আমের হাটে ‘ঢলন’ সিন্ডিকেটে জিম্মি চাষি-ব্যবসায়ীরা

উত্তরবঙ্গের সর্ববৃহৎ আমের হাট হিসেবে পরিচিত রাজশাহীর পুঠিয়া উপজেলার বানেশ্বর বাজার। জ্যৈষ্ঠের দাবদাহ উপেক্ষা করে প্রতিদিন এখানে কোটি কোটি টাকার আমের বেচাকেনা হয়। তবে এই বিশাল বাণিজ্যের আড়ালে বছরের পর বছর ধরে চলে আসা ‘ঢলন’ বা ‘ধলতা’ প্রথা নিয়ে ক্ষোভে ফুঁসছেন আমচাষি ও ব্যবসায়ীরা। তাদের অভিযোগ, প্রভাবশালী আড়তদার সিন্ডিকেটের কাছে তারা কার্যত জিম্মি হয়ে পড়েছেন। সরকারি নির্দেশনা অনুযায়ী কেজিভিত্তিক কেনাবেচার কথা থাকলেও বাস্তবে এখনো ৪০ কেজির মণের পরিবর্তে ৫২ থেকে ৫৪ কেজি, কোথাও কোথাও আরও বেশি আম দিতে বাধ্য হচ্ছেন তারা। চাঁপাইনবাবগঞ্জের কানসাটসহ রাজশাহী অঞ্চলের বিভিন্ন আম মোকামেও একই ধরনের অভিযোগ রয়েছে। কৃষকদের দাবি, এক সময় পরিবহন ও সংরক্ষণজনিত ক্ষতি পুষিয়ে নিতে সামান্য অতিরিক্ত আম দেওয়ার প্রচলন থাকলেও বর্তমানে তা অস্বাভাবিক পর্যায়ে পৌঁছেছে। অনেক ক্ষেত্রে ৪০ কেজির মূল্যে ৫৪ কেজি পর্যন্ত আম নিতে দেখা যায়। ফলে প্রতি মৌসুমে বিপুল আম বিনামূল্যে চলে যাচ্ছে আড়তদার ও পাইকারদের হাতে। বুধবার (১০ জুন) সরেজমিনে বানেশ্বর আমহাটে গিয়ে দেখা যায়, সরকারি নিয়ম-নীতির তোয়াক্কা না করে আড়তদারদের নির্ধারিত অলিখিত

আমের হাটে ‘ঢলন’ সিন্ডিকেটে জিম্মি চাষি-ব্যবসায়ীরা
উত্তরবঙ্গের সর্ববৃহৎ আমের হাট হিসেবে পরিচিত রাজশাহীর পুঠিয়া উপজেলার বানেশ্বর বাজার। জ্যৈষ্ঠের দাবদাহ উপেক্ষা করে প্রতিদিন এখানে কোটি কোটি টাকার আমের বেচাকেনা হয়। তবে এই বিশাল বাণিজ্যের আড়ালে বছরের পর বছর ধরে চলে আসা ‘ঢলন’ বা ‘ধলতা’ প্রথা নিয়ে ক্ষোভে ফুঁসছেন আমচাষি ও ব্যবসায়ীরা। তাদের অভিযোগ, প্রভাবশালী আড়তদার সিন্ডিকেটের কাছে তারা কার্যত জিম্মি হয়ে পড়েছেন। সরকারি নির্দেশনা অনুযায়ী কেজিভিত্তিক কেনাবেচার কথা থাকলেও বাস্তবে এখনো ৪০ কেজির মণের পরিবর্তে ৫২ থেকে ৫৪ কেজি, কোথাও কোথাও আরও বেশি আম দিতে বাধ্য হচ্ছেন তারা। চাঁপাইনবাবগঞ্জের কানসাটসহ রাজশাহী অঞ্চলের বিভিন্ন আম মোকামেও একই ধরনের অভিযোগ রয়েছে। কৃষকদের দাবি, এক সময় পরিবহন ও সংরক্ষণজনিত ক্ষতি পুষিয়ে নিতে সামান্য অতিরিক্ত আম দেওয়ার প্রচলন থাকলেও বর্তমানে তা অস্বাভাবিক পর্যায়ে পৌঁছেছে। অনেক ক্ষেত্রে ৪০ কেজির মূল্যে ৫৪ কেজি পর্যন্ত আম নিতে দেখা যায়। ফলে প্রতি মৌসুমে বিপুল আম বিনামূল্যে চলে যাচ্ছে আড়তদার ও পাইকারদের হাতে। বুধবার (১০ জুন) সরেজমিনে বানেশ্বর আমহাটে গিয়ে দেখা যায়, সরকারি নিয়ম-নীতির তোয়াক্কা না করে আড়তদারদের নির্ধারিত অলিখিত নিয়মেই চলছে আমের বেচাকেনা। ওজনের গরমিল, অতিরিক্ত ‘ঢলন’ এবং বিভিন্ন অজুহাতে টাকা কর্তনের অভিযোগ উঠেছে বাজারের অধিকাংশ আড়তদারের বিরুদ্ধে। এদিকে রাজশাহী জেলা প্রশাসনের প্রকাশিত ‘ম্যাঙ্গো ক্যালেন্ডার’ অনুযায়ী, ১০ জুন থেকে ল্যাংড়া ও ব্যানানা ম্যাংগো বাজারজাত হওয়ার কথা। তবে সরেজমিনে দেখা গেছে, গত সপ্তাহ থেকেই বাজারে ল্যাংড়া আম বিক্রি হচ্ছে। ‘ম্যাঙ্গো ক্যালেন্ডার’ অনুযায়ী, গত ৩০ মে থেকে হিমসাগর (ক্ষীরশাপাতি) আম বাজারজাত শুরু হয়েছে। আগামী ১০ জুন থেকে ব্যানানা ম্যাংগো ও ল্যাংড়া, ১৫ জুন থেকে আম্রপালি ও ফজলি, ৫ জুলাই থেকে বারি আম-৪, ১০ জুলাই থেকে আশ্বিনা এবং ১৫ জুলাই থেকে গৌড়মতি আম সংগ্রহ করা যাবে। এছাড়া পাকলেই সারা বছর কাটিমন ও বারি আম-১১ বাজারজাতের সুযোগ রয়েছে। তবে গত সপ্তাহের চেয়ে কিছুটা দাম বেড়েছে আমের। বর্তমানে বানেশ্বর বাজারে প্রতি মণ লখনা আম বিক্রি হচ্ছে ৫০০ থেকে ৯০০ টাকা মণ, গোপালভোগ ১২০০ থেকে ১৬০০ টাকা, খিরসাপাতি/হিমসাগর ১,৮০০ থেকে ২৪০০ টাকা, ল্যাংড়া ১,৩০০ থেকে ১,৬০০ টাকা, রানীপ্রসাদ ৮০০ থেকে ১৪০০ টাকা। জুন মাসের শেষে বাজারে আসার কথা থাকলেও ইতোমধ্যে কিছু ফজলি আমও উঠেছে, যার দাম ৮০০ থেকে ১,০০০ টাকা পর্যন্ত। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি মৌসুমে রাজশাহী, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, নওগাঁ ও নাটোর জেলায় প্রায় ১২ লাখ ৫৫ হাজার টন আম উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। এসব এলাকার অধিকাংশ কৃষকই তাদের উৎপাদিত আম বিক্রির জন্য পাইকার ও আড়তদারদের ওপর নির্ভরশীল। বাজারে সরবরাহ বেশি থাকায় কৃষকদের দর-কষাকষির সুযোগও সীমিত। সেই সুযোগেই দীর্ঘদিন ধরে বহাল রয়েছে ‘ঢলন’ নামে পরিচিত অতিরিক্ত ওজন নেওয়ার প্রথা। চাষিদের অভিযোগ, দেশের প্রচলিত নিয়ম অনুযায়ী ৪০ কেজিতে এক মণ হলেও বানেশ্বর বাজারে সেই হিসাব মানা হয় না। বিভিন্ন ধাপে ওজন কর্তন ও ক্যারেটের অজুহাতে শেষ পর্যন্ত প্রায় ৪৮ থেকে ৫৪ কেজি আম দিয়ে এক মণের মূল্য পরিশোধ করা হয়। এর বাইরে টাকা পরিশোধের সময়ও প্রতি লেনদেনে ৫০ থেকে ১০০ টাকা পর্যন্ত কেটে নেওয়া হয়। চারঘাট এলাকার আমচাষি আমির হামজা কালবেলাকে বলেন, সারা বছর বাগানের পেছনে শ্রম দিয়ে আম উৎপাদন করি। কিন্তু হাটে এসে ৪০ কেজির বদলে ৫৪ কেজিতে মণ ধরা হয়। প্রতিবাদ করলে আড়তদাররা আম কেনা বন্ধ করে দেয়। আমরা তাদের কাছে পুরোপুরি জিম্মি। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক আড়তদার বলেন, বানেশ্বর বাজারে প্রায় সব আড়তদারই ৪৮ কেজিতে মণ ধরে। ঢলন নেওয়ার বিষয়টিও দীর্ঘদিনের প্রচলিত নিয়ম। এ সমস্যা সমাধানে গত বছরের ১১ জুন রাজশাহী বিভাগীয় প্রশাসনের উদ্যোগে আমচাষি, ব্যবসায়ী, আড়তদার, ইজারাদার ও প্রশাসনের প্রতিনিধিদের নিয়ে এক বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। ওই বৈঠকে সর্বসম্মতিক্রমে ‘ঢলন’ প্রথা বাতিল করে কেজিভিত্তিক আম বেচাকেনার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। একইসঙ্গে আড়তদারদের কমিশন প্রতি কেজিতে সর্বোচ্চ ১ টাকা ৫০ পয়সা নির্ধারণ করা হয়। তবে কৃষকদের অভিযোগ, সিদ্ধান্তটি কেবল কাগজে-কলমেই সীমাবদ্ধ রয়েছে। মাঠপর্যায়ে এর কোনো বাস্তবায়ন দেখা যায়নি। বরং আড়তদারদের রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রভাবের কারণে প্রশাসনও কার্যকর ব্যবস্থা নিতে পারছে না। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক ড. রেজাউল করিম বকসী কালবেলাকে জানান, এটি শুধু আমের বাজারের সমস্যা নয়, দেশের কৃষিপণ্য বিপণন ব্যবস্থার একটি বড় দুর্বলতার প্রতিফলন। উৎপাদনকারী কৃষক ন্যায্যমূল্য না পেলে কৃষিখাতের টেকসই উন্নয়ন ব্যাহত হবে। ব্যবসায়ীরা একদিকে কম দামে আম কিনছেন, অন্যদিকে অতিরিক্ত ওজনও নিচ্ছেন। ফলে কৃষক তার উৎপাদিত পণ্যের প্রকৃত মূল্য থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। আম বিশেষজ্ঞ ও হেরিটেজের সভাপতি মাহবুব সিদ্দিকী কালবেলাকে জানান, বাংলাদেশের আম অর্থনীতির আকার প্রতিবছরই বাড়ছে। দেশের চাহিদা পূরণের পাশাপাশি বিদেশেও আম রপ্তানি হচ্ছে। অথচ উৎপাদনের মূল কেন্দ্রের কৃষকরাই যদি ন্যায্যমূল্য না পান, তাহলে সেই সাফল্য প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়ে। তাই আমের বাজারে ঢলন প্রথা বন্ধ করে কেজিভিত্তিক স্বচ্ছ বেচাকেনা নিশ্চিত করা সময়ের দাবি।  তিনি বলেন, প্রতিটি বাজারে বাধ্যতামূলকভাবে ইলেকট্রনিক ওজনযন্ত্র ব্যবহার, ডিজিটাল রশিদ চালু, নিয়মিত বাজার মনিটরিং এবং কৃষক সংগঠনগুলোকে শক্তিশালী করা গেলে এ ধরনের অনিয়ম অনেকাংশে কমানো সম্ভব। এ বিষয়ে রাজশাহী বিভাগের বিভাগীয় কমিশনার এ এন এম বজলুর রশিদ বলেন, বাড়তি ওজনে আম কেনার কোনো সুযোগ নেই। কেজিভিত্তিক আম বেচাকেনা নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট জেলা প্রশাসকদের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ এবং মোবাইল কোর্ট পরিচালনার নির্দেশ দেওয়া হবে।

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow