‘আমি যদি মরিই, তবে নিজের দেশেই মরব’
দক্ষিণ আফ্রিকায় উপার্জন করে দেশে জমি কিনে বাড়ি নির্মাণের স্বপ্ন ছিল জ্যানেট কাপিটোর। ২০২২ সালে মালাউইয়ের লোলো গ্রাম ছেড়ে দক্ষিণ আফ্রিকায় গিয়েছিলেন ২৭ বছর বয়সী এই তিন সন্তানের মা। কিন্তু স্বপ্ন পূরণের বদলে, বিদেশিবিরোধী সহিংসতার মুখে তিনি এখন আট মাসের শিশুকে নিয়ে খালি হাতে দেশে ফিরেছেন। ফেরার পথে যে অল্প কিছু জিনিসপত্র সঙ্গে আনতে পেরেছিলেন, তাও মালাউইগামী বাসে চুরি হয়ে যায়। কাপিটো কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরাকে বলেন, বিক্ষোভ শুরু হওয়ার পর আমি ঘরের ভেতরেই থাকতাম। কাজেও যেতে পারিনি। নিজ গ্রামের অসমাপ্ত বাড়ির ভিত্তির পাশে দাঁড়িয়ে তিনি জানান, দক্ষিণ আফ্রিকায় এক নাইজেরীয় মালিকানাধীন রেস্তোরাঁয় কাজ করে মাসে দুই হাজার র্যান্ড আয় করতেন। নিম্নস্বরে কথা বলছিলেন কাপিটো। জানান, হামলার সময় খোলা মাঠে আশ্রয় নেওয়ার কারণে ধুলাবালিতে তার গলার সমস্যা হয়েছে। দক্ষিণ আফ্রিকায় পরিচয় হওয়া তার মালাউইয়ান স্বামী এখনো দেশে ফেরার পথে রয়েছেন। সম্পূর্ণ নিঃস্ব হয়ে দেশে ফেরার পর কামুজু স্টেডিয়ামে নিবন্ধন শেষে সরকার থেকে তিনি ৭০ হাজার মালাউইয়ান কওয়াচা, অর্থাৎ প্রায় ৪০ ডলার সহায়তা পেয়েছেন। খালি হাতে ফেরা হা
দক্ষিণ আফ্রিকায় উপার্জন করে দেশে জমি কিনে বাড়ি নির্মাণের স্বপ্ন ছিল জ্যানেট কাপিটোর। ২০২২ সালে মালাউইয়ের লোলো গ্রাম ছেড়ে দক্ষিণ আফ্রিকায় গিয়েছিলেন ২৭ বছর বয়সী এই তিন সন্তানের মা। কিন্তু স্বপ্ন পূরণের বদলে, বিদেশিবিরোধী সহিংসতার মুখে তিনি এখন আট মাসের শিশুকে নিয়ে খালি হাতে দেশে ফিরেছেন।
ফেরার পথে যে অল্প কিছু জিনিসপত্র সঙ্গে আনতে পেরেছিলেন, তাও মালাউইগামী বাসে চুরি হয়ে যায়।
কাপিটো কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরাকে বলেন, বিক্ষোভ শুরু হওয়ার পর আমি ঘরের ভেতরেই থাকতাম। কাজেও যেতে পারিনি।
নিজ গ্রামের অসমাপ্ত বাড়ির ভিত্তির পাশে দাঁড়িয়ে তিনি জানান, দক্ষিণ আফ্রিকায় এক নাইজেরীয় মালিকানাধীন রেস্তোরাঁয় কাজ করে মাসে দুই হাজার র্যান্ড আয় করতেন।
নিম্নস্বরে কথা বলছিলেন কাপিটো। জানান, হামলার সময় খোলা মাঠে আশ্রয় নেওয়ার কারণে ধুলাবালিতে তার গলার সমস্যা হয়েছে।
দক্ষিণ আফ্রিকায় পরিচয় হওয়া তার মালাউইয়ান স্বামী এখনো দেশে ফেরার পথে রয়েছেন।
সম্পূর্ণ নিঃস্ব হয়ে দেশে ফেরার পর কামুজু স্টেডিয়ামে নিবন্ধন শেষে সরকার থেকে তিনি ৭০ হাজার মালাউইয়ান কওয়াচা, অর্থাৎ প্রায় ৪০ ডলার সহায়তা পেয়েছেন।
খালি হাতে ফেরা হাজারো মানুষ
দক্ষিণ আফ্রিকায় অনানুষ্ঠানিক খাতে দীর্ঘদিন কাজ করা হাজারো নাগরিককে দেশে ফেরাতে সহায়তা করছে মালাউই সরকার। পাশাপাশি বিভিন্ন ব্যক্তি ও সংগঠনও অর্থ সংগ্রহ করে আটকে পড়াদের বাসে করে ফেরানোর উদ্যোগ নিয়েছে।
স্থানীয় গণমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, পুনর্বাসন কার্যক্রম শুরুর পর এখন পর্যন্ত ৬ হাজার ৯৩৬ জন মালাউইবাসী দেশে ফিরেছেন।
এর আগে মালাউইয়ের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা বিভাগ জানিয়েছিল, দক্ষিণ আফ্রিকায় প্রায় ১০ হাজার মালাউই নাগরিক সংকটে রয়েছেন। তাদের ‘নিরাপদ, সুশৃঙ্খল ও মর্যাদাপূর্ণ’ প্রত্যাবর্তন নিশ্চিত করতে একটি সমন্বিত পরিকল্পনা চালু করা হয়েছে।
অন্যদিকে দক্ষিণ আফ্রিকার কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, এখন পর্যন্ত ১৫ হাজার ১৬২ জন মালাউই নাগরিককে প্রত্যাবাসন ও বহিষ্কারের প্রক্রিয়ায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
ফেরত আসা অনেকেই আল জাজিরাকে জানিয়েছেন, উচ্চ সুদে ঋণ নিয়ে তারা দক্ষিণ আফ্রিকায় গিয়েছিলেন। কিন্তু করোনার সময় লকডাউনে জীবিকা বিপর্যস্ত হওয়ায় ঋণ শোধ করতেও হিমশিম খাচ্ছিলেন। সহিংসতা শুরু হলে তারা ঘরবাড়ি ছেড়ে ডারবানের খোলা মাঠে আশ্রয় নিতে বাধ্য হন।
‘নিজের দেশেই মরতে চাই’
থাইলো জেলার লোমোলা এলাকার ৩৩ বছর বয়সী থোকোজানি এমফোলা মনে করেন, দক্ষিণ আফ্রিকা ছাড়ার সিদ্ধান্ত ছিল বেঁচে থাকার লড়াই।
দেশে ফিরে লুচেঞ্জায় মায়ের বাড়ির সামনে প্রতিবেশী ও স্বজনদের আলিঙ্গনে আবেগাপ্লুত এমফোলা আল জাজিরাকে বলেন, আমি ভাবলাম, যদি মরতেই হয়, তবে নিজের দেশেই মরব।
২০২৪ সালে দক্ষিণ আফ্রিকায় গিয়ে একটি ছোট কারখানায় ভাজা বাদাম প্যাকেটজাত করার কাজ পেয়েছিলেন তিনি।
এমফোলা বলেন, দক্ষিণ আফ্রিকায় টিকে থাকা খুব কঠিন ছিল। তবু খাবার কিনতে, ভাড়া দিতে এবং সন্তানদের জন্য মায়ের কাছে টাকা পাঠাতে পারতাম। শেষ যে বেতন পেয়েছিলাম, সেটাই দেশে ফেরার পথে খরচ করেছি।
তিনি জানান, বিদেশি নাগরিকদের রাস্তায় মারধরের ঘটনা নিজের চোখে দেখেছেন। তাই পরিস্থিতি শান্ত হলেও আর দক্ষিণ আফ্রিকায় ফিরতে চান না।
এমফোলা আরও বলেন, আমি শুধু কয়েকটা কাপড় নিয়ে ফিরেছি। তবু দেশে ফিরতে পেরে স্বস্তি লাগছে। এখানে একটা বাড়ি করার স্বপ্ন ছিল। এখন সেটা আর সম্ভব নয়। পুঁজি জোগাড় করতে পারলে ছোট একটা ব্যবসা শুরু করব।
বাড়ছে উত্তেজনা
দক্ষিণ আফ্রিকায় থাকা মালাউই কমিউনিটির কয়েকজন সদস্য আল জাজিরাকে জানান, দেশটিতে নির্বাচন এলেই বিদেশিবিরোধী বক্তব্য ও হামলার ঘটনা বেড়ে যায়।
অনেক প্রত্যাবর্তনকারী সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলতেও রাজি হননি। কারণ, দক্ষিণ আফ্রিকা থেকে বহিষ্কৃত হয়ে মালাউইয়ে ফিরে আসাকে সামাজিকভাবে লজ্জাজনক মনে করা হয়। এমন পরিস্থিতিতে দেশে ফিরে নতুন করে জীবন শুরু করাও কঠিন হয়ে পড়ে।
তবে সাম্প্রতিক সহিংসতার কারণে আগামী কয়েক সপ্তাহে আরও হাজারো মালাউই নাগরিক দেশে ফিরবেন বলে ধারণা করা হচ্ছে।
প্রথমদিকে দেশে ফেরা ব্যক্তিদের একজন ইদ্রিসাহ আকিলেমু। দুই সন্তানের এই বাবা জানান, জোহানেসবার্গে তার বাড়িতে গভীর রাতে হামলা চালিয়ে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়।
মালাউইয়ে পৌঁছে সাংবাদিকদের তিনি বলেন, আমি বুঝেছিলাম এটা শুধু বিক্ষোভ নয়, যুদ্ধ। কারণ বিক্ষোভ দিনে হয়, কিন্তু তারা রাতে এসে আমাদের ওপর হামলা চালিয়েছে। আমি বেঁচে ফিরতে পেরেছি, এটাই সৌভাগ্য।
সবকিছু হারিয়ে এখন নতুন করে ছোট ব্যবসা শুরু করার স্বপ্ন দেখছেন আকিলেমু। তিনি জানান, আশ্রয়কেন্দ্রে থাকার সময় স্বেচ্ছাসেবকদের দেওয়া কাপড় নিয়েই দেশে ফিরেছেন।
আকিলেমু বলেন, আমরা বুঝি, এটা তাদের দেশ। কিন্তু এখন আমাদের অবস্থা দেখুন। আমরা যেন শিশুদের মতো খালি হাতে ফিরে এসেছি। যা কিছু উপার্জন করেছিলাম, সব লুট বা পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। এটা খুবই দুঃখজনক।
What's Your Reaction?