ইসলামের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য
ইসলাম মানবজাতির জন্য মহান আল্লাহ তাআলা মনোনীত একমাত্র পূর্ণাঙ্গ জীবনবিধান। সৃষ্টির সূচনা থেকে শুরু করে আজ পর্যন্ত যুগে যুগে আল্লাহ তাআলা মানুষকে ইসলামের দাওয়াত দেওয়ার জন্য নবী-রাসুল প্রেরণ করেছেন। ঐশী বাণী বা ওহি নাজিল করেছেন। এর পেছনে সুনির্দিষ্ট কিছু লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য রয়েছে। মহাবিশ্বের এই বিশাল সৃষ্টিজগৎ, মানবজাতির আগমন, যুগে যুগে নবী-রাসুলগণের আগমন এবং সর্বশেষ রাসুল হজরত মুহাম্মাদের (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) নবুয়্যত ও দাওয়াতের মূল মিশন আসলে কোন মৌলিক লক্ষ্য ও উদ্দেশ্যগুলোকে কেন্দ্র করে আবর্তিত? এই নিবন্ধে আমরা পবিত্র কোরআন ও সুন্নাহর আলোকে ইসলামের কিছু মৌলিক লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য সংক্ষেপে আলোচনা করেছি। ১. এক আল্লাহর ইবাদত এক আল্লাহর ইবাদত ইসলামের অন্যতম মূল লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য। আল্লাহ তাআলা মহাবিশ্বের বিদ্যমান সবকিছু ফেরেশতা, জিন, মানুষ, আসমান, জমিন, পশুপাখি সৃষ্টি করেছেন শুধু তাঁরই ইবাদত করার জন্য। আল্লাহ তাআলা বলেন, তুমি কি দেখ না যে, আল্লাহকে সিজদা করে যা কিছু আছে আসমানসমূহে ও যা কিছু আছে জমিনে—সূর্য, চাঁদ, নক্ষত্রমণ্ডলী, পর্বতরাজি, বৃক্ষলতা, জীবজন্তু এবং মানুষের মধ্যে অনেকে? আ
ইসলাম মানবজাতির জন্য মহান আল্লাহ তাআলা মনোনীত একমাত্র পূর্ণাঙ্গ জীবনবিধান। সৃষ্টির সূচনা থেকে শুরু করে আজ পর্যন্ত যুগে যুগে আল্লাহ তাআলা মানুষকে ইসলামের দাওয়াত দেওয়ার জন্য নবী-রাসুল প্রেরণ করেছেন। ঐশী বাণী বা ওহি নাজিল করেছেন। এর পেছনে সুনির্দিষ্ট কিছু লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য রয়েছে। মহাবিশ্বের এই বিশাল সৃষ্টিজগৎ, মানবজাতির আগমন, যুগে যুগে নবী-রাসুলগণের আগমন এবং সর্বশেষ রাসুল হজরত মুহাম্মাদের (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) নবুয়্যত ও দাওয়াতের মূল মিশন আসলে কোন মৌলিক লক্ষ্য ও উদ্দেশ্যগুলোকে কেন্দ্র করে আবর্তিত? এই নিবন্ধে আমরা পবিত্র কোরআন ও সুন্নাহর আলোকে ইসলামের কিছু মৌলিক লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য সংক্ষেপে আলোচনা করেছি।
১. এক আল্লাহর ইবাদত
এক আল্লাহর ইবাদত ইসলামের অন্যতম মূল লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য। আল্লাহ তাআলা মহাবিশ্বের বিদ্যমান সবকিছু ফেরেশতা, জিন, মানুষ, আসমান, জমিন, পশুপাখি সৃষ্টি করেছেন শুধু তাঁরই ইবাদত করার জন্য।
আল্লাহ তাআলা বলেন, তুমি কি দেখ না যে, আল্লাহকে সিজদা করে যা কিছু আছে আসমানসমূহে ও যা কিছু আছে জমিনে—সূর্য, চাঁদ, নক্ষত্রমণ্ডলী, পর্বতরাজি, বৃক্ষলতা, জীবজন্তু এবং মানুষের মধ্যে অনেকে? আবার অনেকের ওপর শাস্তি অবধারিত হয়েছে। আল্লাহ যাকে অপমানিত করেন তার কোনো সম্মানদাতা নেই। নিশ্চয় আল্লাহ যা চান তা-ই করেন। (সুরা হজ: ১৮)
ফেরেশতাদের সম্পর্কে আল্লাহ আরও বলেন, নিশ্চয় যারা তোমার রবের সান্নিধ্যে রয়েছে, তারা তাঁর ইবাদত থেকে অহংকারবশত বিমুখ হয় না। আর তারা তাঁর তাসবিহ পাঠ করে এবং তাঁরই জন্য সিজদা করে। (সুরা আরাফ: ২০৬)
আল্লাহ তাআলা আরও বলেন, সাত আসমান, জমিন এবং তাদের মধ্যে যা কিছু আছে সবই তাঁর তাসবিহ পাঠ করে। এমন কোনো কিছু নেই যা তাঁর প্রশংসাসহ তাসবীহ পাঠ করে না; কিন্তু তোমরা তাদের তাসবিহ বুঝ না। নিশ্চয় তিনি পরম সহনশীল, ক্ষমাপরায়ণ। (সুরা ইসরা: ৪৪)
অনুরূপ অর্থের আরও অনেক আয়াত রয়েছে। এই উদ্দেশ্য বাস্তবায়নের জন্য আল্লাহ তাআলা নবী-রাসুলগণকে পাঠিয়েছেন এবং তাঁদের ওপর ওহি (ঐশী বাণী) নাজিল করেছেন। আল্লাহ তাআলা বলেন, আমি অবশ্যই প্রত্যেক উম্মতের মধ্যে একজন রাসুল প্রেরণ করেছি এই দাওয়াত দিয়ে যে, ‘তোমরা আল্লাহর ইবাদত কর এবং তাগুতকে বর্জন কর’। (সুরা নাহল: ৩৬)
মহানবী মুহাম্মদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) মানুষের কাছে আল্লাহর প্রেরিত সর্বশেষ রাসুল, যাঁর অন্যতম মূল লক্ষ্য ছিল মানুষের মধ্যে এক আল্লাহর ইবাদত প্রতিষ্ঠা করা। তিনি মানুষকে একমাত্র আল্লাহর ইবাদত করার শিক্ষা দিয়েছেন এবং তাঁর ইবাদতে কাউকে শরিক বা অংশীদার করতে নিষেধ করেছেন।
২. আল্লাহর ইবাদত না করার কোনো অজুহাত যেন না থাকে
রাসুলুল্লাহর (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব বা তাকে প্রেরণ করার অন্যতম মূল লক্ষ্য ছিল কাফের ও অবাধ্য মুসলমানদের সতর্ক করা।
আল্লাহ তাআলা বলেন, নিশ্চয় আমি তোমার কাছে ওহি পাঠিয়েছি, যেমন ওহি পাঠিয়েছিলাম নুহ ও তার পরবর্তী নবীগণের কাছে। আর ওহি পাঠিয়েছিলাম ইবরাহিম, ইসমাইল, ইসহাক, ইয়াকুব ও তাঁর বংশধরগণ, ঈসা, আইয়ুব, ইউনুস, হারুন ও সুলাইমানের কাছে এবং দাউদকে আমি যাবুর দিয়েছিলাম। আর এমন রাসুলগণকে, যাদের বৃত্তান্ত আমি ইতিপূর্বে তোমার কাছে বর্ণনা করেছি এবং এমন রাসুলগণকে যাদের বৃত্তান্ত তোমার কাছে বর্ণনা করিনি। আর আল্লাহ মুসার সাথে সরাসরি কথা বলেছিলেন। আমি রাসুলগণকে সুসংবাদদাতা ও সতর্ককারী হিসেবে পাঠিয়েছি, যেন রাসুলদের পর আল্লাহর বিপক্ষে মানুষের কোনো অজুহাত না থাকে। আর আল্লাহ পরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময়। (সুরা নিসা: ১৬৩-১৬৫)
‘যেন রাসুলদের পর আল্লাহর বিপক্ষে মানুষের কোনো অজুহাত না থাকে’ এর অর্থ হলো, কেয়ামতের দিন মানুষ যেন এই ওজর বা বাহানা দেখাতে না পারে যে, তাদের জীবদ্দশায় আল্লাহর পক্ষ থেকে কোনো সতর্ককারী আসেনি, তারা না জেনে আল্লাহর ইবাদত থেকে দূরে ছিল। আল্লাহ তাআলা রাসুল ও ইসলাম প্রেরণের মাধ্যমে বিচার দিবসে অবিশ্বাসীদের আর এ রকম অজুহাত দেখানোর সুযোগ বন্ধ করে দিয়েছেন।
আল্লাহ তাঁর রাসুলকে উদ্দেশ্য করে বলেন, তোমার দায়িত্ব তো কেবল পৌঁছে দেওয়া। (সুরা শুরা: ৪৮)
আরেক আয়াতে আল্লাহ তাআলা বলেন, রাসুলের দায়িত্ব তো কেবল স্পষ্ট বার্তা পৌঁছে দেওয়া। (সুরা মায়েদা: ৯৯)
আরেক আয়াতে আল্লাহ তাআলা বলেন, বল, ‘তোমরা আল্লাহর আনুগত্য কর এবং রাসুলের আনুগত্য কর’। তারপর যদি তোমরা মুখ ফিরিয়ে নাও, তবে তার ওপর কেবল সেই দায়িত্ব রয়েছে যা তার ওপর অর্পণ করা হয়েছে এবং তোমাদের ওপর সেই দায়িত্ব রয়েছে যা তোমাদের ওপর অর্পণ করা হয়েছে। যদি তোমরা তাঁর আনুগত্য কর, তবে তোমরা হেদায়াত পাবে। রাসুলের দায়িত্ব তো কেবল স্পষ্ট বার্তা পৌঁছে দেওয়া। (সুরা নুর: ৫৪)
এই আয়াতটি ঐশী বাণীর লক্ষ্য, এর মূল বিষয়বস্তু এবং রাসুল ও তাঁর উম্মতের দায়িত্ব স্পষ্ট করে। রাসুলের কাজ ছিল বাণী পৌঁছে দেওয়া, আর যাদের কাছে এই বাণী পৌঁছানো হয়েছে তাদের কাজ হলো অবিলম্বে আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের আনুগত্যের দিকে ছুটে আসা; যদি তারা তা প্রত্যাখ্যান করে, তবে আল্লাহর শাস্তি ন্যায়সঙ্গতভাবেই তাদের ওপর আপতিত হবে।
আল্লাহ তাআলা বলেন, বল, ‘যদি তোমরা না-ই ডাক তাহলে আমার রব তোমাদের কোন পরওয়া করেন না। তারপর তোমরা অস্বীকার করেছ। তাই অচিরেই অপরিহার্য হবে আজাব। (সুরা ফুরকান: ৭৭)
এর অর্থ হলো, যারা নবী-রাসুলদের বাণী জানার পরও তা প্রত্যাখ্যান করে, তারা দুনিয়া বা আখেরাতে নিশ্চিতভাবেই আল্লাহর শাস্তির মুখে পড়বে।
৩. মুসলিম জাতি গঠন করা
ইসলামের আরেকটি প্রধান লক্ষ্য বা উদ্দেশ্য হলো মুসলিম উম্মাহ বা জাতি গঠন করা। আল্লাহ তাআলা বলেন, তিনিই উম্মীদের মধ্যে একজন রাসুল পাঠিয়েছেন তাদের মধ্য থেকে, যিনি তাদের কাছে তাঁর আয়াতসমূহ তিলাওয়াত করেন, তাদেরকে পবিত্র করেন এবং তাদেরকে কিতাব ও হিকমত শিক্ষা দেন, এর আগে তারা স্পষ্ট বিভ্রান্তিতে ছিল। (সুরা জুমুআ: ২)
মহানবী মুহাম্মাদের (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) আগমন ছিল ইবরাহিম ও ইসমাইলের (আলাইহিমাস সালাম) দোয়ার ফসল। মক্কায় কাবার দেয়াল নির্মাণের সময় তাঁরা দোয়া করেছিলেন, হে আমাদের রব, তাদের মধ্য থেকে তাদের মাঝে একজন রাসুল প্রেরণ করুন, যিনি তাদের কাছে আপনার আয়াতসমূহ তিলাওয়াত করবেন, তাদেরকে কিতাব ও হিকমত শিক্ষা দেবেন এবং তাদেরকে পবিত্র করবেন। নিশ্চয় আপনি পরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময়। (সুরা বাকারা: ১২৯)
আল্লাহ তাআলা তাঁদের দোয়া কবুল করে মুহাম্মাদকে (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) প্রেরণ করেন এবং তাঁর মাধ্যমে মানব ইতিহাসের সর্বশ্রেষ্ঠ জাতি প্রতিষ্ঠা করেন, যা আল্লাহ নিজেই ঘোষণা করেছেন, তোমরাই হলে সর্বোত্তম উম্মত, মানবজাতির (কল্যাণের) জন্য যাদের উত্থান ঘটানো হয়েছে। তোমরা সৎকাজের আদেশ দেবে এবং অসৎকাজে বাধা দেবে আর আল্লাহর প্রতি ইমান রাখবে। (সুরা আলে ইমরান: ১১০)
আল্লাহ তাআলা কোরআনের বহু আয়াতে নবীজির সঙ্গী বা সাহাবিদের (রা.) প্রশংসা করেছেন, যেমন আল্লাহ তাআলা বলেন, মুহাম্মদ আল্লাহর রাসুল এবং তার সাথে যারা আছে তারা কাফেরদের প্রতি অত্যন্ত কঠোর; পরস্পরের প্রতি সদয়, তুমি তাদেরকে রুকূকারী, সিজদাকারী অবস্থায় দেখতে পাবে তারা আল্লাহর করুণা ও সন্তুষ্টি অনুসন্ধান করছে। তাদের আলামত হচ্ছে, তাদের চেহারায় সিজদার চিহ্ন থাকে। এটাই তাওরাতে তাদের দৃষ্টান্ত। আর ইনজিলে তাদের দৃষ্টান্ত হলো একটি চারাগাছের মত, যে তার কঁচিপাতা উদগত করেছে ও শক্ত করেছে, অতঃপর তা পুষ্ট হয়েছে ও স্বীয় কান্ডের উপর মজবুতভাবে দাঁড়িয়েছে, যা চাষীকে আনন্দ দেয়। যাতে তিনি তাদের দ্বারা কাফেরদের ক্রোধান্বিত করতে পারেন। তাদের মধ্যে যারা ইমান আনে ও সৎকর্ম করে, আল্লাহ তাদের জন্য ক্ষমা ও মহাপ্রতিদানের ওয়াদা করেছেন। (সুরা ফাতহ, আয়াত: ২৯)
৪. ইসলামকে বিজয়ী আদর্শ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা
রাসুলুল্লাহকে (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) প্রেরণের চতুর্থ উদ্দেশ্য হলো, কেয়ামত পর্যন্ত সমস্ত দ্বীন বা জীবনব্যবস্থার ওপর ইসলামকে একটি বিজয়ী ও প্রধান আদর্শ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা।
আল্লাহ তাআলা বলেন, তিনি তাঁর রাসুলকে হেদায়াত ও সত্য দ্বীনসহ পাঠিয়েছেন, যেন একে সকল দ্বীনের ওপর বিজয়ী করেন। আর সাক্ষী হিসেবে আল্লাহই যথেষ্ট। (সুরা ফাতহ: ২৮)
আল্লাহ তাআলা আরও বলেন, তিনি তাঁর রাসুলকে হেদায়াত ও সত্য দ্বীনসহ পাঠিয়েছেন, যেন একে সকল দ্বীনের ওপর বিজয়ী করেন; যদিও মুশরিকরা তা অপছন্দ করে। (সুরা তাওবা: ৩৩)
ইসলামকে বিজয়ী করার অর্থ হলো, অন্যান্য সমস্ত মতবাদ বা ধর্মের ওপর এর শ্রেষ্ঠত্ব ও আধিপত্য স্পষ্ট করা। মুসলমানরা যখনই সঠিক বিশ্বাসের শক্তিতে বলীয়ান হয়েছে, আল্লাহ তাঁর প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন করেছেন। ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যায়, মুসলমানরা বিশ্বের সমস্ত মতবাদকে তাদের যুক্তি ও প্রজ্ঞার মাধ্যমে পরাস্ত করেছিলেন। পাশাপাশি ইসলামের আদর্শ ও বিশ্বাসের শক্তিতে বলিয়ান মুসলমানরাও বিশ্বের অন্য সব শক্তিকে পরাজিত করে অপ্রতিরোধ্য বিজয়ী শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হয়েছিল।
সূত্র: ইসলাম ওয়েব
ওএফএফ
What's Your Reaction?