আহমদ রাজুর গল্প : একজন বৃদ্ধ ও তার পরাবাস্তবতা
সাতসকালে কী এমন ঘটলো যার কারণে রুদ্রমূর্তি ধারণ করলেন দামিনী! এত বছরের সংসার জীবনে এমন ঘটনা আগে কোনোদিন দেখেননি সুধারাম মল্লিক। আজ এই অস্বাভাবিকতায় শুধু আশ্চর্যই হননি হতবাকও হয়েছেন। একবার অবশ্য ভেবেছিলেন, তিনি স্বপ্নের ঘোরে আছেন। যখন ঘোর কাটে তখন বাস্তবতাকে মেনে নিতেই হয়। তবে কী দামিনীর মাথায় সমস্যা দেখা দিয়েছে? নাকি কেউ কিছু বলে তার কান ভারি করেছে? আর যাই হোক, মিথ্যা কিছু বলে তার মনকে বিগড়ে দেওয়া কোনোভাবেই সম্ভব নয়। এত বছর যখন সম্ভব হয়নি- আজও হবে না এ ব্যাপারে শতভাগ নিশ্চিত। বিভিন্ন রকম চিন্তা সুধারাম মল্লিকের মাথার চারপাশে গিজগিজ করে। এমনিতেই বেশ কিছুদিন যাবৎ তার শরীর ভালো যাচ্ছে না। তিনি স্ত্রীকে শান্ত করতে বললেন, ‘আমি কী অজান্তে কোন অপরাধ করেছি?’ সুধারাম মল্লিকের কথা শেষ না হতেই দামিনী মুখে তাচ্ছিল্যের হাসি ফুটিয়ে বললেন, ‘না না, তা হবে কেন? তুমি কি অজান্তে অপরাধ করতে পারো? যা করেছো সে তো জেনেশুনে।’ সুধারাম মল্লিক যেন আকাশ থেকে পড়েন। তিনি ভেবে পান না কী তার অপরাধ? আর এই বয়সে অপরাধ করার ক্ষেত্রটাইবা কোথায়? যদি অল্প বয়স হতো- যুবক থাকতো, তাহলে না হয় বলা যেত- হয়তো হতে পারে। কিন্তু
সাতসকালে কী এমন ঘটলো যার কারণে রুদ্রমূর্তি ধারণ করলেন দামিনী! এত বছরের সংসার জীবনে এমন ঘটনা আগে কোনোদিন দেখেননি সুধারাম মল্লিক। আজ এই অস্বাভাবিকতায় শুধু আশ্চর্যই হননি হতবাকও হয়েছেন। একবার অবশ্য ভেবেছিলেন, তিনি স্বপ্নের ঘোরে আছেন। যখন ঘোর কাটে তখন বাস্তবতাকে মেনে নিতেই হয়। তবে কী দামিনীর মাথায় সমস্যা দেখা দিয়েছে? নাকি কেউ কিছু বলে তার কান ভারি করেছে? আর যাই হোক, মিথ্যা কিছু বলে তার মনকে বিগড়ে দেওয়া কোনোভাবেই সম্ভব নয়। এত বছর যখন সম্ভব হয়নি- আজও হবে না এ ব্যাপারে শতভাগ নিশ্চিত। বিভিন্ন রকম চিন্তা সুধারাম মল্লিকের মাথার চারপাশে গিজগিজ করে। এমনিতেই বেশ কিছুদিন যাবৎ তার শরীর ভালো যাচ্ছে না। তিনি স্ত্রীকে শান্ত করতে বললেন, ‘আমি কী অজান্তে কোন অপরাধ করেছি?’
সুধারাম মল্লিকের কথা শেষ না হতেই দামিনী মুখে তাচ্ছিল্যের হাসি ফুটিয়ে বললেন, ‘না না, তা হবে কেন? তুমি কি অজান্তে অপরাধ করতে পারো? যা করেছো সে তো জেনেশুনে।’
সুধারাম মল্লিক যেন আকাশ থেকে পড়েন। তিনি ভেবে পান না কী তার অপরাধ? আর এই বয়সে অপরাধ করার ক্ষেত্রটাইবা কোথায়? যদি অল্প বয়স হতো- যুবক থাকতো, তাহলে না হয় বলা যেত- হয়তো হতে পারে। কিন্তু বয়স বিবেচনা করলে সে তো অসম্ভব। আঠাস বছর চাকুরি জীবনে কেউ বলতে পারবে না একটা টাকা ঘুষ পর্যন্ত খেয়েছে। যা যৎসামান্য বেতন পেয়েছে তাই দিয়েই দামিনী কোন রকম মাস পার করেছেন। তার সাথে ছেলে-মেয়ের পড়াশুনার খরচতো ছিলই। এ বিষয়ে অবশ্য দামিনী ধন্যবাদ পাবার যোগ্য। টেনেটুনে চলেছে সত্য- তাকে অন্তত স্বচ্ছল বলা চলে না। সেই ক্রান্তিকালে দামিনী সুধারাম মল্লিককে সন্দেহ করেনি কোন ব্যাপারে। আর অর্থকড়ি নিয়ে উচ্চবাক্য বিনিময় হয়-ই নি কোনোদিন। আজ তবে কেন তার এই পরিবর্তন?
‘কী হলো, একেবারে বিদ্যুতের খুঁটির মতো সোজা হয়ে গেলে যে?’ স্ত্রীর এমন কথায় সুধারাম মল্লিক সম্বিত ফিরে পায়। তিনি মুহূর্তে হারিয়ে গিয়েছিলেন পুরোনো দিনে- যেখানে ফেলে এসেছে সোনালী অতীত।
‘কী এমন ঘটলো যে, সাত সকালে তুমি আমার পিছে লাগলে?’
‘পিছে লাগার দেখেছো কী? হাড় মাংস সব জ্বালিয়ে তবেই ছাড়বো।’ রুক্ষ্ম কণ্ঠ দামিনীর।
সুধারাম মল্লিকের মনের ভেতরে ভয়ের সঞ্চার হতে শুরু করে। তবে কি সব জেনে গেল দামিনী! নিজেকে স্বাভাবিক রেখে বললো, ‘আমার অপরাধটা বলবে তো?’
দামিনী বুঝতে পারে, সুধারাম মল্লিক এখন ভালো সাজার চেষ্টা করছে। তিনিও রায় বংশের মেয়ে; কোন দিক দিয়ে কমতি নেই তার। দাদা মস্ত বড় পুলিশ অফিসার ছিল। রিটায়ার্ড করেছে সত্য, তাই বলে তার যে পুলিশে জানাশোনা নেই তা নয়। তার মূল্যায়ন আগের মতোই আছে। তিনি কথায় দাম্ভিকতা মিশিয়ে বললেন, ‘তোমার অপরাধ আমার কাছে অনেক বড়। তার মানে এই নয় যে, আমাকে কষ্টে রেখে তুমি একটা কঠিন সিদ্ধান্ত নেবে আর আমি তা হাসিমুখে মেনে নেবো, তেমন দাদার বোন আমি নই। একেবারে চৌদ্দ সিঁকের ভাত খাইয়ে ছাড়বো।’
মহামুশকিলে পড়ে যায় সুধারাম মল্লিক। একটা দুর্বলতা তার আছে যা এ কথার সাথে মেলে না! তবে কি অন্য কিছু? দামিনী আসল কথা না বলে এদিক-সেদিক বলেই চলেছে অনর্গল! এখন তিনি কী করবেন বুঝতে পারেন না। ছেলে-মেয়েকে ফোনে বিষয়টা জানাবে, যেন এসে মা’কে বুঝিয়ে বলে? তারা থাকে দূর দেশে; সহজে আসা মুষ্কিল। এসে যদি আবার তার গোপন বিষয়টা জেনে যায়, তাহলে হিতে বিপরীত হয়ে যেতে পারে। সবচেয়ে বড় কথা, কথাটা শোনার পর তাদের স্বাভাবিক কাজকর্ম ব্যাহত হবে; যা পিতা হিসাবে মেনে নিতে পারবে না। এসব ভেবে ছেলে-মেয়েকে কোনোকিছু না জানানোর সিদ্ধান্ত নেয়। তিনি বিষয়টা স্বাভাবিকভাবে নিতে মুখে হাসির রেখা ফুটিয়ে বললেন, ‘তুমি আমার জন্যে ভাত রাঁধতে পারবে না সেটা বলে দিলেই পারো, চৌদ্দ সিঁকের ভয় দেখাচ্ছো কেন?’
মুখ ঝামটা দিয়ে ওঠে দামিনী। বললেন, ‘আমি কি ভাত রাধি? ও কাজটা কাজের মেয়ের। তোমার এমন হৃদয় ভোলানো কথায় আমি গলছি না। যাও, নিতাই ঠাকুরের মেয়েকে শোনাও গিয়ে।’
এ কী কথা? নতুন করে ধাক্কা খায় সুধারাম মল্লিক। তিনি কিছুতেই বুঝে আনতে পারেন না, তাদের দু’জনের ভেতরে নিতাই ঠাকুরের মেয়ে এলো কীভাবে? মেয়েবেলা পার হবার পরে তার সাথে সর্বসাকুল্যে দু’পাঁচবার দেখা হয়েছে। কথা আহামরি খুব বেশি হয়নি। যেটা হয়েছে সেটা এলাকার মুরব্বীদের সাথে প্রতিবেশিদের যেভাবে কথা হয় ঠিক তেমন। শেষ যেদিন তার সাথে দেখা হয়েছিল সেদিন দামিনী সাথেই ছিল। সেতো মাস খানেক আগের কথা। দু’জনে ডাক্তার দেখিয়ে বাড়ি ফিরছিল। গ্রামের পথে দেখা হয়েছিল মুক্তির সাথে। দু’এক মিনিটে সামান্য দু’চারটে কথা। শুধু যে সুধারাম মল্লিক তার সাথে কথা বলেছিল তা নয়, দামিনীও বলেছিল। তার সংসারের কথা- বর্তমান বাস্তবতার কথা। আহা; অকালে স্বামীকে হারিয়ে গত বছর বাবার সংসারে ফিরে এসেছে মেয়েটা! সাথে তার আট বছরের মেয়ে। বাবার অবস্থা একেবারে যে খারাপ তা বলা যাবে না। বেশ ক’বছর আগে বিঘে দশেক জমি বেঁচে দিয়েছিল। এখনও যা আছে তাতে বছরে কমপক্ষে দু’শো মন ধান গোলায় ওঠে। এর সাথে আম, কাঁঠাল, তাল, নারিকেলতো আছেই। এ কারণে খুব ভালো আছে তা নয়; অন্তত বাবা যতদিন বেঁচে আছে ততদিন তো ভালো। বাবার মৃত্যুর পর ভাইদের সংসারে সে ভালো থাকবে তা হলফ করে বলা যাবে না। তবে যতই বাবা-ভাইদের সংসারে থাকুকনা কেন, স্বামী-স্বামীই হয়। তার সাথে- তার বাড়ির সাথে কারোর তুলনা চলে না।
যে মুক্তির মুখে হাসি লেগেই থাকতো স্বামীর মৃত্যুর পর সে হাসি কর্পুরের মতো উবে গেছে। হঠাৎ দামিনী কেন তাকে জড়িয়ে কথা বললো বুঝতে পারে না সুধারাম মল্লিক। সে কি কিছু সন্দেহ করেছে? যদি করেই থাকে তাহলে কী সেই সন্দেহ? নিজের মনকে জিজ্ঞেসা করে সুধারাম মল্লিক।
কথাগুলো উত্তেজিত হবার মতো হলেও সর্বদা ঠাণ্ডা প্রকৃতির সুধারাম মল্লিক নিজেকে বরাবরের মতো শান্ত রেখে বললেন, ‘হঠাৎ কী এমন হলো দামিনী, যার জন্যে তুমি নিতাই ঠাকুরের মেয়েকে টেনে আনলে?’
‘আমি এখন তোমার সাথে কোন কথা বলতে চাচ্ছি না। তুমি যেখানে যাচ্ছো সেখানে যাও।’
‘আমি আবার কোথায় যাবো এই সকালে?’ প্রশ্ন সুধারাম মল্লিকের।
‘আমি বুঝতে পারছি, তুমি নিতাই ঠাকুরের বাড়ি যাবে। আচ্ছা যাও, আমি বাঁধা দেবো না।’
‘আবার সেই কথা! নিতাই ঠাকুরের বাড়ি যাবো কেন? সেখানে আমার কী? আর যদি যাইওবা তাহলেই ক্ষতি কী?’
‘সেখানেই তো তোমার সকল সুধা।’
সুধারাম মল্লিক আর কথা বাড়ায় না। তিনি বুঝতে পেরেছেন, এভাবে যদি কথা চলতেই থাকে তাহলে আর মর্নিং ওয়ার্কে যাওয়া হবে না। তাইতো চুপচাপ টেবিলের ওপর থাকা পানি ভর্তি জগটা উঁচু করে ঢকাঢক খানিকটা গলায় ঢেলে তিনি বেরিয়ে পড়েন। পাশে কাঁচের গ্লাস উপুড় করা থাকলেও সেদিকে ভ্রুক্ষেপ করেন না।
আশ্বিনের মাঝামাঝি হলেও ক্ষণে ক্ষণে বেরসিক বৃষ্টির উপস্থিতি। ভোরে দমকা হাওয়ার সাথে এক পশলা বৃষ্টি প্রকৃতিকে শীতল করে দিয়ে গেছে। শহর ঠিক বলা চলে না। তবে গ্রামও নয়। শহরের মতো পত্র-পল্লবহীন নয়; গ্রামের মতো ইট,পাথর, সিমেন্ট ছাড়া নয়। বর্ষা মৌসুমে রাস্তার কাদায় শেয়াল আটকে থাকে না এখানে। কাউকে প্রাথমিক চিকিৎসা নিতে জেলা সদরে যেতে হয় না। মোটকথা শহর আর গ্রামের এক অন্যরকম মিশেল এখানে।
সাতাস জনের দলটির দলনেতা রিটায়ার্ড লেফটেন্যান্ট কর্ণেল তৌফিকুর রশীদ। তিনি সবাইকে শৃঙ্খলাবদ্ধভাবে পরিচালনা করেন। কারো কারো বয়স বেশি হলেও মনের দিক থেকে সবাই এক। নির্দেশনা পেয়ে সবাই টান পায়ে হাঁটতে থাকে। যুবকদের মতো জগিং স্টাইলে দৌঁড়াতে না পারলেও সবার পায়ের ছন্দ প্রায় একই। সঙ্গীদের শীত অনুভূত হলেও সুধারাম মল্লিকের শরীর দিয়ে দরদর করে ঘাম ঝরতে থাকে। সঙ্গী বলতে যাদের সাথে তিনি মর্নিং ওয়ার্কে বের হন। আসলে এই বয়সে এসে ইচ্ছে করলেও সবার সাথে মেশা যায় না- কিংবা মন খুলে দু’টি কথা বলা যায় না। অল্প বয়সী কেউ তাদের সাথে মিশতেও চায় না। তবে সুধারাম মল্লিকের এ বিষয়ে কোন আক্ষেপ নেই। তিনি বেশ ক’জন বন্ধু পেয়েছেন; যারা তার ভোরের বন্ধু, বিকেলের বন্ধু, সুখ-দুঃখ, ফেলে আসা দিনগুলো রোমন্থনের বন্ধু। তাদের কারো কারো পারিবারিক ও সামাজিক অবস্থান সুধারাম মল্লিককে ছাড়িয়ে গেছে সত্য, তবে রিটায়ার্ড হবার পর সবার মন যেন এক কাতারে এসে ঠেকেছে।
দলনেতার নজর পড়ে সুধারাম মল্লিকের দিকে। তিনি সবাইকে অবাক করে বললেন, ‘স্টপ।’
কথাটা শুনে সবাই যে যেখানে ছিল সেখানেই দাঁড়িয়ে যায়। ‘আমরা এখানে কিছু সময় বিশ্রাম নেবো।’ বললেন কর্ণেল তৌফিকুর রশীদ। কথাটা কানে যেতেই সবাই যেন হোঁচট খায়। এই এত বছরে কোনদিন তার মুখ থেকে ‘বিশ্রাম’ শব্দটা কেউ শোনেনি। বিশেষ করে মাঝপথে। আজ কী এমন ঘটলো, যে কারণে তাকে অনিচ্ছাসত্ত্বেও স্টপ বলতে হলো!
ইতোমধ্যে সবাই বুঝতে পেরেছে ঘটনা কী ঘটেছে। তারা সুধারাম মল্লিককে ধরে রাস্তার পাশের একটা বেঞ্চের ওপর নিয়ে বসিয়ে নিজেদের সাধ্যমত বাতাস করতে থাকে। কেউ মাথার ক্যাপ দিয়ে, কেউ পকেটের রুমাল দিয়ে, কেউবা খালি হাত দিয়ে। ডাক্তার মোহন মোদক এই দলেরই একজন। সিভিল সার্জন থেকে অবসর নিয়েছে এগারো বছর আগে। বর্তমানে গ্রামের এক ওষুধের দোকানে বসে নামমাত্র মূল্যে রুগি দেখেন। তিনি হাত ধরে নাড়ির অবস্থা বোঝার চেষ্টা করে বললেন, ‘মল্লিকবাবু, কেমন অনুভব করছেন?’
সুধারাম মল্লিক ততক্ষণে নিজেকে সামলে নিয়েছেন। বললেন, ‘আমি ঠিকই আছি ডাক্তার বাবু।’
‘আপনি ঠিক আছেন তাতো বুঝতে পারছি। কিছু নিয়ে টেনশন করছেন নিশ্চয়ই?’ বললেন ডাক্তার।
‘না আসলে...’
‘আমরা আপনার বন্ধু-স্বজন; নির্দিধায় বলতে পারেন সবকিছু।’
সুধারাম মল্লিক আমতা আমতা করতে থাকায় কর্ণেল তৌফিকুর রশীদ বললেন, ‘মল্লিকবাবু, বয়সের কাছে সবকিছু তুচ্ছ হয়ে যায়। আমরাও বোধ করি তার থেকে আলাদা নই। তবে সত্যি কথা হলো, আমরা সাতাস জনের একটা অবিচ্ছেদ্য পরিবার। একটা বৃহৎ বৃক্ষ। এই বৃক্ষের একটা ডাল ক্ষতিগ্রস্ত হবে তা তো হয় না। আপনার সমস্যা- কষ্টের কথা আমাদের মাঝে চাপিয়ে দিন। আমরাও আপনার কষ্টের ভাগীদার হতে চাই।’
সকলের পীড়াপিড়িতে সুধারাম মল্লিক সকালে ঘটে যাওয়া ঘটনা খুলে বলেন। সবাই বুঝ দেন, আরো দু’পাঁচ দিন দেখা যাক ঘটনা কী ঘটে। তখন প্রয়োজনে একজন মানসিক বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া যাবে।
দিন যত গড়ায় দামিনীর অবহেলা ততই বৃদ্ধি পায়। তার সীমা এমন পর্যায় পৌঁছেছে যে, এক গ্লাস পানিও ঢেলে দিতে তার আপত্তি। কিছু চাইলেই ‘পারলে নিজে করো’ এমন উক্তি পাকাপোক্ত হয়ে গেছে। বেশ কিছুদিন পেরিয়ে গেলেও দামিনীর মনে কী চলছে তা বুঝতে পারেন না সুধারাম মল্লিক। এমনিতে নিজের শরীরের অবস্থা বেশি ভালো না। তার ওপর পারিবারিক বিপর্যয় মানিয়ে নিজেকে টিকিয়ে রাখতে খুব কষ্ট হয় তার।
আজ দামিনীর উদ্ভট ব্যবহারে মনে দারুণভাবে কষ্ট পেয়েছেন সুধারাম মল্লিক। নিজেকে ভয়ানক অচেনা লাগছিল। দুপুরে ভাতঘুম দেওয়া তার বরাবরই অভ্যাস। কিন্তু বর্তমানের মানসিক টানাপোড়েনে বিছানায় গড়াগড়ি করলেও ঘুম আসছিল না। সকাল থেকে আকাশে মেঘ থাকলেও প্রকৃতিতে একটা গুমোট ভাব থেকেই গিয়েছিল। ক্লান্ত শরীরটাকে স্বস্তি দিতে বাড়ি থেকে বেরিয়ে হাঁটতে হাঁটতে চলে যান বিলের ধারে শতবর্ষী বট গাছের নিচে। অনেকের বিশ্বাস, দশগ্রামের মধ্যে সবচেয়ে বিশুদ্ধ বাতাস এই বৃহৎ বট গাছের নিচে। আসলেই তাই; কোথাও যদি বাতাসের অভাবে গাছের পাতা না নড়ে তবুও এই বটগাছের নিচে আসলে মুহূর্তে শরীর জুড়িয়ে যেতে বাধ্য।
গ্রামের অনেকেই এখানে- এই ছায়া সুনিবিড়ে সময় অসময় পার করে। সামনে বিশাল এলাকাজুড়ে মান্দার বিলের পানিতে শাপলা-পদ্মের সমারোহ চোখ জুড়িয়ে যায়। আশপাশের অধিকাংশ পরিবার এই বিলের ওপর নির্ভরশীল। কেউ মাছ ধরে সংসার চালায়- কেউ শাপলা কিংবা পদ্ম পাতায়।
‘ঠাকুর্দা তুমিও চলে এসেছো? ঠাম্মি তোমাকে আসতে দিল!’ সামনে এসে দাঁড়িয়ে কথাটা বললো নিতাই ঠাকুরের মেয়ে মুক্তি।
বিলের পানিতে কালো কুচকুচে একটা পানকৌড়ি ডুব দিয়ে মাছ ধরার চেষ্টা করছিল আপনমনে। সে এক জায়গায় ডুব দিয়ে অন্য জায়গায় ভেসে উঠছিল। এভাবেই চলছিল তার ডুবসাঁতার খেলা। সুধারাম মল্লিক শেকড়ের ওপর বসে সেদিকে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে ছিল। তিনি মুক্তির দিকে মুখ ফিরিয়ে বললেন, ‘হ্যাঁ রে দাদু, বস এখানে।’ বলে মুক্তির হাত টেনে ধরে পাশে বসান। দামিনী দূরে গাছের আড়ালে দাঁড়িয়ে সব দেখছিলেন। সুধারাম মল্লিক যখন ঘর থেকে বের হয় তখনই তিনি পেছন পেছন এসেছিলেন। দু’জনকে একসাথে দেখে পা টিপে টিপে এসে সামনে দাঁড়ান। মুক্তি দামিনীকে দেখে শেকড় থেকে নেমে দাঁড়িয়ে বললো, ‘ওমা, ঠাম্মি তুমিও চলে এসেছো? তাইতো বলি ঠাকুর্দা হাওয়া খেতে একা তো আসতেই পারে না।’
দামিনীর চোখে মুখে উত্তেজনার ভাব। তিনি রাগান্বিত স্বরে বললেন, ‘থাক আর ন্যাকা সাজতে হবে না।’
মুক্তি হতবাক। দামিনীর মুখে এমন কথা সে কোনদিন শোনেনি। মায়ের মুখে শুনেছে, ছেলেবেলায় এই দামিনীই তাকে কোলে কাঙ্খে নিয়ে মানুষ করেছে। তার কাছে রেখে মা দৈনন্দিন কাজ সারতেন। আজ সেই দামিনীই তাকে এ কী বলছে! অজান্তেই তার চোখ জলে ভরে উঠেছে। ‘ঠাম্মি, আমি কী কোন অপরাধ করেছি?’ প্রশ্ন মুক্তির।
‘অপরাধ তুই করবি কী, অপরাধ করেছি আমি।’ বললেন দামিনী।
‘ঠাকুর্দা তুমি বলোতো, আমি কী করেছি?’
‘সে কী বলবে? তুই কিছু করিসনি, সাধু সাবিত্রি। এই তুমি কি বাড়ি যাবে নাকি এখানেই.....’
অবস্থা বেগতিক দেখে সুধারাম মল্লিক আস্তে আস্তে বলেন, ‘তুই কিছু মনে করিসনে দিদি, আমি তোর সাথে পরে কথা বলবো।’
স্বামীর ভাব দেখে রাগের মাত্রা আরো বৃদ্ধি পায় দামিনীর। ‘পরে তোমাকে বলাচ্ছি; চলো।’ বলে সুধারাম মল্লিকের ডান হাত ধরে টানতে টানতে বাড়ির দিকে নিয়ে যান। মুক্তি সেখানে ঠাঁই দাঁড়িয়ে থাকে। মুহূর্তে কী ঘটলো- কেন ঘটলো কিছুই বুঝে উঠতে পারে না। তার মনে পড়ে না এমন কোন অপরাধ সে করেছে যার জন্যে কথা শুনতে হয়।
‘আমাকে এভাবে টানতে টানতে নিয়ে আসলে কেন? লোকেরাই বা কী ভাবলো বলতো?’ বারান্দার চেয়ারে বসে হাঁপাতে হাঁপাতে বললেন সুধারাম মল্লিক।
‘সংসারই যেখানে টিকছে না সেখানে কে কী ভাবলো তাতে আমার কী-ইবা আসে যায়?’ উত্তেজিত হয়ে ওঠেন দামিনী।
সুধারাম মল্লিকের ধৈয্যের বাঁধ ভেঙে যাবার উপক্রম। তার প্রচণ্ড কাশি পায়। নিজেকে সামলে নিয়ে কাঁশতে কাঁশতেই বললেন, ‘তোমার কাছে অনেকদিন থেকে জানতে চাচ্ছি কী হয়েছে- কী হয়েছে; কিছুই বলছো না। শুধু সন্দেহের বশবর্তী হয়ে আমার ওপর রাগ ঝাড়ছো! ঠাকুরের দোহাই একটু ভেবে বলো, আমাদের কি আর সন্দেহ করার মতো বয়স আছে?’
‘তোমার মন ভোলানো কথায় আমি আর ভুলছি না। আজই ভাইয়ের বাড়ি চলে যাচ্ছি। তুমি মুক্তিকে ঘরে তোলো- আমার কোন আপত্তি নেই। তবে হ্যাঁ, চৌদ্দ শিঁকের ভাত খাবার জন্যে তৈরি হয়ে নাও।’
সুধারাম মল্লিক কী বলবে বুঝতে পারেন না। তিনি হেসে ওঠেন। বললেন, ‘কী বললে? কার কথা বললে! আর একবার বলো?’
‘আমি কিন্তু সিরিয়াস। ন্যাকামি একদম করার চেষ্টা করো না। তুমি যদি আমাকে অবলা ভেবে থাকো তাহলে ভুল করবে।’
‘আমি তোমাকে কখনও অবলা ভাবিনি গিন্নি। দয়া করে আমার ওপর এই অসহ্য সন্দেহ বন্ধ করো।’
‘কোনটা অসহ্য- কোনটা সহ্য তা পরে টের পাবে।’ বলে তিনি ঘরের ভেতরে যেয়ে ব্যাগ নিয়ে ভাইয়ের বাড়ির উদ্দেশ্যে বেরিয়ে যান। পেছন থেকে অনেকবার সুধারাম মল্লিক ডাকলেও তিনি পেছন দিকে ফিরেও তাকান না।
এত বছরের সংসার; ঠুকনো একটা ব্যাপার নিয়ে দামিনী ঘর ছাড়তে পারে যা ভাবনায় আসে না সুধারাম মল্লিকের। নিশ্চয়ই এর ভেতরে অন্য কোন রহস্য আছে যা তিনি জানেন না। কী সেই রহস্য? বাড়িতে এমন কেউ নেই যার কাছ থেকে কিছু অন্তত জানা যায়।
সুদীপ আর সুকন্যাকে কর্ণেল তৌফিকুর রশীদ টেলিফোনে সবকিছু খুলে বলেছেন। তাদের মা অভিমান করে বেশ কিছুদিন হলো ভাইয়ের বাড়ি চলে গেছে- বাবা বাড়িতে একা। বাবা-মায়ের মান ভাঙাতে তাদেরকে উদ্যোগ নিতে হবে। বড় মামাকে ফোনে একই কথা জানালে তিনি সন্তান-সন্ততি নিয়ে দেশে আসেন।
দামিনী বাড়ি ফিরতে প্রথমে রাজী না হলেও ছেলে-মেয়ের পীড়াপিড়িতে রাজি হতে বাধ্য হন। তারা যখন বাড়িতে পৌঁছায় তখন সেখানে অনেক মানুষের কোলাহল। সুধারাম মল্লিক বিছানায় শুয়ে আছেন। থেকে থেকে জ্বর যেন ছাড়তেই চাইছে না। সুদীপ আর সুকন্যা তার পাশে বসে গায়ে-মাথায় হাত দেয়। সবার নিষেধ সত্ত্বেও তিনি উঠে পালঙ্কে ঠেস দিয়ে বসেন।
বাবার শরীরের অবস্থা দেখে সুকন্যার মন ডুকরে কেঁদে ওঠে। বললো, ‘এখন কেমন আছো বাবা? তোমার এই অবস্থা কী করে হলো? তুমি তো চির যুবক ছিলে!’
‘আমি ভালো আছিরে মা। তোরা কেমন আছিস বল?’
‘ভালো কী করে থাকবো বলো? মায়ের সাথে তোমার মনমালিন্য আমাদের ভালো থাকতে দেয় কীভাবে? এখনতো দেখছি তোমার মনের সাথে শরীরও ভেঙে খান খান হয়ে গেছে। খেয়াল করে দেখেছো তুমি?’ বললো সুকন্যা।
সুদীপ বললো, ‘কাজের খুব চাপ জানো। তোমাদের কথা শুনে কোন কাজে মন বসে বলো?’
‘আমিতো কিছু করিনি। তোর মা-ইতো একতরফা আমাকে রেখে চলে গেলো।’
‘একদম মিথ্যে কথা। এই বয়সে একজন মহিলা কেন ঘর ছাড়ে? শখ করে বুঝি?’ চিল্লিয়ে ওঠেন দামিনী।
সুকন্যা বললো, ‘মা, আমার বাবা পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ বাবা। সে কখনও ভুল করতে পারে না। তোমার ভুল হয়েছে কোথাও হয়তো।’
‘হ্যাঁ; সবইতো আমার ভুল? তোর বাবা নিতাই ঠাকুরের মেয়ে মুক্তিকে ঘরে তোলার জন্যে উঠে পড়ে লেগেছে। বয়স যা-ই হোক, কোন মহিলা চাইবে তার স্বামীকে ভাগ দিতে?’
উত্তেজিত হয়ে ওঠেন সুধারাম মল্লিক। বললেন, ‘সেই একই কথা। মুক্তিকে কেন টানো তুমি? কপাল দোষে অল্প বয়সে মেয়েটা বিধবা হয়েছে। একারণে তাকে নিয়ে যা খুশি তা বলতে পারো না।’
‘আমি বলবো কেন, তোমার ধ্যান-জ্ঞানে মুক্তিকে ছাড়া কি কিছু দেখতে পাও?’
‘দ্যাখ, তোদের মা’র কথার ধারা দ্যাখ। আমার ধ্যান জ্ঞানে নাকি....! ছি..ছি...ছি; কী সব কথা!’
সুদীপ বললো, ‘মা তুমি এসব ফালতু চিন্তা মাথায় আনো কেন? বাবাকে নিয়ে এমন বাজে সন্দেহ করা ঠিক না।’
‘আমি কোন বাজে কিছু বলছি না। যা সত্য তাই।’
‘কী সত্য তোমাকে আজ বলতেই হবে।’ বললেন সুধারাম মল্লিক।
‘তুমি অসুস্থ। আগে সুস্থ হও।’
‘আমি সুস্থ। বরং না বললে আরো অসুস্থ হবো।’
সুধারাম মল্লিক নাছোড়বান্দা হওয়ায় দামিনী বললেন, ‘আর একবার ভেবে দেখো। সবার সামনে বললে তোমার কিন্তু মান-সম্মান থাকবে না।’
কী কথা বলবে দামিনী? মনে সন্দেহের দানা বাঁধলেও ঢোক গিলে সুধারাম মল্লিক বললেন, ‘মান-সম্মান যা যাবার তা চলে গেছে। সবার সামনে বলো।
দামিনী কিছুটা ইতস্তত বোধ করে বললেন, ‘প্রায়ই ঘুমের ঘোরে তুমি মুক্তির নাম ধরে ডাকো। শুধু কী ঘুমের ঘোরে, দু’জনকে প্রায় কথা বলতে- হাসাহাসি করতেও দেখেছি।’
সুধারাম মল্লিক হাসবে না কাঁদবে বুঝতে পারেন না। তাহলে এই ব্যাপার? বললেন, ‘আসলে দেশের আইন শৃঙ্খলার চরম অবনতি, গোষ্ঠিভিত্তিক নিয়ন্ত্রণে দ্রব্যমূল্যের উর্ধ্বগতি, ক্ষমতার অপব্যবহারে চারিদিকে হাহাকার, সর্বোপরি একনায়কতন্ত্রের যাতাকল থেকে আমি স্বপ্নে হয়তো অনেকবার মুক্তি চেয়েছি; নিতাই ঠাকুরের মেয়ে মুক্তিকে নয়। তাছাড়া......’ থামেন সুধারাম মল্লিক।
কথাটা শুনে লজ্জায় আঁচল কামড়াতে থাকে দামিনী। তিনি যেন একবারে অসাঢ় হয়ে গেছেন।
‘থামলে কেন বাবা? তুমি আর কিসের থেকে মুক্তি চাও?’ প্রশ্ন সুকন্যার।
আজ এই বাড়িতে এমন একটা পরিবেশের সৃষ্টি হয়েছে যেখান থেকে উত্তোরণের পথ আপাতত জানা নেই সুধারাম মল্লিকের। সে কারণে কঠিন একটা সত্যকে তিনি সামনে আনতে চান; এতদিন যা গোপন রেখেছিলেন। বালিশের তলা থেকে একটা মেডিকেল রিপোর্টের ফাইল বের করে সুদীপের হাতে দিয়ে বললেন, ‘আমাকে তোরা ভুল বুঝিসনা বাবা। আমি তোদের কাউকে কষ্ট দিতে চাইনি।’
কী আছে ফাইলের ভেতরে? কাঁপা কাঁপা হাতে সুদীপ ফাইলটা মেলে ধরে হতবাক হয়ে যায়। মুহূর্তে দরদর করে চোখ থেকে পানি বের হতে থাকে। বললো, ‘বাবা, ও বাবা; এতবড় একটা ঘটনা তুমি অবলিলায় লুকিয়ে গেলে? আমরা কি তোমার কেউ নই?’
হঠাৎ চোখ দু’টি জলে ভরে ওঠে সুধারাম মল্লিকের। যা তিনি লুকাতে ব্যর্থ চেষ্টা করে বললেন, ‘এই বয়সে এমন একটা মরণব্যাধি আমার হয়েছে যে, কাউকে কিছু বলতেও পারছি না- সহ্য করতেও পারছি না।’
ডাক্তার মোহন মোদক বললেন, ‘তোমাদের হয়তো মনে আছে, ছয় বছর আগে শহরের একটা ক্লিনিকে মল্লিকবাবুর পেটের টিউমার অপারেশন করা হয়েছিল। সেদিন অপারেশনের জন্যে দুই ব্যাগ রক্তের প্রয়োজন হওয়ায় পরিচিত কারো রক্তের সাথে ম্যাচ করছিল না। শেষ পর্যন্ত বাইরে থেকে কিনে আনতে হয়েছিল। অনাকাঙ্ক্ষিতভাবে সেই রক্তের মাধ্যমে এইডস তার শরীরে বাসা বেঁধেছে।’
ডাক্তারের কথা শুনে সুধারাম মল্লিক হতবাক। তার অসুখের কথা ডাক্তার বাবু জানলো কীভাবে? কোন লক্ষণ প্রকাশ না পাবার কারণে তিনি কাউকেই জানাননি এ কথা। এমনকি দামিনীকেও নয়। তিনি মাস তিনেক আগে জ্বরের জন্যে ডাক্তারের কাছে গিয়েছিলেন। কৌতুহলবসত ডেঙ্গু টেস্টের সাথে এইচআইভি টেস্ট করলে ডেঙ্গু টেস্ট নেগেটিভ আসলেও এইচআইভি পজেটিভ আসে। তারপর ডাক্তার সন্দেহ দূর করার জন্যে আরো তিন বার তিন ক্লিনিক থেকে টেস্ট করলে একই রেজাল্ট আসে। এসব কথা শুধু সুধারাম মল্লিক আর সেই ডাক্তারই জানেন।
‘ডাক্তারবাবু আপনি এত কথা জানলেন কীভাবে?’
‘মল্লিকবাবু আপনার ছাব্বিশ বন্ধু সবাই জানে। একটা বিষয় হয়তো জানেন না, আপনাকে নিয়ে মেডিকেল বোর্ড গঠন করা ছয় সদস্যের মধ্যে আমিও ছিলাম। আপনার সকল হিস্ট্রি পর্যালোচনা করে বোর্ড সিদ্ধান্ত পৌঁছেছিল, ছয় বছর আগে আপনার শরীরে যে রক্ত প্রবেশ করানো হয়েছিল তাতে এইচআইভি ভাইরাস ছিল। ডাক্তার মজুমদার আপনাকে সে কথা অবশ্যই জানিয়েছিলেন। অথচ আপনি তথাকথিত সভ্যদের মতো লোক লজ্জার ভয়ে বেমালুম চেপে গেছেন!’
‘আমার বন্ধুরা সব জেনে শুনে আমার সাথে...’
কর্নেল তৌফিকুর রশীদ সুধারাম মল্লিকের কথা মাঝখানে থামিয়ে দিয়ে বললেন, ‘মল্লিকবাবু আমরা সবাই আপনার বন্ধু। আর প্রকৃত বন্ধু কখনও কোন পরিস্থিতিতে মুখ ফিরিয়ে নেয় না। তবে অসুখটাকে আপনি যেভাবে ভাবছেন একদম তেমন নয়। ছোঁয়াচেতো নয়ই। আমাদেরই উচিৎ সমাজের দৃষ্টিভঙ্গি পাল্টে দেওয়া। আর আমরাই যদি ভুল করি তাহলে সমাজ কার কাছ থেকে শিক্ষা পাবে?’
সুকন্যা বললো, ‘বাবা, যার এতগুলো বন্ধু আছে তার কিছু হতেই পারে না। তোমারও কিছু হবে না। তোমার বন্ধুদের মুখের দিকে তাকিয়ে দেখো, তোমার জন্যে তারা কেমন কষ্ট পাচ্ছে। তুমি কি পারবে এই মানুষগুলোর মনে কষ্ট দিয়ে বিছানায় শুয়ে থাকতে?’
মনের মাঝে হঠাৎ তীব্র শক্তি অনুভব করেন সুধারাম মল্লিক। বললেন, ‘তাহলে কি বলছিস, আমি আবার জগিং-এ যেতে পারবো?’
সুকন্যা মাথা নেড়ে বললো, ‘হ্যাঁ বাবা, অবশ্যই পারবে।’
‘এখনতো দুপুর। কাল সকালে যাবো তাহলে।’
‘কাল সকালে কেন? আমি সবার জন্যে রান্না করতে যাচ্ছি। দুপুরে খেয়ে রেস্ট নিয়ে বিকেলে হাঁটতে যাবে। না হয় আজ একটু ছন্দপতন হলোই বা। আপনাদের কোন আপত্তি নেইতো আঙ্কেল?’
সবাই সমস্বরে ‘না, একদম না; কোন আপত্তি নেই।’ বলে ঘর থেকে বেরিয়ে বাইরে যায়।
অনুতপ্ত দামিনী সুধারাম মল্লিকের পায়ের কাছে লুটিয়ে পড়েন। তিনি হয়তো তার স্বামীকে আজ এমন কিছু বলবে যা আর কোনদিন বলা হয়ে ওঠেনি।
কবি পরিচিতি : আহমদ রাজু গল্পকার হলেও তিনি একাধারে কবি, উপন্যাসিক, চিত্রশিল্পী।
শিক্ষায় হাতেখড়ি স্থানীয় জঙ্গলবাঁধাল প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। লেখালেখি শুরু ছেলেবেলায়। গল্প, উপন্যাস, প্রবন্ধ, ছড়া, কবিতা, গান মোটকথা সাহিত্যের সব শাখাতেই পদার্পণ তার। দেশ-বিদেশের শীর্ষস্থানীয় জাতীয় দৈনিকসহ স্থানীয় ও বিভিন্ন সাহিত্য পত্রিকায় লেখা প্রকাশিত হচ্ছে নিয়মিত। ‘মেঘবালিকা’ তার প্রথম গল্পগ্রন্থ।
২০১৩ সালে ‘অরণি গল্প প্রতিযোগিতা’য় তার ‘মুকুট’ গল্প শ্রেষ্ঠ গল্পের পুরস্কার লাভ করে। তাছাড়া ২০১৫ সালে অস্ট্রেলিয়ান সংবাদপত্র ‘সুপ্রভাত সিডনি’ তাকে শ্রেষ্ঠ গল্প লেখক সম্মাননা পুরস্কার প্রদান করে।
লেখক বর্তমানে অস্ট্রেলিয়া থেকে প্রকাশিত সংবাদপত্র ‘সুপ্রভাত সিডনি’র বিশেষ বিভাগীয় সম্পাদকসহ বিদ্রোহী সাহিত্য পরিষদ, যশোরের সভাপতির দায়িত্ব পালন করছেন।
আহমদ রাজু
(কবি ও কথাশিল্পী)
সভাপতি-
বিদ্রোহী সাহিত্য পরিষদ (বিএসপি) যশোর।
বিশেষ বিভাগীয় সম্পাদক-
সুপ্রভাত সিডনি, অস্ট্রেলিয়া
www.suprovatsydney.com.au
ইমেইল: [email protected]
মুঠোফোন: ০১৭১২-৮১০ ৯২৯
What's Your Reaction?