ঈদ যাত্রায় হামের সংক্রমণ থেকে বাঁচার উপায়
ঈদ মানেই ঘরে ফেরার আনন্দ। বছরের ব্যস্ততা শেষে পরিবার–পরিজনের সঙ্গে কিছু আনন্দঘন মুহূর্ত কাটাতে লাখো মানুষ ছুটে যায় গ্রামের বাড়িতে। বাসস্ট্যান্ড, রেলস্টেশন, লঞ্চঘাট—সব জায়গায় তখন মানুষের ঢল নামে। কিন্তু এবারের ঈদযাত্রার আনন্দের ভেতর লুকিয়ে আছে এক অদৃশ্য আতঙ্ক—হাম। দেশজুড়ে হামের সংক্রমণ যেভাবে ছড়িয়ে পড়েছে, তাতে এবারের ঈদযাত্রা শুধু ভ্রমণ নয়; এটি জনস্বাস্থ্যের জন্যও বড় এক চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছে। বিশেষ করে শিশুদের জন্য পরিস্থিতি আরও উদ্বেগজনক। গত কয়েক মাসে হাম ও হামের উপসর্গে শত শত শিশুর মৃত্যু হয়েছে। হাজার হাজার শিশু হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে। চিকিৎসকেরা সতর্ক করছেন, ঈদের সময় এক অঞ্চল থেকে আরেক অঞ্চলে বিপুল মানুষের যাতায়াত সংক্রমণকে আরও ভয়াবহ করে তুলতে পারে। এই বাস্তবতায় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো—ঈদযাত্রায় হামের সংক্রমণ থেকে মানুষ বাঁচবে কীভাবে? এই প্রশ্নের উত্তর শুধু ব্যক্তিগত সতর্কতায় সীমাবদ্ধ নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে রাষ্ট্রীয় প্রস্তুতি, সামাজিক সচেতনতা এবং জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থার কার্যকারিতা। সহযোগী একটি পত্রিকার প্রতিবেদন বলছে, ঢাকার সদরঘাটে পরিবার নিয়ে লঞ্চে উঠেছিলেন বেসরকারি চাকরিজীবী সা
ঈদ মানেই ঘরে ফেরার আনন্দ। বছরের ব্যস্ততা শেষে পরিবার–পরিজনের সঙ্গে কিছু আনন্দঘন মুহূর্ত কাটাতে লাখো মানুষ ছুটে যায় গ্রামের বাড়িতে। বাসস্ট্যান্ড, রেলস্টেশন, লঞ্চঘাট—সব জায়গায় তখন মানুষের ঢল নামে। কিন্তু এবারের ঈদযাত্রার আনন্দের ভেতর লুকিয়ে আছে এক অদৃশ্য আতঙ্ক—হাম।
দেশজুড়ে হামের সংক্রমণ যেভাবে ছড়িয়ে পড়েছে, তাতে এবারের ঈদযাত্রা শুধু ভ্রমণ নয়; এটি জনস্বাস্থ্যের জন্যও বড় এক চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছে। বিশেষ করে শিশুদের জন্য পরিস্থিতি আরও উদ্বেগজনক। গত কয়েক মাসে হাম ও হামের উপসর্গে শত শত শিশুর মৃত্যু হয়েছে। হাজার হাজার শিশু হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে। চিকিৎসকেরা সতর্ক করছেন, ঈদের সময় এক অঞ্চল থেকে আরেক অঞ্চলে বিপুল মানুষের যাতায়াত সংক্রমণকে আরও ভয়াবহ করে তুলতে পারে।
এই বাস্তবতায় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো—ঈদযাত্রায় হামের সংক্রমণ থেকে মানুষ বাঁচবে কীভাবে? এই প্রশ্নের উত্তর শুধু ব্যক্তিগত সতর্কতায় সীমাবদ্ধ নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে রাষ্ট্রীয় প্রস্তুতি, সামাজিক সচেতনতা এবং জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থার কার্যকারিতা।
সহযোগী একটি পত্রিকার প্রতিবেদন বলছে, ঢাকার সদরঘাটে পরিবার নিয়ে লঞ্চে উঠেছিলেন বেসরকারি চাকরিজীবী সানাউল্লাহ। তাঁর দুই সন্তান—একজনের বয়স সাত বছর, অন্যজনের চার। ঈদে গ্রামের বাড়ি ভোলার বোরহানউদ্দিনে যাওয়ার সময় তিনি অন্যবারের তুলনায় অনেক বেশি সতর্ক ছিলেন। কারণ একটাই—হাম। কিন্তু তিনি অবাক হয়েছেন একটি বিষয় দেখে। এত বড় স্বাস্থ্যঝুঁকির মধ্যেও কোথাও হামের সংক্রমণ প্রতিরোধে দৃশ্যমান কোনো নির্দেশনা নেই। নেই সচেতনতামূলক প্রচার, স্বাস্থ্য সতর্কতা কিংবা জরুরি পরামর্শ।
সানাউল্লাহর অভিজ্ঞতা আসলে দেশের কোটি মানুষের বাস্তবতা। আমরা এখনো সড়ক দুর্ঘটনা, যানজট কিংবা অতিরিক্ত ভাড়ার বিষয়ে আলোচনা করছি; কিন্তু ঈদযাত্রার স্বাস্থ্যঝুঁকি নিয়ে জাতীয়ভাবে তেমন কোনো জোরালো আলোচনা নেই। অথচ পরিস্থিতি ভয়াবহ।
সরকারি হিসাব বলছে, মাত্র ৭২ দিনে হাম ও হামের উপসর্গে ৫৫৫ জনের মৃত্যু হয়েছে। আক্রান্তের সংখ্যা প্রায় ৭৫ হাজার। এর মধ্যে অধিকাংশই শিশু। প্রতিদিন নতুন করে শত শত শিশু হাসপাতালে ভর্তি হচ্ছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, বাস্তব সংখ্যা আরও বেশি হতে পারে। কারণ গ্রামের অনেক শিশুর চিকিৎসা হয় স্থানীয়ভাবে, যা সরকারি পরিসংখ্যানে আসে না।
হামকে সাধারণ ভাইরাসজনিত রোগ ভেবে অবহেলা করার সুযোগ নেই। এটি অত্যন্ত ছোঁয়াচে। একজন আক্রান্ত ব্যক্তি সহজেই আশপাশের ১২ থেকে ১৮ জনকে সংক্রমিত করতে পারেন। কাশি, হাঁচি কিংবা শ্বাসপ্রশ্বাসের মাধ্যমে ভাইরাস বাতাসে ছড়িয়ে পড়ে। গণপরিবহনের ভিড়ে এটি আরও দ্রুত ছড়ায়। একটি লঞ্চ, বাস বা ট্রেন কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই ভাইরাস বিস্তারের বড় কেন্দ্র হয়ে উঠতে পারে।
সবচেয়ে ঝুঁকিতে থাকে শিশুরা। বিশেষ করে যাদের টিকা সম্পূর্ণ হয়নি, অপুষ্টিতে ভুগছে কিংবা রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কম। হাম শুধু জ্বর বা র্যাশ তৈরি করে না; এটি নিউমোনিয়া, ডায়রিয়া, চোখের জটিলতা এমনকি মস্তিষ্কে প্রদাহও সৃষ্টি করতে পারে। অনেক শিশুর মৃত্যু হয় এসব জটিলতায়।
তাহলে করণীয় কী? প্রথম এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো টিকা নিশ্চিত করা। যে শিশুদের হাম–রুবেলা টিকা নেওয়ার বয়স হয়েছে, তাদের অবশ্যই টিকা দিতে হবে। টিকা নেওয়া থাকলে সংক্রমণের ঝুঁকি ও জটিলতা অনেক কমে যায়। ঈদের আগে যেসব এলাকায় বিশেষ টিকাদান কর্মসূচি চলছে, সেখানে অভিভাবকদের সক্রিয়ভাবে অংশ নিতে হবে।
দ্বিতীয়ত, অসুস্থ শিশু নিয়ে ভ্রমণ এড়িয়ে চলা উচিত। অনেক সময় অভিভাবকেরা জ্বর বা সর্দিকে সাধারণ সমস্যা ভেবে দীর্ঘ ভ্রমণে বের হন। কিন্তু শিশুর যদি হাম হয়ে থাকে, তাহলে সে পুরো যাত্রাপথে বহু মানুষকে সংক্রমিত করতে পারে। তাই জ্বর, চোখ লাল হওয়া, কাশি কিংবা শরীরে লালচে দাগ দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে।
তৃতীয়ত, গণপরিবহনে ব্যক্তিগত সুরক্ষাব্যবস্থা জরুরি। ছোট শিশুদের ভিড়ের মধ্যে অপ্রয়োজনীয়ভাবে ঘোরাঘুরি না করানো, সম্ভব হলে মাস্ক ব্যবহার করা এবং শিশুদের হাত পরিষ্কার রাখা গুরুত্বপূর্ণ। যদিও হাম বাতাসের মাধ্যমে ছড়ায়, তবু হাতের পরিচ্ছন্নতা অন্য সংক্রমণ কমাতেও সহায়তা করে।
চতুর্থত, ভ্রমণের সময় শিশুর খাবার ও বিশুদ্ধ পানির বিষয়ে সতর্ক থাকতে হবে। হাম আক্রান্ত শিশুদের বড় সমস্যা হলো অপুষ্টি ও পানিশূন্যতা। তাই স্বাস্থ্যকর খাবার নিশ্চিত করা জরুরি। কিন্তু শুধু ব্যক্তিগত সচেতনতা দিয়ে এত বড় সংকট মোকাবিলা করা সম্ভব নয়। এখানে রাষ্ট্রের ভূমিকা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
ঈদের আগে যেমন সড়ক নিরাপত্তা নিয়ে বড় প্রচারণা চালানো হয়, তেমনি এবার স্বাস্থ্য নিরাপত্তা নিয়েও জরুরি প্রচারণা প্রয়োজন ছিল। বাসস্ট্যান্ড, রেলস্টেশন, লঞ্চঘাট ও ফেরিঘাটে স্বাস্থ্যবিষয়ক ঘোষণা, ডিজিটাল স্ক্রিনে সতর্কবার্তা, স্বাস্থ্যকর্মী মোতায়েন—এসব উদ্যোগ মানুষের মধ্যে সচেতনতা তৈরি করতে পারত।
দুর্ভাগ্যজনকভাবে সেই প্রস্তুতি দৃশ্যমান নয়। ফলে অনেক মানুষ এখনো জানেন না হাম কতটা ভয়ংকর হতে পারে।
আরও উদ্বেগের বিষয় হলো, মাঠপর্যায়ের স্বাস্থ্যব্যবস্থা এখনো দুর্বল।
হাসপাতালে আইসিইউ বাড়ানো হচ্ছে, শিশু ভর্তি হচ্ছে—কিন্তু সংক্রমণ কমাতে যে কমিউনিটি পর্যায়ে নজরদারি প্রয়োজন, সেটি সীমিত। গ্রামে গ্রামে স্বাস্থ্যকর্মীদের সক্রিয়তা বাড়ানো, বাড়ি বাড়ি গিয়ে টিকা যাচাই, আক্রান্ত এলাকায় বিশেষ মেডিকেল টিম গঠন—এসব এখন অত্যন্ত জরুরি।
জনস্বাস্থ্যবিদেরা বলছেন, ঈদের পর পরিস্থিতি আরও খারাপ হতে পারে। কারণ শহর থেকে গ্রামে সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়লে সেটি নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হয়ে যাবে। গ্রামীণ স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলোর সক্ষমতা সীমিত। সেখানে শিশু রোগ বিশেষজ্ঞ, পর্যাপ্ত অক্সিজেন কিংবা নিবিড় পরিচর্যার সুবিধা অনেক জায়গায় নেই।
এখানে আরেকটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ—গুজব ও ভুল তথ্য। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এখনো অনেকেই টিকা নিয়ে বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়ান। কেউ বলেন টিকার প্রয়োজন নেই, কেউ আবার টিকা নিয়ে অযথা ভয় তৈরি করেন। এসব গুজব শুধু অজ্ঞতা নয়; এটি জনস্বাস্থ্যের জন্য হুমকি। কারণ টিকা না নেওয়া একটি শিশুই অনেক সময় পুরো এলাকায় সংক্রমণ ছড়িয়ে দিতে পারে।
বাংলাদেশ একসময় টিকাদানে বিশ্বের কাছে উদাহরণ ছিল। সেই অর্জন ধরে রাখতে হলে এখন নতুন করে জনসচেতনতা গড়ে তুলতে হবে। শুধু সরকারি উদ্যোগ নয়, সমাজের সব অংশকে সম্পৃক্ত করতে হবে। শিক্ষক, ইমাম, জনপ্রতিনিধি, সামাজিক সংগঠন—সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে।
গণমাধ্যমের ভূমিকাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। হাম নিয়ে প্রতিদিন তথ্যভিত্তিক প্রচারণা প্রয়োজন। মানুষকে বুঝতে হবে, এটি কোনো গুজব নয়; এটি বাস্তব সংকট।
ঈদের আনন্দ কখনোই আতঙ্কের হওয়া উচিত নয়। কিন্তু সতর্কতা ছাড়া আনন্দও নিরাপদ থাকে না। আমরা করোনার সময় দেখেছি, অবহেলা কী ভয়াবহ পরিণতি ডেকে আনতে পারে। হামের বর্তমান পরিস্থিতিও একই সতর্কবার্তা দিচ্ছে।
এখনো সময় আছে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনার। যদি দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া যায়, তাহলে সংক্রমণ অনেকটাই কমানো সম্ভব। কিন্তু যদি আমরা এটিকে “সাধারণ শিশু রোগ” ভেবে অবহেলা করি, তাহলে ঈদের পর পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হতে পারে।
একটি শিশুর জীবন শুধু একটি পরিবারের স্বপ্ন নয়; সেটি পুরো জাতির ভবিষ্যৎ। তাই ঈদযাত্রার আনন্দের পাশাপাশি এবার সবচেয়ে বড় দায়িত্ব হওয়া উচিত শিশুদের নিরাপদ রাখা। কারণ নিরাপদ শিশুই নিরাপদ বাংলাদেশ। সুতরাং সচেতনতার কোনো বিকল্প নেই।
লেখক: সাংবাদিক, কলামিস্ট, রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও সম্পাদক, আমার দিন।
ই-মেইল: [email protected]
এইচআর/জেআইএম
What's Your Reaction?