আবদুর রহমান ইবনে আউফ (রা.)
ইসলামের ইতিহাসে এমন কিছু মানুষ আছেন, যাদের জীবন একসঙ্গে বহু গুণের পাঠশালা। তারা ছিলেন ইমানদার, সাহসী, ত্যাগী, দক্ষ সংগঠক এবং একই সঙ্গে নিজের ব্যক্তিগত পেশাগত জীবন বা আয়-উপার্জনের ক্ষেত্রেও সফল। কিন্তু তাদের সাফল্যের সবচেয়ে বড় সৌন্দর্য ছিল, দুনিয়া তাদের হাতে ছিল, হৃদয়ে নয়। আবদুর রহমান ইবনে আউফ (রা.) ছিলেন এমনই এক অনন্য সাহাবি। তিনি ছিলেন রাসুলুল্লাহ (সা.) এর প্রিয় সাহাবিদের একজন, জান্নাতের সুসংবাদপ্রাপ্ত দশ সাহাবির অন্তর্ভুক্ত এবং ইসলামের প্রথম যুগের অন্যতম সফল ব্যবসায়ী। তার জীবন থেকে সবচেয়ে বড় যে শিক্ষাটি আমরা পাই তা হলো, সম্পদ মানুষকে বড় করে না; বরং সম্পদকে আল্লাহর পথে ব্যয় করার মানসিকতাই মানুষকে বড় করে। ইসলাম গ্রহণের শুরুতেই ত্যাগের পথ আবদুর রহমান ইবনে আউফ (রা.) কোরাইশের সম্মানিত বনি যুহরা গোত্রে জন্মগ্রহণ করেন। জাহেলি যুগে তার নাম ছিল ‘আবদু আমর’; কোনো কোনো বর্ণনায় ‘আবদু কা’বা’ও বলা হয়েছে। ইসলাম গ্রহণের পর রাসুলুল্লাহ (সা.) তার নাম রাখেন ‘আবদুর রহমান’, পরম দয়াময়ের বান্দা। তিনি ইসলামের প্রথম যুগে ইমান গ্রহণকারীদের অন্যতম। সে সময় ইসলাম গ্রহণ করা মানে শুধু একটি নতুন ধর্মবিশ্বাস গ্রহণ কর
ইসলামের ইতিহাসে এমন কিছু মানুষ আছেন, যাদের জীবন একসঙ্গে বহু গুণের পাঠশালা। তারা ছিলেন ইমানদার, সাহসী, ত্যাগী, দক্ষ সংগঠক এবং একই সঙ্গে নিজের ব্যক্তিগত পেশাগত জীবন বা আয়-উপার্জনের ক্ষেত্রেও সফল। কিন্তু তাদের সাফল্যের সবচেয়ে বড় সৌন্দর্য ছিল, দুনিয়া তাদের হাতে ছিল, হৃদয়ে নয়। আবদুর রহমান ইবনে আউফ (রা.) ছিলেন এমনই এক অনন্য সাহাবি। তিনি ছিলেন রাসুলুল্লাহ (সা.) এর প্রিয় সাহাবিদের একজন, জান্নাতের সুসংবাদপ্রাপ্ত দশ সাহাবির অন্তর্ভুক্ত এবং ইসলামের প্রথম যুগের অন্যতম সফল ব্যবসায়ী। তার জীবন থেকে সবচেয়ে বড় যে শিক্ষাটি আমরা পাই তা হলো, সম্পদ মানুষকে বড় করে না; বরং সম্পদকে আল্লাহর পথে ব্যয় করার মানসিকতাই মানুষকে বড় করে।
ইসলাম গ্রহণের শুরুতেই ত্যাগের পথ
আবদুর রহমান ইবনে আউফ (রা.) কোরাইশের সম্মানিত বনি যুহরা গোত্রে জন্মগ্রহণ করেন। জাহেলি যুগে তার নাম ছিল ‘আবদু আমর’; কোনো কোনো বর্ণনায় ‘আবদু কা’বা’ও বলা হয়েছে। ইসলাম গ্রহণের পর রাসুলুল্লাহ (সা.) তার নাম রাখেন ‘আবদুর রহমান’, পরম দয়াময়ের বান্দা।
তিনি ইসলামের প্রথম যুগে ইমান গ্রহণকারীদের অন্যতম। সে সময় ইসলাম গ্রহণ করা মানে শুধু একটি নতুন ধর্মবিশ্বাস গ্রহণ করা ছিল না; বরং এর অর্থ ছিল নিজের সামাজিক অবস্থান, ব্যবসা-বাণিজ্য, পারিবারিক নিরাপত্তা এবং ভবিষ্যৎ স্বাচ্ছন্দ্যকে অনিশ্চয়তার মুখে ঠেলে দেওয়া। মুশরিকদের নির্যাতন যখন দিন দিন তীব্র হচ্ছিল, তখন আবদুর রহমান (রা.) ও অন্য মুসলমানদের মতো হিজরতের কঠিন পথ বেছে নেন।
তিনি আবিসিনিয়ায় হিজরতকারী সাহাবিদের অন্তর্ভুক্ত ছিলেন। সেখানে কিছুদিন অবস্থানের পর মক্কার পরিস্থিতি পরিবর্তন হয়েছে শুনে অনেকের সঙ্গে তিনি মক্কায় ফিরে আসেন। কিন্তু ফিরে এসে বুঝতে পারেন, মক্কার পরিস্থিতি আগের মতোই প্রতিকূল। পরবর্তী সময়ে মহান আল্লাহ তাদের জন্য মদিনার দরজা খুলে দেন।
মদিনায় নতুন জীবন, শূন্য থেকে শুরু
হিজরতের পর আবদুর রহমান ইবনে আউফ (রা.) মদিনায় পৌঁছালেন, তখন তিনি প্রায় নিঃস্ব। মক্কায় তিনি ছিলেন স্বচ্ছল ব্যবসায়ী। কিন্তু হিজরত তাকে প্রায় সবকিছু থেকে বিচ্ছিন্ন করে দিয়েছিল। নতুন শহর, নতুন পরিবেশ, নতুন মানুষ; কিন্তু হাতে নেই পুরোনো সম্পদ, ব্যবসা কিংবা প্রতিষ্ঠিত কোনো অবলম্বন।
মদিনার আনসাররা মুহাজিরদের জন্য নিজেদের ঘর, সম্পদ ও জীবনের দরজা খুলে দিয়েছিলেন। আবদুর রহমান (রা.) এর সঙ্গে সাদ ইবনে রাবি (রা.) এর ভ্রাতৃত্ব স্থাপিত হয়। সাদ (রা.) ছিলেন মদিনার অন্যতম ধনী সাহাবি। তিনি আবদুর রহমান (রা.) কে আন্তরিকভাবে বললেন, আমার সম্পদ অনেক; তুমি চাইলে তা ভাগ করে নিতে পারো। কিন্তু আবদুর রহমান ইবনে আউফের (রা.) বলেছিলেন, ‘আল্লাহ তোমার পরিবার ও সম্পদে বরকত দিন। আমাকে শুধু বাজারের পথ দেখিয়ে দাও।’
এই একটি বাক্যেই যেন তার জীবনের দর্শন ফুটে ওঠে। তিনি সাহায্য গ্রহণ করতে অস্বীকার করেননি; বরং এমন সাহায্য চেয়েছিলেন, যা তাকে নিজের পায়ে দাড়ানোর সুযোগ দেবে। তিনি জানতেন, শ্রম মানুষের মর্যাদা বাড়ায়। অন্যের সম্পদের ওপর নির্ভর করে জীবন কাটানোর চেয়ে নিজের সামর্থ্য দিয়ে নতুন করে শুরু করা উত্তম।
এরপর তিনি মদিনার বাজারে ব্যবসা শুরু করেন। অল্প সময়ের মধ্যেই তার ব্যবসায় সাফল্য আসে। কিন্তু তার এই সাফল্যের পেছনে ছিল না প্রতারণা, সুদ কিংবা অন্যায় মুনাফা। ছিল সততা, পরিশ্রম, বুদ্ধিমত্তা এবং আল্লাহর ওপর অগাধ ভরসা।
সম্পদের মালিক, সম্পদের দাস নন
আবদুর রহমান ইবনে আউফের (রা.) জীবনের সবচেয়ে বড় শিক্ষা হলো, তিনি সম্পদ অর্জন করেছিলেন, কিন্তু সম্পদ তাকে অধিকার করতে পারেনি।
ইসলাম সম্পদ নিষিদ্ধ করেনি। বরং হালাল উপায়ে সম্পদ অর্জন, পরিবারকে স্বচ্ছল রাখা এবং আল্লাহর পথে ব্যয় করাকে উৎসাহিত করেছে। আবদুর রহমান (রা.) ছিলেন এর উজ্জ্বল উদাহরণ। তিনি ছিলেন ধনী, কিন্তু তার হৃদয় ছিল আল্লাহমুখী। ব্যবসা তাকে ব্যস্ত রাখত, কিন্তু ইবাদত থেকে দূরে সরিয়ে দেয়নি। সম্পদ তার হাতে ছিল; হৃদয়ের আসনে ছিল আল্লাহ ও আখেরাত।
তার দানের ঘটনা ইসলামের ইতিহাসে বিস্ময় জাগায়। বিভিন্ন সময় তিনি বিপুল পরিমাণ সম্পদ আল্লাহর পথে ব্যয় করেছেন। তাবুকের অভিযানের সময় তার দানের কথা বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। তিনি তখন বিপুল পরিমাণ সম্পদ দান করে মুসলমানদের শক্তি বৃদ্ধি করেছিলেন।
তার দানের পরিমাণ যত বড় ছিল, তার চেয়েও বড় ছিল দানের মানসিকতা। তিনি দান করতেন এমনভাবে, যেন সম্পদ তার কাছে আমানত, দান করা তার দায়িত্ব, এটা নিজের কৃতিত্বের বিষয় নয়।
তিনি একজন সাহসী যোদ্ধাও ছিলেন। বদরসহ নবীজি (সা.) ও সাহাবিদের অনেকগুলো যুদ্ধেও তিনি অংশগ্রহণ করেছেন বীরত্বপূর্ণ অবদান রেখেছেন।
নেতৃত্বের যোগ্যতা ও দায়িত্ববোধ
আবদুর রহমান ইবনে আউফ (রা.) শুধু একজন ব্যবসায়ী বা যোদ্ধাই ছিলেন না; তিনি ছিলেন বিচক্ষণ ও দায়িত্বশীল সংগঠক ও নেতা। রাসুলুল্লাহ (সা.) তাকে বিভিন্নস সময় নেতৃত্বের দায়িত্ব দিয়েছেন। যেমন দুমাতুল জান্দালের অভিযানে নেতৃত্ব দেওয়ার দায়িত্ব তার ওপর অর্পিত হয়েছিল।
এই অভিযানে তার নেতৃত্বের একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য ছিল, শুধু শক্তি প্রয়োগ নয়, বরং দাওয়াত ও প্রজ্ঞার মাধ্যমে মানুষের কাছে ইসলামের বার্তা পৌঁছে দেওয়া। তিনি সেখানে গিয়ে কয়েক দিন ইসলামের দাওয়াত দেন। পরবর্তীতে সেখানকার মানুষ ইসলামের প্রতি আকৃষ্ট হয়।
খলিফা নির্বাচনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা
ওমর ইবনুল খাত্তাবের (রা.) শাহাদাতের পর পরবর্তী খলিফা নির্বাচনের জন্য ছয়জন বিশিষ্ট সাহাবিকে নিয়ে যে শূরা গঠিত হয়েছিল, আবদুর রহমান ইবনে আউফ (রা.) ছিলেন তাদের একজন। এই ছয়জনের মধ্যে ছিলেন আলী (রা.), উসমান (রা.), তালহা (রা.), যুবাইর (রা.), সাদ ইবনে আবি ওয়াক্কাস (রা.) এবং আবদুর রহমান ইবনে আউফ (রা.)।
এই শূরা কমিটি হজরত ওসমানকে (রা.) খলিফা নির্বাচন করে। এ ক্ষেত্রে আবদুর রহমান ইবনে আউফ (রা.) গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।
দুনিয়ার প্রাচুর্য, আখেরাতের ভয়
আবদুর রহমান ইবনে আউফ (রা.) এর জীবন যত সমৃদ্ধ হয়েছে, তার অন্তরে তাকওয়া বা আল্লাহর ভয় তত গভীর হয়েছে। তিনি জানতেন, সম্পদ যত বেশি, হিসাবও তত কঠিন।
সাহাবিদের জীবন থেকে আমরা দেখি, তারা সম্পদকে প্রয়োজনীয় বস্তু হিসেবে দেখলেও সম্পদের মোহে বন্দি হননি। আবদুর রহমান (রা.) ছিলেন তার উজ্জ্বল উদাহরণ। তিনি উপার্জন করেছেন, পরিবার পরিচালনা করেছেন, ব্যবসা করেছেন; কিন্তু একই সঙ্গে দান করেছেন, আল্লাহর পথে ব্যয় করেছেন এবং আখেরাতের হিসাবকে সামনে রেখেছেন।
মৃত্যু
ঐতিহাসিক ইবন সা’দের মতে আবদুর রহমান ইবনে আউফ (রা.) ৩২ হিজরিতে ৭৫ বছর বয়সে ইনতেকাল করেন। কিন্তু আরেক ঐতিহাসিক ইবন হাজারের মত হলো, তিনি ৭২ বছর জীবন লাভ করেছিলেন। ইবন হাজার আরও বলেছেন, হজরত ওসমান অথবা যুবাইর ইবনুল আওয়াম তার জানাজার ইমামতি করেন, তাকে মদিনার জান্নাতুল বাকিতে দাফন করা হয় এবং গোরস্থান পর্যন্ত তার লাশ বহনকারীদের মধ্যে প্রখ্যাত সাহাবী সা’দ ইবনে আবি ওয়াক্কাসও ছিলেন।
অন্যান্য মত অনুযায়ী, আবদুর রহমান ইবনে আউফ (রা.) ৩৩ হিজরি মোতাবেক ৬৫৩-৬৫৪ খ্রিষ্টাব্দে ইনতেকাল করেন। বর্তমান জর্ডানের আম্মানে তাকে দাফন করা হয়।
ওএফএফ
What's Your Reaction?