# তদন্তের নির্দেশ বিএসইসির
# ১৪ কার্যদিবসে দাম বেড়েছে ১২৭ দশমিক ৭২ শতাংশ
# অপ্রকাশিত মূল্য সংবেদশীল তথ্য নেই
# নয় মাসে লোকসান ১৮ লাখ ৭৫ হাজার টাকা
দেশের শেয়ারবাজারে রূপকথার আলাদিনের চেরাগের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছে লোকসানে নিমজ্জিত ইনফরমেশন সার্ভিসেস নেটওয়ার্ক লিমিটেড (আইএসএন)। মাত্র ১৪ কার্যদিবসে কোম্পানিটির শেয়ারের দাম বেড়ে দ্বিগুণের বেশি হয়ে গেছে।
অবশ্য শুধু শেষ ১৪ কার্যদিবস নয়, কোম্পানিটির শেয়ারের দাম তিন মাসের বেশি সময় ধরে বাড়ছে। অস্বাভাবিক হারে দাম বাড়ায় ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই) থেকে বিনিয়োগকারীদের সতর্ক করে সতর্কবার্তাও প্রকাশ করা হয়েছে। এরপরও দাম বাড়ার প্রবণতা থামেনি। বরং লাফিয়ে লাফিয়ে দাম বেড়েই চলেছে। তিন মাসের মধ্যে কোম্পানির শেয়ারের দাম বেড়ে প্রায় তিনগুণ হয়ে গেছে।
প্রতিষ্ঠানটির শেয়ারের এমন দাম বাড়াকে অস্বাভাবিক বলছেন শেয়ারবাজার সংশ্লিষ্টরা। তারা বলছেন, ইনফরমেশন সার্ভিসেসে নেটওয়ার্কের আর্থিক ভিত্তি দুর্বল। কোম্পানিটি লোকসানের মধ্যে রয়েছে। আবার লভ্যাংশের অতীত ইতিহাসও খুব একটা ভালো না। এমন একটি কোম্পানির শেয়ারের দাম ১৪ দিনে ১০০ শতাংশের বেশি বেড়ে যাওয়া কিছুতেই স্বভাবিক ঘটনা না। এই দাম বাড়ার পেছনে কোনো বিশেষ চক্রের হাত থাকতে পারে।
এদিকে কোম্পানিটির শেয়ারের এমন অস্বাভাবিক দাম বাড়ার কারণ ক্ষতিয়ে দেখতে এরই মধ্যে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) থেকে ডিএসইকে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। ডিএসই থেকেও সম্প্রতি কোম্পানিটির শেয়ারের দাম বাড়াকে অস্বাভাবিক বলে অভিহিত করা হয়েছে।
শেয়ারের অস্বাভাবিক দাম বাড়ার পরিপ্রেক্ষিতে সম্প্রতি ডিএসই থেকে কোম্পানিটির কর্তৃপক্ষকে নোটিশ দেওয়া হয়। নোটিশের জবাবে কোম্পানিটির কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, সম্প্রতি শেয়ারের দাম যে অস্বাভাবিক হারে বেড়েছে তার পেছনে কোনো অপ্রকাশিত মূল্য সংবেদনশীল তথ্য নেই।
তথ্য পর্যালোচনায় দেখা যায়, গত ৭ আগস্ট ইনফরমেশন সার্ভিসেসে নেটওয়ার্কের প্রতিটি শেয়ারের দাম ছিল ৪২ টাকা ২০ পয়সা। সেখান থেকে লাফিয়ে লাফিয়ে বেড়ে ২৭ আগস্ট লেনদেন শেষে প্রতিটি শেয়ারের দাম দাঁড়িয়েছে ৯৬ টাকা ১০ পয়সা। অর্থাৎ গত ১৪ কার্যদিবসে প্রতিটি শেয়ারের দাম বেড়েছে ৫৩ টাকা ৯০ পয়সা বা ১২৭ দশমিক ৭২ শতাংশ।
শুধু গত ১৪ কার্যদিবস নয়, চলতি বছরের ৩০ এপ্রিলের পর থেকেই কোম্পানিটির শেয়ারের দাম বাড়ছে। গত ৩০ এপ্রিল কোম্পানিটির প্রতিটি শেয়ারের দাম ছিল ৩৩ টাকা ৭০ পয়সা। অর্থাৎ সাড়ে তিন মাসের ব্যবধানে প্রতিটি শেয়ারের দাম বেড়েছে ৬২ টাকা ৪০ পয়সা বা ১৮৫ দশমিক ১৬ শতাংশ।
অন্যভাবে বলা যায়, যদি কোনো বিনিয়োগকারী গত ৩০ এপ্রিল ইনফরমেশন সার্ভিসেস নেটওয়ার্কের ১০ লাখ টাকার শেয়ার কেনেন, তাহলে এখন তার বাজারমূল্য ২৮ লাখ ৫১ হাজার ৬৩২ টাকা। এ হিসাবে ১০ লাখ টাকা খাটিয়ে সাড়ে তিন মাসেই মুনাফা হয়েছে ১৮ লাখ ৫১ হাজার টাকার বেশি।
- আরও পড়ুন
- আলুর সর্বনিম্ন দাম বেঁধে দিলো সরকার
- বেসরকারি খাতে যাচ্ছে ‘নগদ’, বিনিয়োগকারী খুঁজছে বাংলাদেশ ব্যাংক
আর শেষ ১৪ কার্যদিবসেও এই মুনাফার পরিমাণ কম না। কোনো বিনিয়োগকারী ৭ আগস্ট কোম্পানিটির ১০ লাখ টাকার শেয়ার কিনলে তার বাজারমূল্য এখন ২২ লাখ ৭৭ হাজার ২৫১ টাকা। অর্থাৎ ১০ লাখ টাকা ২০ দিন খাটিয়েই ১২ লাখ ৭৭ হাজার টাকার বেশি মুনাফা হয়েছে। এ যেন রূপকথার ‘আলাদিনের চেরাগ’ পাওয়ার মতো ঘটনা!
শেয়ারের এমন দাম বাড়া কোম্পানিটির সর্বশেষ প্রকাশিত আর্থিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৪ সালের জুন থেকে চলতি বছরের মার্চ পর্যন্ত নয় মাসের ব্যবসায় লোকসান হয়েছে ১৮ লাখ ৭৫ হাজার ৬৬৪ টাকা। এতে শেয়ারপ্রতি ১৭ পয়সা লোকসান হয়েছে।
২০২৪ সালের ৩০ জুন সমাপ্ত বছরে কোম্পানিটি বিনিয়োগকারীদের শূন্য দশমিক ৫০ শতাংশ নগদ লভ্যাংশ দিয়েছে। তার আগে ২০২৩ সালে ১ শতাংশ, ২০২২ সালে ৩ শতাংশ, ২০২০ সালে ১ শতাংশ এবং ২০১৯ সালে ১ শতাংশ নগদ লভ্যাংশ দেয়। অর্থাৎ কোম্পানিটির লভ্যাংশের হার খুব একটা ভালো না।
২০০২ সালে শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত হওয়া কোম্পানিটির পরিশোধিত মূলধন মাত্র ১০ কোটি ৯২ লাখ টাকা। শেয়ার সংখ্যা এক কোটি ৯ লাখ ২০ হাজার ৩টি। এর মধ্যে ২১ দশমিক ৪৭ শতাংশ শেয়ার আছে উদ্যোক্তা ও পরিচালকদের কাছে। বাকি শেয়ারের মধ্যে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের কাছে ৬৮ দশমিক ৭৪ শতাংশ এবং প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের কাছে ৯ দশমিক ৭৯ শতাংশ শেয়ার রয়েছে।
ডিএসইর এক সদস্য বলেন, যে কোম্পানি লোকসানে নিমজ্জিত, আবার লভ্যাংশ দেয় এক-দুই শতাংশ- সেই কোম্পানির শেয়ারের দাম প্রায় ১০০ টাকা। এটা কিছুতেই স্বাভাবিক হতে পারে না। খোলা চোখেই বোঝা যায়, এই দাম বাড়ার পেছনে কোনো বিশেষ চক্র আছে। বিনিয়োগকারীদের কোম্পানির শেয়ারে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে সতর্কতা অবলম্বন করা উচিত।
তিনি আরও বলেন, আতীতে আমরা অনেক কোম্পানির শেয়ারের দাম অস্বাভাবিক হারে বাড়তে দেখেছি। এরপর সাধারণ বিনিয়োগকারীদের বড় ধরনের লোকসানের মধ্যেও পড়তে দেখেছি। কারণ অস্বাভাবিক দম বাড়ার পর অস্বাভাবিক দরপতনও হয়। কোন বিশেষ চক্র এই দাম বাড়ানোর পেছনে রয়েছে, নিয়ন্ত্রক সংস্থার উচিত তা ক্ষতিয়ে দেখে বের করা। যদি কেউ আইন লঙ্ঘন করে অবশ্যই তার বিরুদ্ধে পদক্ষেপ নিতে হবে।
ডিএসইর দায়িত্বশীল এক কর্মকর্তা জাগো নিউজকে বলেন, ইনফরমেশন সার্ভিসেস নেটওয়ার্কের শেয়ারের দাম অস্বাভাবিক হারে বাড়ার বিষয়টি নজরদারি করা হচ্ছে। শেয়ারের দাম বাড়ার ক্ষেত্রে কোনো অসংগতি থাকলে সে অনুযায়ী প্রতিবেদন তৈরি করে নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিএসইসিকে দেওয়া হবে।
যোগাযোগ করা হলে বিএসইসির পরিচালক ও মুখপাত্র মো. আবুল কালাম জাগো নিউজকে বলেন, ইনফরমেশন সার্ভিসেস নেটওয়ার্কের অস্বাভাবিক দাম বাড়ার বিষয়টি ক্ষতি দেখতে এরই মধ্যে ডিএসইকে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। ডিএসই বিষয়টি ক্ষতিয়ে দেখবে।
এমএএস/কেএসআর/জিকেএস