আমরা কি ক্রমেই অসহিষ্ণু হয়ে উঠছি?

একজন মানুষ ভিন্নমত প্রকাশ করলেন। সঙ্গে সঙ্গে তাঁকে আক্রমণ করা হলো। কেউ একটি রাজনৈতিক দলের সমালোচনা করলেন—তাঁকে প্রতিপক্ষের দালাল বলা হলো। কেউ ধর্ম, সংস্কৃতি, পোশাক, জীবনযাপন কিংবা সামাজিক কোনো বিষয়ে প্রচলিত মতের বাইরে কথা বললেন—তাঁর বিরুদ্ধে শুরু হলো সামাজিক বিচার। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি বাক্য, একটি ছবি বা একটি মতামত মুহূর্তের মধ্যে মানুষের বিরুদ্ধে জনমত তৈরি করে ফেলছে। অনেক সময় সত্য যাচাইয়ের আগেই রায় হয়ে যাচ্ছে, শাস্তির দাবিও উঠছে। প্রশ্ন হলো, আমরা কি সত্যিই ক্রমেই অসহিষ্ণু হয়ে উঠছি? প্রশ্নটির উত্তর সহজ নয়। কারণ বাংলাদেশে মানুষের মধ্যে সহমর্মিতা, পারস্পরিক সহযোগিতা ও সংকটে পাশে দাঁড়ানোর দীর্ঘ ঐতিহ্য আছে। বন্যা, ঘূর্ণিঝড়, অগ্নিকাণ্ড কিংবা কোনো জাতীয় দুর্যোগে মানুষ যে অসাধারণ মানবিকতার পরিচয় দেয়, তা বিশ্বে বিরল। কিন্তু একই সমাজে মতের অমিল, রাজনৈতিক পরিচয়, ধর্মীয় অনুভূতি, সামাজিক অবস্থান কিংবা ব্যক্তিগত জীবনযাপনের পার্থক্য নিয়ে যে দ্রুত ক্ষোভ, ঘৃণা ও আক্রমণাত্মক আচরণ তৈরি হচ্ছে, তা উদ্বেগজনক। আমরা হয়তো অন্যের বিপদে পাশে দাঁড়াতে পারি, কিন্তু অন্যের ভিন্নতাকে গ্রহণ করতে পারছি না। এটাই

আমরা কি ক্রমেই অসহিষ্ণু হয়ে উঠছি?

একজন মানুষ ভিন্নমত প্রকাশ করলেন। সঙ্গে সঙ্গে তাঁকে আক্রমণ করা হলো। কেউ একটি রাজনৈতিক দলের সমালোচনা করলেন—তাঁকে প্রতিপক্ষের দালাল বলা হলো। কেউ ধর্ম, সংস্কৃতি, পোশাক, জীবনযাপন কিংবা সামাজিক কোনো বিষয়ে প্রচলিত মতের বাইরে কথা বললেন—তাঁর বিরুদ্ধে শুরু হলো সামাজিক বিচার। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি বাক্য, একটি ছবি বা একটি মতামত মুহূর্তের মধ্যে মানুষের বিরুদ্ধে জনমত তৈরি করে ফেলছে। অনেক সময় সত্য যাচাইয়ের আগেই রায় হয়ে যাচ্ছে, শাস্তির দাবিও উঠছে।

প্রশ্ন হলো, আমরা কি সত্যিই ক্রমেই অসহিষ্ণু হয়ে উঠছি?

প্রশ্নটির উত্তর সহজ নয়। কারণ বাংলাদেশে মানুষের মধ্যে সহমর্মিতা, পারস্পরিক সহযোগিতা ও সংকটে পাশে দাঁড়ানোর দীর্ঘ ঐতিহ্য আছে। বন্যা, ঘূর্ণিঝড়, অগ্নিকাণ্ড কিংবা কোনো জাতীয় দুর্যোগে মানুষ যে অসাধারণ মানবিকতার পরিচয় দেয়, তা বিশ্বে বিরল। কিন্তু একই সমাজে মতের অমিল, রাজনৈতিক পরিচয়, ধর্মীয় অনুভূতি, সামাজিক অবস্থান কিংবা ব্যক্তিগত জীবনযাপনের পার্থক্য নিয়ে যে দ্রুত ক্ষোভ, ঘৃণা ও আক্রমণাত্মক আচরণ তৈরি হচ্ছে, তা উদ্বেগজনক।

আমরা হয়তো অন্যের বিপদে পাশে দাঁড়াতে পারি, কিন্তু অন্যের ভিন্নতাকে গ্রহণ করতে পারছি না।

এটাই আজকের বড় সংকট।

সহনশীলতা মানে অন্যের মতকে নিজের মত বলে মেনে নেওয়া নয়। সহনশীলতা মানে হলো—আমি আপনার সঙ্গে একমত নই, কিন্তু আপনার কথা বলার অধিকারকে স্বীকার করি। আপনি আমার বিশ্বাসের মতো বিশ্বাস করবেন না, কিন্তু আপনার বিশ্বাসের অধিকারকে আমি সম্মান করি। আপনি আমার রাজনৈতিক দলের সমর্থক নন, কিন্তু তাই বলে আপনি আমার শত্রু নন।

গণতন্ত্রের সবচেয়ে মৌলিক শিক্ষা এটাই। কিন্তু বাস্তব জীবনে আমরা ক্রমেই এই সহজ সত্যটি ভুলে যাচ্ছি।

বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ইতিহাস দেখলে বোঝা যায়, অসহিষ্ণুতা শুধু সামাজিক আচরণের সমস্যা নয়; এটি রাষ্ট্র ও রাজনৈতিক সংস্কৃতির সঙ্গেও গভীরভাবে যুক্ত। দীর্ঘ সময় ধরে রাজনৈতিক মতপ্রকাশ, বিরোধিতা ও সমালোচনার পরিসর সংকুচিত হয়েছে। বিভিন্ন সময়ে সাংবাদিক, লেখক, মানবাধিকারকর্মী, রাজনৈতিক কর্মী ও ভিন্নমতাবলম্বীরা চাপ, মামলা, হুমকি কিংবা হামলার মুখোমুখি হয়েছেন। জাতিসংঘের মানবাধিকার দপ্তর ২০২৪ সালের আন্দোলন ঘিরে গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের কথা উল্লেখ করেছে এবং ১ জুলাই থেকে ১৫ আগস্টের মধ্যে সর্বোচ্চ ১,৪০০ জন নিহত হয়ে থাকতে পারেন বলে অনুমান করেছে।

শেষ পর্যন্ত একটি দেশের গণতন্ত্রের সবচেয়ে বড় পরীক্ষা সংসদে নয়, মানুষের আচরণে। আমরা কি এমন একটি সমাজ গড়তে পারব, যেখানে মতভেদ থাকবে, কিন্তু বিদ্বেষ থাকবে না; প্রতিযোগিতা থাকবে, কিন্তু প্রতিহিংসা থাকবে না; বিশ্বাসে পার্থক্য থাকবে, কিন্তু মানুষে মানুষে মর্যাদার পার্থক্য থাকবে না?

এ ধরনের অভিজ্ঞতা সমাজে শুধু ক্ষত তৈরি করে না; মানুষের মনোজগতে ভয়, প্রতিশোধ ও অবিশ্বাসের সংস্কৃতিও তৈরি করে।

যে সমাজ দীর্ঘদিন ধরে দেখে এসেছে, ক্ষমতাবানরা সমালোচনা সহ্য করে না, সেখানে সাধারণ মানুষও ধীরে ধীরে ভিন্নমতকে হুমকি হিসেবে দেখতে শেখে। রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে নাগরিক হিসেবে নয়, শত্রু হিসেবে দেখা শুরু হয়। আর একবার যখন প্রতিপক্ষকে মানুষ হিসেবে দেখা বন্ধ হয়ে যায়, তখন তার ওপর অন্যায় আচরণকে ন্যায্য বলে মনে হতে থাকে।

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বাংলাদেশে রাজনৈতিক প্রতিশোধ, জনতার চাপ, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে হুমকি এবং জনতার হাতে বিচার নিয়ে যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে, তা এই অসহিষ্ণুতারই বহিঃপ্রকাশ। মানবাধিকার সংস্থাগুলোও রাজনৈতিক প্রতিহিংসা, জনতার সহিংসতা ও মতপ্রকাশের ওপর চাপ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে।

অসহিষ্ণুতার আরেকটি বড় ক্ষেত্র হলো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম।

ফেসবুক, ইউটিউব, টিকটক কিংবা অন্যান্য ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম মানুষের মতপ্রকাশের সুযোগ বাড়িয়েছে। কিন্তু একই সঙ্গে এগুলো ক্ষোভ, গুজব ও ঘৃণা ছড়ানোর গতিও বহুগুণ বাড়িয়েছে। আগে একটি গুজব একটি পাড়া বা গ্রামে সীমাবদ্ধ থাকত; এখন তা কয়েক মিনিটে লাখো মানুষের কাছে পৌঁছে যায়। কোনো ঘটনার সত্যতা যাচাই করার আগেই মানুষ মন্তব্য করে, শেয়ার করে, বিচার করে এবং অনেক সময় আক্রমণে অংশ নেয়।

ডিজিটাল মাধ্যম আমাদের দ্রুত প্রতিক্রিয়া দিতে শিখিয়েছে; গভীরভাবে ভাবতে নয়।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অ্যালগরিদমও অনেক সময় এমন কনটেন্ট সামনে আনে, যা আমাদের আগের মতামতকে আরও শক্তিশালী করে। ফলে মানুষ নিজের মতের সঙ্গে মেলে এমন তথ্যই বেশি দেখতে থাকে। যে ব্যক্তি একটি রাজনৈতিক মতাদর্শে বিশ্বাস করেন, তিনি ক্রমাগত সেই মতাদর্শের সমর্থক কনটেন্ট দেখতে থাকেন। অন্য মতের মানুষকে তিনি ধীরে ধীরে অজ্ঞ, অসৎ বা শত্রু হিসেবে ভাবতে শুরু করেন।

এভাবে সমাজে তৈরি হয় ‘আমরা’ বনাম ‘ওরা’।

এটি শুধু বাংলাদেশের সমস্যা নয়। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে রাজনৈতিক মেরুকরণ, ঘৃণাত্মক বক্তব্য, অনলাইন হয়রানি ও মতের অসহিষ্ণুতা বাড়ছে। তবে বাংলাদেশের মতো রাজনৈতিকভাবে উত্তেজনাপূর্ণ সমাজে এর প্রভাব আরও ভয়াবহ হতে পারে। কারণ এখানে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের সঙ্গে রাজনৈতিক পরিচয়, ধর্মীয় অনুভূতি ও জনতার আবেগ দ্রুত যুক্ত হয়ে যায়।

কোনো গুজব তাই শুধু গুজব থাকে না; তা কখনো সহিংসতার কারণ হয়ে ওঠে।

ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভয়, ভুল তথ্য ও ঘৃণাত্মক বক্তব্যের প্রভাব নিয়ে গবেষণাতেও উদ্বেগের বিষয় উঠে এসেছে। গবেষণায় দেখা গেছে, ভুল তথ্য, সামাজিক কলঙ্ক, স্টেরিওটাইপ ও ভয় সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর অনলাইন অংশগ্রহণ ও মতপ্রকাশকে প্রভাবিত করে।

এখানে একটি মৌলিক প্রশ্ন আছে: আমরা কি সত্যিই অন্যের মতকে ভয় পাই, নাকি নিজের মতের দুর্বলতা নিয়ে ভীত?

যে ব্যক্তি নিজের বিশ্বাসে দৃঢ়, সে সাধারণত প্রশ্নকে ভয় পায় না। সে যুক্তি দিয়ে উত্তর দেয়। কিন্তু যখন কোনো মতবাদ প্রশ্ন সহ্য করতে পারে না, তখন তার অনুসারীরা প্রশ্নকারীকে আক্রমণ করতে শুরু করে। ফলে সমাজে বিতর্কের জায়গা সংকুচিত হয়, আর চিৎকার যুক্তির জায়গা দখল করে নেয়।

আজ আমাদের রাজনৈতিক আলোচনা প্রায়ই এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে, যেখানে একজন মানুষের বক্তব্যের মূল্যায়ন করা হয় তিনি কী বলেছেন তা দিয়ে নয়, তিনি কোন দলের মানুষ তা দিয়ে। একজন অর্থনীতিবিদ কোনো নীতি নিয়ে মত দিলেন—প্রথমে দেখা হলো তিনি কোন রাজনৈতিক দলের সমর্থক। একজন সাংবাদিক সরকারের সমালোচনা করলেন—তাঁকে কোনো দলের এজেন্ট বলা হলো। আবার বিরোধী দলের সমালোচনা করলে তাঁকে সরকারের দালাল বলা হলো।

এভাবে আমরা বক্তব্যকে নয়, বক্তাকে বিচার করছি।

এটি গণতন্ত্রের জন্য বিপজ্জনক।

গণতন্ত্রের শক্তি হলো মতের বহুত্ব। একটি সমাজে সবাই একই কথা বলবে—এটি গণতন্ত্র নয়; বরং তা চিন্তার স্থবিরতা। রাষ্ট্রের উন্নতি হয় যখন ভিন্ন মত একে অন্যকে প্রশ্ন করে, ভুল ধরিয়ে দেয় এবং বিকল্প পথ দেখায়।

কিন্তু আমাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে বিরোধিতা প্রায়ই দেশবিরোধিতা হিসেবে উপস্থাপিত হয়। ক্ষমতাসীনরা সমালোচনাকে ষড়যন্ত্র মনে করে, বিরোধীরা রাষ্ট্রের প্রতিটি পদক্ষেপকে সন্দেহের চোখে দেখে। ফলে যুক্তির জায়গায় সন্দেহ, আলোচনার জায়গায় অভিযোগ এবং রাজনৈতিক প্রতিযোগিতার জায়গায় শত্রুতা প্রতিষ্ঠিত হয়।

এখানেই রাজনৈতিক নেতৃত্বের বড় দায়িত্ব।

রাজনৈতিক দলগুলো যদি নিজেরাই ভিন্নমতকে সহ্য না করে, তাহলে সমাজে সহনশীলতা তৈরি হবে কীভাবে? একটি দল ক্ষমতায় থাকলে যদি সমালোচনা দমন করে এবং ক্ষমতার বাইরে থাকলে মতপ্রকাশের স্বাধীনতার কথা বলে, তাহলে মানুষ রাজনৈতিক নৈতিকতার প্রতি আস্থা হারায়। গণতন্ত্রের জন্য প্রয়োজন—ক্ষমতায় থাকুক বা বিরোধী দলে থাকুক, সব দলের জন্য একই নীতি।

ভিন্নমতকে সম্মান করার সংস্কৃতি দলের ভেতর থেকেই শুরু করতে হবে।

অসহিষ্ণুতার সঙ্গে বিচারব্যবস্থার দুর্বলতারও সম্পর্ক আছে। যখন মানুষ মনে করে আইন দ্রুত বিচার দিতে পারে না, তখন তারা নিজেরাই বিচার করতে চায়। যখন রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান দুর্বল হয়, তখন জনতার আবেগ আইনকে প্রতিস্থাপন করতে শুরু করে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অভিযোগ উঠল, মানুষ জড়ো হলো, কাউকে অপরাধী ঘোষণা করা হলো—এরপর শুরু হলো শাস্তি।

কিন্তু আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়া কোনোভাবেই ন্যায়বিচার নয়।

একজন মানুষ অপরাধী হলেও তাকে বিচার করার অধিকার আদালতের, জনতার নয়। অভিযোগ সত্য হলেও জনতার হাতে শাস্তি দেওয়ার অধিকার নেই। কারণ আইনের শাসনের সবচেয়ে বড় পরীক্ষা হলো—আমরা যাকে অপছন্দ করি, তার অধিকারও কি রক্ষা করতে পারি?

এই প্রশ্নের উত্তরই একটি সভ্য সমাজের পরিচয় নির্ধারণ করে।

অসহিষ্ণুতার আরেকটি উৎস হলো আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা। আমরা শিশুদের পরীক্ষায় ভালো করতে শেখাই, কিন্তু ভিন্ন মতের মানুষের সঙ্গে কীভাবে কথা বলতে হয়, তা শেখাই না। আমরা সাফল্যের প্রতিযোগিতা শেখাই, কিন্তু সহমর্মিতা শেখাই না। আমরা ইতিহাস মুখস্থ করাই, কিন্তু ইতিহাসের ভিন্ন ব্যাখ্যা নিয়ে আলোচনা করতে শেখাই না।

বিদ্যালয় ও বিশ্ববিদ্যালয়ে বিতর্ক, মুক্ত আলোচনা, নাগরিক শিক্ষা ও মানবিক মূল্যবোধের চর্চা বাড়াতে হবে। একটি তরুণকে শুধু চাকরির বাজারের জন্য প্রস্তুত করলেই হবে না; তাকে গণতান্ত্রিক সমাজের নাগরিক হিসেবেও প্রস্তুত করতে হবে।

পরিবারের ভূমিকাও গুরুত্বপূর্ণ। শিশুরা বড়দের আচরণ দেখে শেখে। বাবা-মা যদি রাজনৈতিক মতের পার্থক্যের কারণে আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্ন করেন, যদি অন্য ধর্মের মানুষকে অবজ্ঞা করেন, যদি গৃহকর্মী বা নিম্নআয়ের মানুষকে অপমান করেন, তাহলে শিশুরা সহনশীলতার পাঠ কোথা থেকে শিখবে?

সহনশীলতা কোনো বক্তৃতার বিষয় নয়; এটি প্রতিদিনের আচরণের অভ্যাস।

আমাদের গণমাধ্যমেরও দায়িত্ব আছে। উত্তেজনাপূর্ণ শিরোনাম, যাচাইহীন তথ্য ও বিভাজনমূলক ভাষা মানুষের ক্ষোভ বাড়াতে পারে। সাংবাদিকতার কাজ শুধু খবর দেওয়া নয়; সমাজকে তথ্যসমৃদ্ধ ও দায়িত্বশীল আলোচনার দিকে নিয়ে যাওয়া। মতপ্রকাশের স্বাধীনতা যেমন রক্ষা করতে হবে, তেমনি তথ্য যাচাই ও দায়িত্বশীল সাংবাদিকতার মানও নিশ্চিত করতে হবে।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারকারীদেরও কিছু নৈতিক দায়িত্ব আছে। কোনো পোস্ট শেয়ার করার আগে যাচাই করা, গুজব না ছড়ানো, ব্যক্তিগত আক্রমণ এড়িয়ে চলা, ভিন্নমতকে অপমান না করা—এসব খুব সাধারণ কাজ। কিন্তু সমাজের পরিবেশ বদলাতে এই সাধারণ কাজগুলোরই প্রয়োজন।

সবচেয়ে বড় পরিবর্তন আসতে হবে আমাদের নিজেদের ভেতর থেকে।

আমরা কি অন্যের কথা শেষ পর্যন্ত শুনি? আমরা কি কখনো নিজের মত পরিবর্তন করতে প্রস্তুত? আমরা কি স্বীকার করতে পারি যে আমাদের রাজনৈতিক দল ভুল করতে পারে? আমাদের ধর্মীয় ব্যাখ্যা নিয়ে প্রশ্ন থাকতে পারে? আমাদের সামাজিক মূল্যবোধ সময়ের সঙ্গে বদলাতে পারে? আমরা কি বুঝতে পারি, সত্যের ওপর কোনো ব্যক্তি বা দলের একচেটিয়া মালিকানা নেই?

এই প্রশ্নগুলো যতদিন না আমরা নিজেদের করি, ততদিন অসহিষ্ণুতার বিরুদ্ধে কোনো আইনই যথেষ্ট হবে না।

আইন প্রয়োজন। ঘৃণাত্মক বক্তব্য, সহিংসতার উসকানি, হামলা ও হুমকির বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা প্রয়োজন। কিন্তু আইন দিয়ে মানুষের মন পুরোপুরি বদলানো যায় না। মানুষের মধ্যে যুক্তিবোধ, সহমর্মিতা ও আত্মসংযম তৈরি করতে হয় শিক্ষা, পরিবার, সংস্কৃতি ও রাজনৈতিক চর্চার মাধ্যমে।

বাংলাদেশের ইতিহাসে সহনশীলতার বহু উদাহরণ আছে। এই ভূখণ্ড বহু ধর্ম, ভাষা, সংস্কৃতি ও জনগোষ্ঠীর সহাবস্থানের মধ্য দিয়ে গড়ে উঠেছে। বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতির শক্তিই বহুত্বে। আমাদের সাহিত্য, সংগীত ও লোকঐতিহ্য কোনো একক পরিচয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। নদী যেমন নানা স্রোতকে ধারণ করে সমুদ্রের দিকে যায়, তেমনি একটি দেশও নানা মত, বিশ্বাস ও পরিচয়কে ধারণ করেই শক্তিশালী হয়।

যে সমাজে সবাই একই রকম, সেখানে ঐক্য থাকতে পারে; কিন্তু বৈচিত্র্যের সৌন্দর্য থাকে না। আর যে সমাজ ভিন্নতাকে গ্রহণ করতে শেখে, সেখানেই প্রকৃত গণতন্ত্রের জন্ম হয়।

আমরা কি ক্রমেই অসহিষ্ণু হয়ে উঠছি? হয়তো হ্যাঁ—যদি আমরা অন্যের মতকে শত্রুতা মনে করি, গুজবকে সত্যের আগে স্থান দিই, জনতার বিচারকে আইনের বিকল্প ভাবি এবং নিজের দলের ভুলকে ক্ষমা করে অন্যের একই ভুলে উত্তেজিত হই।

কিন্তু এই প্রবণতা অনিবার্য নয়।

আমরা চাইলে বদলাতে পারি। রাজনীতি বদলাতে পারে, শিক্ষাব্যবস্থা বদলাতে পারে, গণমাধ্যম আরও দায়িত্বশীল হতে পারে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ব্যবহারকারীরা আরও সচেতন হতে পারেন। সবচেয়ে বড় কথা, আমরা প্রত্যেকে নিজের আচরণে একটি ছোট পরিবর্তন আনতে পারি।

আজ কোনো ভিন্নমতের মানুষকে অপমান না করা। কোনো গুজব যাচাই না করে ছড়িয়ে না দেওয়া। কোনো অভিযোগের ভিত্তিতে কাউকে অপরাধী ঘোষণা না করা। কোনো রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে মানুষ হিসেবে দেখতে ভুলে না যাওয়া।

সভ্যতার অগ্রগতি শুধু প্রযুক্তির উন্নতিতে মাপা যায় না। সভ্যতার প্রকৃত পরীক্ষা হলো—আমরা কতটা ক্ষমতাশালী হয়েছি তা নয়, আমাদের সঙ্গে দ্বিমত পোষণকারী মানুষের প্রতি আমরা কতটা মানবিক থাকতে পেরেছি।

একটি সমাজ তখনই সত্যিকার অর্থে গণতান্ত্রিক হয়, যখন সেখানে মানুষ শুধু নিজের কথা বলার স্বাধীনতা নয়, অন্যের কথা বলার অধিকারও রক্ষা করে। একটি রাষ্ট্র তখনই সত্যিকার অর্থে শক্তিশালী হয়, যখন সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ সংখ্যালঘুর অধিকার রক্ষা করে। আর একজন মানুষ তখনই সত্যিকার অর্থে উদার হয়, যখন সে বুঝতে পারে—তার নিজের সত্যই পৃথিবীর একমাত্র সত্য নয়।

আমাদের সামনে এখন বড় নির্বাচন শুধু ব্যালটের নয়; এটি আচরণের নির্বাচন। আমরা কি ঘৃণা বেছে নেব, নাকি সংলাপ? প্রতিশোধ, নাকি ন্যায়বিচার? গুজব, নাকি সত্য? শত্রুতা, নাকি সহাবস্থান?

উত্তরটি শেষ পর্যন্ত রাষ্ট্রের নয়, রাজনৈতিক দলের নয়, অন্য কারও নয়—আমাদের প্রত্যেকের।

কারণ অসহিষ্ণু সমাজ একদিনে তৈরি হয় না। প্রতিবার যখন আমরা অন্যের ভিন্নতাকে অপমান করি, প্রতিবার যখন গুজব যাচাই না করে ছড়াই, প্রতিবার যখন অন্যায়কে শুধু ‘আমাদের লোকের’ বিরুদ্ধে হলে অন্যায় মনে করি—তখন আমরা সেই সমাজটিকে আরও একটু অসহিষ্ণু করে তুলি।

আবার প্রতিবার যখন আমরা ভিন্নমতের মানুষকে শুনি, ভুল স্বীকার করি, দুর্বল মানুষের পাশে দাঁড়াই এবং অপছন্দের মানুষের অধিকারও রক্ষা করি—তখন আমরা সমাজকে একটু বেশি মানবিক করে তুলি।

শেষ পর্যন্ত একটি দেশের গণতন্ত্রের সবচেয়ে বড় পরীক্ষা সংসদে নয়, মানুষের আচরণে। আমরা কি এমন একটি সমাজ গড়তে পারব, যেখানে মতভেদ থাকবে, কিন্তু বিদ্বেষ থাকবে না; প্রতিযোগিতা থাকবে, কিন্তু প্রতিহিংসা থাকবে না; বিশ্বাসে পার্থক্য থাকবে, কিন্তু মানুষে মানুষে মর্যাদার পার্থক্য থাকবে না?

যদি পারি, তবে আমরা শুধু অসহিষ্ণুতা থেকে বেরিয়ে আসব না—আমরা একটি পরিণত সমাজের দিকে এগোব।

আর যদি না পারি, তবে সবচেয়ে বড় বিপদ হবে এই যে, একদিন আমরা এতটাই অসহিষ্ণু হয়ে উঠব যে অন্যের কণ্ঠ বন্ধ করতে গিয়ে নিজের কণ্ঠও হারিয়ে ফেলব।

লেখক : সাংবাদিক, কলামিস্ট। ডেপুটি এডিটর, জাগো নিউজ।
[email protected]

এইচআর/জেআইএম

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow