বর্তমানে প্রযুক্তির ছোঁয়ায় দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে চিকিৎসাব্যবস্থা। স্বাস্থ্যসেবাকে আরও আধুনিক, কার্যকর এবং সহজলভ্য করে তুলতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে ইলেকট্রোমেডিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং। চিকিৎসা যন্ত্রপাতির উন্নয়ন, লাইফ-সাপোর্ট সিস্টেম, ইমেজিং প্রযুক্তি এবং বায়োমেডিক্যাল সেন্সরসহ আধুনিক চিকিৎসার প্রায় প্রতিটি স্তরেই অবদান আছে এ টেকনোলজির। তাই দিন দিন বিশ্বজুড়ে বাড়ছে ইলেকট্রোমেডিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারদের চাহিদা। অনেকের মনেই প্রশ্ন জাগে—ইলেকট্রোমেডিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং আসলে কী? এ টেকনোলজির কাজ কী? এ বিষয়ে ডিগ্রি অর্জনের পর শিক্ষার্থীর ক্যারিয়ার বা কর্মসংস্থান কেমন হতে পারে? এ ছাড়া আরও প্রশ্ন মাথায় ঘুরপাক খায়। সেসব নিয়েই আজকের আয়োজন—
ইলেকট্রোমেডিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং কী
ইলেকট্রোমেডিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং হলো একটি আধুনিক ও বিশেষায়িত প্রকৌশল শাখা; যেখানে ইলেকট্রনিক, বিদ্যুৎ ও চিকিৎসা বিজ্ঞানের সমন্বয় ঘটে। এ শাখার মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে চিকিৎসা ক্ষেত্রের জন্য বিভিন্ন বৈদ্যুতিক ও ইলেকট্রনিক যন্ত্রপাতি তৈরি, রক্ষণাবেক্ষণ, উন্নয়ন এবং তা সঠিকভাবে পরিচালনা করা।
আধুনিক চিকিৎসাব্যবস্থায় যেসব উন্নত যন্ত্রের ওপর নির্ভর করা হয়, যেমন এক্স-রে মেশিন, আল্ট্রাসোনোগ্রাফি, ইসিজি, এমআরআই, সিটি স্ক্যানার, ভেন্টিলেটর, রোগী মনিটরিং সিস্টেম এবং ডায়ালাইসিস মেশিন—এসব যন্ত্রের কার্যকারিতা নিশ্চিত করতে কাজ করেন ইলেকট্রোমেডিক্যাল ইঞ্জিনিয়াররা। এই টেকনোলজির বিশেষজ্ঞরা চিকিৎসা যন্ত্রপাতির কার্যক্ষমতা বিশ্লেষণ করেন। যান্ত্রিক ত্রুটি শনাক্ত করে তা মেরামত করেন। প্রয়োজন হলে নতুন যন্ত্র উদ্ভাবন ও উন্নয়নেও অংশ নেন। তা ছাড়া রোগ নির্ণয় ও চিকিৎসা প্রক্রিয়াকে আরও নির্ভুল ও সহজ করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। এককথায় রোগ বা রোগীর সম্পর্কে তথ্য দিয়ে চিকিৎসকদের সহায়তা করেন। এ পেশা শুধু প্রযুক্তির দিক থেকেই নয়, মানবসেবার দিক থেকেও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
যেসব বিষয়ে পড়ানো হয়
১. ইলেকট্রিক্যাল ও ইলেকট্রনিক
> বেসিক ইলেকট্রিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং
> ডিজিটাল ইলেকট্রনিক
> অ্যানালগ ইলেকট্রনিক
> ইলেকট্রনিক ডিভাইস ও সার্কিট
> ইলেকট্রনিক মেজারমেন্ট ও ইনস্ট্রুমেন্টেশন
> পাওয়ার সাপ্লাই ও কন্ট্রোল সিস্টেম
> মাইক্রোকন্ট্রোলার ও মাইক্রোপ্রসেসর
> পিএলসি।
২. চিকিৎসা-সম্পর্কিত প্রযুক্তি
> মেডিক্যাল ইক্যুইপমেন্ট পরিচিতি
> রোগ নির্ণায়ক যন্ত্রপাতির কার্যপদ্ধতি
> লাইফ সাপোর্ট যন্ত্রপাতি পরিচিতি
> মেডিক্যাল ইমেজিং টেকনোলজি
> হাসপাতালের যন্ত্রপাতির নিরাপত্তা ও ক্যালিব্রেশন।
৩. যান্ত্রিক ও কারিগরি দক্ষতা
৪. কম্পিউটার ও প্রোগ্রামিং বিষয়।
ইলেকট্রোমেডিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের ভবিষ্যৎ
আধুনিক চিকিৎসাব্যবস্থায় প্রযুক্তির ওপর নির্ভরতা যত বাড়ছে; ততই বাড়ছে ইলেকট্রোমেডিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের গুরুত্ব। যা যুগের সঙ্গে তাল মিলিয়ে ভবিষ্যতেও এ টেকনোলজির ব্যবহার বাড়বে। এটি হচ্ছে চিকিৎসাব্যবস্থার একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ। বিশ্বজুড়ে জনসংখ্যা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে রোগের প্রকৃতি যেমন পরিবর্তিত হচ্ছে; তেমনই চিকিৎসাপদ্ধতিও উন্নত হচ্ছে। আজকাল যেসব ডিজিটাল ও অটোমেটেড যন্ত্র ব্যবহার করা হচ্ছে, যেমন- স্মার্ট ভেন্টিলেটর, পোর্টেবল এক্স-রে, রিমোট পেশেন্ট মনিটরিং সিস্টেম, রোবোটিক সার্জারি যন্ত্র—এসবের সঠিক পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণের জন্য দক্ষ ইলেকট্রোমেডিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারদের চাহিদাও বাড়ছে। আগামী দিনে টেলিমেডিসিন, ই-হেলথ এবং আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্সভিত্তিক চিকিৎসাপদ্ধতির প্রসারে এ টেকনোলজির ইঞ্জিনিয়াররা চিকিৎসাসেবার অন্যতম চালিকাশক্তি হয়ে উঠবে। তাই এ পেশায় একটি উজ্জ্বল ও সম্ভাবনাময় ভবিষ্যৎ উপহার দিতে পারে ইলেকট্রোমেডিক্যাল।
ইলেকট্রোমেডিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে কর্মসংস্থান
দেশে স্বাস্থ্যসেবায় আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে। সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতাল, ডায়াগনস্টিক সেন্টার, ক্লিনিক এবং চিকিৎসা যন্ত্র আমদানিকারক ও উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানে ইলেকট্রোমেডিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারদের জন্য আছে বিশাল কর্মক্ষেত্র। এ ছাড়া জাতীয় ও আন্তর্জাতিক সংস্থায় মেডিকেল টেকনোলজি বিশেষজ্ঞ হিসেবে কাজ করার সুযোগ আছে। এ পেশা শুধু দেশেই নয় আন্তর্জাতিক পর্যায়েও অত্যন্ত চাহিদাসম্পন্ন ও সম্মানজনক। তবে এ খাতে ভালো ক্যারিয়ার গড়তে হলে শুধু প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা নয়, নতুন প্রযুক্তির সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলার জন্য প্রশিক্ষণ, গবেষণা এবং আধুনিক যন্ত্রপাতি সম্পর্কে জ্ঞান অর্জন করতে হবে।
সরকারি চাকরি
১. স্বাস্থ্য অধিদপ্তর
২. বাংলাদেশ মেডিক্যাল রিসার্চ কাউন্সিল
৩. উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স
৪. জেলা হাসপাতাল ও সরকারি মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল
৫. বাংলাদেশ ওষুধ প্রশাসন অধিদপ্তর
৬. বাংলাদেশ স্পেশালাইজড হাসপাতাল এবং বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউট
৯. স্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর।
বেসরকারি চাকরি
১. বেসরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিক
২. মেডিক্যাল ইক্যুইপমেন্ট সাপ্লাই ও সার্ভিস কোম্পানি
৩. ডায়াগনস্টিক সেন্টার ও ল্যাবরেটরি
৪. মেডিক্যাল ডিভাইস আমদানিকারক ও পরিবেশক কোম্পানি
৫. বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় ও মেডিক্যাল কলেজ।
অন্য ক্যারিয়ার
প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় এবং সরকারি-বেসরকারি পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটে শিক্ষকতার মাধ্যমে ক্যারিয়ার গড়ার সুযোগ আছে। এ ছাড়া সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন কারিগরি ট্রেনিং সেন্টারেও চাকরি করতে পারবেন। এ পেশায় স্বাধীনভাবে কাজ করার সুযোগও আছে। কেউ চাইলে মেডিক্যাল ইক্যুইপমেন্ট সাপ্লাই, সার্ভিস কোম্পানি এবং ডায়াগনস্টিক সেন্টার ও ল্যাবরেটরি দিয়েও সফল ক্যারিয়ার গড়তে পারবেন। গবেষণার মাধ্যমেও নিজেকে প্রমাণ করা যাবে। এ ছাড়া সেনাবাহিনী, নৌবাহিনী ও বিমানবাহিনীর মেডিক্যাল ইউনিটেও চাকরির সুযোগ আছে। ভালো দক্ষতা, নতুন প্রযুক্তির অভিজ্ঞতা থাকলে ইলেকট্রোমেডিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে দেশ কিংবা বিদেশে সহজেই উজ্জ্বল ও সম্ভাবনাময় ক্যারিয়ার গড়ে তোলা সম্ভব।
কারা পড়বেন
ইলেকট্রোমেডিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং তাদের জন্য; যারা পদার্থবিজ্ঞান, গণিত ও জীববিজ্ঞানে দক্ষ এবং নতুন জ্ঞান অর্জনে আগ্রহী। যারা চিকিৎসাবিজ্ঞানের সঙ্গে ইলেকট্রনিক ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের প্রযুক্তি নিয়ে কাজ করতে আগ্রহী এবং মানবসেবায় অবদান রাখতে চায়, তাদের জন্য এ টেকনোলজি উপযোগী। তবে ইলেকট্রোমেডিক্যালে পড়তে হলে অবশ্যই পরিশ্রম, ধৈর্য ও দলবদ্ধভাবে কাজ করার মানসিকতা থাকতে হবে।
কোথায় পড়বেন
যদি ইলেকট্রোমেডিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার বা ডিপ্লোমা ইলেকট্রোমেডিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার হতে চান, তাহলে ৪ বছর মেয়াদি ডিপ্লোমা ইন ইলেকট্রোমেডিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং অথবা কোনো বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ৪ বছর মেয়াদি বিএসসি ডিগ্রি অর্জন করতে হবে। ডিপ্লোমা ইন ইলেকট্রোমেডিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ার জন্য সরকারি ও বেসরকারি পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট আছে। এ ছাড়া সরকারি ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এ টেকনোলজি নিয়ে বিএসসি করতে পারবেন।
এসইউ/এএসএম