আধিপত্যবাদ নীরবতার কান্না শোনে না
বোমা পড়ার পর এক একটি শহরে যে নিস্তব্ধতা নেমে আসে— পতিত অট্টালিকার নীরবতা, বিচ্ছিন্ন জীবনের নীরবতা, আর কখনো আসবে না এমন ভবিষ্যতের নীরবতা— তার শব্দ কি কেউ আমরা উপেক্ষা করতে পারি? আমেরিকার সামরিক শক্তির এ নীরবতাই ছুটে চলে দিক থেকে দিগন্তে। হিম প্রবাহের মতো প্রায় স্তব্ধ গতিতে এ নীরবতা ব্যাপ্ত হয় দূর থেকে দূরে, বহু দূরে। যুদ্ধের জয়ের ঘোষণা বা উদ্দেশ্য ব্যাখ্যাকারী কোনো বক্তৃতার চেয়ে এ নীরবতার ভাষাই বেশি অনুরণিত। তিন দশকের বেশি সময় ধরে এ নীরবতা পৃথিবীকে আবৃত করে ফেলেছে—ভিয়েতনামের সুড়ঙ্গ থেকে হো চি মিন শহরে, দারফুরে, সাহেল অঞ্চল থেকে সোমালিয়ায়, কঙ্গোর গভীর জঙ্গলে, প্যালেস্টাইনে, আফগানিস্তানের পাহাড় থেকে বাগদাদের রাস্তায়, লিবিয়ার উপকূলীয় শহর থেকে দামেস্কের প্রাচীন অলিগলিতে, আর এখন ইরানের নগর থেকে গ্রামাঞ্চলে, পাহাড়ে, দ্বীপে। ২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বরের হামলার পর যুক্তরাষ্ট্র এক অবিরাম যুদ্ধের আবর্তে প্রবেশ করে। ‘সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধ’ নামক সেই অভিযান ধীরে ধীরে আরও ব্যাপক ও বিস্তৃত এক রূপ নিয়েছে— এক ধরনের একক পদক্ষেপের মতবাদ, যা খুব কম সীমানাই স্বীকার করে এবং আরও কম বাধাই মেনে নেয়। সংখ্যাগ
বোমা পড়ার পর এক একটি শহরে যে নিস্তব্ধতা নেমে আসে— পতিত অট্টালিকার নীরবতা, বিচ্ছিন্ন জীবনের নীরবতা, আর কখনো আসবে না এমন ভবিষ্যতের নীরবতা— তার শব্দ কি কেউ আমরা উপেক্ষা করতে পারি? আমেরিকার সামরিক শক্তির এ নীরবতাই ছুটে চলে দিক থেকে দিগন্তে। হিম প্রবাহের মতো প্রায় স্তব্ধ গতিতে এ নীরবতা ব্যাপ্ত হয় দূর থেকে দূরে, বহু দূরে। যুদ্ধের জয়ের ঘোষণা বা উদ্দেশ্য ব্যাখ্যাকারী কোনো বক্তৃতার চেয়ে এ নীরবতার ভাষাই বেশি অনুরণিত। তিন দশকের বেশি সময় ধরে এ নীরবতা পৃথিবীকে আবৃত করে ফেলেছে—ভিয়েতনামের সুড়ঙ্গ থেকে হো চি মিন শহরে, দারফুরে, সাহেল অঞ্চল থেকে সোমালিয়ায়, কঙ্গোর গভীর জঙ্গলে, প্যালেস্টাইনে, আফগানিস্তানের পাহাড় থেকে বাগদাদের রাস্তায়, লিবিয়ার উপকূলীয় শহর থেকে দামেস্কের প্রাচীন অলিগলিতে, আর এখন ইরানের নগর থেকে গ্রামাঞ্চলে, পাহাড়ে, দ্বীপে।
২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বরের হামলার পর যুক্তরাষ্ট্র এক অবিরাম যুদ্ধের আবর্তে প্রবেশ করে। ‘সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধ’ নামক সেই অভিযান ধীরে ধীরে আরও ব্যাপক ও বিস্তৃত এক রূপ নিয়েছে— এক ধরনের একক পদক্ষেপের মতবাদ, যা খুব কম সীমানাই স্বীকার করে এবং আরও কম বাধাই মেনে নেয়। সংখ্যাগুলো, যদি কেউ সেগুলো দেখতে চায়, প্রায় ধারণার বাইরে। ব্রাউন ইউনিভার্সিটির ‘কস্টস অব ওয়ার’ প্রকল্প অনুসারে, ২০০১ সাল থেকে আফগানিস্তান, পাকিস্তান, ইরাক, সিরিয়া, ইয়েমেন ও অন্যান্য সংঘাতপূর্ণ অঞ্চলে মার্কিন নেতৃত্বাধীন যুদ্ধে প্রত্যক্ষভাবে প্রায় ৯ লাখ ৪০ হাজার মানুষকে হত্যা করা হয়েছে। এ পরিসংখ্যানে পরোক্ষ মৃত্যু নেই— যারা স্বাস্থ্যব্যবস্থার পতনে, ধ্বংসপ্রাপ্ত অবকাঠামোর ফলে দূষিত পানিতে, খাদ্য সরবরাহ ব্যবস্থার ওপর বোমা পড়ায় সৃষ্ট দুর্ভিক্ষে, অথবা শরণার্থী শিবিরে ছড়িয়ে পড়া রোগে মারা গেছেন, তাদের সংখ্যা এতে অন্তর্ভুক্ত নয়।
এসব আগ্রাসনে আমেরিকান করদাতাদের ওপর পতিত আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ৫ দশমিক ৮ ট্রিলিয়ন ডলার এবং শুধু যুদ্ধ-পরবর্তী সময়ে মার্কিন সেনাদের স্বাস্থ্যসেবা বাবদ আগামী তিন দশকে আরও প্রায় ২ দশমিক ২ ট্রিলিয়ন ডলার ব্যয় হতে পারে। কিন্তু এ সংখ্যাগুলো কখনোই মানুষের ক্ষতির গভীরতা পরিমাপ করতে পারে না—যে শিশু কখনো নিজের পিতা-মাতাকে চেনে না, যে বৃদ্ধা নির্জনে মারা যায় কারণ তার চিকিৎসার হাসপাতালটি এখন ধ্বংসস্তূপ, যে পারিবারিক অ্যালবাম চাপা পড়ে কংক্রিটের নিচে, আর কখনো উদ্ধার হয় না।
২০০৩ সালের মার্চে ইরাক আক্রমণ এ বিবরণের এক বিশেষ ভয়াবহ অধ্যায়। গণবিধ্বংসী অস্ত্রের (weapons of mass destruction)—যে কারণে যুদ্ধ ঘোষণা করা হয়েছিল—যার অস্তিত্ব কখনোই পাওয়া যায়নি, কিন্তু যুদ্ধ থামেনি। বাগদাদের পতন দ্রুত ঘটলেও পরবর্তী বছরগুলো ধরে ইরাকি সমাজের সূক্ষ্ম বুনন ছিঁড়ে যায়। সাম্প্রদায়িক সহিংসতা, বিদ্রোহ এবং শেষ পর্যন্ত ইসলামিক স্টেটের (আইএস) উত্থান ঘটে। শুধু প্রাথমিক আক্রমণ নয়, পরবর্তী দীর্ঘ যুদ্ধের, সামাজিক ভাঙনের ফলেই শহরগুলোর ধ্বংস সম্পূর্ণ হয়। এ এমন এক ভাঙন—যার রেখাগুলো বিদেশি শক্তিগুলো কখনো বোঝেনি, বোঝার চেষ্টাও করেনি।
২০১১ সালে ন্যাটো বাহিনী লিবিয়ায় হস্তক্ষেপ করে, মুয়াম্মার গাদ্দাফির শাসনের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ জোরদার হয়। অভিযান শেষ হয় গাদ্দাফির বন্দি ও নির্মম, নিষ্ঠুর, অমানবিক হত্যার মধ্য দিয়ে। লিবিয়া নিজেই ছিন্নভিন্ন হয়ে যায়। প্রতিদ্বন্দ্বী গোষ্ঠী ও সশস্ত্র সংগঠনের মধ্যে বিভক্ত হয়ে পড়ে। আজও সে ভাঙন জোরা লাগেনি। লিবিয়া এখনো বহুধা বিভক্ত। একটি কার্যকর রাষ্ট্র ছিল যেখানে, সেখানে বহু বছর ধরে অভ্যন্তরীণ সংঘাত চলছে। লিবিয়া শুধু শরণার্থীদের পথ হয়ে ওঠে না, আঞ্চলিক পরাশক্তিগুলোর ক্ষেত্রেও এক যুদ্ধক্ষেত্রে পরিণত হয়। একই নকশা বারবার ফিরে আসে: সামরিক লক্ষ্য অর্জিত হয়, মানবিক পরিণতি উপেক্ষিত হয়। সিরিয়ায়ও তাই হয়েছে। দামাস্কাস আজ শাসন করছে প্রাক্তন আইএস। তার অংশ কেড়ে নিয়েছে ক্রমাগত সাম্রাজ্য বিস্তারকারী আমেরিকার পরম বন্ধু, ইসরায়েল। সমগ্র লেভান্ত দখল করে নেওয়া তাদের লক্ষ্য।
সম্প্রতি এ সংঘাত আরও বিস্তৃত হয়েছে। ইরানি কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, সামরিক স্থাপনার পাশাপাশি আবাসিক এলাকা, স্কুল ও হাসপাতালেও হামলা চালানো হয়েছে। জাতিসংঘে ইরানের রাষ্ট্রদূতের বিবৃতি অনুসারে, মিনাব শহরের একটি বালিকা প্রাথমিক বিদ্যালয়ে হামলায় ১৬৫ জন শিশু নিহত হয়, যাদের অধিকাংশই ছিল ছাত্রী। ক্রীড়া কেন্দ্রে হামলায় প্রশিক্ষণরত ক্রীড়াবিদরাও প্রাণ হারান। ইরানের রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটির পরিসংখ্যান অনুযায়ী নারী-শিশুসহ বেসামরিক নাগরিকের মৃত্যুসংখ্যা ছাড়িয়েছে ৩ হাজার। এ সংখ্যাগুলো স্বাধীনভাবে যাচাই করা যায় কি না, তা আসলে তেমন গুরুত্বপূর্ণ নয়। গুরুত্বপূর্ণ এই যে, বেসামরিক মানুষ মারা যাচ্ছে, আর এটিও এখন আমেরিকান আগ্রাসনের ধারাবাহিক প্যাটার্নের অংশ হয়ে গেছে।
আমরা এখানে কেবল সামরিক অভিযান দেখছি না, এক বিশেষ ক্ষমতা-দর্শন দেখছি। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী বিশ্বব্যবস্থার মূল স্তম্ভ বহুপক্ষীয় কাঠামো থেকে যুক্তরাষ্ট্র এখন সরে গেছে। তাদের বর্তমান জাতীয় নিরাপত্তা কৌশলপত্র স্পষ্ট ভাষায় বিদেশে গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের প্রসারের কথা পরিত্যাগ করে, পরিবর্তে এক লেনদেনভিত্তিক বাস্তববাদ গ্রহণ করেছে, যা জাতীয় স্বার্থকে সবার ওপরে স্থান দেয়। আন্তর্জাতিক আইন যা আগে নির্দেশক নীতি হিসেবে উল্লিখিত হতো, তা আমেরিকা এখন নিজেদের সুবিধামতো ব্যবহার করে।
এটি সেই আধিপত্য, যা তার পুরোনো কোমল ভণিতা ত্যাগ করেছে। কোনো যৌথ মূল্যবোধ, বিশ্ব শান্তি বা সম্মিলিত নিরাপত্তার পথে নয়, বরং আধিপত্য বিস্তারে ক্ষমতার ব্যবহার হচ্ছে। আন্তর্জাতিক সংস্থা থেকে পশ্চাদপসরণ, একতরফা শুল্ক আরোপ, জাতিসংঘের অনুমোদন ছাড়াই সামরিক শক্তি প্রয়োগ —এগুলো মার্কিন পররাষ্ট্রনীতির ব্যতিক্রমী ঘটনা নয়, বরং এই যুগে তার মৌলিক চরিত্রেরই বহিঃপ্রকাশ।
২০২৬ সালের শুরুর দিকে সিজিটিএন সংবাদ মাধ্যম পরিচালিত এক বৈশ্বিক জরিপে দেখা যায়, ৯৩ দশমিক ৭ শতাংশ উত্তরদাতা মনে করেন ভেনেজুয়েলায় মার্কিন কর্মকাণ্ড আন্তর্জাতিক আইনের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন, আর ৯৪ দশমিক ৩ শতাংশ সেখানে মার্কিন সামরিক হস্তক্ষেপকে মূলত তেলের সম্পদ নিয়ন্ত্রণের উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে মনে করেন। এ সংখ্যাগুলো বিশ্বের এক সুস্পষ্ট মতামত প্রতিফলিত করে: যুক্তরাষ্ট্র যা নেতৃত্ব বলে অভিহিত করে, বিশ্বের বড় অংশ তাকে আধিপত্য হিসেবে দেখে। ইরানে ইসরায়েল-আমেরিকার যৌথ হামলা শুরু হওয়ার পর ২ মার্চ ২০২৬ তারিখে প্রকাশিত সিএনএন জরিপে জানা যায় ৫৯ শতাংশ আমেরিকান এ যুদ্ধ সমর্থন করে না।
আমেরিকান আধিপত্য সম্পর্কে যে কোনো সৎ প্রতিফলনের সামনে যে প্রশ্নটি দাঁড়ায়, তা এই নয় যে যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষমতা প্রয়োগের সক্ষমতা আছে কি না? তা নিঃসন্দেহে আছে। এ ক্ষমতা, এত সহজে এবং এত বিপর্যয়কর পরিণতি বহন করে কি প্রয়োগ করা যায়? এ ক্ষমতা কি কখনো সেই মূল্যবোধের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হতে পারে যার প্রতিনিধিত্ব করার দাবি করে দেশটি? প্রতিটি বোমা যখন শহরের ওপর পড়ে, স্কুলে নিহত প্রতিটি শিশু, বাস্তুচ্যুত প্রতিটি পরিবার —তারা কেবল জীবন ও সম্প্রদায়ই ধ্বংস করে না, বরং সেই নৈতিক কর্তৃত্বকেও ক্ষয় করে দেয়, যা একসময় মার্কিন শক্তিকে অতীতের সাম্রাজ্যগুলোর ঘৃণ্য সাম্রাজ্যবাদ থেকে পৃথক করত।
এখনো অনুরণিত হয় ধ্বংস করে দেওয়া প্রাচীন ট্রয়, পার্সেপোলিস কিংবা মধ্যযুগে মাটির সঙ্গে মিলিয়ে দেওয়া বাগদাদের কান্না। নীরবতার প্রতিটি হামলার পর নেমে আসা নীরবতায়, মহাদেশের পর মহাদেশে জমে থাকা ধ্বংসস্তূপের মধ্যে, আমাদের মনে প্রশ্ন জাগে—এই সব ধ্বংসের মধ্য দিয়ে কী নির্মাণ হচ্ছে? উত্তর, এখন পর্যন্ত, যতদূর দেখা যায়, কিছুই না। শুধু আরও ধ্বংসাবশেষ, আরও শরণার্থী, আরও ক্ষোভ, আরও ভবিষ্যৎ সংঘাতের বীজ। শক্তি অস্বীকার করার উপায় নেই। কিন্তু অধিকার নিয়ে সংশয় দিন দিন ঘনীভূত হয়, স্তূপাকার ধ্বংসের নিচে চাপা পড়ে যায় সেই সব নগরের ইতিহাস, যেখানে সাধারণ মানুষ শান্তিতে বাঁচার আকাঙ্ক্ষা নিয়ে দিনযাপন করত। নগরগুলোর ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়া নীরবতা মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের এই লাগামহীন সন্ত্রাস, ধ্বংস, হত্যা রুখে দাঁড়াবেই।
লেখক : কলাবাগান, ঢাকা
What's Your Reaction?