অসহযোগ আন্দোলনের ডাক, স্পষ্ট হয় স্বাধীনতার পথরেখা

শেখ মুজিবুর রহমানের দৃঢ় নেতৃত্বে বাংলাদেশের স্বাধীনতার বন্দরে পৌঁছানোর পথরেখা কার্যত ১৯৭১ সালের ৩ মার্চ স্পষ্ট রূপ পায়। তার ডাকে ঢাকায় টানা দ্বিতীয় দিনের মতো এবং সমগ্র বাংলাদেশে প্রথমবারের মতো সর্বাত্মক হরতাল পালিত হয়। এতে শহরের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ছিল প্রায় স্তব্ধ। হরতালের মধ্যেই পল্টন ময়দানে স্বাধীন বাংলা কেন্দ্রীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের ডাকা ছাত্র জনসভায় উপস্থিত হন শেখ মুজিব। সেখানে তিনি অসহযোগ আন্দোলনের ডাক দিয়ে কর-খাজনা না দেওয়ার ঘোষণা দেন এবং ক্ষমতা গণপ্রতিনিধিদের হাতে হস্তান্তরে সামরিক সরকারের প্রতি আহ্বান জানান। সামরিক বাহিনীকে ব্যারাকে ফিরে যাওয়ার নির্দেশনা দিয়ে তিনি দৃপ্ত কণ্ঠে বলেন, ‘আমি যদি নাও থাকি, আন্দোলন যেন না থামে।’ সভায় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের চার নেতা- নূরে আলম সিদ্দিকী, শাজাহান সিরাজ, আ স ম আবদুর রব ও আবদুল কুদ্দুস মাখন স্বাধীনতা ও মুক্তিসংগ্রামে ঝাঁপিয়ে পড়ার শপথ নেন। ছাত্রলীগের তৎকালীন সভাপতি নূরে আলম সিদ্দিকীর সভাপতিত্বে এসময় সাধারণ সম্পাদক শাজাহান সিরাজের কণ্ঠে পাঠ করা হয় স্বাধীনতার ইশতেহার। এতে স্বাধীন ও সার্বভৌম বাংলাদেশের সর্বাধিনায়ক হিসেবে শেখ মুজিবের নাম ঘোষণ

অসহযোগ আন্দোলনের ডাক, স্পষ্ট হয় স্বাধীনতার পথরেখা

শেখ মুজিবুর রহমানের দৃঢ় নেতৃত্বে বাংলাদেশের স্বাধীনতার বন্দরে পৌঁছানোর পথরেখা কার্যত ১৯৭১ সালের ৩ মার্চ স্পষ্ট রূপ পায়। তার ডাকে ঢাকায় টানা দ্বিতীয় দিনের মতো এবং সমগ্র বাংলাদেশে প্রথমবারের মতো সর্বাত্মক হরতাল পালিত হয়। এতে শহরের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ছিল প্রায় স্তব্ধ।

হরতালের মধ্যেই পল্টন ময়দানে স্বাধীন বাংলা কেন্দ্রীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের ডাকা ছাত্র জনসভায় উপস্থিত হন শেখ মুজিব। সেখানে তিনি অসহযোগ আন্দোলনের ডাক দিয়ে কর-খাজনা না দেওয়ার ঘোষণা দেন এবং ক্ষমতা গণপ্রতিনিধিদের হাতে হস্তান্তরে সামরিক সরকারের প্রতি আহ্বান জানান। সামরিক বাহিনীকে ব্যারাকে ফিরে যাওয়ার নির্দেশনা দিয়ে তিনি দৃপ্ত কণ্ঠে বলেন, ‘আমি যদি নাও থাকি, আন্দোলন যেন না থামে।’

সভায় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের চার নেতা- নূরে আলম সিদ্দিকী, শাজাহান সিরাজ, আ স ম আবদুর রব ও আবদুল কুদ্দুস মাখন স্বাধীনতা ও মুক্তিসংগ্রামে ঝাঁপিয়ে পড়ার শপথ নেন। ছাত্রলীগের তৎকালীন সভাপতি নূরে আলম সিদ্দিকীর সভাপতিত্বে এসময় সাধারণ সম্পাদক শাজাহান সিরাজের কণ্ঠে পাঠ করা হয় স্বাধীনতার ইশতেহার। এতে স্বাধীন ও সার্বভৌম বাংলাদেশের সর্বাধিনায়ক হিসেবে শেখ মুজিবের নাম ঘোষণা করা হয়।

একই সঙ্গে জাতীয় সংগীত হিসেবে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘আমার সোনার বাংলা, আমি তোমায় ভালোবাসি’ গানটি নির্বাচন এবং সবুজ জমিনের মাঝে লাল সূর্য ও সোনালি মানচিত্রখচিত পতাকাকে বাংলাদেশের জাতীয় পতাকা হিসেবে নির্ধারণের সিদ্ধান্ত জানানো হয়।

হরতাল চলাকালে দেশের বিভিন্ন স্থানে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর গুলিতে ও সহিংস ঘটনায় শতাধিক মানুষের প্রাণহানি ঘটে। ঢাকা ছাড়াও রংপুর ও সিলেটে কারফিউ জারি করা হয়। পরদিনের সংবাদ অনুযায়ী, চট্টগ্রামেই নিহত হন অন্তত ৭৫ জন।

অসহযোগ আন্দোলনের ডাক, স্পষ্ট হয় স্বাধীনতার পথরেখাপল্টন ময়দানে শাজাহান সিরাজের স্বাধীনতার ইশতেহার পাঠ (বাঁয়ে) এবং চার ছাত্রনেতার স্বাধীনতা ও মুক্তিসংগ্রামে ঝাঁপিয়ে পড়ার শপথ/ছবি: সংগৃহীত

এদিকে, প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান ১০ মার্চ ঢাকায় নেতাদের সম্মেলনের ঘোষণা দেন এবং রাওয়ালপিন্ডি থেকে জানানো হয়, সম্মেলনের দুই সপ্তাহের মধ্যে জাতীয় পরিষদের অধিবেশন অনুষ্ঠিত হবে। তবে শেখ মুজিব তাৎক্ষণিকভাবে এ আমন্ত্রণ প্রত্যাখ্যান করেন। অপরদিকে, জুলফিকার আলী ভুট্টো তা গ্রহণ করেন।

ভুট্টোর উদ্দেশে শেখ মুজিব বলেন, ‘গণতান্ত্রিক নিয়মে প্রণীত এক শাসনতন্ত্র যদি না চান, তাহলে আপনাদের শাসনতন্ত্র আপনারা রচনা করুন। বাংলাদেশের শাসনতন্ত্র আমরাই রচনা করবো।’

দিনশেষে তিনি হাসপাতালে গিয়ে আহতদের খোঁজখবর নেন এবং জীবন রক্ষায় ব্লাড ব্যাংকে রক্তদানের আহ্বান জানান। পাশাপাশি তিনি সতর্ক করে বলেন, স্বাধিকারবিরোধী বিশেষ মহল নিজস্ব এজেন্টদের মাধ্যমে লুটতরাজ ও অগ্নিসংযোগ ঘটিয়ে আন্দোলনকে বিপথগামী করার ষড়যন্ত্রে লিপ্ত রয়েছে। এ অশুভ চক্রান্ত রুখতে তিনি জনগণকে সজাগ থাকতে বলেন।

এভাবে অসহযোগ আন্দোলনের দৃঢ় ঘোষণা ও ছাত্রসমাজের ঐক্যবদ্ধ শপথ স্বাধীনতার সংগ্রামকে নতুন গতি দেয় এবং বাঙালির মুক্তির অভিযাত্রায় এক ঐতিহাসিক মোড় তৈরি করে।

তথ্যসূত্র: বাংলাদেশ মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর ও ১৯৭১ সালে প্রকাশিত সংবাদপত্র

এমএএস/একিউএফ

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow