কিশোরগঞ্জের তাড়াইল উপজেলার বিভিন্ন হাট-বাজারে ৫, ১০ ও ২০ টাকার নতুন নোটের এক বা একাধিক কোণা আগুনে পোড়া অবস্থায় ব্যাপকভাবে লেনদেন হচ্ছে। দেখতে প্রায় ঝকঝকে নতুন হলেও নোটের একটি কোণা আগুনে পোড়া থাকায় এসব নোট নিয়ে বিপাকে পড়ছেন ক্রেতা-বিক্রেতা উভয়েই। কোথা থেকে এসব নোট আসছে, কেনই বা নোটগুলোর কোণা পোড়া— এ নিয়ে স্থানীয়দের মধ্যে দেখা দিয়েছে নানা প্রশ্ন ও কৌতূহল।
সরেজমিনে তাড়াইল সদর বাজার, কাপড়পট্টি, সিএনজি স্ট্যান্ড,বাসস্ট্যান্ডসহ উপজেলার বিভিন্ন হাট-বাজার ঘুরে দেখা গেছে, প্রতিদিনের স্বাভাবিক লেনদেনে এমন পোড়া কোণাযুক্ত নোটের উপস্থিতি চোখে পড়ার মতো। বিশেষ করে ৫, ১০ ও ২০ টাকার নোটের মধ্যে এ সমস্যা বেশি দেখা যাচ্ছে। অধিকাংশ নোটই দেখতে একেবারে নতুন। কোথাও নোটের এক কোণা সামান্য ঝলসে গেছে, আবার কোনো কোনো নোটে পোড়া অংশ বেশ স্পষ্ট।
ব্যবসায়ীরা বলছেন, ক্রেতাদের কাছ থেকে এসব নোট গ্রহণ করলেও পরে অন্য ক্রেতা বা ব্যবসায়ীর কাছে লেনদেন করতে গিয়ে বিড়ম্বনায় পড়তে হচ্ছে। অনেক দোকানি পোড়া নোট নিতে অনীহা প্রকাশ করেন। ফলে একই নোট নিয়ে এক দোকান থেকে অন্য দোকানে ঘোরাঘুরি করতে হচ্ছে গ্রাহকদের। কখনো কখনো নোট গ্রহণ করা নিয়ে ক্রেতা-বিক্রেতার মধ্যে মনোমালিন্যের ঘটনাও ঘটছে।
এলাকায় চলাচল করা রিকশা, অটোরিকশা ও সিএনজি ভাড়া পরিশোধের সময়ও এসব নোট নিয়ে প্রায়ই বাগবিতণ্ডা হচ্ছে। যাত্রীর হাতে থাকা পোড়া কোণাযুক্ত ৫, ১০ বা ২০ টাকার নোট চালক নিতে না চাইলে উভয়ের মধ্যে তর্কাতর্কি শুরু হয়। বিশেষ করে স্বল্পমূল্যের ভাড়ার ক্ষেত্রে একটি নোট গ্রহণ না করায় যাত্রীকে নতুন নোট খুঁজতে হয়। কেউ কেউ নোট পরিবর্তন করে দেওয়ার জন্য যাত্রীকে পাশের দোকানে পাঠান। এতে সামান্য কয়েক টাকার ভাড়া পরিশোধ করতেও তৈরি হচ্ছে অস্বস্তিকর পরিস্থিতি। সাধারণ যাত্রীদের মধ্যেও এ নিয়ে ক্ষোভ ও ভোগান্তি বাড়ছে।
তাড়াইল বাজারের কয়েকজন ব্যবসায়ী জানান, আগে ছেঁড়া, ময়লাযুক্ত বা অতিরিক্ত ব্যবহারে জীর্ণ নোট নিয়ে সমস্যা থাকলেও সাম্প্রতিক সময়ে নতুন নোটের কোণা পোড়া অবস্থায় পাওয়ার প্রবণতা বেড়েছে। বিষয়টি তাদের কাছেও অস্বাভাবিক মনে হচ্ছে। তবে এসব নোট কোথা থেকে আসছে বা কী কারণে নোটের কোণা পুড়ে যাচ্ছে, সে বিষয়ে তারা নিশ্চিত নন।
একজন ব্যাংক কর্মকর্তা বলেন, বাংলাদেশ ব্যাংক বা অন্যান্য ব্যাংকের শাখায় ছেঁড়া-ফাটা নোট পরিবর্তনের সুযোগ রয়েছে। কোনো ব্যক্তি ছেঁড়া-ফাটা নোট নিয়ে গেলে নোটের ৫১ থেকে ৭৫ শতাংশ অবশিষ্ট থাকলে মূল টাকার ৫০ শতাংশ ফেরত পাওয়ার সুযোগ রয়েছে। ৭৬ থেকে ৯০ শতাংশ অবশিষ্ট থাকলে ৭৫ শতাংশ এবং ৯০ শতাংশের বেশি অবশিষ্ট থাকলে পুরো মূল্য ফেরত পাওয়ার নিয়ম রয়েছে। তাছাড়া আমরা সাধারণত পোড়া নোটের লেনদেন করি না। তবে অনেক সময় গ্রাহকের সঙ্গে এ নিয়ে মনোমালিন্যের সৃষ্টি হয়। সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয় হলো— নোটগুলো অনেক সময় একেবারেই নতুন থাকে। নতুন নোট কীভাবে এমন পুড়ে যাচ্ছে, সেটি খতিয়ে দেখা দরকার।
উপজেলা সদরের কয়েকজন দোকানদার বলেন, তরুণদের একটি অংশ বিভিন্ন ধরনের মাদকে আসক্ত। তাদের ধারণা, কোনো কোনো মাদক সেবনের পদ্ধতিতে কাগুজে নোট ব্যবহার করার কারণে নোটের কোণা আগুনে পুড়ে যেতে পারে। তবে এটি তাদের ব্যক্তিগত ধারণা। এ দাবির পক্ষে তারা কোনো নির্ভরযোগ্য প্রমাণ দেখাতে পারেননি।
স্থানীয় কয়েকজন ব্যবসায়ী জানান, তারা ব্যাংক থেকে নতুন নোট সংগ্রহ করলেও সেগুলো কীভাবে পরে পোড়া অবস্থায় বাজারে ফিরে আসছে, তা তাদের জানা নেই। তাদের মতে, বাজারে এমন নোটের সংখ্যা যদি সত্যিই বেড়ে থাকে, তাহলে ব্যাংক, প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সমন্বয়ে বিষয়টি খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।
তবে পোড়া টাকার ক্ষেত্রে বিষয়টি আলাদা। ব্যাংক কর্মকর্তার ভাষ্য অনুযায়ী,পোড়া নোট নিয়ে ব্যাংকে গেলেই সঙ্গে সঙ্গে টাকা পাওয়া যায় না। ক্ষতিগ্রস্ত নোটের তথ্য-প্রমাণসহ বাংলাদেশ ব্যাংক বরাবর আবেদন করতে হয়। এরপর সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ বিষয়টি বিশেষ বিবেচনায় নিয়ে সিদ্ধান্ত দিতে পারে।
সচেতন নাগরিকদের দাবি, তাড়াইলের বিভিন্ন বাজারে নতুন নোটের কোণা পোড়া অবস্থায় ছড়িয়ে পড়ার বিষয়টি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নজরে নেওয়া প্রয়োজন। একই সঙ্গে ক্ষতিগ্রস্ত নোট পরিবর্তন বা দাবির ক্ষেত্রে ব্যাংকের নিয়ম সম্পর্কে সাধারণ মানুষকে স্পষ্ট ধারণা দেওয়া দরকার। এতে একদিকে যেমন গ্রাহকদের ভোগান্তি কমবে, অন্যদিকে পোড়া নোটের প্রকৃত উৎস ও কারণ সম্পর্কে তৈরি হওয়া রহস্যও দূর হতে পারে।
স্থানীয় বাজারে বিষয়টি নিয়ে নানা আলোচনা থাকলেও প্রমাণ ছাড়া কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তি, গোষ্ঠী বা মাদকসেবনের সঙ্গে পোড়া নোটের বিষয়টি যুক্ত করা ঠিক হবে না বলে মনে করছেন সচেতন নাগরিকরা। তাদের মতে, পোড়া নোটের পেছনে দুর্ঘটনাজনিত আগুন, সংরক্ষণ বা পরিবহনের সময় তাপের সংস্পর্শ কিংবা অন্য কোনো কারণও থাকতে পারে। তাই প্রকৃত কারণ জানতে যথাযথ অনুসন্ধান প্রয়োজন।
তাড়াইল থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) শেখ আবু সালেহ মাসুদ করিম বলেন, কাগজের নোটের এক বা একাধিক কোণা কী কারণে পোড়া থাকে; তা নির্দিষ্ট করে বলা যাচ্ছে না। হয়তো কোথাও দুর্ঘটনাজনিত আগুনে পুড়তে পারে। অন্যান্য কারণও থাকতে পারে।