আমেরিকায় অভিবাসীদের অসহায়ত্ব পুঁজি করে বড় জালিয়াতি, হারাচ্ছে দু’কূল

  আমেরিকায় সাধারণত বড় অংকের জালিয়াতির মামলা বলতে ক্রিপ্টোকারেন্সি, আবাসন ব্যবসা কিংবা কর ফাঁকির ঘটনাকে বোঝায়। কিন্তু সম্প্রতি ফ্লোরিডার অরেঞ্জ কাউন্টিতে এক বিচিত্র ও নজিরবিহীন প্রতারক চক্রের সন্ধান পেয়েছে পুলিশ। একটি বন্ধ দোকানের ভেতর ‘লেগাসি ইমিগ্রা’ নামে ভুয়া অভিবাসন ল ফার্ম খুলে বসেছিলেন এক দম্পতি ও তাদের দুই সহযোগী। এই ভুয়া প্রতিষ্ঠানের আড়ালে তারা মূলত শত শত নথিপত্রহীন অভিবাসীদের সঙ্গে প্রতারণা করে আসছিলেন। আদালতের অভিযোগপত্রে বলা হয়েছে, ফ্লোরিডা, নিউইয়র্কসহ অন্তত চারটি অঙ্গরাজ্যের শত শত অভিবাসীর কাছ থেকে ভুয়া আইনি সহায়তার নামে এবং জাল রাজনৈতিক আশ্রয়ের আবেদন জমা দিয়ে প্রায় দুই কোটি ডলারের বেশি হাতিয়ে নিয়েছে এই চক্রটি। ভুক্তভোগীদের বেশিরভাগই ব্রাজিলের নাগরিক। প্রতারকেরা অভিবাসীদের আসল নথিপত্র আটকে রেখে এক প্রকার জিম্মি করে অর্থ আদায় করত। আরও পড়ুন ট্রাম্পের অভিবাসন নীতি / যুক্তরাষ্ট্রে নাগরিকত্ব পাওয়া অভিবাসীরাও এখন ‘নিরাপদ নয়’ অন্যদিকে, নিউইয়র্কের ফেডারেল প্রসিকিউটররা এর চেয়েও বড় এবং সুসংগঠিত এক প্রতারক চক্রের সন্ধান পেয়েছেন। কলম্বিয়ান নাগরিকদের একটি দল কেবল আইনজীবীর ভুয়

আমেরিকায় অভিবাসীদের অসহায়ত্ব পুঁজি করে বড় জালিয়াতি, হারাচ্ছে দু’কূল

 

আমেরিকায় সাধারণত বড় অংকের জালিয়াতির মামলা বলতে ক্রিপ্টোকারেন্সি, আবাসন ব্যবসা কিংবা কর ফাঁকির ঘটনাকে বোঝায়। কিন্তু সম্প্রতি ফ্লোরিডার অরেঞ্জ কাউন্টিতে এক বিচিত্র ও নজিরবিহীন প্রতারক চক্রের সন্ধান পেয়েছে পুলিশ। একটি বন্ধ দোকানের ভেতর ‘লেগাসি ইমিগ্রা’ নামে ভুয়া অভিবাসন ল ফার্ম খুলে বসেছিলেন এক দম্পতি ও তাদের দুই সহযোগী। এই ভুয়া প্রতিষ্ঠানের আড়ালে তারা মূলত শত শত নথিপত্রহীন অভিবাসীদের সঙ্গে প্রতারণা করে আসছিলেন।

আদালতের অভিযোগপত্রে বলা হয়েছে, ফ্লোরিডা, নিউইয়র্কসহ অন্তত চারটি অঙ্গরাজ্যের শত শত অভিবাসীর কাছ থেকে ভুয়া আইনি সহায়তার নামে এবং জাল রাজনৈতিক আশ্রয়ের আবেদন জমা দিয়ে প্রায় দুই কোটি ডলারের বেশি হাতিয়ে নিয়েছে এই চক্রটি। ভুক্তভোগীদের বেশিরভাগই ব্রাজিলের নাগরিক। প্রতারকেরা অভিবাসীদের আসল নথিপত্র আটকে রেখে এক প্রকার জিম্মি করে অর্থ আদায় করত।

অন্যদিকে, নিউইয়র্কের ফেডারেল প্রসিকিউটররা এর চেয়েও বড় এবং সুসংগঠিত এক প্রতারক চক্রের সন্ধান পেয়েছেন। কলম্বিয়ান নাগরিকদের একটি দল কেবল আইনজীবীর ভুয়া পরিচয় দিয়ে চাঁদাবাজিই করেনি, বরং বিচারকের পোশাক ও পুলিশের ইউনিফর্ম পরে ভিডিও কলে ভুয়া আদালতের দৃশ্যও সাজাত। সরকারি সিলমোহর দেওয়া জাল নথিপত্র তৈরি করে তারা ‘মক্কেলদের’ আসল আদালতের শুনানি এড়িয়ে যাওয়ার পরামর্শ দিত। এর ফলে অনেক অভিবাসীই এখন সরাসরি দেশান্তরের বা ডিপোর্টেশনের ঝুঁকিতে পড়েছেন।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদে আইনি উপায়ে নাগরিকত্ব পাওয়ার পথ সংকুচিত হওয়া এবং দেশান্তরের তৎপরতা বৃদ্ধি পাওয়ায় এই ধরনের প্রতারণার ব্যবসা এখন রমরমা। আইনি সুরক্ষার জন্য মরিয়া হয়ে পড়া অভিবাসীদের এই অসহায়ত্বকে পুঁজি করে কোটি কোটি ডলার হাতিয়ে নিচ্ছে জালিয়াত চক্রগুলো।

গত বছর আমেরিকায় অভিবাসন সংক্রান্ত গ্রেফতারের সংখ্যা প্রায় তিনগুণ বেড়েছে, অথচ বহিষ্কারের প্রক্রিয়ার মুখোমুখি হওয়া অভিবাসীদের মাত্র ৪২ শতাংশের আইনজীবী ছিল। অভিবাসন মামলাগুলো দেওয়ানি প্রকৃতির হওয়ায় আইনি অধিকার হিসেবে সরকারের পক্ষ থেকে কোনো আইনজীবী দেওয়া হয় না। আমেরিকান ইমিগ্রেশন কাউন্সিলের ১২ লাখ মামলার একটি বিশ্লেষণে দেখা গেছে, আইনজীবী থাকলে অভিবাসীদের মামলায় জেতার সম্ভাবনা অন্তত তিনগুণ বেড়ে যায় এবং বন্দি অভিবাসীদের ক্ষেত্রে এই সম্ভাবনা বাড়ে ১০ গুণ।

লাতিন আমেরিকার দেশগুলোতে ‘নোটারিও’ বলতে বিশেষজ্ঞ আইনজীবীকে বোঝানো হলেও আমেরিকায় ‘নোটারি’ হলো সাধারণ আইনি সাক্ষী, যা একটি সাধারণ অনলাইন আবেদনের মাধ্যমেই হওয়া যায়। ভাষার এই বিভ্রান্তিকে কাজে লাগিয়ে লস অ্যাঞ্জেলেসের মতো শহরগুলোতে বছরের পর বছর ধরে প্রতারকেরা অভিবাসীদের ঠকিয়ে আসছে। ক্যালিফোর্নিয়ার পাবলিক কাউন্সেলের জিনা আমাতো বলেন, যেখানে অভিবাসীদের জীবন-মরণ সমস্যা, সেখানে এই প্রতারকেরা এসে সোনার হরিণ বিক্রি করছে।

আগে এই প্রতারণা স্থানীয় পর্যায়ে সীমাবদ্ধ থাকলেও এখন ফেসবুক, টিকটক এবং হোয়াটসঅ্যাপের মতো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করে তা অত্যন্ত পরিশীলিত রূপ নিয়েছে। ক্যাথলিক চ্যারিটিজের মতো সুপরিচিত দাতব্য সংস্থা এবং নামী আইনজীবীদের নাম ও লোগো নকল করে ভুয়া অ্যাকাউন্ট খোলা হচ্ছে। নর্থ ক্যারোলাইনার ডায়োসিস অব রালের কনসুয়েলো কুই জানান, গত এক বছরে এই প্রবণতা ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। প্রতিদিন তার কাছে প্রতারিত হওয়া মানুষদের পাঁচ থেকে ১০টি ফোন আসে। সম্প্রতি এক ব্যক্তি তার পরিবারকে বৈধ করার জন্য এনজিও ভেবে প্রতারকদের ৫০ হাজার ডলার দিয়েছেন, কিন্তু এক বছর পরও কোনো নথিপত্র পাননি।

বর্তমান প্রযুক্তির যুগে এআই বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করে নামী আইনজীবীদের মাত্র এক মিনিটের আসল ভিডিও ক্লিপ থেকে তৈরি করা হচ্ছে নিখুঁত ডিপফেক ভিডিও। মিয়ামির প্রখ্যাত অভিবাসন আইনজীবী অ্যাঞ্জেল লিল জানান, তার নাম ব্যবহার করে তৈরি করা প্রায় ৬ হাজার ৪০০টি ভুয়া প্রোফাইল তিনি বন্ধ করেছেন। এসব ডিপফেক ভিডিওতে দেখানো হচ্ছে তিনি একটি কান্নারত পরিবারকে মার্কিন নাগরিকত্বের কাগজ দিচ্ছেন। টিকটক বা মেটার মতো বড় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলো এই স্ক্যাম ঠেকাতে কিছু এআই টুল চালু করলেও তা পর্যাপ্ত নয়। অনেক সময় অভিযোগ জানানোর পরও ভুয়া আইডিগুলো সচল থাকছে।

ফেডারেল ট্রেড কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, ট্রাম্প ক্ষমতায় ফেরার পর থেকে অভিবাসন জালিয়াতির অভিযোগের সংখ্যা দ্বিগুণ হয়েছে। আমেরিকার শীর্ষ নেতাদের একাংশের অভিবাসীবিরোধী কঠোর অবস্থান এবং আইনি জটিলতার কারণে প্রতারিত ব্যক্তিরা সাধারণত পুলিশের কাছে যেতে ভয় পান। এই ভয়কেই মূল হাতিয়ার বানিয়েছে অপরাধীরা। আমেরিকান ইমিগ্রেশন লয়ার্স অ্যাসোসিয়েশনের চ্যারিটি আনাস্তাসিও বলেন, এই অসহায় মানুষদের বাঁচাতে সাহায্য করাটা এখন যেন এক অন্তহীন ইঁদুর-বিড়াল খেলা হয়ে দাঁড়িয়েছে, এবং সামনের দিনগুলোতে পরিস্থিতি আরও খারাপের দিকেই যাবে।

সূত্র: দ্য ইকোনমিস্ট
কেএএ/

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow