ইউসি ব্রাউজারের উত্থান-পতন: ইন্টারনেটের রাজা যেভাবে হারিয়ে গেল
সামিন ইয়াসার মনে আছে সেই সময়টার কথা, যখন মোবাইলে মেগাবাইট গুনে গুনে ইন্টারনেট চালাতে হতো? তখন প্রায় প্রতিটি হ্যান্ডসেটে একটা হলুদ-সাদা আইকনের অ্যাপ ছাড়া যেন গতিই ছিল না ইউসি ব্রাউজার। থ্রিজি নেটওয়ার্কে যখন সাধারণ একটা ওয়েবসাইট লোড হতে মিনিট পার হয়ে যেত, তখন এই ব্রাউজারই পেজ সংকুচিত করে চোখের পলকে খুলে দিত। বাংলাদেশ ও ভারতের কোটি কোটি মানুষের কাছে এটাই ছিল ইন্টারনেটে ঢোকার প্রথম দরজা। অথচ আজ অ্যাপটির নাম শুনলে অনেকের মনে পড়ে শুধু পুরোনো একটা ফোনের স্মৃতি। কীভাবে একটা চীনা অ্যাপ বিশ্বের দ্বিতীয় জনপ্রিয় মোবাইল ব্রাউজার হয়ে উঠলো, আবার কীভাবেই বা প্রায় হারিয়ে গেল সেই গল্পে জড়িয়ে আছে প্রযুক্তি, রাজনীতি আর গোপনীয়তার এক জটিল সমীকরণ। গল্পের শুরু ২০০৪ সালে, চীনের গুয়াংজু শহরে। ইউসিওয়েব নামের কোম্পানিটির প্রথম পরিকল্পনা ছিল একটা মেসেজিং সেবা তৈরি করা। কিন্তু ব্যবহারকারীরা বার্তা পাঠানোর চেয়ে বেশি আগ্রহী হয়ে ওঠেন মোবাইলে ইন্টারনেট ব্রাউজ করতে। সেই চাহিদা বুঝেই প্রতিষ্ঠাতারা পরিকল্পনা পাল্টে ফেলেন, আর জন্ম নেয় ইউসি ব্রাউজার নামের অর্থ দাঁড় করানো হয় ‘ইউ ক্যান ওয়েব’। আরও পড়ু
সামিন ইয়াসার
মনে আছে সেই সময়টার কথা, যখন মোবাইলে মেগাবাইট গুনে গুনে ইন্টারনেট চালাতে হতো? তখন প্রায় প্রতিটি হ্যান্ডসেটে একটা হলুদ-সাদা আইকনের অ্যাপ ছাড়া যেন গতিই ছিল না ইউসি ব্রাউজার। থ্রিজি নেটওয়ার্কে যখন সাধারণ একটা ওয়েবসাইট লোড হতে মিনিট পার হয়ে যেত, তখন এই ব্রাউজারই পেজ সংকুচিত করে চোখের পলকে খুলে দিত।
বাংলাদেশ ও ভারতের কোটি কোটি মানুষের কাছে এটাই ছিল ইন্টারনেটে ঢোকার প্রথম দরজা। অথচ আজ অ্যাপটির নাম শুনলে অনেকের মনে পড়ে শুধু পুরোনো একটা ফোনের স্মৃতি। কীভাবে একটা চীনা অ্যাপ বিশ্বের দ্বিতীয় জনপ্রিয় মোবাইল ব্রাউজার হয়ে উঠলো, আবার কীভাবেই বা প্রায় হারিয়ে গেল সেই গল্পে জড়িয়ে আছে প্রযুক্তি, রাজনীতি আর গোপনীয়তার এক জটিল সমীকরণ।
গল্পের শুরু ২০০৪ সালে, চীনের গুয়াংজু শহরে। ইউসিওয়েব নামের কোম্পানিটির প্রথম পরিকল্পনা ছিল একটা মেসেজিং সেবা তৈরি করা। কিন্তু ব্যবহারকারীরা বার্তা পাঠানোর চেয়ে বেশি আগ্রহী হয়ে ওঠেন মোবাইলে ইন্টারনেট ব্রাউজ করতে। সেই চাহিদা বুঝেই প্রতিষ্ঠাতারা পরিকল্পনা পাল্টে ফেলেন, আর জন্ম নেয় ইউসি ব্রাউজার নামের অর্থ দাঁড় করানো হয় ‘ইউ ক্যান ওয়েব’।
শাওমির প্রতিষ্ঠাতা লেই জুনের কাছ থেকে পাওয়া প্রাথমিক বিনিয়োগ নিয়ে তৈরি হয় জাভা-নির্ভর একটা হালকা ব্রাউজার, যার লক্ষ্য ছিল একটাই তখনকার ধীরগতির আর দামি টুজি নেটওয়ার্কেও যেন পেজ দ্রুত খোলে। ২০০৬ সালে মাত্র ১২ জনের একটা দল নিয়ে কোম্পানির দায়িত্ব নেন ইউ ইয়ংফু, এর আগে যিনি কাজ করতেন একজন ভেঞ্চার ক্যাপিটালিস্ট হিসেবে।
তার হাত ধরেই ইউসি ব্রাউজারের আসল অস্ত্রটা পূর্ণাঙ্গ রূপ পায় ক্লাউড কম্প্রেশন প্রযুক্তি। পদ্ধতিটা ছিল সহজ কিন্তু কার্যকর: ব্যবহারকারীর অনুরোধ সরাসরি ওয়েবসাইটে না গিয়ে প্রথমে যেত কোম্পানির নিজস্ব সার্ভারে, সেখানে ছবি আর কোড সংকুচিত করে তারপর পাঠানো হতো ফোনে। এতে ডাটা খরচ কমে যেত অর্ধেকের বেশি, লোডিং গতি বাড়ত কয়েক গুণ।
২০১০-২০১১ সালে ভারতের বাজারে পা রাখার পর ঠিক এই একটা বৈশিষ্ট্যই অ্যাপটিকে রাতারাতি তারকা বানিয়ে দেয়। কারণ তখন হাতে হাতে সস্তা স্মার্টফোন পৌঁছালেও ডাটার দাম আর নেটওয়ার্কের গতিই ছিল ব্যবহারকারীদের সবচেয়ে বড় ভোগান্তি। ২০১৬ সাল নাগাদ ভারতের মোবাইল ব্রাউজার বাজারে ইউসি ব্রাউজার একাই দখল করে নেয় প্রায় অর্ধেক অংশ, পেছনে ফেলে দেয় গুগল ক্রোমকেও।
২০১৪ সালে আলিবাবা গ্রুপ পুরো ইউসিওয়েবকে কিনে নেয় প্রায় ৪০০ কোটি ডলারে, যা তখনকার হিসাবে চীনা ইন্টারনেট খাতের সবচেয়ে বড় অধিগ্রহণ। আলিবাবার আর্থিক শক্তি যোগ হওয়ার পর বিশ্বজুড়ে ৫০ কোটির বেশি ব্যবহারকারী নিয়ে ইউসি ব্রাউজার হয়ে ওঠে গুগল ক্রোমের পরই বিশ্বের দ্বিতীয় সবচেয়ে জনপ্রিয় মোবাইল ব্রাউজার।
কিন্তু যে প্রযুক্তি ইউসি ব্রাউজারকে এত দ্রুতগতির করে তুলেছিল, সময়ের সঙ্গে সেটাই হয়ে ওঠে তার সবচেয়ে বড় দুর্বলতা। ব্যবহারকারীর প্রতিটি অনুরোধ যেহেতু কোম্পানির নিজস্ব সার্ভার হয়ে যাতায়াত করত, তাই ব্রাউজিং তথ্য, লোকেশন, এমনকি ফোনের আইএমইআই নম্বরও ওই সার্ভারের মধ্য দিয়ে পার হতো। ২০১৫ সালে টরন্টো বিশ্ববিদ্যালয়ের সিটিজেন ল্যাবের একটি গবেষণায় উঠে আসে, এসব স্পর্শকাতর তথ্য প্রায়ই পর্যাপ্ত এনক্রিপশন ছাড়াই পাঠানো হচ্ছিল, যা যে কারো হাতে পড়ার ঝুঁকি তৈরি করেছিল।
২০১৭ সালে বিভ্রান্তিকর বিজ্ঞাপন-পদ্ধতি ব্যবহারের অভিযোগে গুগল প্লে স্টোর থেকে সাময়িকভাবে সরিয়ে দেওয়া হয় অ্যাপটিকে, যদিও সপ্তাহ দুয়েকের মধ্যেই তা ফিরে আসে। একের পর এক এসব ঘটনা ভারত সরকারের নজরদারি বাড়িয়ে দেয়, বিশেষ করে যখন প্রশ্ন উঠতে থাকে অ্যাপটির মাধ্যমে সংগৃহীত তথ্য শেষ পর্যন্ত গিয়ে জমা হচ্ছে কোথায়।
আসল ধাক্কাটা আসে ২০২০ সালের জুনে। লাদাখ সীমান্তে ভারত-চীন সেনাদের সংঘর্ষের পর ভারত সরকার একযোগে ৫৯টি চীনা অ্যাপ নিষিদ্ধ করে, তথ্যপ্রযুক্তি আইনের ৬৯এ ধারার আওতায়, জাতীয় নিরাপত্তা আর সার্বভৌমত্বের প্রশ্ন তুলে। টিকটকের পাশাপাশি সেই তালিকায় ছিল ইউসি ব্রাউজারও। এই এক সিদ্ধান্তেই কোম্পানির সবচেয়ে বড় বাজারটা রাতারাতি হাতছাড়া হয়ে যায়। রাজস্ব ও ব্যবহারকারী, দুই দিক থেকেই তখন ভারত ছিল ইউসি ব্রাউজারের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দেশ।
একই সময়ে বদলে যাচ্ছিল বাজারের বাস্তবতাও। ফোরজি নেটওয়ার্ক সহজলভ্য হতে শুরু করে, ডাটার দাম কমে আসে, আর অ্যান্ড্রয়েড ফোনে আগে থেকেই ইনস্টল করা গুগল ক্রোম হয়ে ওঠে স্বাভাবিক পছন্দ। এক দশক আগে যে কম্প্রেশন প্রযুক্তি ছিল ইউসি ব্রাউজারের সবচেয়ে বড় শক্তি, প্রযুক্তির অগ্রগতির সঙ্গে সঙ্গে সেটাই আর তেমন কারো দরকার পড়ল না।

ওপেনএআইর বিরুদ্ধে অ্যাপলের মামলা
আজকের হিসাবে বিশ্বজুড়ে মোবাইল ব্রাউজার বাজারে ইউসি ব্রাউজারের অংশ নেমে এসেছে মোটামুটি ১ শতাংশের ঘরে। এখনো টিকে আছে মূলত চীনে, যেখানে আলিবাবার নিজস্ব বাজারে এর দখল প্রায় ৮ শতাংশ। ভারতে আনুষ্ঠানিকভাবে নিষিদ্ধ হলেও কৌতূহলোদ্দীপক ব্যাপার হলো, অ্যাপটির ওয়েবসাইটে এখনো সিংহভাগ ভিজিট আসে ভারত থেকেই। যা বলে দেয়, নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও সরাসরি ফাইল ডাউনলোড করে পুরোনো অভ্যাস এখনো ধরে রেখেছেন অনেকে। তবে সামগ্রিকভাবে বলা যায়, এক দশক আগে যে অ্যাপ ছিল কোটি কোটি মানুষের ইন্টারনেটে ঢোকার প্রথম মাধ্যম, আজ সেটা প্রযুক্তির ইতিহাসের একটা অধ্যায় মাত্র।
বাংলাদেশে কোন কোন প্রোভাইডার সমর্থন করে
ভারতের মতো বাংলাদেশে ইউসি ব্রাউজার কখনো নিষিদ্ধ হয়নি। বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন এই অ্যাপের ওপর কোনো বিধিনিষেধ আরোপ করেনি, ফলে আজও গ্রামীণফোন, রবি, বাংলালিংক ও টেলিটক-এই চার অপারেটরের স্বাভাবিক ইন্টারনেট সংযোগেই অ্যাপটি ডাউনলোড ও ব্যবহার করা যায়। তবে ফেসবুক, হোয়াটসঅ্যাপ বা ইউটিউবের মতো অ্যাপ যেভাবে অপারেটরদের বিশেষ ছাড়যুক্ত ‘সোশ্যাল প্যাকেজ’-এর অংশ হতে পেরেছে, ইউসি ব্রাউজার কখনো সেই তালিকায় জায়গা পায়নি। কারণটা লুকিয়ে আছে এর নিজস্ব প্রযুক্তিতেই কোম্পানির সার্ভার হয়ে ঘুরপথে ডাটা আসার এই পদ্ধতি জিরো-রেটিং বা বিনা মূল্যের ডাটা-অফারের কাঠামোর সঙ্গে খাপ খায় না। এই কারণেই ২০১৫ সালে রবি ও ফেসবুকের যৌথ উদ্যোগে চালু হওয়া ফ্রি ইন্টারনেট সেবাতেও পরিষ্কার শর্ত ছিল, ইউসি ব্রাউজারের মতো প্রক্সি ব্রাউজার দিয়ে এই সুবিধা মিলবে না। ফলে বাংলাদেশে ইউসি ব্রাউজার ব্যবহারকারীদের সবসময়ই নির্ভর করতে হয়েছে নিজেদের কেনা সাধারণ এমবি বা জিবি প্যাকেজের ওপর, কোনো বিশেষ প্রমোশনাল সুবিধা ছাড়াই।
লেখক: প্রযুক্তি লেখক ও পোস্ট-কোয়ান্টাম ক্রিপ্টোগ্রাফি গবেষক।
কেএসকে
What's Your Reaction?
