‘আম-চিংড়ির সম্ভাবনা কাজে লাগাতে দরকার প্রসেসিং জোন’

2 days ago 2

ভৌগোলিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে থেকেও শিল্প ও বাণিজ্যে পিছিয়ে রয়েছে সাতক্ষীরা জেলা। প্রতিবেশী জেলাগুলোর তুলনায় এর বাণিজ্যিক অগ্রগতি অনেকটাই ধীর। অবকাঠামোগত ঘাটতি, শিল্পায়ন ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার অভাবে জেলার বিপুল সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও অর্থনীতিতে স্থবিরতা বিরাজ করছে। এই জেলার সম্ভাবনা, চ্যালেঞ্জ ও উত্তরণের পথ নিয়ে সম্প্রতি জাগো নিউজের সঙ্গে কথা বলেছেন সাতক্ষীরা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সভাপতি নাসিম ফারুক খান মিঠু। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন জেলা প্রতিনিধি আহসানুর রহমান রাজীব

জাগো নিউজ: সাতক্ষীরার ব্যবসা-বাণিজ্যের বর্তমান চালচিত্র কেমন? পার্শ্ববর্তী জেলাগুলোর তুলনায় এর অবস্থান কোথায়?

নাসিম ফারুক খান মিঠু: ভৌগোলিকভাবে অত্যন্ত সম্ভাবনাময় হওয়া সত্ত্বেও সাতক্ষীরার ব্যবসা-বাণিজ্য কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে পৌঁছাতে পারেনি। যশোর, খুলনা বা কুষ্টিয়ার মতো প্রতিবেশী জেলাগুলোর তুলনায় আমাদের বাণিজ্যিক অগ্রগতি বেশ ধীর। এর প্রধান কারণগুলো হলো অবকাঠামোগত দুর্বলতা, নতুন শিল্প-কারখানার অভাব, দক্ষ জনশক্তির সংকট এবং দীর্ঘমেয়াদি সরকারি পরিকল্পনার অনুপস্থিতি। আমাদের বাণিজ্য মূলত কৃষি, মৎস্য এবং সীমিত পরিসরে পণ্য আমদানি-রপ্তানির মধ্যেই সীমাবদ্ধ, যা বড় আকারের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বা কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে পারছে না।

জাগো নিউজ: দেশের অন্যতম বৃহৎ স্থলবন্দর হওয়া সত্ত্বেও ভোমরার উন্নয়নে প্রধান বাধাগুলো কী?

নাসিম ফারুক খান মিঠু: ভোমরা বন্দর দিয়ে প্রতি বছর হাজার কোটি টাকার পণ্য আমদানি-রপ্তানি হলেও এখানে বেশ কিছু মৌলিক ঘাটতি রয়েছে। বন্দরে পূর্ণাঙ্গ ব্যাংকিং পরিষেবা, কাস্টম হাউস, এক্স-রে স্ক্যানার এবং ইপিআই স্টেশনের মতো জরুরি সুবিধা নেই। ব্যবস্থাপনার আধুনিকায়ন না হওয়ায় ব্যবসায়ীরা প্রতিনিয়ত ক্ষতির শিকার হচ্ছেন। ভারতের ঘোজাডাঙ্গা বন্দরে ডিজিটাল স্ক্যানার থেকে শুরু করে আধুনিক সব সুবিধা থাকলেও আমাদের বন্দর সেই তুলনায় পিছিয়ে, যা আমাদের প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতা কমাচ্ছে।

জাগো নিউজ: জেলার বাণিজ্য প্রসারে রেল ও নৌপথের উন্নয়ন কতটা জরুরি বলে আপনি মনে করেন?

নাসিম ফারুক খান মিঠু: রেলপথ ও নৌপথের উন্নয়ন সাতক্ষীরার বাণিজ্যের জন্য অপরিহার্য। জেলায় কোনো রেল সংযোগ না থাকায় আমাদের পণ্য পরিবহনের খরচ অনেক বেশি। পাশের জেলার সঙ্গে রেল যোগাযোগ স্থাপিত হলে আমদানি-রপ্তানি খরচ কমবে এবং পচনশীল পণ্য দ্রুত গন্তব্যে পৌঁছানো সম্ভব হবে। এছাড়া আমাদের প্রায় ৭০০ কিলোমিটার নৌপথ ড্রেজিং ও সঠিক ব্যবস্থাপনার অভাবে প্রায় অকার্যকর। এই নৌপথগুলোকে পুনরায় সক্রিয় করা গেলে কৃষিপণ্য ও ভারী মালামাল পরিবহনে একটি বিপ্লব আনা সম্ভব।

জাগো নিউজ: সাতক্ষীরার আম চাষিরা কেন ন্যায্যমূল্য থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন এবং এর সমাধানে চেম্বার কী ভাবছে?

নাসিম ফারুক খান মিঠু: সাতক্ষীরার আমের আন্তর্জাতিক খ্যাতি থাকলেও এখানে কোনো হিমাগার বা আম প্রক্রিয়াজাতকরণ কেন্দ্র নেই। ফলে প্রতি বছর বিপুল পরিমাণ আম নষ্ট হয় এবং কৃষকরা সঠিক দাম পান না। আমরা একটি ‌‘ম্যাংগো প্রসেসিং সেন্টার’ স্থাপনের জন্য সরকারি ও বেসরকারি বিনিয়োগের আহ্বান জানিয়েছি; যেখানে আম সংরক্ষণ, জুস, আমচূর্ণ ইত্যাদি তৈরি করে বাজারজাত করা যাবে। এতে কৃষকরা লাভবান হবেন এবং নতুন শিল্প গড়ে উঠবে।

আরও পড়ুন:

জাগো নিউজ: সাতক্ষীরায় বড় শিল্প-কারখানা গড়ে না ওঠার পেছনে মূল কারণগুলো কী?

নাসিম ফারুক খান মিঠু: বড় শিল্প-কারখানা গড়ে না ওঠার পেছনে বেশ কিছু চ্যালেঞ্জ রয়েছে। এর মধ্যে প্রধান হলো জেলায় সরাসরি গ্যাস সংযোগের অভাব, অনিয়মিত বিদ্যুৎ সরবরাহ এবং দক্ষ কারিগরি জনবলের সংকট। এই কারণগুলো বড় বিনিয়োগকারীদের নিরুৎসাহিত করে। তবে আমরা চিংড়ি, কৃষি, টেক্সটাইল ও হালকা প্রকৌশল শিল্পের জন্য একটি শিল্প অঞ্চল প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করছি।

জাগো নিউজ: জেলার ঐতিহ্যবাহী সুন্দরবন টেক্সটাইল মিলটি পুনরায় চালুর বিষয়ে কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে?

নাসিম ফারুক খান মিঠু: একসময় এই মিলটি হাজার হাজার মানুষের কর্মসংস্থানের ঠিকানা ছিল, যা এখন পরিত্যক্ত। আমরা এটিকে সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্বে (পিপিপি) পুনরায় চালুর দাবি জানিয়েছি। এটি চালু হলে কেবল কর্মসংস্থানই বাড়বে না, জেলার অর্থনীতিও গতিশীল হবে।

জাগো নিউজ: সুন্দরবনের একটি বড় অংশ সাতক্ষীরায় থাকা সত্ত্বেও পর্যটন শিল্পে পিছিয়ে থাকার কারণ কী?

নাসিম ফারুক খান মিঠু: সুন্দরবনকে ঘিরে পর্যটনের বিপুল সম্ভাবনা থাকলেও অবকাঠামোগত অভাব, নিরাপত্তা এবং দুর্বল যোগাযোগ ব্যবস্থার কারণে বিনিয়োগকারীরা আগ্রহী হচ্ছেন না। সরকার যদি একটি পরিকল্পিত পর্যটন জোন গড়ে তোলে এবং বেসরকারি উদ্যোক্তাদের প্রণোদনা দেয়, তাহলে সাতক্ষীরাতেও পর্যটন শিল্পের বিকাশ সম্ভব, যা স্থানীয় অর্থনীতিতে বড় ভূমিকা রাখবে।

জাগো নিউজ: চিংড়ি শিল্পে সাতক্ষীরার সম্ভাবনা পুরোপুরি কাজে লাগছে না কেন?

নাসিম ফারুক খান মিঠু: সাতক্ষীরায় প্রচুর চিংড়ি উৎপাদিত হলেও আন্তর্জাতিক মানের হ্যাচারি, ল্যাব ও প্রসেসিং প্ল্যান্টের অভাবে রপ্তানি আশানুরূপ হচ্ছে না। অনেক সময় সিন্ডিকেটের কারণে চাষিরা ন্যায্যমূল্য থেকেও বঞ্চিত হন। আমরা সাতক্ষীরায় একটি আন্তর্জাতিক মানের ‘ফিশ প্রসেসিং জোন’ গড়ে তোলার জন্য সরকারের কাছে দাবি জানিয়েছি।

জাগো নিউজ: জেলার নারী ও তরুণ উদ্যোক্তাদের সহায়তায় চেম্বারের কোনো পরিকল্পনা আছে কি?

নাসিম ফারুক খান মিঠু: অবশ্যই। আমরা নারী ও তরুণ উদ্যোক্তাদের জন্য একটি ‘উদ্যোক্তা সহায়তা ডেস্ক’ গঠনের প্রস্তাব দিয়েছি। এর মাধ্যমে তাদের প্রশিক্ষণ, পুঁজি ও বাজার সংযোগ তৈরিতে সহায়তা করা হবে। বিশেষ করে, নারীদের জন্য একটি আলাদা মার্কেটিং প্ল্যাটফর্ম তৈরির পরিকল্পনাও আমাদের রয়েছে।

জাগো নিউজ: জেলার অর্থনীতিকে এগিয়ে নিতে সরকারের কাছে আপনাদের সুনির্দিষ্ট দাবিগুলো কী?

নাসিম ফারুক খান মিঠু: আমাদের প্রধান দাবিগুলো হলো ভোমরা বন্দরকে একটি পূর্ণাঙ্গ ও আধুনিক স্থলবন্দরে রূপান্তরিত করা, একটি শিল্পাঞ্চল প্রতিষ্ঠা, রেল ও নৌপথের উন্নয়ন, গ্যাস সংযোগ নিশ্চিত করা এবং কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্পে ভর্তুকি প্রদান। আমরা বিশ্বাস করি, সরকার ও বেসরকারি খাতের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় সাতক্ষীরা আবারও অর্থনৈতিকভাবে একটি গুরুত্বপূর্ণ জেলা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হবে।

জাগো নিউজ: আপনাকে ধন্যবাদ।

নাসিম ফারুক খান মিঠু: আপনাকেও ধন্যবাদ।

এসআর/এমএস

Read Entire Article