ঈদযাত্রা যেন শেষযাত্রা না হয়

ঈদের আগে ঘরে ফেরার প্রস্তুতি চলছিল। হয়তো কারও ব্যাগে ছিল সন্তানের জন্য কেনা নতুন জামা, কারও হাতে মায়ের জন্য শাড়ি, কারও মনে ছিল কোরবানির ঈদে পরিবারের সঙ্গে একসঙ্গে বসে খাওয়ার আনন্দ। অনেক দিনের অপেক্ষা শেষে বাড়ি ফেরার সেই পথই শেষ পর্যন্ত কারও কারও জন্য হয়ে উঠল জীবনের শেষ যাত্রা। টাঙ্গাইলে রডবোঝাই একটি ট্রাক উল্টে ১৫ জনের প্রাণহানির খবর শুধু একটি দুর্ঘটনার সংবাদ নয়; এটি অসংখ্য পরিবারের ঈদকে শোকে ডুবিয়ে দেওয়ার গল্প। যে মানুষগুলো হয়তো কয়েক ঘণ্টা পর বাড়ির উঠানে পা রাখতেন, প্রিয়জনের মুখ দেখতেন, তাদের কেউই আর ফিরলেন না। বাড়িতে অপেক্ষায় থাকা মানুষগুলো হয়তো ফোনের দিকে তাকিয়ে ছিলেন—‘কোথায় পৌঁছালে?’—কিন্তু সেই ফোন আর ধরেনি কেউ। ঈদের আনন্দের অপেক্ষা মুহূর্তেই পরিণত হয়েছে কান্নায়। এই মৃত্যুগুলো আমাদের ব্যথিত করে শুধু প্রাণহানির সংখ্যা হিসেবে নয়, বরং এই কারণে যে এগুলো অনেকাংশেই প্রতিরোধযোগ্য ছিল। রডভর্তি ট্রাক তো যাত্রী পরিবহনের জন্য নয়। সেখানে মানুষ উঠল কীভাবে? কেন উঠল? পথে কেউ দেখল না? কেউ থামাল না? দুর্ঘটনার পর আমরা শোক জানাই, তদন্তের কথা বলি, দায় খুঁজি। কিন্তু সবচেয়ে বড় প্রশ্নটি থেকে যায়—এমন মৃত্

ঈদযাত্রা যেন শেষযাত্রা না হয়

ঈদের আগে ঘরে ফেরার প্রস্তুতি চলছিল। হয়তো কারও ব্যাগে ছিল সন্তানের জন্য কেনা নতুন জামা, কারও হাতে মায়ের জন্য শাড়ি, কারও মনে ছিল কোরবানির ঈদে পরিবারের সঙ্গে একসঙ্গে বসে খাওয়ার আনন্দ। অনেক দিনের অপেক্ষা শেষে বাড়ি ফেরার সেই পথই শেষ পর্যন্ত কারও কারও জন্য হয়ে উঠল জীবনের শেষ যাত্রা।

টাঙ্গাইলে রডবোঝাই একটি ট্রাক উল্টে ১৫ জনের প্রাণহানির খবর শুধু একটি দুর্ঘটনার সংবাদ নয়; এটি অসংখ্য পরিবারের ঈদকে শোকে ডুবিয়ে দেওয়ার গল্প। যে মানুষগুলো হয়তো কয়েক ঘণ্টা পর বাড়ির উঠানে পা রাখতেন, প্রিয়জনের মুখ দেখতেন, তাদের কেউই আর ফিরলেন না। বাড়িতে অপেক্ষায় থাকা মানুষগুলো হয়তো ফোনের দিকে তাকিয়ে ছিলেন—‘কোথায় পৌঁছালে?’—কিন্তু সেই ফোন আর ধরেনি কেউ। ঈদের আনন্দের অপেক্ষা মুহূর্তেই পরিণত হয়েছে কান্নায়।

এই মৃত্যুগুলো আমাদের ব্যথিত করে শুধু প্রাণহানির সংখ্যা হিসেবে নয়, বরং এই কারণে যে এগুলো অনেকাংশেই প্রতিরোধযোগ্য ছিল। রডভর্তি ট্রাক তো যাত্রী পরিবহনের জন্য নয়। সেখানে মানুষ উঠল কীভাবে? কেন উঠল? পথে কেউ দেখল না? কেউ থামাল না? দুর্ঘটনার পর আমরা শোক জানাই, তদন্তের কথা বলি, দায় খুঁজি। কিন্তু সবচেয়ে বড় প্রশ্নটি থেকে যায়—এমন মৃত্যু কি এড়ানো যেত না?

ঈদযাত্রা আমাদের দেশে কেবল ভ্রমণ নয়, এটি আবেগের নাম। বছরের পর বছর শহরে পরিশ্রম করে মানুষ এই সময়টুকুর জন্য অপেক্ষা করে। সন্তানদের নিয়ে গ্রামের বাড়ি ফেরা, বৃদ্ধ মা-বাবার সঙ্গে ঈদের সকাল কাটানো, আত্মীয়স্বজনের সঙ্গে দেখা—এসবই ঈদের গভীর সামাজিক আনন্দের অংশ। কিন্তু দুঃখজনকভাবে এই ঘরে ফেরা যেন প্রতি বছরই এক অনিশ্চয়তার সঙ্গে শুরু হয়। আনন্দের পাশাপাশি থাকে ভয়—রাস্তা কেমন থাকবে, গাড়ি পাওয়া যাবে কি না, যানজটে আটকে পড়তে হবে কি না, নিরাপদে পৌঁছানো যাবে তো?

দুঃখজনকভাবে বাংলাদেশে ঈদযাত্রা যেন বহু বছর ধরেই আনন্দের পাশাপাশি এক অদৃশ্য শঙ্কারও নাম। এছাড়া ঈদযাত্রা শুরু হলেই আমাদের সামনে এক পরিচিত দৃশ্য ফিরে আসে—মহাসড়কে ধীরগতির যানবাহন, টিকিটের জন্য দীর্ঘ অপেক্ষা, অতিরিক্ত ভাড়া, ফেরিঘাটে চাপ, ট্রেনের ছাদে যাত্রী, আর খবরের পাতায় একের পর এক দুর্ঘটনার সংবাদ। বছর ঘুরে ঈদ আসে, কিন্তু এই চিত্র খুব বেশি বদলায় না। প্রতি বছর মানুষের প্রত্যাশা থাকে—এবার হয়তো যাত্রাটা একটু স্বস্তির হবে। কিন্তু যাত্রাপথের বাস্তবতা অনেক সময় সেই আশাকে ম্লান করে দেয়।

এবারও ২৫ মে ছুটির প্রথম দিনেই ঢাকা থেকে বের হওয়ার পথে যানজটের খবর এসেছে। রাজধানীর বিভিন্ন প্রান্তে চাপ বেড়েছে। সামনে কোরবানির পশুবাহী ট্রাক পুরোপুরি নামলে গাবতলী ও আশপাশের এলাকায় পরিস্থিতি আরও জটিল হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। ঘরমুখো মানুষের চাপ আর পশুবাহী যানবাহনের বাড়তি প্রবাহ মিলিয়ে ঈদের আগের কয়েকটি দিন সাধারণত সবচেয়ে কঠিন হয়ে ওঠে। ফলে স্বস্তির ঈদযাত্রা নিয়ে মানুষের আশার সঙ্গে শঙ্কাও সমানতালে হাটে।

বাংলাদেশে সড়ক দুর্ঘটনা যেন ধীরে ধীরে এক নীরব মহামারিতে রূপ নিয়েছে। ঈদের সময় তা আরও দৃশ্যমান হয়। কারণ এই সময় লাখো মানুষ একই সঙ্গে রাস্তায় নামে। পরিবহনের ওপর চাপ বেড়ে যায় কয়েক গুণ। সেই চাপ সামলাতে গিয়ে কোথাও নিয়ম শিথিল হয়, কোথাও তদারকি দুর্বল হয়, কোথাও বাড়তি মুনাফার লোভে নিরাপত্তা উপেক্ষিত হয়। আর এই ফাঁকেই ঘটে যায় দুর্ঘটনা।

টাঙ্গাইলের সড়কে যে প্রাণগুলো নিভে গেল, তারা কেবল সংখ্যা নয়। তাদের প্রত্যেকের পেছনে একটি পরিবার আছে, অপেক্ষা আছে, স্বপ্ন আছে। কেউ হয়তো বাড়ি ফিরছিলেন সন্তানের জন্য নতুন জামা নিয়ে, কেউ বৃদ্ধ মায়ের জন্য, কেউ ঈদের নামাজ গ্রামের মসজিদে পড়বেন বলে। কিন্তু তারা আর পৌঁছাতে পারলেন না।

টাঙ্গাইলের দুর্ঘটনাটি আমাদের সামনে আরেকটি বাস্তবতা স্পষ্ট করেছে—নিরাপদ পরিবহনের অভাব মানুষকে ঝুঁকিপূর্ণ বিকল্প বেছে নিতে বাধ্য করছে। বাসের টিকিট নেই, ভাড়া বেশি, সময়মতো গাড়ি পাওয়া যাচ্ছে না—এমন পরিস্থিতিতে অনেকে ট্রাক, পিকআপ বা মালবাহী যানবাহনে চড়ে বসেন। সেটি যে কতটা বিপজ্জনক, তা আমরা জানি। তবুও বাস্তবতার চাপে মানুষ সেই ঝুঁকি নেন। আর সেই ঝুঁকির মূল্য কখনো কখনো জীবন দিয়ে দিতে হয়।

তবে দায় শুধু যাত্রীর নয়। দায় ব্যবস্থারও। গত এক দশকে সড়ক অবকাঠামোতে বাংলাদেশ উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি করেছে। নতুন সেতু হয়েছে, এক্সপ্রেসওয়ে হয়েছে, মহাসড়ক প্রশস্ত হয়েছে। কিন্তু কেবল রাস্তা বড় হলেই নিরাপদ যাত্রা নিশ্চিত হয় না। প্রয়োজন নিয়মের কার্যকর প্রয়োগ, যানবাহনের মান নিয়ন্ত্রণ, দক্ষ চালক, যাত্রীসচেতনতা এবং সবচেয়ে বড় কথা—সমন্বিত ব্যবস্থাপনা।

ঈদের সময় অনেক চালক দীর্ঘ সময় বিশ্রামহীনভাবে গাড়ি চালান। অতিরিক্ত ট্রিপের চাপ থাকে। দ্রুত যাতায়াতের প্রতিযোগিতা থাকে। ক্লান্তি, অসতর্কতা ও অতিরিক্ত গতি মিলিয়ে দুর্ঘটনার ঝুঁকি ভয়াবহভাবে বেড়ে যায়। একজন চালকের কয়েক সেকেন্ডের ভুল সিদ্ধান্ত কখনো একটি পরিবারের পুরো জীবন বদলে দিতে পারে।

এদিকে যাত্রীদের মধ্যেও তাড়াহুড়ো থাকে। যত দ্রুত সম্ভব বাড়ি পৌঁছানোর ইচ্ছায় অনেকে ঝুঁকি নেন। ট্রেনের ছাদে ওঠেন, অতিরিক্ত যাত্রীবোঝাই বাসে চড়েন, এমনকি পণ্যবাহী ট্রাকেও ওঠেন। এই বাস্তবতা পরিবর্তন করতে হলে শুধু আইন প্রয়োগ যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন সামাজিক সচেতনতা এবং মানুষের কাছে নিরাপদ বিকল্প পৌঁছে দেওয়া।

স্বস্তির ঈদযাত্রা নিশ্চিত করতে হলে কয়েকটি জায়গায় একসঙ্গে কাজ করতে হবে। মহাসড়কে পণ্যবাহী ট্রাকে যাত্রী বহন বন্ধে কঠোর নজরদারি জরুরি। শুধু ঘোষণা নয়, বাস্তবে দৃশ্যমান নিয়ন্ত্রণ থাকতে হবে। গুরুত্বপূর্ণ প্রবেশপথ, টোলপ্লাজা ও মহাসড়কের মোড়ে নজরদারি বাড়ানো গেলে অনেক দুর্ঘটনা আগেই ঠেকানো সম্ভব।

যানবাহনের ফিটনেস নিশ্চিত করাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ঈদের আগে রাস্তায় নামা প্রতিটি দূরপাল্লার যানবাহনের কার্যকর পরীক্ষা প্রয়োজন। কাগজে ফিটনেস থাকলেই হবে না; বাস্তব সক্ষমতা যাচাই করতে হবে।

চালকদের বিশ্রামের বিষয়টিও গুরুত্ব পেতে হবে। দীর্ঘপথে বিকল্প চালক নিশ্চিত করা এবং নির্দিষ্ট সময় পর বিশ্রামের ব্যবস্থা বাধ্যতামূলক করা গেলে ঝুঁকি অনেক কমে।

পশুবাহী ট্রাক চলাচল ও যাত্রীবাহী পরিবহন ব্যবস্থার মধ্যে কার্যকর সমন্বয়ও প্রয়োজন। বিশেষ সময়ভিত্তিক চলাচল বা আলাদা রুট ব্যবস্থাপনা থাকলে গাবতলীর মতো এলাকায় চাপ কিছুটা কমানো সম্ভব।

সড়কের ওপর নির্ভরতা কমাতে রেল ও নৌপথে বাড়তি সেবা বাড়ানোও জরুরি। ঈদের সময় ট্রেন ও লঞ্চ যদি আরও পরিকল্পিতভাবে পরিচালিত হয়, তাহলে মহাসড়কের ওপর চাপ অনেকটাই হালকা হতে পারে।

সবকিছুর শেষে সবচেয়ে জরুরি বিষয়টি হলো—মানুষের জীবনের মূল্যকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া। ঈদে বাড়ি ফেরা কোনো বিলাসিতা নয়; এটি মানুষের আবেগ, অধিকার ও প্রয়োজনের অংশ। সেই যাত্রা নিরাপদ করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব, সমাজের দায়িত্ব, আমাদের সবার দায়িত্ব।

টাঙ্গাইলের সড়কে যে প্রাণগুলো নিভে গেল, তারা কেবল সংখ্যা নয়। তাদের প্রত্যেকের পেছনে একটি পরিবার আছে, অপেক্ষা আছে, স্বপ্ন আছে। কেউ হয়তো বাড়ি ফিরছিলেন সন্তানের জন্য নতুন জামা নিয়ে, কেউ বৃদ্ধ মায়ের জন্য, কেউ ঈদের নামাজ গ্রামের মসজিদে পড়বেন বলে। কিন্তু তারা আর পৌঁছাতে পারলেন না।

প্রতি ঈদে যদি ঘরে ফেরার আনন্দের সঙ্গে মৃত্যুভয়ও যাত্রাসঙ্গী হয়ে ওঠে, তাহলে আমাদের উন্নয়নের গল্পে কোথাও না কোথাও বড় অসম্পূর্ণতা রয়ে যায়। উন্নয়নের মানে শুধু সেতু নয়, শুধু মহাসড়ক নয়—উন্নয়নের মানে মানুষ নিরাপদে গন্তব্যে পৌঁছাবে।

নিরাপদ ঈদযাত্রা কোনো অলীক কল্পনা নয়। এটি সম্ভব। প্রয়োজন শুধু সদিচ্ছা, কার্যকর উদ্যোগ, দায়িত্বশীলতা এবং আইনের নিরপেক্ষ প্রয়োগ। আমরা চাই এবারের ঈদযাত্রা হোক স্বস্তির, শোকের নয়; নিরাপদের, অনিশ্চয়তার নয়।

কারণ ঈদের সবচেয়ে বড় আনন্দ কোরবানির পশু নয়, নতুন পোশাক নয়—প্রিয়জনের কাছে নিরাপদে পৌঁছে যাওয়ার সেই মুহূর্ত। সেই আনন্দটুকু যেন কোনো সড়কে এসে থেমে না যায়।

লেখক: সাংবাদিক, কলামিস্ট। ডেপুটি এডিটর, জাগো নিউজ।
[email protected]

এইচআর/এমএফএ/জেআইএম

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow