ইন্ডিয়ানার বিকেল পেরিয়ে আটলান্টার আলোকিত নিশীথে
দিনটি ছিল মে মাসের ২২ তারিখের স্নিগ্ধ দুপুর। ওয়েস্ট লাফায়েত শহরের আকাশজুড়ে তখন তুলোর মতো সাদা মেঘ ভেসে বেড়াচ্ছিল। দুপুর ঠিক একটা বাজতেই শুরু হলো আমাদের দীর্ঘ সড়কভ্রমণ। গন্তব্য ক্যাথলিন, যা জর্জিয়া অঙ্গরাজ্যের আটলান্টা শহরের উপকণ্ঠে অবস্থিত শান্ত ও পরিচ্ছন্ন আবাসিক এলাকা। প্রায় সাড়ে সাতশ মাইলের এ যাত্রাপথ শুরু থেকেই বিশেষ আবেগে জড়িয়ে ছিল। সামনে বিস্তীর্ণ মহাসড়ক, অচেনা পথের আকর্ষণ, আর বহুদিন পর কিছু প্রিয় মানুষের সঙ্গে দেখা হওয়ার আনন্দ মনে আলাদা উচ্ছ্বাস তৈরি করছিল। সবচেয়ে বড় কথা, সফরসঙ্গী ছিল আমার পুরো পরিবার এবং সঙ্গে ছিলেন আমার বেয়াইনও। প্রিয়জনদের হাসি, গল্প আর একসঙ্গে পথচলার অনুভূতি পুরো যাত্রাটিকে এমন উষ্ণতায় ভরে তুলেছিল, যা শুধু ভ্রমণ নয় বরং পারিবারিক ভালোবাসা ও মিলনের অনন্য অভিজ্ঞতায় রূপ নিয়েছিল। গাড়ির স্টিয়ারিংয়ে ছিল আমাদের সুদীপ্ত মন্ডল। আমেরিকায় সাধারণত গাড়ি ভাড়া নিতে হয় চালক ছাড়া, তাই শুরু থেকেই তাকে অত্যন্ত মনোযোগী ও দায়িত্বশীল মনে হচ্ছিল। সামনে জিপিএসের আলো জ্বলছে, আর সে ধৈর্যের সঙ্গে পথ এগিয়ে নিয়ে চলেছে দক্ষিণের দিকে। পেছনের সারিতে আমার স্ত্রী,
দিনটি ছিল মে মাসের ২২ তারিখের স্নিগ্ধ দুপুর। ওয়েস্ট লাফায়েত শহরের আকাশজুড়ে তখন তুলোর মতো সাদা মেঘ ভেসে বেড়াচ্ছিল। দুপুর ঠিক একটা বাজতেই শুরু হলো আমাদের দীর্ঘ সড়কভ্রমণ। গন্তব্য ক্যাথলিন, যা জর্জিয়া অঙ্গরাজ্যের আটলান্টা শহরের উপকণ্ঠে অবস্থিত শান্ত ও পরিচ্ছন্ন আবাসিক এলাকা। প্রায় সাড়ে সাতশ মাইলের এ যাত্রাপথ শুরু থেকেই বিশেষ আবেগে জড়িয়ে ছিল। সামনে বিস্তীর্ণ মহাসড়ক, অচেনা পথের আকর্ষণ, আর বহুদিন পর কিছু প্রিয় মানুষের সঙ্গে দেখা হওয়ার আনন্দ মনে আলাদা উচ্ছ্বাস তৈরি করছিল। সবচেয়ে বড় কথা, সফরসঙ্গী ছিল আমার পুরো পরিবার এবং সঙ্গে ছিলেন আমার বেয়াইনও। প্রিয়জনদের হাসি, গল্প আর একসঙ্গে পথচলার অনুভূতি পুরো যাত্রাটিকে এমন উষ্ণতায় ভরে তুলেছিল, যা শুধু ভ্রমণ নয় বরং পারিবারিক ভালোবাসা ও মিলনের অনন্য অভিজ্ঞতায় রূপ নিয়েছিল।
গাড়ির স্টিয়ারিংয়ে ছিল আমাদের সুদীপ্ত মন্ডল। আমেরিকায় সাধারণত গাড়ি ভাড়া নিতে হয় চালক ছাড়া, তাই শুরু থেকেই তাকে অত্যন্ত মনোযোগী ও দায়িত্বশীল মনে হচ্ছিল। সামনে জিপিএসের আলো জ্বলছে, আর সে ধৈর্যের সঙ্গে পথ এগিয়ে নিয়ে চলেছে দক্ষিণের দিকে। পেছনের সারিতে আমার স্ত্রী, মৃত্তিকা ও বেয়াইন গল্প আর হাসি-ঠাট্টায় মেতে উঠেছিলেন। আমার ঠিক পাশেই কারসিটে বসে ছিল ছোট্ট নাতনি বাঁশরী। কখনো হঠাৎ ঘাড় ঘুরিয়ে ‘দিদু’, ‘ঠাম্মি’ কিংবা ‘মাম্মী’ বলে পেছনে খুঁজছে, আবার ছোট্ট হাত বাড়িয়ে তাদের ছুঁতে চাইছে। কখনো জানালার বাইরে বিস্ময়ভরা চোখে পথ দেখছে, আবার হঠাৎ করেই কেঁদে উঠছে, আর কিছুক্ষণের মধ্যেই ফিরে আসছে হাসিতে। শিশুর এ সরল হাসি, অভিমান আর অবুঝ কৌতূহল পুরো যাত্রাপথকে অন্যরকম প্রাণচাঞ্চল্যে ভরে তুলেছিল। মনে হচ্ছিল, ছোট্ট বাঁশরীই যেন দীর্ঘ পথের ক্লান্তি ভুলিয়ে আমাদের ভ্রমণকে আরও উজ্জ্বল করে তুলেছে।
যাত্রার শুরুতেই আবহাওয়া যেন অন্যরকম নাটকীয় হয়ে উঠল। মাঝপথে আচমকা নেমে এলো প্রবল বৃষ্টি। উইন্ডশিল্ডের ওপর ঘনবেগে আছড়ে পড়া বৃষ্টির ফোঁটা আর সামনে জমে থাকা সাদা কুয়াশার মতো জলীয় আবরণ পথকে অনেকটাই আবছা করে দিচ্ছিল। গাড়ির সামনে তখন কেবল অস্পষ্ট আলোর রেখা আর ধীরগতিতে এগিয়ে চলা যানবাহনের ছায়া। সুদীপ্ত অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে গাড়ি চালিয়ে যাচ্ছিল। সেই মুহূর্তে প্রকৃতির রূপ যেন একই সঙ্গে ভয়াল ও মনোমুগ্ধকর হয়ে উঠেছিল।
প্রথম যাত্রাবিরতি নিলাম ইন্ডিয়ানার শেষ প্রান্তে। সেখানে কিছু সময়ের জন্য থামতে হলো, কারণ সুদীপ্তর একটি অনলাইন অফিস মিটিং ছিল। গ্যাস স্টেশনের বাইরে দাঁড়িয়ে লক্ষ্য করলাম, পুরো মহাসড়কে কোনো যাত্রীবাহী গাড়ি নেই। অসংখ্য প্রাইভেটকার আর বিশাল আকারের ট্রাক অবিরাম ছুটে চলেছে। আমেরিকার আন্তঃরাজ্য মহাসড়ক যেন মূলত ব্যক্তিগত গাড়ি ও পণ্য পরিবহনের বিশাল প্রবাহ। পথে চলতে চলতে দূর থেকে চোখে পড়ছিল বিভিন্ন শহর ও স্থাপনার ঝলক। লুইসভিল শহরের উঁচু ভবন আর শিল্পাঞ্চলের বিস্তৃতি, বিশাল সেতুর ওপর দিয়ে নদী পার হওয়ার দৃশ্য, দূরে কারখানার ধোঁয়া আর নদীতীরের আলো মিলিয়ে ব্যস্ত নগরজীবনের চিত্র ফুটে উঠছিল। এরপর ন্যাশভিল অঞ্চলের দিকে এগোতে গিয়ে চোখে পড়ল আধুনিক উড়ালসড়ক, আলোকিত স্টেডিয়াম, দূরের সুউচ্চ ভবন আর অসংখ্য চলমান যানবাহনের আলোর রেখা। শহরগুলোকে খুব কাছ থেকে দেখা না হলেও চলন্ত গাড়ির জানালা দিয়ে তাদের ছন্দময় ব্যস্ততা অনুভব করা যাচ্ছিল।
প্রথম বড় যাত্রাবিরতি নিলাম কেনটাকি অঙ্গরাজ্যের একটি গ্যাস স্টেশনে। বিকেলের আলো তখন কোমল হয়ে এসেছে। চারদিকে সারি সারি গাড়ি, ভ্রমণকারীদের হাঁটাহাঁটি আর কফির দোকান থেকে ভেসে আসা সুবাস পুরো পরিবেশে প্রাণবন্ত আবহ তৈরি করেছিল। আমরা সবাই কিছুক্ষণ হাঁটাহাঁটি করলাম। দীর্ঘসময় গাড়িতে বসে থাকার পর শরীরে যেন নতুন শক্তি ফিরে এলো। ছোট্ট বাঁশরীকেও কোলে নিয়ে বাইরে ঘোরানো হলো। দূরে উড়ে যাওয়া পাখি দেখে সে আনন্দে হাত নাড়তে শুরু করল। বাঁশরীর চোখে পৃথিবীকে দেখার আনন্দ সত্যিই আলাদা।
আবার পথচলা শুরু হলো। ধীরে ধীরে বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা নামতে লাগল। পশ্চিম আকাশে সূর্য অস্ত যাওয়ার আগে রঙের এক বিস্ময়কর খেলা শুরু করল। কোথাও কমলা, কোথাও সোনালি, কোথাও হালকা বেগুনি আভা। দীর্ঘ মহাসড়ক সেই আলোয় যেন কোনো চলচ্চিত্রের দৃশ্য হয়ে উঠেছিল। দ্বিতীয় বিরতি নিলাম টেনেসি অঞ্চলের একটি গ্যাস স্টেশনে। তখন সন্ধ্যা নেমে এসেছে পুরোপুরি। আলো ঝলমলে দোকান, গরম খাবারের কাউন্টার আর ক্লান্ত যাত্রীদের ব্যস্ততা দেখে মনে হচ্ছিল, এই মহাসড়ক হাজার মানুষের গল্প বয়ে নিয়ে চলেছে। সুদীপ্ত গাড়িতে জ্বালানি ভরছিল, আর আমরা দোকান থেকে গরম কফি ও হালকা খাবার নিলাম। কফির কাপ হাতে বাইরে দাঁড়াতেই শীতল বাতাস শরীর ছুঁয়ে গেল। দূরে ট্রাকগুলোর দীর্ঘ সারি আর অবিরাম ছুটে চলা গাড়ির আলো রাতের পথকে অনন্য সৌন্দর্য দিচ্ছিল।
রাত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে পথের প্রকৃতিও ধীরে ধীরে রূপ বদলাতে শুরু করল। ন্যাশভিল অঞ্চলের সমতল বিস্তার পেরিয়ে গাড়ি যখন পাহাড়ি ঢালের দিকে উঠতে লাগল এবং চাটানুগা অভিমুখী আঁকাবাঁকা মহাসড়কে প্রবেশ করল, তখন চারপাশের দৃশ্য যেন হঠাৎ করেই অন্য আবহে মোড় নিলো। পাহাড়ের বুক চিরে চলে যাওয়া মহাসড়কটি কোথাও উঁচু ঢালে হারিয়ে যাচ্ছে, কোথাও আবার চাঁদের ম্লান আলোয় দূরের পাহাড়ি রেখাগুলো আবছাভাবে চোখে পড়ছে। রাস্তার দুপাশে বিস্তৃত অরণ্যের গাঢ় ছায়া, মাঝেমধ্যে পাহাড়ের ঢালে টিমটিমে আলোর বিন্দু, যেন পাহাড়ি জনপদগুলো এখনো আপন ছন্দে জেগে আছে। পাহাড়ি বাঁক ঘুরে এগিয়ে যাওয়ার সময় নিচের উপত্যকার আলোগুলো দূরে আকাশের নক্ষত্রের মতো জ্বলছিল। সেই দৃশ্যের মধ্যে এমন মুগ্ধতা ছড়িয়ে ছিল, যা ভাষায় পুরোপুরি প্রকাশ করা কঠিন।
তৃতীয় বিরতিতে আমরা কিছুটা দীর্ঘসময় থামলাম। তখন রাত অনেকটাই গভীর হয়ে এসেছে। একটি নিরিবিলি বিশ্রামকেন্দ্রে গাড়ি থামিয়ে সবাই কিছুক্ষণ বিশ্রাম নিলাম। বেয়াইন আর আমার স্ত্রী গল্পে মেতে উঠলেন। দুই মেয়ে পুরোনো স্মৃতি নিয়ে হাসাহাসি করছিল। সেই মুহূর্তে মনে হচ্ছিল, পরিবারের সঙ্গে দীর্ঘ সড়কভ্রমণের আসল সৌন্দর্য সম্ভবত এখানেই। গন্তব্যে পৌঁছানো নয় বরং পথের প্রতিটি মুহূর্ত একসঙ্গে অনুভব করাই সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি। ছোট্ট বাঁশরী তখন গভীর ঘুমে। কারসিটে মাথা হেলিয়ে নিশ্চিন্তে ঘুমিয়ে থাকা শিশুটিকে দেখে মনে হচ্ছিল, পৃথিবীর সমস্ত ক্লান্তির মাঝেও শিশুর ঘুম সবচেয়ে নিরাপদ আশ্রয়।
রাত আরও বাড়ল। গাড়ির ভেতরেও নেমে এলো প্রশান্ত স্তব্ধতা। শুধু ইঞ্জিনের মৃদু শব্দ আর দূরের হেডলাইটের রেখা পথ দেখিয়ে নিয়ে চলছিল। সুদীপ্তর ধৈর্য ও একাগ্রতা সত্যিই প্রশংসনীয় ছিল। এত দীর্ঘ পথ সে অত্যন্ত স্থিরভাবে চালিয়ে যাচ্ছিল। চতুর্থ ও শেষ বিরতি নিলাম জর্জিয়া সীমান্ত অতিক্রম করার পর। তখন রাত প্রায় দেড়টা। দূরের আকাশে শহরের আলোর আভা ধীরে ধীরে স্পষ্ট হয়ে উঠছিল। ক্লান্ত শরীরের মধ্যেও তখন এক ধরনের আনন্দ কাজ করছিল। মনে হচ্ছিল, বহু প্রতীক্ষিত গন্তব্য আর খুব দূরে নয়।
পথে চলতে চলতে দূর থেকে চোখে পড়ছিল বিভিন্ন শহর ও স্থাপনার ঝলক। লুইসভিল শহরের উঁচু ভবন, শিল্পাঞ্চলের বিস্তৃতি, বিশাল সেতুর ওপর দিয়ে নদী পার হওয়ার দৃশ্য, দূরে কারখানার ধোঁয়া আর নদীতীরের আলো মিলিয়ে ব্যস্ত নগরজীবনের চিত্র ফুটে উঠছিল। গাড়ির ভেতরে তখন আমার মেয়েরা নানা গল্প করছিল। কথার এক পর্যায়ে মেয়ে জানালো, কেনটাকির নাম উচ্চারণ করলেই পৃথিবীর মানুষ প্রথমেই মনে করে কেএফসির কথা। এ অঙ্গরাজ্যের প্রথম অক্ষর ‘কে’ ফ্রাইড চিকেনের ‘এফসি’ থেকেই কর্নেল হারল্যান্ড স্যান্ডার্স তাঁর বিখ্যাত ফ্রাইড চিকেনের যাত্রা শুরু করেছিলেন। ছোট্ট রাস্তার ধারের খাবারের দোকান থেকে শুরু হয়ে সেই স্বাদ আজ পৃথিবীর প্রায় প্রতিটি দেশে পৌঁছে গেছে।
মেয়ের মুখে সেই ইতিহাস শুনতে শুনতে মনে হচ্ছিল, আমেরিকার এই মহাসড়কগুলো শুধু শহরকে শহরের সঙ্গে যুক্ত করেনি বরং মানুষের স্বপ্ন ও সৃষ্টিশীলতার গল্পও বহন করে চলেছে। এরপর ন্যাশভিল অঞ্চলের দিকে এগোতে গিয়ে চোখে পড়ল আধুনিক উড়ালসড়ক, আলোকিত স্টেডিয়াম, দূরের সুউচ্চ ভবন আর অসংখ্য চলমান যানবাহনের আলোর রেখা। আর যখন আটলান্টা শহরের প্রসঙ্গ উঠল; তখন মেয়ে আবার স্মরণ করিয়ে দিলো বিশ্বখ্যাত দ্য কোকা-কোলা কোম্পানির ইতিহাস। ১৮৮৬ সালে একজন ফার্মাসিস্টের ছোট্ট পরীক্ষাগারে তৈরি হওয়া পানীয়টি কীভাবে ধীরে ধীরে পুরো পৃথিবীর সংস্কৃতির অংশ হয়ে উঠল; সেই গল্প শুনতে শুনতে জানালার বাইরে ছুটে চলা আলোগুলোও যেন অন্যরকম অর্থবহ হয়ে উঠছিল। মনে হচ্ছিল, এ দীর্ঘ সড়কভ্রমণ শুধু ভৌগোলিক দূরত্ব অতিক্রমের যাত্রা নয় বরং আমেরিকার ব্যবসা, ঐতিহ্য ও জনপ্রিয় সংস্কৃতির ইতিহাসের ভেতর দিয়েও এগিয়ে চলা এক অভিজ্ঞতা।
অবশেষে রাত দুটোর দিকে আটলান্টা অঞ্চলে পৌঁছালাম। তবে আমাদের প্রকৃত গন্তব্য ছিল আরও দক্ষিণে, ক্যাথলিন। দীর্ঘ পথ অতিক্রম করে ভোররাত চারটার দিকে পৌঁছালাম আমার শ্যালক লিটন দাসের বাড়িতে। আশ্চর্যের বিষয়, এত রাত হলেও তারা পুরো পরিবার নিয়ে আমাদের জন্য জেগে অপেক্ষা করছিল। দরজা খুলতেই উষ্ণ অভ্যর্থনা আর আন্তরিক হাসিমুখ মুহূর্তেই পথের সমস্ত ক্লান্তি দূর করে দিলো।
শ্যালকের স্ত্রী সোমা দাস আমাদের জন্য যত্ন করে নানা পদের বাংলাদেশি খাবার রান্না করে রেখেছিলেন। গরম পোলাও, মাছ, মাংস, নানা ধরনের তরকারি আর ঘরোয়া রান্নার পরিচিত সুবাস মুহূর্তেই দূরদেশে বসেও দেশের স্মৃতিকে জীবন্ত করে তুলল। দীর্ঘ সড়কভ্রমণের ক্লান্তি যেন সেই উষ্ণ আতিথেয়তার মধ্যেই ধীরে ধীরে মিলিয়ে যাচ্ছিল। এত রাতেও সবার মুখে ছিল আন্তরিক হাসি আর আপন মানুষকে কাছে পাওয়ার আনন্দ। ছেলে নৈশিক আর মেয়ে নিসু তাদের পিসা ও পিসিকে পেয়ে উচ্ছ্বাসে ভরে উঠেছিল। তাদের ছুটোছুটি, হাসি আর আনন্দমাখা ডাক ঘরের পরিবেশকে আরও প্রাণবন্ত করে তুলেছিল। বাড়িটিও ছিল ছবির মতো।
আমেরিকার অভিজাত আবাসিক এলাকার আদলে নির্মিত বিশাল ডুপ্লেক্স, যার সামনে বিস্তৃত সবুজ লন, সারি সারি ফুলগাছ আর প্রশস্ত ড্রাইভওয়ে পুরো পরিবেশে এক ধরনের সৌন্দর্যময় আভিজাত্য এনে দিয়েছিল। ভেতরে প্রবেশ করতেই চোখে পড়ল উঁচু ছাদ, মৃদু আলোকসজ্জা, আধুনিক আসবাব আর অত্যন্ত পরিপাটি সাজসজ্জা। প্রশস্ত ড্রইংরুমের বড় কাঁচের জানালা দিয়ে বাইরে রাতের নরম আলো ভেসে আসছিল। কাঠের সিঁড়ি বেয়ে ওপরে উঠতেই আরামদায়ক শয়নকক্ষগুলো যেন দীর্ঘ ভ্রমণের পর ক্লান্ত শরীরকে নীরব বিশ্রামের আহ্বান জানাচ্ছিল। দূরদেশের সেই বাড়িতে বসে তখন মনে হচ্ছিল, আপন মানুষের ভালোবাসাই পৃথিবীর সবচেয়ে বড় আশ্রয়।
যা হোক, রাতের খাবার শেষ করে আমরা আমাদের জন্য বরাদ্দকৃত ঘরে গিয়ে শুয়ে পড়লাম। বিছানায় শরীর ছুঁয়ে দিতেই মনে হচ্ছিল, দীর্ঘ পথের সমস্ত ক্লান্তি ধীরে ধীরে মিলিয়ে যাচ্ছে। চোখ বন্ধ করার আগে মনে হলো, এই সফর শুধু এক শহর থেকে আরেক শহরে যাওয়ার গল্প নয়। এটি ছিল পরিবার, ভালোবাসা, পথের সৌন্দর্য আর দূরদেশে আপনজনের উষ্ণতার অবিস্মরণীয় ভ্রমণকাহিনি।
এসইউ
What's Your Reaction?