আত্মিক শুদ্ধতার যাত্রা: মদিনার স্মৃতি পেরিয়ে মক্কার পথে

কাজী মনজুর করিম মিতুল, প্রকৌশলী ও প্রাবন্ধিক মদিনা ছাড়ার সময় যত ঘনিয়ে আসছিল, মন ততই বিষণ্নতায় ছেয়ে যাচ্ছিল। ভীষণ মিস করব এই মসজিদ, এর বাইরের চত্বরের কবুতরগুলোকে, এর সকালে খোলা আর সন্ধ্যায় বন্ধ হওয়া ছাতাগুলোকেও। ভীষণ মিস করব এর ভেতরের সেই বেহেশতী পরিবেশ। আর সবচেয়ে বেশি মিস করব, হুজুরে পাক (সা:) এর রওজা মোবারক এর কাছেই বসে মন খুলে ইবাদাতে নিজেকে সঁপে দেওয়ার সেই সুবর্ণ সুযোগ। বিশেষ করে মদিনা ছেড়ে আসার দিন ফজরের ওয়াক্তে হারানো চশমা পরে ফিরে পাবার অলৌকিক ঘটনা আমাকে আপ্লুত করবে আজীবন। তার বিস্তারিত বর্ণনায় যাব না। মহানবী (সা:) মক্কাবাসীর অত্যাচার থেকে বাঁচতে ও ইসলামের প্রচারণা আরও জোরদার করতে মক্কা থেকে হিজরত করে মদিনায় এসেছিলেন। আর তার প্রায় ১৪৪৭ বছর পর (১ জিলহজ) আমরা চলেছি উল্টো পথে, মদিনা থেকে আমাদের যাত্রা মক্কার পথে, পবিত্র হজ্জের নিয়াতে। অধিকাংশ হাজি শুরুতে মক্কায় যান, পরে মদীনায় আসেন। আমি একটু বিপরীত পরিকল্পনা করেছি সময়ের স্বল্পতার জন্য। পাঁচদিন মদিনায় থাকার পর আমাদের কাফেলা চলছে মক্কার দিকে। নিয়মানুযায়ী, আমরা মিকাত (হারাম শরীফের সীমানা) অতিক্রম করে ইহরাম পরার জন্য একটি নির্দিষ্ট মস

আত্মিক শুদ্ধতার যাত্রা: মদিনার স্মৃতি পেরিয়ে মক্কার পথে

কাজী মনজুর করিম মিতুল, প্রকৌশলী ও প্রাবন্ধিক

মদিনা ছাড়ার সময় যত ঘনিয়ে আসছিল, মন ততই বিষণ্নতায় ছেয়ে যাচ্ছিল। ভীষণ মিস করব এই মসজিদ, এর বাইরের চত্বরের কবুতরগুলোকে, এর সকালে খোলা আর সন্ধ্যায় বন্ধ হওয়া ছাতাগুলোকেও। ভীষণ মিস করব এর ভেতরের সেই বেহেশতী পরিবেশ।

আর সবচেয়ে বেশি মিস করব, হুজুরে পাক (সা:) এর রওজা মোবারক এর কাছেই বসে মন খুলে ইবাদাতে নিজেকে সঁপে দেওয়ার সেই সুবর্ণ সুযোগ। বিশেষ করে মদিনা ছেড়ে আসার দিন ফজরের ওয়াক্তে হারানো চশমা পরে ফিরে পাবার অলৌকিক ঘটনা আমাকে আপ্লুত করবে আজীবন। তার বিস্তারিত বর্ণনায় যাব না।

jagonews24

মহানবী (সা:) মক্কাবাসীর অত্যাচার থেকে বাঁচতে ও ইসলামের প্রচারণা আরও জোরদার করতে মক্কা থেকে হিজরত করে মদিনায় এসেছিলেন। আর তার প্রায় ১৪৪৭ বছর পর (১ জিলহজ) আমরা চলেছি উল্টো পথে, মদিনা থেকে আমাদের যাত্রা মক্কার পথে, পবিত্র হজ্জের নিয়াতে। অধিকাংশ হাজি শুরুতে মক্কায় যান, পরে মদীনায় আসেন। আমি একটু বিপরীত পরিকল্পনা করেছি সময়ের স্বল্পতার জন্য। পাঁচদিন মদিনায় থাকার পর আমাদের কাফেলা চলছে মক্কার দিকে।

jagonews24

নিয়মানুযায়ী, আমরা মিকাত (হারাম শরীফের সীমানা) অতিক্রম করে ইহরাম পরার জন্য একটি নির্দিষ্ট মসজিদে ঢুকলাম। ইহরাম পরেই আমরা হোটেল থেকে বাসে উঠেছিলাম, নিয়াতের নামাজ পড়ে শুরু হলো হজ্জের উদ্দেশ্যে যাত্রা। এই নিয়াত শুধু বাহ্যিক নয়, আত্মিক।

আগের পর্ব পড়ুন
আত্মশুদ্ধির পথে অনন্য এক যাত্রা 

সকল পংকিলতা, পার্থিব লেনদেন, চাওয়া-পাওয়ার উর্ধ্বে উঠে এক আল্লাহর কাছে আত্মসমর্পণ করার প্রতিই সবার ফোকাস তৈরি হয় ইহরামের নিয়ত করার সাথে সাথে। অন্যদের কথা জানি না, আমার মনে হলো, এই ইহরাম পরার সাথে সাথে জাগতিক সব কিছু থেকে আমি বিচ্ছিন্ন হয়ে গেলাম।

jagonews24

তাই, কাফেলার কেউ কেউ যখন ভিডিও কলে পরিবারের লোকেদের সাথে আলাপে ব্যস্ত, বা দাপ্তরিক কলে উচ্চস্বরে কথা বলছিলেন, আমার বিরক্ত লাগছিল। তবে, এই যাত্রা এক অনন্য যাত্রা। এখানে কথা ও কাজে অনেক সংযমী হতে হয়। তাই বাইরের দৃশ্য দেখায় মন দিলাম। পাহাড় কেটে তৈরি এই মহাসড়ক। মাঝে মাঝে মরুভূমির ভেতর দিয়ে ছুটে চলা।

jagonews24

চোখে পড়ছিল পাহাড়ের চূড়ায় বসানো মোবাইল নেটওয়ার্ক এর টাওয়ার। উপত্যকায় নির্মিত বিদুৎ উপকেন্দ্র ও বিদ্যুৎ সঞ্চালন লাইন। আমার চাকরি জীবনের ২২ বছরের ১৮ বছরই কেটেছে টাওয়ারের সঙ্গে। তাই অন্য সব বাদ দিয়ে হয়তো এগুলোই আমার দৃষ্টিকে টানছিল। তবে মন বারবার ফিরে যায় মদিনায়। বাসে বসে কিছু বই পড়ছিলাম আর প্রস্তুতি নিচ্ছিলাম রাতে উমরাহ করার।

jagonews24

মক্কার কাছাকাছি পৌঁছে আমরা তালবিয়া (লাব্বাইক আল্লাহুম্মা লাব্বাইক) পড়তে শুরু করলাম। যখন দূর থেকে ক্লক টাওয়ারের চূড়া দেখা গেলো, আবেগে তখন আপ্লুত কাফেলার সবাই। পাহাড় কেটে তৈরি করা এক টানেলে ঢুকে পড়ল আমাদের বাস। আর সেটা থেকে বের হয়ে মনে হলো ক্লক টাওয়ারের চূড়া আরো কাছে মনে হলো। বুকের ভেতর যেন উদ্বেল আবেগের ঢেউ!

jagonews24

অনুভূতিটা অনেক দিন পর নিজের গ্রামের বাড়ির কাছাকাছি পৌঁছে দূর থেকে চিরচেনা উঁচু গাছটা দেখে যেমন মনে হয়, ‘আহ, এসে পড়েছি’, অনেকটা সেই রকম! ক্লক টাওয়ার একটি আধুনিক বাণিজ্যিক ভবন, এটি মসজিদ আল হারামের খুব কাছে। এটা যে এত বিশাল, তা কোন ছবি বা ভিডিও দেখে আন্দাজ করতে পারিনি।

jagonews24

সবার মুখে তখন ‘লাব্বাইক আল্লাহুম্মা লাব্বাইক’ ধ্বনিত হচ্ছে। চোখের জল চলে আসে নিজের অজান্তে, কণ্ঠ রুদ্ধ হয়ে আসে আবেগে। আল্লাহর ঘর, যার সকল দায়-দায়িত্ব যুগে যুগে আল্লাহ নিজে নিয়েছেন, আর তার প্রিয় রাসূলদের ভার দিয়েছেন এর রক্ষণাবেক্ষণ, পুন:নির্মাণ ও এর মহিমা সমুজ্জ্বল করার, সেই ঘরের খুব কাছে আমরা। এসেছি আত্মসমর্পণ করতে, আত্মাকে শুদ্ধ করতে। হাজির হয়েছি সেই মহান আল্লাহর একত্ববাদ, সার্বভৌমত্ব আর মহা পরাক্রমশীলতার প্রতি পূর্ণ আস্থা নিয়ে, তার ক্ষমা ও করুণা লাভের আশায়।

jagonews24

রাসূলে কারিম মোহাম্মদ (সা:) বলেছেন, ‘যে হজ আল্লাহ কবুল করেন, তার প্রতিদান হলো জান্নাত’! আল্লাহর ঘরের কাছে এসে তাই বারবার একটাই প্রার্থনা মনে আসে, যেন সবাই সঠিকভাবে হজ পালন করতে পারি।

যে দিনটা শুরু হয়েছিল ফজরের ওয়াক্তে চশমা হারিয়ে, তা শেষ হলো স্মরণীয় একটি উমরাহ সম্পন্ন করে। সেই গল্প, ইন শা আল্লাহ, পরের পর্বে।

চলবে...

এমআরএম

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow