আমের লাভ গিলে খাচ্ছে ‘ঢলন’ প্রথা

৫৪ কেজিতে মণ ধরে আম কেনেন ব্যবসায়ীরা হিসাবের বাইরে থাকা এসব আমের মূল্য ৫০০ কোটি টাকারও বেশি কাগজে-কলমে সীমাবদ্ধ ঢলন বাতিলের সিদ্ধান্ত আম ঘিরে রাজশাহী অঞ্চলের অর্থনীতি প্রতিবছরই সম্প্রসারিত হচ্ছে। দেশের চাহিদা পূরণের পাশাপাশি বিদেশের বাজারেও বাড়ছে রাজশাহী ও চাঁপাইনবাবগঞ্জের আমের কদর। তবে এই সাফল্যের আড়ালে দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা ‘ঢলন’ নামে একটি প্রথা আমচাষিদের লাভের বড় অংশ কেড়ে নিচ্ছে। প্রশাসনের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী কেজিভিত্তিক আম বেচাকেনা চালুর কথা থাকলেও বাস্তবে এখনো রাজশাহী বিভাগের বিভিন্ন মোকাম ও পাইকারি বাজারে কৃষকদের ৪০ কেজির (এক মণ) পরিবর্তে ৫২ থেকে ৫৪ কেজি পর্যন্ত আম দিতে হচ্ছে। অথচ মূল্য পরিশোধ করা হচ্ছে মাত্র ৪০ কেজির হিসাবেই। ফলে প্রতি মৌসুমে শত কোটি টাকার আম বিনামূল্যে চলে যাচ্ছে ব্যবসায়ী ও আড়তদারদের হাতে। ‘বাগান পরিচর্যা, শ্রমিক, সার ও কীটনাশকের খরচ প্রতিবছর বাড়ছে। কিন্তু আম বিক্রির সময় এসে যদি ৪০ কেজির দামে ৫৪ কেজি আম দিতে হয়, তাহলে লাভ করার সুযোগ কোথায়?’ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি মৌসুমে রাজশাহী, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, নওগাঁ ও নাটোর- এই চার জেলায় প্রায় ১২ লাখ ৫৫

আমের লাভ গিলে খাচ্ছে ‘ঢলন’ প্রথা
  • ৫৪ কেজিতে মণ ধরে আম কেনেন ব্যবসায়ীরা
  • হিসাবের বাইরে থাকা এসব আমের মূল্য ৫০০ কোটি টাকারও বেশি
  • কাগজে-কলমে সীমাবদ্ধ ঢলন বাতিলের সিদ্ধান্ত

আম ঘিরে রাজশাহী অঞ্চলের অর্থনীতি প্রতিবছরই সম্প্রসারিত হচ্ছে। দেশের চাহিদা পূরণের পাশাপাশি বিদেশের বাজারেও বাড়ছে রাজশাহী ও চাঁপাইনবাবগঞ্জের আমের কদর। তবে এই সাফল্যের আড়ালে দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা ‘ঢলন’ নামে একটি প্রথা আমচাষিদের লাভের বড় অংশ কেড়ে নিচ্ছে।

প্রশাসনের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী কেজিভিত্তিক আম বেচাকেনা চালুর কথা থাকলেও বাস্তবে এখনো রাজশাহী বিভাগের বিভিন্ন মোকাম ও পাইকারি বাজারে কৃষকদের ৪০ কেজির (এক মণ) পরিবর্তে ৫২ থেকে ৫৪ কেজি পর্যন্ত আম দিতে হচ্ছে। অথচ মূল্য পরিশোধ করা হচ্ছে মাত্র ৪০ কেজির হিসাবেই। ফলে প্রতি মৌসুমে শত কোটি টাকার আম বিনামূল্যে চলে যাচ্ছে ব্যবসায়ী ও আড়তদারদের হাতে।

‘বাগান পরিচর্যা, শ্রমিক, সার ও কীটনাশকের খরচ প্রতিবছর বাড়ছে। কিন্তু আম বিক্রির সময় এসে যদি ৪০ কেজির দামে ৫৪ কেজি আম দিতে হয়, তাহলে লাভ করার সুযোগ কোথায়?’

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি মৌসুমে রাজশাহী, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, নওগাঁ ও নাটোর- এই চার জেলায় প্রায় ১২ লাখ ৫৫ হাজার টন আম উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। দেশের মোট আম উৎপাদনের একটি বড় অংশ আসে এই অঞ্চল থেকে।

আমের লাভ গিলে খাচ্ছে ‘ঢলন’ প্রথা

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় এবার ফলনও ভালো হয়েছে। কিন্তু উৎপাদন বাড়লেও বাজার ব্যবস্থার নানা অসঙ্গতির কারণে সেই সুফল পাচ্ছেন না চাষিরা। বরং আম বিক্রির সময় তারা ন্যায্য মূল্য থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।

রাজশাহীর পুঠিয়া উপজেলার আমচাষি আব্দুল কাদের বলেন, ‘বাগান পরিচর্যা, শ্রমিক, সার ও কীটনাশকের খরচ প্রতিবছর বাড়ছে। কিন্তু আম বিক্রির সময় এসে যদি ৪০ কেজির দামে ৫৪ কেজি আম দিতে হয়, তাহলে লাভ করার সুযোগ কোথায়?’

‘চারটি প্রধান আম উৎপাদনকারী জেলায় মোট উৎপাদনের ভিত্তিতে হিসাব করলে শুধু অতিরিক্ত ওজন হিসেবে নেওয়া আমের মূল্যই প্রতি মৌসুমে ৫০০ কোটি টাকারও বেশি হতে পারে।’

একই ধরনের অভিযোগ করেন চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিবগঞ্জ উপজেলার আমচাষি আলম সরকার। তিনি বলেন, ‘অনেক ব্যবসায়ী অতিরিক্ত ওজন ছাড়া আম কিনতেই চান না। বাধ্য হয়েই লোকসান মেনে বিক্রি করতে হয়।’

স্থানীয়ভাবে ‘ঢলন’ বলতে নির্ধারিত ওজনের চেয়ে অতিরিক্ত আম দেওয়াকে বোঝায়। একসময় পরিবহন, ঝরে যাওয়া কিংবা পচনজনিত ক্ষতি সমন্বয়ের জন্য প্রতি মণে এক থেকে দুই কেজি অতিরিক্ত আম দেওয়ার প্রচলন ছিল। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেই প্রথা অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যায়। বর্তমানে অনেক বাজারে ৪০ কেজির মূল্যে ৫২ থেকে ৫৪ কেজি পর্যন্ত আম নেওয়া হচ্ছে। কোথাও কোথাও আমের মান, আকার কিংবা পরিবহনজনিত ক্ষতির অজুহাতে আরও দুই থেকে তিন কেজি বেশি আম দাবি করেন ব্যবসায়ীরা। বাধ্য হয়ে আম বিক্রি করতে হয় আম চাষিদের।

আমের লাভ গিলে খাচ্ছে ‘ঢলন’ প্রথা

চাষিদের অভিযোগ, রাজশাহীর বানেশ্বর, চারঘাট ও বাঘা থেকে শুরু করে চাঁপাইনবাবগঞ্জের কানসাট, শিবগঞ্জ, ভোলাহাট এবং নওগাঁর সাপাহার ও পোরশার বাজারগুলোতেও এই প্রথা এখনো বহাল রয়েছে।

অর্থনৈতিক হিসাবে এই ক্ষতির চিত্র আরও স্পষ্ট। যদি এক মণ আমের দাম ২ হাজার টাকা হয়, তাহলে কাগজে-কলমে প্রতি কেজির মূল্য দাঁড়ায় ৫০ টাকা। কিন্তু কৃষক যদি ৫৪ কেজি আম দিয়ে একই ২ হাজার টাকা পান, তাহলে প্রকৃতপক্ষে প্রতি কেজির দাম দাঁড়ায় প্রায় ৩৭ টাকা। অর্থাৎ উৎপাদিত পণ্যের প্রায় ২৬ শতাংশ মূল্য থেকে তিনি বঞ্চিত হচ্ছেন।

আমচাষি সমবায় নেতাদের দাবি, চারটি প্রধান আম উৎপাদনকারী জেলায় মোট উৎপাদনের ভিত্তিতে হিসাব করলে শুধু অতিরিক্ত ওজন হিসেবে নেওয়া আমের মূল্যই প্রতি মৌসুমে ৫০০ কোটি টাকারও বেশি হতে পারে।

শিবগঞ্জ আমচাষি সমবায় সমিতির সম্পাদক ইসমাইল খান শামীম বলেন, কৃষকরা বছরের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত বাগানের পেছনে বিপুল অর্থ বিনিয়োগ করেন। কিন্তু বাজারে এসে তাদের উৎপাদিত পণ্যের একটি বড় অংশ বিনামূল্যে চলে যাচ্ছে। এটি শুধু ব্যক্তিগত ক্ষতি নয়, পুরো অঞ্চলের কৃষি অর্থনীতির জন্যও উদ্বেগজনক বিষয়।

‘দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের চাহিদা পূরণের পাশাপাশি বিদেশেও রপ্তানি হচ্ছে রাজশাহীর আম। অথচ উৎপাদনের মূল কেন্দ্রের কৃষকরাই যদি ন্যায্যমূল্য থেকে বঞ্চিত হন, তাহলে সেই সাফল্য প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়ে।’

তবে ব্যবসায়ীদের বক্তব্য ভিন্ন। রাজশাহীর ঐতিহ্যবাহী বানেশ্বর আমের হাটের এক ব্যবসায়ী নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘আম সংগ্রহের পর পরিবহন, বাছাই, সংরক্ষণ ও বাজারজাতকরণের সময় কিছু ক্ষতি হয় এবং ওজনও কমে যায়। দীর্ঘদিন ধরে সেই ক্ষতি সমন্বয়ের জন্যই অতিরিক্ত ওজন নেওয়ার প্রচলন তৈরি হয়েছে।’

তবে কৃষকদের প্রশ্ন, বাজার ব্যবস্থার এই ক্ষতির পুরো দায় কেন শুধু উৎপাদনকারীদের বহন করতে হবে?

কৃষক ও ব্যবসায়ীদের এই বিরোধ মেটাতে গত বছরের ১১ জুন রাজশাহী বিভাগীয় প্রশাসনের উদ্যোগে একটি বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠকে আমচাষি, ব্যবসায়ী, আড়তদার, ইজারাদার ও প্রশাসনের প্রতিনিধিরা অংশ নেন। সেখানে সর্বসম্মতিক্রমে ঢলন প্রথা বাতিল করে কেজিভিত্তিক আম বেচাকেনার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। একইসঙ্গে আড়তদারদের কমিশন প্রতি কেজিতে সর্বোচ্চ ১ টাকা ৫০ পয়সা নির্ধারণ করা হয়।

কিন্তু কৃষকদের অভিযোগ, সিদ্ধান্তটি এখনো কাগজে-কলমেই সীমাবদ্ধ রয়েছে। অধিকাংশ বাজারেই আগের নিয়মে আম কেনাবেচা চলছে।

অর্থনীতিবিদ মো. আব্দুল ওয়াদুদ বলেন, ব্যবসায়ীরা একদিকে কম দামে আম কিনছেন, অন্যদিকে অতিরিক্ত ওজনও নিচ্ছেন। ফলে কৃষক তার উৎপাদিত পণ্যের প্রকৃত মূল্য থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।

আমের লাভ গিলে খাচ্ছে ‘ঢলন’ প্রথা

এটি শুধু আমের বাজারের সমস্যা নয়, দেশের কৃষিপণ্য বিপণন ব্যবস্থার একটি বড় দুর্বলতার প্রতিফলন। উৎপাদনকারী কৃষক ন্যায্যমূল্য না পেলে কৃষি খাতের টেকসই উন্নয়ন ব্যাহত হবে।

সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) রাজশাহী জেলা শাখার সভাপতি আহমেদ শফি উদ্দিন বলেন, বাংলাদেশের আম কেন্দ্রিক অর্থনীতির আকার প্রতিবছর বাড়ছে। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের চাহিদা পূরণের পাশাপাশি বিদেশেও রপ্তানি হচ্ছে রাজশাহীর আম। অথচ উৎপাদনের মূল কেন্দ্রের কৃষকরাই যদি ন্যায্যমূল্য থেকে বঞ্চিত হন, তাহলে সেই সাফল্য প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়ে।

তিনি বলেন, প্রতিটি বাজারে বাধ্যতামূলকভাবে ইলেকট্রনিক ওজন যন্ত্র ব্যবহার, ডিজিটাল রসিদ চালু, নিয়মিত বাজার মনিটরিং এবং কৃষক সংগঠনগুলোকে শক্তিশালী করা গেলে এ ধরনের অনিয়ম অনেকটাই কমানো সম্ভব।

রাজশাহী বিভাগীয় কমিশনার এ এন এম বজলুর রশিদ বলেন, বাড়তি ওজনে আম কেনার কোনো সুযোগ নেই। কেজিভিত্তিক আম বেচাকেনা নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট জেলা প্রশাসকদের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ এবং মোবাইল কোর্ট পরিচালনার নির্দেশ দেওয়া হবে।

এফএ/এএসএম

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow