ভাতার আওতায় এনেছে সরকার। সোমবার প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে এ কর্মসূচির উদ্বোধনের মধ্য দিয়ে সরকার গঠনের মাত্র দুই মাসের মধ্যে নিজেদের নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন করলেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।

সদ্যসমাপ্ত সংসদ নির্বাচনে ঢাকা মহানগরীতে বিএনপির বেশিরভাগ প্রার্থী জয়লাভ করলেও পরাজিত হন দলটির অন্যতম নেতা আমিনুল হক। তবে নির্বাচনে হারলেও তাকে টেকনোক্র্যাট কোটায় ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব দেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। দলীয় সূত্রগুলোর মতে, এই নিয়োগের পেছনে প্রধান কারণ ছিল ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলনে আমিনুলের দীর্ঘ রাজনৈতিক ত্যাগ এবং দেশের ক্রীড়াঙ্গন নিয়ে তার সুস্পষ্ট রূপকল্প।

জাতীয় ফুটবল দলের সাবেক এই অধিনায়ক খেলা ছেড়ে রাজনীতিতে যুক্ত হওয়ার পর ঢাকা মহানগরীতে রাজপথের আন্দোলনে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন। বিগত সরকারের সময় তিনি বারবার কারাবরণ করেন এবং হামলা-মামলা, নির্যাতনের শিকার হন। চরম প্রতিকূলতার মধ্যেও দলের প্রতি তার অবিচল আনুগত্য তারেক রহমানের দৃষ্টি আকর্ষণ করে।

এর বাইরে, ক্রীড়াঙ্গনকে রাজনীতিমুক্ত করে আন্তর্জাতিক মানের করার যে অঙ্গীকার আমিনুল প্রচার করে আসছিলেন, তার সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গির মিল ছিল। সংশ্লিষ্টদের মতে, আমিনুল হকের চোখ দিয়েই ভবিষ্যৎ বাংলাদেশের ক্রীড়াঙ্গন সাজাতে চেয়েছেন তারেক রহমান, আর সে কারণেই তার ওপর এ গুরুত্বপূর্ণ আস্থা রাখা হয়েছে।

সেই আস্থার প্রথম প্রমাণ পাওয়া গেল সোমবার। ‘ক্রীড়া হলে পেশা, পরিবার পাবে ভরসা’- বিএনপির এই নির্বাচনী অঙ্গীকার বাস্তবায়নের অংশ হিসেবে প্রধানমন্ত্রী কার্যালয়ের শাপলা হলে এক অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান নিজে ১২৯ জন ক্রীড়াবিদের হাতে ক্রীড়া কার্ড তুলে দেন। এই কার্ডের মাধ্যমে তারা মাসিক এক লাখ টাকা করে ভাতা পাবেন। প্রাথমিক পর্যায়ে ১২৯ জন এই সুবিধা পেলেও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী জানিয়েছেন, পর্যায়ক্রমে বিভিন্ন ডিসিপ্লিনের মোট ৫০০জন জাতীয় দলের ক্রীড়াবিদকে এই ভাতার আওতায় আনা হবে।

বিশেষভাবে এই ১২৯ জনকে বেছে নেওয়ার কারণ হলো, তারা ব্যক্তিগত ও দলগতভাবে গত এক বছরে দক্ষিণ এশীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বাংলাদেশকে সাফল্য এনে দিয়েছেন। এর মধ্যে ব্যক্তিগত পর্যায়ে স্বর্ণজয়ীদের জন্য ভাতার বাইরে অতিরিক্ত তিনলাখ টাকার নগদ পুরস্কারের চেক প্রদান করা হয়েছে। একইভাবে রৌপ্য পদকের জন্য ২ লাখ এবং ব্রোঞ্জের জন্য ১ লাখ টাকা করে দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি দলগতভাবে জয়ীদের প্রত্যেক সদস্যকে ২ লাখ করে এবং অন্যান্য ডিসিপ্লিনে দলগতভাবে স্বর্ণ, রৌপ্য ও ব্রোঞ্জের জন্য যথাক্রমে ২ লাখ, দেড় লাখ ও ১ লাখ টাকা করে দেওয়া হয়েছে।

এর আগে সরকারিভাবে ক্রীড়াবিদরা নির্দিষ্ট কোনো মাসোহারা পেতেন না। বিভিন্ন টুর্নামেন্টের আগে শুধু ক্যাম্প খরচ, দৈনিক ভাতা ও সামান্য কিছু অর্থ দেওয়া হতো। নতুন এই উদ্যোগের ফলে এখন থেকে ফুটবল, হকি, শুটিং, সাঁতার, জিমন্যাস্টিকস ও কারাতের মতো বিভিন্ন ডিসিপ্লিনে জাতীয় দলের হয়ে খেলা ক্রীড়াবিদরা মাসে এক লাখ টাকা করে পাবেন।

ক্রীড়াবিদরা দারুণ খুশি। এই উদ্যোগে সন্তোষ প্রকাশ করেছেন তারা। সদ্য সাফ নারী ফুটসালে চ্যাম্পিয়ন দলের অধিনায়ক সাবিনা খাতুন বলেন, এটি শুধু অর্থনৈতিক নিশ্চয়তা নয়, বরং পেশাগত উৎকর্ষতা বৃদ্ধির জন্যও অত্যন্ত কার্যকর হবে। ক্রীড়াবিদরা এখন নিজেদের জীবনধারণের দুশ্চিন্তা বাদ দিয়ে শুধু খেলায় মনোযোগ দিতে পারবেন বলে তিনি উল্লেখ করেন।

তবে এই কাঠামোগত উদ্যোগ নিয়ে ক্রীড়া মহলে কিছু প্রশ্নও রয়েছে। সব খেলার ক্রীড়াবিদদের একই স্কেলে বেতন দেওয়া কতটা যৌক্তিক, তা নিয়ে আলোচনা চলছে। বিশ্লেষকদের মতে, অলিম্পিকে স্বীকৃত এবং পদকজয়ী ইভেন্টগুলোর (যেমন শুটিং বা আর্চারি) ক্রীড়াবিদদের সঙ্গে যদি স্বল্প প্রচলিত খেলা যেমন যোগা বা ব্রিজের ক্রীড়াবিদদের বেতন সমান হয়, তবে তা অসামঞ্জস্যপূর্ণ হতে পারে। আন্তর্জাতিক পদক ও পারফরম্যান্সের ভিত্তিতে বেতনের একটি শ্রেণিবিন্যাস করা প্রয়োজন বলে মনে করছেন তাঁরা।

এর পাশাপাশি কোচ এবং সংগঠকদের জন্য সুনির্দিষ্ট অর্থনৈতিক কাঠামোর অভাব নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। দীর্ঘ মেয়াদে মানসম্পন্ন অ্যাথলেট তৈরির ক্ষেত্রে প্রশিক্ষকদের ভূমিকা অপরিহার্য। শিষ্যের তুলনায় কোচদের জন্য সুনির্দিষ্ট বরাদ্দ না থাকলে তা দীর্ঘমেয়াদি ক্রীড়া উন্নয়নের অন্তরায় হতে পারে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করেন।

অবকাঠামোগত উন্নয়নের বিষয়টিও পাশাপাশি চিন্তা করা দরকার। বলার অপেক্ষা রাখে না, বাংলাদেশ দক্ষিণ এশীয় ও মহাদেশীয় পর্যায়ে এমন কিছু ইভেন্ট ও ডিসিপ্লিনে পদক পায়, সাফল্যের মুখ দেখে, যেসব খেলায় পর্যাপ্ত মাঠ, কোর্ট বা কমপ্লেক্স নেই।

উল্লেখ্য, নিজেদের কোনো ফুটসাল কোর্ট না থাকলেও বাংলাদেশের নারীরা সাফ ফুটসালে চ্যাম্পিয়ন হওয়ার কৃতিত্ব দেখিয়েছে। ফুটসাল দলের অধিনায়ক সাবিনা খাতুন আজ সোমবার ক্রীড়াবিদদের অর্থ পুরস্কার ও ক্রীড়া কার্ড প্রদান অনুষ্ঠানে একটি ফুটসাল কোর্টের দাবি জানালে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান তাৎক্ষণিকভাবে তা পূরণের আশ্বাস দেন।

ক্রীড়া বিশ্লেষকদের মতে, উন্নত মাঠ, ইনডোর সুবিধা এবং আধুনিক প্রশিক্ষণ সরঞ্জাম নিশ্চিত করার পাশাপাশি প্রশিক্ষকদের অর্থনৈতিক নিরাপত্তা দেওয়া সম্ভব হলেই কেবল পেশাদার ক্রীড়াঙ্গন তৈরির এই উদ্যোগ পূর্ণাঙ্গ সফলতা পাবে। মোটকথা, ক্রীড়াবিদদের অর্থনৈতিকভাবে স্বচ্ছল করলেই হবে না- ক্রীড়াঙ্গনের উন্নয়নের জন্য দরকার সংশ্লিষ্ট সবার আর্থিক ও লজিস্টিক সহায়তা। তাহলেই তৈরি হবে নতুন নতুন ক্রীড়াবিদ, আর খেলাধুলায় সামনে এগিয়ে যাবে বাংলাদেশ।

এআরবি/আইএইচএস

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow