এইচএসসিতে ৩৬ শতাংশ অনুপস্থিতি: আমরা কি একটি প্রজন্মকে হারাচ্ছি?
শতকরা ৩৬ জন শিক্ষার্থী যে উচ্চমাধ্যমিক ও সমমানের অন্য পরীক্ষায় অংশ নিচ্ছে না, এটা ভাবিয়ে তুলেছে সবাইকে। এরা দুই বছর কলেজে পড়েছে, পরীক্ষা দেবে বলে নিবন্ধনও করেছে, কিন্তু শেষ পর্যন্ত পরীক্ষা দিতে আসেনি। প্রতি একশ ছেলেমেয়ের মধ্যে ছত্রিশ জন ছেলেমেয়ে পরীক্ষা হলে অনুপস্থিত। এত গুরুত্বপূর্ণ একটি পরীক্ষায় ৩৬ শতাংশ ছাত্রছাত্রী পরীক্ষা দিচ্ছে না, কিন্তু কেন? খবরটা জানার পর থেকে ক্রমাগত মনে হচ্ছে, এর জন্য দায়ী কে? কেন এই ছেলেমেয়েগুলো পরীক্ষা দিতে পারল না? দায়ী কি পরিবার, সমাজ, রাজনীতি, ব্যবস্থা, নাকি রাষ্ট্র? দায়ী আসলে আমরা সবাই, পুরো ব্যবস্থাই। তবে চট করে এর কারণ অনুসন্ধান করা সহজ হবে না। এই ঝরে পড়ার হার খুবই উদ্বেগজনক। এভাবে যদি উচ্চশিক্ষার দ্বারপ্রান্তে এসে আমাদের সন্তানরা পড়াশোনা ছেড়ে দেয়, তাহলে এর নেতিবাচক প্রভাব পড়বে অর্থনীতির ওপর। শিক্ষার্থীরা উচ্চমাধ্যমিক বা এইচএসসি পরীক্ষায় অংশ নেয়, কারণ উচ্চশিক্ষায় ভর্তির ন্যূনতম শিক্ষাগত যোগ্যতা হিসেবে এইচএসসি পাস বাধ্যতামূলক। এ ছাড়া যেকোনো ধরনের সরকারি বা বেসরকারি চাকরি, ব্যবসা-বাণিজ্য—সব ক্ষেত্রেই এইচএসসির সনদ লাগে। অভিবাসী শ্রমিক
শতকরা ৩৬ জন শিক্ষার্থী যে উচ্চমাধ্যমিক ও সমমানের অন্য পরীক্ষায় অংশ নিচ্ছে না, এটা ভাবিয়ে তুলেছে সবাইকে। এরা দুই বছর কলেজে পড়েছে, পরীক্ষা দেবে বলে নিবন্ধনও করেছে, কিন্তু শেষ পর্যন্ত পরীক্ষা দিতে আসেনি। প্রতি একশ ছেলেমেয়ের মধ্যে ছত্রিশ জন ছেলেমেয়ে পরীক্ষা হলে অনুপস্থিত। এত গুরুত্বপূর্ণ একটি পরীক্ষায় ৩৬ শতাংশ ছাত্রছাত্রী পরীক্ষা দিচ্ছে না, কিন্তু কেন?
খবরটা জানার পর থেকে ক্রমাগত মনে হচ্ছে, এর জন্য দায়ী কে? কেন এই ছেলেমেয়েগুলো পরীক্ষা দিতে পারল না? দায়ী কি পরিবার, সমাজ, রাজনীতি, ব্যবস্থা, নাকি রাষ্ট্র? দায়ী আসলে আমরা সবাই, পুরো ব্যবস্থাই।
তবে চট করে এর কারণ অনুসন্ধান করা সহজ হবে না। এই ঝরে পড়ার হার খুবই উদ্বেগজনক। এভাবে যদি উচ্চশিক্ষার দ্বারপ্রান্তে এসে আমাদের সন্তানরা পড়াশোনা ছেড়ে দেয়, তাহলে এর নেতিবাচক প্রভাব পড়বে অর্থনীতির ওপর।
শিক্ষার্থীরা উচ্চমাধ্যমিক বা এইচএসসি পরীক্ষায় অংশ নেয়, কারণ উচ্চশিক্ষায় ভর্তির ন্যূনতম শিক্ষাগত যোগ্যতা হিসেবে এইচএসসি পাস বাধ্যতামূলক। এ ছাড়া যেকোনো ধরনের সরকারি বা বেসরকারি চাকরি, ব্যবসা-বাণিজ্য—সব ক্ষেত্রেই এইচএসসির সনদ লাগে। অভিবাসী শ্রমিক হিসেবে বিদেশে যেতে চাইলেও সনদ দরকার হয়। এরপরও কেন ছেলেমেয়েরা পরীক্ষার হলে গেল না?
শিক্ষা ও শিক্ষাব্যবস্থার ওপর আস্থাহীনতা খুবই বিপজ্জনক হয়ে উঠতে পারে। এতগুলো শিক্ষার্থী পড়া বাদ দিয়ে বসে থাকবে না, সবাই কাজকর্মেও নিয়োজিত হবে না। তাহলে এরা করবে কী? কোথায় যাবে? এরা আয়ের পথ হিসেবে কিশোর গ্যাং গঠন করতে পারে, এবং করছেও। অপরাধজগতের সঙ্গে যোগাযোগ বাড়বে এবং পাশাপাশি বাড়বে মাদক গ্রহণের হার।
প্রস্তুতি ঠিক হয়নি, শরীর অসুস্থ, ব্যক্তিগত সমস্যা—এই কারণগুলো এ ক্ষেত্রে তুচ্ছ। দরিদ্র পরিবারের অনেক শিক্ষার্থী শ্রমবাজারে যোগ দিয়েছে বা কোনো মেয়ের বিয়ে হয়ে গেছে, কিন্তু সেই সংখ্যাও কি এতটাই বেশি? আগেও এসএসসি ও এইচএসসির পর সাধারণত ১০ থেকে ১৫ শতাংশ শিক্ষার্থী ঝরে পড়ত। কিন্তু এবার মাদ্রাসায় ৪৪ শতাংশ, কারিগরি শিক্ষায় ৫৪ শতাংশ এবং সাধারণ শিক্ষায় ৩৩ শতাংশ শিক্ষার্থী এইচএসসি পরীক্ষায় অংশ নেয়নি। এই সংখ্যা অত্যন্ত উদ্বেগজনক এবং সবার কাছেই বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে।
অনেকেই মনে করছেন, বিগত দুই বছরের রাজনৈতিক অস্থিরতা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বিশৃঙ্খলা, মানসম্মত শিক্ষা না দেওয়া, শিক্ষকের অনুপস্থিতি, দারিদ্র্য, বাল্যবিয়ে ও শিশুশ্রমসহ নানা কারণে এই পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে।
জুলাই আন্দোলন এবং অন্তর্বর্তী সরকারের সময় শিক্ষাঙ্গনে সৃষ্ট বিশৃঙ্খলার কারণে অনেক শিক্ষার্থী নিয়মিত শ্রেণিবিমুখ হয়েছে। পড়াশোনার প্রতি অনেকের আগ্রহও হারিয়ে গেছে। কিশোর বয়সে পড়ার প্রতি আগ্রহ একবার নষ্ট হয়ে গেলে তা ফিরিয়ে আনা খুব কঠিন।
অন্তর্বর্তী সরকারের সময় দাবি আদায়ের অংশ হিসেবে ২০২৫ সালে অটোপাস দেওয়া হয়েছিল। তখন অনেকেই এর বিরোধিতা করেছিলেন, কিন্তু তা শোনা হয়নি। অটোপাসের দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতি নিয়েও কোনো আলোচনা হয়নি। ফলে শিক্ষার্থীদের শিখন-ঘাটতি তৈরি হয়েছে।
তবে সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা ও শিক্ষাবিদ রাশেদা কে চৌধুরী একটু ভিন্ন কথা বলেছেন। তিনি বলেছেন, ‘এই ঝরে পড়া শুধু দুই বছরের বিষয় নয়। করোনা-পরবর্তী সময়ে শিক্ষাঙ্গনের ক্ষতি ঠিকমতো নিরূপণ করা হয়নি, সেই ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে কার্যকর ব্যবস্থাও নেওয়া হয়নি। করোনা-পরবর্তী সময় ধরলে প্রায় পাঁচ বছর ধরে আমরা একটি টানাপোড়েনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছি। প্রথমত, পুরো শিক্ষাঙ্গন করোনা-পরবর্তী ক্ষতি সামাল দিতে পারেনি। দ্বিতীয়ত, আমরা এমন একটি সময় পার করেছি, যখন ঘন ঘন শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক পরিবর্তন করা হয়েছে।’ (বাংলা ট্রিবিউন)
২০২৬ সালে নতুন সরকার আসার পর পড়াশোনার পরিবেশ স্বাভাবিক হওয়া শুরু করেছে। নিয়ম মেনে পরীক্ষা ও ক্লাস শুরু হয়েছে, যার ফলে ছাত্রছাত্রীদের মধ্যে একধরনের চাপ পড়েছে বলে মনে হচ্ছে। এই চাপ থেকেই পড়াশোনার প্রতি ভীতি তৈরি হতে পারে। দীর্ঘদিন পড়াশোনার প্রতি মনোযোগহীনতার কারণে তারা হয়তো পরীক্ষাকে এড়িয়ে যেতে চেয়েছে। আসলে ভালো গবেষণা না হলে এই ঝরে পড়ার পেছনের কারণ খুঁজে পাওয়া কঠিন হবে; শুধু অনুমান করা যাবে।
বাল্যবিয়ের বিষয়টি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। করোনাকাল থেকে বাল্যবিয়ের যে প্রবণতা শুরু হয়েছিল, তৎকালীন সরকার তা সামাল দিতে পারছিল না। আর পরবর্তীতে ২০২৪-২৫ সালে বাল্যবিয়ের বিষয়টি একেবারে লোকচক্ষুর অন্তরালে চলে যায়। রাজনৈতিক ডামাডোলে অসংখ্য শিশু-কিশোরীর বিয়ে হয়ে গেছে। বাল্যবিয়ের মতো ঘটনাও শিক্ষার্থী ঝরে পড়ার হার অনেক বাড়িয়েছে।
শিক্ষা ব্যয়বহুল হয়ে উঠছে। কিছু সরকারি সুবিধা থাকার পরও নিয়মিত শিক্ষা ব্যয় বহন করা অনেক পরিবারের পক্ষেই সম্ভব হয় না। তাই তারা ভাবছে, সন্তান টাকা খরচ করে পড়বে, নাকি কাজ করে পরিবারের পাশে দাঁড়াবে? অর্থাভাবে এই শিক্ষার্থীরা ঠিকমতো পড়াশোনা করতে পারে না। কাজেই পরীক্ষার প্রস্তুতি গ্রহণ করা কঠিন হয়ে পড়ে এবং একসময় তারা আর পরীক্ষার হলে যেতে চায় না।
দেশে অনেক কলকারখানা বন্ধ হয়ে গেছে, অনেকে কাজ হারিয়েছেন, বিভিন্ন বেসরকারি অফিসেও অবস্থা একই রকম। ফলে বেকারত্ব বেড়েছে, পাশাপাশি বেড়েছে পারিবারিক উপার্জনে যুক্ত হওয়া কিশোরদের সংখ্যা। পড়াশোনা ছেড়ে যেকোনো ধরনের কাজে ঢুকে যাচ্ছে শিশু-কিশোররা।
বেড়েছে অভ্যন্তরীণ অভিবাসন। অনেক শিক্ষার্থী বাবা-মায়ের কর্মসংস্থান হারানোর কারণে শহর থেকে গ্রামে চলে যাচ্ছে বা গেছে। এই নীরব অভিবাসন চলছেই, আর এর ফলে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে শিশু ও শিক্ষা।
অনেকেই ভেবেছিল, ছাত্রছাত্রীদের জন্য সাধারণ শিক্ষার বদলে কারিগরি শিক্ষা বেশি ভালো হবে। তারা এইচএসসি পাস করে কোনো একটি বিষয়ে প্রশিক্ষণ নিয়ে কাজ শুরু করতে পারবে। কিন্তু ২০২৬ সালে দেখা যাচ্ছে, কারিগরি শিক্ষাতেই অধিকাংশ শিক্ষার্থী অনুপস্থিত। এ বছর নিয়মিত শিক্ষার্থীদের মধ্যে ৫৪ শতাংশের বেশি পরীক্ষার ফরমই পূরণ করেনি।
দরিদ্র পরিবারের অনেক শিক্ষার্থী পড়াশোনা ছেড়ে দেওয়াকে বড় ক্ষতি বলে মনে করছে না। কারণ সাধারণ শিক্ষাব্যবস্থা তাদের কর্মজীবনের জন্য খুব একটা কার্যকর হচ্ছে না। তাই প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরেও অনিয়মিত উপস্থিতির প্রবণতা দেখা যাচ্ছে।
শিক্ষালাভের ফলাফলকে লাভজনক হিসেবে দেখাতে না পারলে ভবিষ্যতে আরও ছাত্রছাত্রী ঝরে পড়তে বাধ্য হবে। এইচএসসি, অনার্স, মাস্টার্স—এই ডিগ্রিগুলো অর্জন করার জন্য অনেক সময়, অর্থ, ধৈর্য ও সহায়তা দরকার। এত কিছুর পরও যখন শেষে চাকরি পাওয়া যায় না, দারিদ্র্যের মুখোমুখি হতে হয়, ব্যবসার পুঁজি ও নিরাপত্তা পাওয়া যায় না, তখন পড়াশোনা টেনে নিয়ে যাওয়াটা অনেকের কাছেই যুক্তিহীন মনে হতে পারে। তাই এর কারণ খুঁজে বের করার জন্য নীতিনির্ধারক ও সরকারের পক্ষ থেকে গবেষণা করতে হবে। ঝরে পড়ার মূল কারণগুলো চিহ্নিত করতে না পারলে বিপদ আরও বাড়বে।
শিক্ষা ও শিক্ষাব্যবস্থার ওপর আস্থাহীনতা খুবই বিপজ্জনক হয়ে উঠতে পারে। এতগুলো শিক্ষার্থী পড়া বাদ দিয়ে বসে থাকবে না, সবাই কাজকর্মেও নিয়োজিত হবে না। তাহলে এরা করবে কী? কোথায় যাবে? এরা আয়ের পথ হিসেবে কিশোর গ্যাং গঠন করতে পারে, এবং করছেও। অপরাধজগতের সঙ্গে যোগাযোগ বাড়বে এবং পাশাপাশি বাড়বে মাদক গ্রহণের হার।
এরা যদি দেশ, সমাজ ও শিক্ষা থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়—তাহলে আমাদের কোনো ভবিষ্যৎ থাকবে না। সব অর্জন শূন্য হয়ে যাবে। কাজেই শিক্ষাখাতে বরাদ্দ বাড়ানোর পাশাপাশি বাস্তবসম্মত ব্যবস্থাপনা ও মানোন্নয়নও জরুরি। তবে সবচেয়ে আগে এই ঝরে পড়ার কারণ খুঁজে বের করে ব্যবস্থা নিতে হবে।
৭ জুলাই, ২০২৬
লেখক : যোগাযোগ বিশেষজ্ঞ ও কলাম লেখক।
এইচআর/এএসএম
What's Your Reaction?