এক কৃষ্ণাঙ্গ খেলোয়াড়ের বাধা অতিক্রমের গল্প

১৯৯০ সালে ইতালি আয়োজন করেছিল ফুটবল বিশ্বকাপের ১৪তম আসর। দীর্ঘ চার দশক পর সে বছর যখন ফুটবলের বিশ্বমঞ্চে ফিরে আসে যুক্তরাষ্ট্র, তখন সেই দলের একজন গুরুত্বপূর্ণ সদস্য ছিলেন ডেসমন্ড আর্মস্ট্রং। তিনি কেবল একজন ডিফেন্ডার ছিলেন না—হয়ে উঠেছিলেন এক ইতিহাসের অংশ। তবে সেই ইতিহাসের শুরুটা প্রশংসা ছিল না, বরং তিক্ত বাধার মুখোমুখি দাঁড়ানো এক তরুণের গল্প। বিশ্বকাপে প্রথম সংবাদ সম্মেলনে যখন ২৫ বছর বয়সী কৃষ্ণাঙ্গ ডেসমন্ড আর্মস্ট্রং সাংবাদিকদের সামনে দাঁড়ালেন, তখন প্রথম প্রশ্নটি ছিল না যুক্তরাষ্ট্রের ৪০ বছরের মধ্যে প্রথমবার বিশ্বকাপে ওঠার অসাধারণ অর্জন নিয়ে। বরং তাকে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল— ‘আপনি বাস্কেটবল খেলছেন না কেন?’ ২৫ বছর বয়সী এই ডিফেন্ডার, যিনি তখন যুক্তরাষ্ট্রের হয়ে বিশ্বকাপে খেলতে যাওয়া প্রথম কৃষ্ণাঙ্গ খেলোয়াড় হতে যাচ্ছিলেন, এই প্রশ্নে বিস্মিত হয়েছিলেন। আর্মস্ট্রং বিবিসি স্পোর্টকে বলেন, ‘কোনো অভিনন্দন ছিল না, বা কেউ জিজ্ঞেস করেনি আপনি এখানে এসে কতটা উত্তেজিত। বরং ধারণাটা ছিল—তুমি আমেরিকান, তুমি কৃষ্ণাঙ্গ, তাহলে তোমার বাস্কেটবল খেলা উচিত।’ তিনি আরও বলেন, ‘এখানে আসা নিয়েই সন্দেহ ছিল, তারপর আবার প্

এক কৃষ্ণাঙ্গ খেলোয়াড়ের বাধা অতিক্রমের গল্প
১৯৯০ সালে ইতালি আয়োজন করেছিল ফুটবল বিশ্বকাপের ১৪তম আসর। দীর্ঘ চার দশক পর সে বছর যখন ফুটবলের বিশ্বমঞ্চে ফিরে আসে যুক্তরাষ্ট্র, তখন সেই দলের একজন গুরুত্বপূর্ণ সদস্য ছিলেন ডেসমন্ড আর্মস্ট্রং। তিনি কেবল একজন ডিফেন্ডার ছিলেন না—হয়ে উঠেছিলেন এক ইতিহাসের অংশ। তবে সেই ইতিহাসের শুরুটা প্রশংসা ছিল না, বরং তিক্ত বাধার মুখোমুখি দাঁড়ানো এক তরুণের গল্প। বিশ্বকাপে প্রথম সংবাদ সম্মেলনে যখন ২৫ বছর বয়সী কৃষ্ণাঙ্গ ডেসমন্ড আর্মস্ট্রং সাংবাদিকদের সামনে দাঁড়ালেন, তখন প্রথম প্রশ্নটি ছিল না যুক্তরাষ্ট্রের ৪০ বছরের মধ্যে প্রথমবার বিশ্বকাপে ওঠার অসাধারণ অর্জন নিয়ে। বরং তাকে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল— ‘আপনি বাস্কেটবল খেলছেন না কেন?’ ২৫ বছর বয়সী এই ডিফেন্ডার, যিনি তখন যুক্তরাষ্ট্রের হয়ে বিশ্বকাপে খেলতে যাওয়া প্রথম কৃষ্ণাঙ্গ খেলোয়াড় হতে যাচ্ছিলেন, এই প্রশ্নে বিস্মিত হয়েছিলেন। আর্মস্ট্রং বিবিসি স্পোর্টকে বলেন, ‘কোনো অভিনন্দন ছিল না, বা কেউ জিজ্ঞেস করেনি আপনি এখানে এসে কতটা উত্তেজিত। বরং ধারণাটা ছিল—তুমি আমেরিকান, তুমি কৃষ্ণাঙ্গ, তাহলে তোমার বাস্কেটবল খেলা উচিত।’ তিনি আরও বলেন, ‘এখানে আসা নিয়েই সন্দেহ ছিল, তারপর আবার প্রশ্ন—তুমি এখানে কেন?’ এই ধারণার পেছনে ছিল যুক্তরাষ্ট্রের তৎকালীন সামাজিক বাস্তবতা। ফুটবল তখনো সেখানে মূলধারার খেলা হয়ে ওঠেনি। দেশটিতে ফুটবল বলতে মনে করা হতো শ্বেতাঙ্গ উচ্চবিত্ত বা মধ্যবিত্তদের খেলা। আর কৃষ্ণাঙ্গ খেলোয়াড়দের জন্য ফুটবল খেলার সুযোগ ছিল আরও সীমিত। তবে এসব বাধা পেরিয়েই ইতিহাস গড়েন আর্মস্ট্রং, যিনি হয়ে ওঠেন যুক্তরাষ্ট্রের হয়ে বিশ্বকাপে খেলা প্রথম দেশটিতে জন্মগ্রহণকারী কৃষ্ণাঙ্গ ফুটবলার। তবে সাংবাদিকদের সেই ধারণা কেটে যায় কয়েক দিন পরই, যখন ইতালির রোমে স্টাডিও অলিম্পিকোতে তিনি দুর্দান্ত এক রক্ষণাত্মক পারফরম্যান্সে বিশ্বমানের স্ট্রাইকার জিয়ানলুকা ভিয়ালিকে গোলশূন্য রাখেন। এই ম্যাচটি যুক্তরাষ্ট্রের ফুটবলের ইতিহাসে এক বড় মোড় পরিবর্তন হিসেবে দেখা হয়। ফুটবলে আসার শুরু ফুটবলের সঙ্গে তার যাত্রা শুরু হয়েছিল একেবারেই সাধারণভাবে। শৈশবে তিনি ওয়াশিংটন ডিসির উপকণ্ঠ থেকে মেরিল্যান্ডের একটি শ্বেতাঙ্গ প্রধান এলাকায় চলে যান। সেখানেই এক কোচের সঙ্গে পরিচয়ের মাধ্যমে তিনি প্রথম ফুটবলের সঙ্গে যুক্ত হন। একদিন টিভিতে ব্রাজিলিয়ান কিংবদন্তি পেলেকে নিউইয়র্ক কসমসের জার্সিতে দেখেন আর্মস্ট্রং। সেদিন টেলিভিশনে কিংবদন্তি পেলের খেলা দেখা তার জীবন বদলে দেয়। আর্মস্ট্রংয়ের মতে, পেলের নড়াচড়া তাকে বাস্কেটবলের পয়েন্ট গার্ডদের মতো মনে হলেও, পার্থক্য ছিল বল পায়ে নিয়ন্ত্রণে। তিনি বলেন, ‘তিনি ছিলেন পেলে। তার নড়াচড়া আমাকে বাস্কেটবলের পয়েন্ট গার্ডদের মতো মনে হয়েছিল, কিন্তু সে পা দিয়ে বল খেলছিল।’ যুক্তরাষ্ট্রের ফুটবল কাঠামোর বাস্তবতা যুক্তরাষ্ট্রে ফুটবলের উন্নয়ন ব্যবস্থা ইউরোপ ও দক্ষিণ আমেরিকার মতো নয়। এখানে ‘পে-টু-প্লে’ মডেল প্রচলিত, যেখানে উন্নত পর্যায়ে যেতে পরিবারকে বড় অঙ্কের অর্থ খরচ করতে হয়। ফলে দরিদ্র বা মধ্যবিত্ত পরিবারের অনেক প্রতিভা পিছিয়ে পড়ে। ফুটবল সাংবাদিক ফ্র্যাঙ্ক ডেল’আপা বলেন, ‘ফুটবল পৃথিবীর সবচেয়ে সহজ খেলা, কিন্তু আমেরিকায় এটাকে খেলতে টাকা লাগে—এটাই সমস্যার মূল।’ আর্মস্ট্রং নিজেও বলেন, ‘আমার পরিবার যদি শহরতলিতে না আসত, আমি কখনোই ফুটবল খেলতে পারতাম না।’ জাতীয় দলে উত্থান ও ১৯৯০ বিশ্বকাপ ১৯৮৫ সালে যুক্তরাষ্ট্রে পেশাদার লিগ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় ফুটবলারদের পথ আরও কঠিন হয়ে যায়। আর্মস্ট্রং তখন ইনডোর লিগে খেলেন এবং পরে জাতীয় দলে সুযোগ পান। ১৯৮৯ সালে যুক্তরাষ্ট্র ত্রিনিদাদ অ্যান্ড টোবাগোকে হারিয়ে ১৯৯০ বিশ্বকাপে জায়গা করে নেয়—৪০ বছরের মধ্যে প্রথমবার। আর্মস্ট্রং বলেন, ‘আমরা কোনো পেশাদার লিগ ছাড়াই বিশ্বকাপে গেলাম—অবিশ্বাস্য।’ ইতালির বিশ্বকাপে ঐতিহাসিক ম্যাচ ১৯৯০ বিশ্বকাপে যুক্তরাষ্ট্র প্রথম ম্যাচে চেকোস্লোভাকিয়ার কাছে ৫–১ গোলে হারে। দ্বিতীয় ম্যাচে স্বাগতিক ইতালির বিপক্ষে তাদের পারফরম্যান্স বিশ্বকে চমকে দেয়। ইতালির দলে ছিলেন ফ্রাঙ্কো বারেসি, পাওলো মালদিনি এবং রবার্তো বাগিও’র মতো তারকারা। আর্মস্ট্রংকে দায়িত্ব দেওয়া হয় জিয়ানলুকা ভিয়ালিকে মার্ক করার। নিজের দায়িত্ব সম্পর্কে আর্মস্ট্রং বলেন, ‘আমি মনে মনে বলছিলাম, সে বল পাবে না।’ ম্যাচটি শেষ হয় ২–১ গোলে, তবে যুক্তরাষ্ট্রের লড়াকু পারফরম্যান্স বিশ্ব ফুটবলে তাদের জন্য নতুন পরিচিতি তৈরি করে। ব্রাজিলে নতুন অধ্যায় বিশ্বকাপের পর আর্মস্ট্রং ব্রাজিলের ক্লাব সান্তোসে যোগ দেন এবং সেখানে খেলা প্রথম মার্কিন খেলোয়াড় হন। তিনি হাসতে হাসতে বলেন, ‘আমি ভেবেছিলাম আমি সমুদ্র সৈকতে যাচ্ছি, ইংল্যান্ডের ধূসর আকাশ থেকে পালাতে চাইছিলাম। তারপর শুনলাম—সান্তোস। আমি বললাম—এখনই টিকিট কেটে দাও।’ পরবর্তী জীবন ও কোচিং খেলোয়াড়ি জীবন শেষে তিনি ১৯৯৬ সালে অবসর নিয়ে কোচিংয়ে আসেন। তিনি এখন যুক্তরাষ্ট্রের টেনেসি অঞ্চলে শিশুদের ফুটবল শেখানোর কাজ করেন এবং অভিবাসী পরিবারগুলোর জন্য একটি ফুটবল কমিউনিটি গড়ে তুলেছেন। তিনি বলেন, ‘এখানে অনেক প্রতিভাবান শিশু আছে, কিন্তু সুযোগ দরকার।’ বর্তমান যুক্তরাষ্ট্র জাতীয় দলের খেলোয়াড় ক্রিস রিচার্ডস আর্মস্ট্রংয়ের বিষয়ে বলেন, ‘তার কারণেই আমরা আজ এখানে।’ তিনি আরও বলেন, ‘আমাদের ইতিহাস শুরু হয়েছে আপনাদের হাত ধরে।’ সূত্র: বিবিসি

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow