আফ্রিকায় বিস্ময়কর মাটির মসজিদ

পশ্চিম আফ্রিকার দেশ মালির ডিজেনি শহরে অবস্থিত ‘গ্র্যান্ড মস্ক অব ডিজেনি মসজিদ’ পৃথিবীর সবচেয়ে বড় মাটির মসজিদ। অনুন্নত কৃষিভিত্তিক এই দেশে খরা, মহামারি আর অনাহার লেগেই থাকে সবসময়। উল্লেখ করার মতো তেমন কিছুই নেই। তবে ঐতিহাসিক এ মসজিদের কারণে দেশটি পুরো বিশ্বে ব্যাপক পরিচিত। মসজিদটির নির্মাণপদ্ধতি এখন পর্যন্ত আধুনিক সব প্রযুক্তিমুক্ত। শুধু মাটি, বালু আর পানির সাহায্যে নির্মাণ করা হয়েছে সম্পূর্ণ অবকাঠামো। দেয়ালের গাঁথুনি শক্ত করতে নির্দিষ্ট পরিমাণ দূরত্ব বজায় রেখে ব্যবহৃত হয়েছে তালগাছের কাঠ। স্থানীয়দের ভাষায় একে বলা হয় ‘টোরন’। তালগাছের কাঠগুলো মসজিদের দেয়ালে এমনভাবে গেঁথে দেওয়া হয়েছে, যেন মাটির দেয়াল সহজে ধসে না যায়। মাটি দিয়ে নির্মিত হওয়ায় প্রতি বছরই এর কিছু অংশ অথবা পুরো অংশ সংস্কার করতে হয়। সেই হিসেবে এটিই বিশ্বের একমাত্র মসজিদ, যাকে প্রতি বছর পুনর্নির্মাণ করতে হয়। মালির দক্ষিণাঞ্চলে সাহারা মরুভূমির উত্তপ্ত বালুকাময় জমিনের বুক চিরে বয়ে গেছে বানি নদী। এই নদীর তীরেই গড়ে উঠেছে ঐতিহ্যবাহী ডিজেনি মসজিদ। মসজিদটি ২৪৫ ফুট আয়তনবিশিষ্ট ৩ ফুট উঁচু কাঠামোর ওপর নির্মিত। বর্ষাকালে বানি নদীর প্লাবিত

আফ্রিকায় বিস্ময়কর মাটির মসজিদ

পশ্চিম আফ্রিকার দেশ মালির ডিজেনি শহরে অবস্থিত ‘গ্র্যান্ড মস্ক অব ডিজেনি মসজিদ’ পৃথিবীর সবচেয়ে বড় মাটির মসজিদ। অনুন্নত কৃষিভিত্তিক এই দেশে খরা, মহামারি আর অনাহার লেগেই থাকে সবসময়। উল্লেখ করার মতো তেমন কিছুই নেই। তবে ঐতিহাসিক এ মসজিদের কারণে দেশটি পুরো বিশ্বে ব্যাপক পরিচিত।

মসজিদটির নির্মাণপদ্ধতি এখন পর্যন্ত আধুনিক সব প্রযুক্তিমুক্ত। শুধু মাটি, বালু আর পানির সাহায্যে নির্মাণ করা হয়েছে সম্পূর্ণ অবকাঠামো। দেয়ালের গাঁথুনি শক্ত করতে নির্দিষ্ট পরিমাণ দূরত্ব বজায় রেখে ব্যবহৃত হয়েছে তালগাছের কাঠ। স্থানীয়দের ভাষায় একে বলা হয় ‘টোরন’। তালগাছের কাঠগুলো মসজিদের দেয়ালে এমনভাবে গেঁথে দেওয়া হয়েছে, যেন মাটির দেয়াল সহজে ধসে না যায়। মাটি দিয়ে নির্মিত হওয়ায় প্রতি বছরই এর কিছু অংশ অথবা পুরো অংশ সংস্কার করতে হয়। সেই হিসেবে এটিই বিশ্বের একমাত্র মসজিদ, যাকে প্রতি বছর পুনর্নির্মাণ করতে হয়।

মালির দক্ষিণাঞ্চলে সাহারা মরুভূমির উত্তপ্ত বালুকাময় জমিনের বুক চিরে বয়ে গেছে বানি নদী। এই নদীর তীরেই গড়ে উঠেছে ঐতিহ্যবাহী ডিজেনি মসজিদ। মসজিদটি ২৪৫ ফুট আয়তনবিশিষ্ট ৩ ফুট উঁচু কাঠামোর ওপর নির্মিত। বর্ষাকালে বানি নদীর প্লাবিত পানি থেকে মসজিদটি সুরক্ষিত রাখে এই কাঠামো। দূর থেকে মসজিদটি দেখলে যে কেউ হারিয়ে যাবে নন্দনমুগ্ধতায়। চোখে ধরা দেবে এক অসাধারণ দৃশ্যপট। মসজিদটির উচ্চতা প্রায় ২০ মিটার এবং দৈর্ঘ্য প্রায় ৯১ মিটার। আফ্রিকার স্থানীয় সুদানো-সাহেলাইন স্থাপত্যশৈলীতে নির্মিত হয়েছে এটি।

জেনির ২৬তম শাসক কুনবোরোর হাতে এ মসজিদের মূল ভিত্তি স্থাপিত হয়। কুনবোরো রাজা হওয়ার পর ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেন। জেনির সাধারণ মানুষ তখন ব্যাপক উৎসাহে গ্রহণ করে নেন তাদের প্রথম মুসলমান শাসককে। কুনবোরো চিন্তা করলেন তার প্রজাদের ইবাদতের জন্য একটি মসজিদ দরকার। তাই ঠিক করলেন তার প্রাসাদ ভেঙে সেই স্থানে নির্মাণ করবেন একটি মসজিদ। গ্রামের অভিজ্ঞ প্রকৌশলীকে ডেকে আনা হলো। সিদ্ধান্ত হলো মসজিদ তৈরিতে শুধু কাদামাটি এবং গ্রামের সাধারণ জিনিসপত্র ব্যবহার করা হবে। মসজিদ নির্মাণ শেষে মসজিদের পূর্বদিকে রাজার জন্য নতুন প্রাসাদ নির্মাণ করা হয়। এটি ছিল মসজিদের তুলনায় আকারে ছোট। পরবর্তীকালে রাজার উত্তরাধিকারীরা এ মসজিদের সঙ্গে আরও দুটো মিনার এবং চারপাশে উঁচু দেয়াল নির্মাণ করেন।

১৮২৭ সাল পর্যন্ত এ মসজিদ সম্পর্কে কোনো প্রকার লিখিত তথ্য খুঁজে পাওয়া যায় না। ফরাসি পর্যটক রেনে কেইলি ১৮২৭ সালে মালি ভ্রমণের সময় মসজিদটি আবিষ্কার করেন। পরে তিনি এই মসজিদের বিস্তারিত বর্ণনা ‘জার্নাল অব দ্য ভয়েজ টু টিম্বাকটু অ্যান্ড জেনি’তে উল্লেখ করেন। তিনিই প্রথম ইউরোপিয়ান ব্যক্তিত্ব, যিনি মসজিদের আদি অবয়ব ধ্বংস হওয়ার পূর্বে নিজের চোখে দেখেছিলেন। তিনি সফর শেষে তার প্রবন্ধে লেখেন, ‘ডিজেনি শহরে মাটির তৈরি একটি মসজিদ আছে। মসজিদটির দুই পাশে দুটো দর্শনীয় টাওয়ার রয়েছে। তবে মসজিদের অবস্থা খুবই আশঙ্কাজনক।’ এরপর থেকে মসজিদটি সম্পর্কে মানুষ জানতে পারে এবং এর প্রতি তাদের আগ্রহ বাড়তে থাকে।

গবেষকদের মতে, ১৮৩৪ থেকে ১৮৩৬ সালের দিকে প্রথম মসজিদের ভগ্নাবশেষের ওপর দ্বিতীয় মসজিদটি তৈরি করা হয়। এর প্রমাণ হিসেবে ১৮৯৬ সালে ফরাসি সাংবাদিক ফেলিক্স ডুবইস মসজিদটির ভগ্নাবশেষের ওপর একটি হাতে আঁকা ছবি প্রকাশ করেন। সেখানে দেখানো হয় আকার ও আকৃতিতে দ্বিতীয় মসজিদের স্থাপনা প্রথম মসজিদের চাইতে অনেক বড়। পাশাপাশি দ্বিতীয়বার নির্মিত মসজিদের মিনারের পাশাপাশি স্তম্ভের ব্যবহার করা হয়েছিল।

বর্তমানে মসজিদটির যে রূপ দেখা যায়, তা মূলত এর তৃতীয় সংস্করণ। ১৯০৭ সালের দিকে এর কাজ সম্পূর্ণভাবে শেষ হয়। অনেক বিশেষজ্ঞের ধারণা, মালি যখন ফরাসি উপনিবেশের অধীনে ছিল, তখন ফরাসিরা এ মসজিদ পুনরায় নির্মাণ করে। বর্তমানে মসজিদটিতে বেশ পরিকল্পিত স্থাপত্যশৈলীর ছাপ পাওয়া যায়। মসজিদটির চারপাশ উঁচু মাটির প্রাচীর দিয়ে ঘেরা। মসজিদটির মাঝখানের চূড়াটি স্তম্ভের মতো খানিকটা উঁচু। মসজিদের দেয়াল এবং ছাদে আলো-বাতাস প্রবেশে জন্য রয়েছে অনেকগুলো ছিদ্র। এর বাইরের অংশের তিনটি উঁচু মিনার মসজিদটি অসম্ভব সৌন্দর্যে পৌঁছে দিয়েছে।

প্রচণ্ড গরমের দিনেও মসজিদের অভ্যন্তরীণ পরিবেশ থাকে অত্যন্ত ঠান্ডা। ভেতরে একসঙ্গে প্রায় তিন হাজার মানুষ নামাজ আদায় করতে পারে। বর্তমানে মসজিদের সঙ্গে মহিলাদের জন্য নামাজের আলাদা একটি স্থান নির্ধারণ করা হয়েছে। মসজিদের বাইরে দুজন মুসলিম নেতার সমাধি রয়েছে।

মসজিদের দেয়াল ও ছাদের ভার বহন করার জন্য ব্যবহার করা হয়েছে ৯০টি মজবুত কাঠের কলাম। অন্যান্য মৌসুমে তেমন কোনো সমস্যা না হলেও বর্ষা মৌসুমে বৃষ্টির পানিতে মসজিদের দেয়াল ও ছাদ কিছুটা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এ কারণে স্বেচ্ছাশ্রমের ভিত্তিতে প্রতি বছরের এপ্রিল মাসে মসজিদের পুনর্নির্মাণ উৎসব পালিত হয়, যাকে স্থানীয় ভাষায় বলা হয় ‘লা ক্রিপিসাজি’ বা ‘পলেস্তারা দিবস’। মূলত জুলাই থেকে আগস্ট মাস পর্যন্ত মালিতে ভারী বৃষ্টিবর্ষণ হয়, এর আগেই মসজিদটি সংস্কার করে প্রস্তুত রাখা হয়।

বর্তমানে বর্ষাকালে মসজিদের খুব সামান্য অংশই ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তারপরও প্রতি বছর এই সংস্কারকাজ চালু রাখার মূল কারণ হচ্ছে উৎসবটি উদযাপন করা। দীর্ঘদিনের ঐতিহ্য হওয়ায় এই উৎসবে স্থানীয় বাসিন্দাদের প্রায় সবাই অংশগ্রহণ করে। উৎসবের আগের রাতে পুরো শহরকে দারুণভাবে সাজানো হয়। তারপর সকাল থেকে মসজিদ সংস্কারের কাজ শুরু হয়। মসজিদের নির্মাণকাজে অংশগ্রহণ করতে পারা ডিজেনি শহরবাসীর জন্য গর্বের বিষয়। কেননা এটি তাদের কাছে অত্যন্ত সৌভাগ্য ও পুণ্যের কাজ। তবে একসঙ্গে সব মানুষকে এ কাজে অংশগ্রহণের সুযোগ দেওয়া বেশ কঠিন। তাই প্রত্যেক সমাজ থেকে একটি করে প্রতিনিধিদলকে এ সংস্কারকাজে অংশগ্রহণের সুযোগ দেওয়া হয়। তারা খুব যত্ন সহকারে দেয়ালে নতুন করে মাটির প্রলেপ দেয় এবং ক্ষতিগ্রস্ত জায়গা সংস্কার করে। প্রায় ৮০ জন পেশাদার মিস্ত্রি তাদের কার্যক্রম পরিচালনা ও পর্যবেক্ষণ করেন। মসজিদ সংস্কারের এমন ঐক্যবদ্ধ প্রচেষ্টার নজির সম্ভবত বর্তমান বিশ্বের আর কোথাও নেই। একটি মসজিদ পুরো ডিজেনি শহরবাসীকে ভ্রাতৃত্বের বন্ধনে আবদ্ধ করে রেখেছে। ১৯৮৮ সালে ইউনেসকো এ মসজিদটিসহ এর চারপাশের ঐতিহাসিক স্থানগুলোকে বিশ্ব ঐতিহ্য হিসেবে তালিকাভুক্ত করেছে।

লেখক: মাদ্রাসা শিক্ষক

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow