ঈদের ছুটিতে চট্টগ্রামে সড়কে ঝরল ২৬ প্রাণ

ঈদ মানেই আনন্দ, প্রিয়জনের কাছে ফেরার খুশি আর ঘরে ফেরার গল্প। কিন্তু সেই আনন্দযাত্রায় এবার অনেক পরিবারের জন্য শোকের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ঈদের আগে ও ছুটির সময় চট্টগ্রামের সড়কগুলোতে বেড়েছে দুর্ঘটনা। একের পর এক দুর্ঘটনায় প্রাণ ঝরেছে, আহত হয়েছেন অনেক মানুষ। ফলে অনেক পরিবারের ঈদের আনন্দ পরিণত হয়েছে কান্নায়। গত ২১ মার্চ দেশে পবিত্র ঈদুল ফিতর উদ্‌যাপিত হয়। ১৭ মার্চ শবে কদরের ছুটি থেকে শুরু করে সাত দিন অফিস-আদালত বন্ধ থাকায় সড়কে ঘরমুখো মানুষের চাপ বেড়ে যায়। এই সময়ে ঘরমুখো মানুষের চাপ ও যানবাহনের অতিরিক্ত চলাচলের কারণে দুর্ঘটনার ঝুঁকিও বাড়ে। বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, ১ থেকে ২৩ মার্চ পর্যন্ত চট্টগ্রাম জেলায় ৩৬টি সড়ক দুর্ঘটনায় ৪৪ জন নিহত ও ৯৫ জন আহত হয়েছেন। এর মধ্যে ঈদের ছুটির সাত দিন (১৭ থেকে ২৩ মার্চ) ঘটেছে ১৬টি দুর্ঘটনা। এসব দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন ২৬ জন এবং আহত হয়েছেন ৬০ জন। অর্থাৎ মোট নিহতের ৫৯ শতাংশ এবং আহতের ৬৩ শতাংশই ঘটেছে ঈদের ছুটির এই সাত দিনে। গত বুধবার চট্টগ্রামের সাতকানিয়ায় ভাইরাল হওয়া একটি সিসিটিভি ফুটেজে দেখা গেছে, সড়কের একপাশে দাঁড়িয়

ঈদের ছুটিতে চট্টগ্রামে সড়কে ঝরল ২৬ প্রাণ

ঈদ মানেই আনন্দ, প্রিয়জনের কাছে ফেরার খুশি আর ঘরে ফেরার গল্প। কিন্তু সেই আনন্দযাত্রায় এবার অনেক পরিবারের জন্য শোকের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ঈদের আগে ও ছুটির সময় চট্টগ্রামের সড়কগুলোতে বেড়েছে দুর্ঘটনা। একের পর এক দুর্ঘটনায় প্রাণ ঝরেছে, আহত হয়েছেন অনেক মানুষ। ফলে অনেক পরিবারের ঈদের আনন্দ পরিণত হয়েছে কান্নায়।

গত ২১ মার্চ দেশে পবিত্র ঈদুল ফিতর উদ্‌যাপিত হয়। ১৭ মার্চ শবে কদরের ছুটি থেকে শুরু করে সাত দিন অফিস-আদালত বন্ধ থাকায় সড়কে ঘরমুখো মানুষের চাপ বেড়ে যায়। এই সময়ে ঘরমুখো মানুষের চাপ ও যানবাহনের অতিরিক্ত চলাচলের কারণে দুর্ঘটনার ঝুঁকিও বাড়ে।

বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, ১ থেকে ২৩ মার্চ পর্যন্ত চট্টগ্রাম জেলায় ৩৬টি সড়ক দুর্ঘটনায় ৪৪ জন নিহত ও ৯৫ জন আহত হয়েছেন। এর মধ্যে ঈদের ছুটির সাত দিন (১৭ থেকে ২৩ মার্চ) ঘটেছে ১৬টি দুর্ঘটনা। এসব দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন ২৬ জন এবং আহত হয়েছেন ৬০ জন। অর্থাৎ মোট নিহতের ৫৯ শতাংশ এবং আহতের ৬৩ শতাংশই ঘটেছে ঈদের ছুটির এই সাত দিনে।

গত বুধবার চট্টগ্রামের সাতকানিয়ায় ভাইরাল হওয়া একটি সিসিটিভি ফুটেজে দেখা গেছে, সড়কের একপাশে দাঁড়িয়ে থাকা একটি ব্যাটারিচালিত অটোরিকশায় কয়েকজন যাত্রী ওঠার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। হঠাৎ পেছন দিক থেকে অতিরিক্ত গতিতে আসা একটি প্রাইভেটকার সজোরে ধাক্কা দিলে মুহূর্তেই যাত্রীসহ অটোরিকশাটি ছিটকে পড়ে যায়। ঘটনাস্থলেই দুই যাত্রী নিহত হন। একইভাবে লোহাগাড়া উপজেলার পদুয়া ইউনিয়নের নোয়াপাড়া এলাকায় সড়ক পারাপারের সময় মোটরসাইকেলের ধাক্কায় গুরুতর আহত হন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের এক শিক্ষার্থী।

চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের তথ্য অনুযায়ী, ঈদের ছুটির সাত দিনে হাসপাতালের অর্থোপেডিক বিভাগে নতুন রোগী ভর্তি হয়েছে ৩৬০ জন। তাদের মধ্যে ১৪৯ জন সড়ক দুর্ঘটনার শিকার। অর্থাৎ নতুন রোগীদের প্রায় ৪১ শতাংশ সড়ক দুর্ঘটনায় আহত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। গুরুতর আঘাত না হলে অনেকেই জরুরি বিভাগ থেকে চিকিৎসা নিয়ে হাসপাতাল ছাড়ছেন।

চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের অর্থোপেডিক সার্জারি বিভাগের সূত্র জানায়, বিভাগটির ২৬ ও ৭৯ নম্বর ওয়ার্ডে চলতি মাসের শুরু থেকে ২৫ মার্চ পর্যন্ত অন্তত ৪০০ নতুন রোগী ভর্তি হয়েছেন। তাদের মধ্যে প্রায় ৪৫ থেকে ৫০ শতাংশ সড়ক দুর্ঘটনার শিকার। ঈদের ছুটির সময় দুর্ঘটনায় আহত রোগীর সংখ্যা আরও বেড়েছে। আহতদের বেশির ভাগই মোটরসাইকেল, অটোরিকশা ও প্রাইভেট কার দুর্ঘটনায় আহত হয়েছেন। 

হাইওয়ে পুলিশ ও প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছেন, চট্টগ্রামের অধিকাংশ সড়ক দুর্ঘটনার প্রধান কারণ অতিরিক্ত গতি ও ঝুঁকিপূর্ণ ওভারটেকিং। বিশেষ করে ছোট ও সরু সড়কে দ্রুতগতিতে যান চালানো এবং নিয়ম না মেনে একে অপরকে অতিক্রম করতে গিয়ে অনেক দুর্ঘটনা ঘটছে। এছাড়া সড়কে ইজিবাইক ও ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার সংখ্যা বেড়ে যাওয়া এবং অদক্ষ চালকদের কারণে দুর্ঘটনার ঝুঁকি আরও বাড়ছে বলে জানিয়েছেন তারা।

পরিবহন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, অনেক দুর্ঘটনার জন্য যানবাহনের ফিটনেস ও যান্ত্রিক ত্রুটিও দায়ী। অনেক গাড়ির মালিক নিয়মিত সার্ভিসিং করেন না, ব্রেক, স্টিয়ারিংসহ গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্রাংশ ঠিক আছে কি না তা যাচাই করা হয় না। অনেক চালক শুধু গাড়ি চালিয়ে আবার গ্যারেজে রাখেন, কিন্তু গাড়ির যান্ত্রিক অবস্থা পরীক্ষা করা হয় না। এতে হঠাৎ ব্রেক কাজ না করা বা নিয়ন্ত্রণ হারানোর মতো ঘটনা ঘটে দুর্ঘটনা বাড়ছে বলে অভিযোগ করেছেন কয়েকজন বাস চালক।

দক্ষিণ চট্টগ্রামের সড়ক দুর্ঘটনার সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ সড়ক হিসেবে চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়কের নাম উল্লেখ করেছেন সংশ্লিষ্টরা। এই মহাসড়কে বেপরোয়া গাড়ি চলাচল এবং সড়ক পিচ্ছিল থাকার কারণে প্রায় প্রতিদিনই ঘটছে দুর্ঘটনা। পটিয়া থেকে চকরিয়া পর্যন্ত লবণবাহী ও বালুবাহী ট্রাক চলাচলের কারণে সড়কের বিভিন্ন অংশে পিচ্ছিল অবস্থা তৈরি হয়। এতে কম গতির যানবাহন ও মোটরসাইকেল প্রায়ই দুর্ঘটনার শিকার হচ্ছে। দুই লেনের এই মহাসড়কে বিপরীতমুখী যানবাহনের চাপ বেশি থাকায় ওভারটেকিং করতে গিয়ে প্রায়ই ভয়াবহ দুর্ঘটনা ঘটছে।

ঈদের পরবর্তী সময়েও দুর্ঘটনা থামেনি। গত বৃহস্পতিবার হাটহাজারীতে বেপরোয়া গতির ট্রাকের চাপায় এক মোটরসাইকেল আরোহী নিহত হন। একই দিন ভোরে চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়কের বানিয়ারছড়া এলাকায় বাসের ধাক্কায় দুই মোটরসাইকেল আরোহী নিহত হন। চন্দনাইশে কক্সবাজারমুখী একটি যাত্রীবাহী বাস নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ধানখেতে পড়ে গেলে চালকের সহকারীসহ দুজন আহত হন।

চট্টগ্রামে মার্চ মাসজুড়ে ছোট-বড় সড়ক দুর্ঘটনা ঘটেছে প্রায় প্রতিদিনই। কোথাও প্রাণহানি, কোথাও আহত, আবার কোথাও শুধু যানবাহনের ক্ষতি হয়েছে। তবে সব দুর্ঘটনার হিসাব সরকারি খাতায় নেই। পুলিশ বলছে, সাধারণত গুরুতর হতাহত বা বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতি না হলে অনেকেই থানায় অভিযোগ করেন না। অনেক ঘটনা নিজেদের মধ্যে মীমাংসা হয়ে যায়। এ কারণে দুর্ঘটনার একটি অংশ হিসাবের বাইরে থেকে যায়।

নিরাপদ সড়ক ব্যবস্থা নিশ্চিত করার জন্য দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন সংগঠন সরকারের কাছে দাবি জানিয়ে আসছে। কিন্তু সড়কে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা, যানবাহন চলাচল নিয়ন্ত্রণ, ফিটনেসবিহীন যানবাহন বন্ধ এবং অদক্ষ চালকদের নিয়ন্ত্রণে কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে সড়ক দুর্ঘটনা কমানো সম্ভব হবে না বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। 

ঈদের আনন্দঘন সময়ে ঘরমুখো মানুষের যাত্রা নিরাপদ করার কথা থাকলেও বাস্তবে সেই যাত্রাই অনেক পরিবারের জন্য হয়ে উঠেছে জীবনের শেষ যাত্রা। প্রতি বছর ঈদ এলেই সড়ক দুর্ঘটনা বাড়ে এই চিত্র যেন এখন নিয়মে পরিণত হয়েছে। আর এসব দুর্ঘটনায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে সাধারণ মানুষ, যারা শুধু পরিবার-পরিজনের সঙ্গে ঈদের আনন্দ ভাগাভাগি করতে বাড়ি ফিরছিলেন।

পটিয়া হাইওয়ে থানার ওসি হারুনুর রশিদ কালবেলাকে বলেন, দীর্ঘ সময় ধরে বিরতিহীনভাবে গাড়ি চালানো সড়ক দুর্ঘটনার একটি বড় কারণ। উত্তরাঞ্চল থেকে কক্সবাজার কিংবা ঢাকা থেকে কক্সবাজারের মতো দীর্ঘ রুটে অনেক চালক টানা ২০ থেকে ২২ ঘণ্টা পর্যন্ত গাড়ি চালান। এসব দূরপাল্লার বাসে অধিকাংশ ক্ষেত্রে একজন চালকই দায়িত্ব পালন করেন, বিকল্প চালকের ব্যবস্থা থাকে না। এতে ক্লান্তি ও অসতর্কতার ঝুঁকি বাড়ে।

তিনি আরও বলেন, সড়কের সক্ষমতার তুলনায় অতিরিক্ত যানবাহন চলাচল, একে অপরকে ছাড়িয়ে যাওয়ার প্রতিযোগিতা এবং বেপরোয়া ওভারটেকিং দুর্ঘটনার হার বাড়াচ্ছে। অনেক চালক ট্রাফিক আইন অমান্য করেন, এমনকি দুর্ঘটনাপ্রবণ এলাকায় সতর্কবার্তা থাকা সত্ত্বেও ধীরগতিতে চলেন না। পাশাপাশি পথচারীদের অসচেতন পারাপার, চালকদের অদক্ষতা এবং সড়কের নির্মাণ ত্রুটি— বিশেষ করে সার্ভিস লেনের অভাব- এসব কারণও দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়িয়ে দিচ্ছে।

চট্টগ্রাম কক্সবাজার মহাসড়কে দুর্ঘটনার কারণ সম্পর্কে অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ট্রাফিক) শেখ মো. সেলিম কালবেলাকে বলেন, মহাসড়কটি ছোট হওয়া সত্ত্বেও চলাচলকারী যানবাহনের সংখ্যা অত্যধিক। অনেক চালকের অসতর্কতা এবং ঝুঁকিপূর্ণ ওভারটেকিং দুর্ঘটনার মূল কারণ। সড়কের অবস্থা, যানবাহন নিয়ন্ত্রণে ঘাটতি ও সচেতনতার অভাবও দুর্ঘটনার মাত্রা বাড়াচ্ছে।

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow