এক চুমুকে পকেট লোপাট: জনস্বাস্থ্য ও পুষ্টিচিন্তার মূল্যায়ন
রত্না মাহমুদা ডা. জাফরুল্লাহ্ চৌধুরীর (১৯৪১-২০২৩) ‘এক চুমুকে পকেট লোপাট’ বইটি পুষ্টিবিষয়ক গুরুত্বপূর্ণ রচনা। যেখানে জনস্বাস্থ্য, খাদ্য-নিরাপত্তা, পুষ্টি-সচেতনতা এবং ভোক্তা-অধিকারের প্রশ্নকে কেন্দ্র করে আলোচনা উপস্থাপিত হয়েছে। তিনি বৈজ্ঞানিক তথ্য, চিকিৎসা-অভিজ্ঞতা এবং সামাজিক বাস্তবতার সমন্বয়ে খাদ্য ও পুষ্টি সম্পর্কে প্রচলিত নানা ভ্রান্ত ধারণার সমালোচনামূলক বিশ্লেষণ করেছেন। বইটিতে সর্বমোট ১১টি গবেষণা প্রবন্ধ আছে। বইটি ২০০৯ সালে গণ প্রকাশনী থেকে গ্রন্থাকারে প্রকাশিত হয়েছে। লেখক মনে করেন, সুষম খাদ্য থেকেই প্রয়োজনীয় পুষ্টি পাওয়া সম্ভব। তাঁর লেখায় তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোর খাদ্য সংকটের একটি কাঠামোগত কারণ তুলে ধরেছেন। তাঁর মতে, বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের লক্ষ্যে খাদ্যশস্যের জমিতে তামাক, কফি ও চায়ের মতো অর্থকরী ফসল চাষ বাড়লে খাদ্য উৎপাদন কমে যায় এবং খাদ্য নিরাপত্তা হুমকির মুখে পড়ে। এর ফলে দেশ খাদ্য আমদানির ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়তে পারে। তিনি বলেছেন, ‘পৃথিবীর আর কোনো দেশের খাদ্য সংকটের অন্যতম কারণ বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের উদ্দেশ্যে তৃতীয় বিশ্বের রবিশস্যের জমিতে রবিশস্যের পরিবর্তে ন্যূনতম বা সম্পূর্ণভাবে
রত্না মাহমুদা
ডা. জাফরুল্লাহ্ চৌধুরীর (১৯৪১-২০২৩) ‘এক চুমুকে পকেট লোপাট’ বইটি পুষ্টিবিষয়ক গুরুত্বপূর্ণ রচনা। যেখানে জনস্বাস্থ্য, খাদ্য-নিরাপত্তা, পুষ্টি-সচেতনতা এবং ভোক্তা-অধিকারের প্রশ্নকে কেন্দ্র করে আলোচনা উপস্থাপিত হয়েছে। তিনি বৈজ্ঞানিক তথ্য, চিকিৎসা-অভিজ্ঞতা এবং সামাজিক বাস্তবতার সমন্বয়ে খাদ্য ও পুষ্টি সম্পর্কে প্রচলিত নানা ভ্রান্ত ধারণার সমালোচনামূলক বিশ্লেষণ করেছেন। বইটিতে সর্বমোট ১১টি গবেষণা প্রবন্ধ আছে। বইটি ২০০৯ সালে গণ প্রকাশনী থেকে গ্রন্থাকারে প্রকাশিত হয়েছে।
লেখক মনে করেন, সুষম খাদ্য থেকেই প্রয়োজনীয় পুষ্টি পাওয়া সম্ভব। তাঁর লেখায় তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোর খাদ্য সংকটের একটি কাঠামোগত কারণ তুলে ধরেছেন। তাঁর মতে, বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের লক্ষ্যে খাদ্যশস্যের জমিতে তামাক, কফি ও চায়ের মতো অর্থকরী ফসল চাষ বাড়লে খাদ্য উৎপাদন কমে যায় এবং খাদ্য নিরাপত্তা হুমকির মুখে পড়ে। এর ফলে দেশ খাদ্য আমদানির ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়তে পারে। তিনি বলেছেন, ‘পৃথিবীর আর কোনো দেশের খাদ্য সংকটের অন্যতম কারণ বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের উদ্দেশ্যে তৃতীয় বিশ্বের রবিশস্যের জমিতে রবিশস্যের পরিবর্তে ন্যূনতম বা সম্পূর্ণভাবে খাদ্যমান বিহীন অর্থকরী ফসল, যথা তামাক, কফি, চা ইত্যাদি চাষ।' (জাফরুল্লাহ্ চৌধুরী, ২০০৯: ১১৭)
বৈশ্বিক উন্নয়ন অর্থনীতি ও খাদ্যনিরাপত্তার দৃষ্টিকোণ থেকে তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ অতিরিক্ত অর্থকরী ফসলের চাষ খাদ্য উৎপাদনে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। তবে কফি, চা বা অন্যান্য অর্থকরী ফসল বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন, কর্মসংস্থান ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। তাই খাদ্যশস্য ও অর্থকরী ফসলের মধ্যে ভারসাম্যপূর্ণ কৃষিনীতি গ্রহণই সবচেয়ে কার্যকর সমাধান বলে তিনি মনে করেন। বিশ্বে খাদ্য সংকট ও অপুষ্টির জন্য জনসংখ্যা বৃদ্ধি একমাত্র দায়ী নয়। পাশাপশি উন্নত দেশগুলোর সম্পদের অপচয়, বৈষম্যমূলক ভোগ এবং অন্যায্য বণ্টনই এর প্রধান কারণ। উন্নত দেশগুলো বিপুল পরিমাণ খাদ্য ও কৃষিজ সম্পদ গবাদিপশুর খাদ্য হিসেবে ব্যবহার এবং অপচয় করে। অথচ অনুন্নত দেশের মানুষের খাদ্য হিসেবে ব্যবহার করলে বিশ্বের ক্ষুধা অনেকাংশে দূর করা সম্ভব হতো। তাই খাদ্য সংকটের প্রকৃত সমাধান জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণে নয়; খাদ্যের ন্যায্য বণ্টন, অপচয় রোধ এবং সম্পদের সুষ্ঠু ব্যবহারে নিহিত।
বিশ্বে খাদ্য সংকটের অন্যতম কারণ হলো খাদ্যশস্য উৎপাদনের পরিবর্তে রপ্তানিমুখী নগদ ফসলের চাষ, উন্নত দেশগুলোর স্বার্থকেন্দ্রিক কৃষিনীতি এবং আন্তর্জাতিক বাজারে খাদ্যপণ্যের মুনাফাভিত্তিক বাণিজ্য। পৃথিবীতে পর্যাপ্ত খাদ্য উৎপাদনের সক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও অসম বণ্টন, মজুতদারি ও বাজার নিয়ন্ত্রণের কারণে দরিদ্র দেশগুলো খাদ্য সংকটে পড়ে। তাই খাদ্য সংকটের প্রকৃত কারণ খাদ্যের অভাব নয়। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের বৈষম্যমূলক অর্থনৈতিক ব্যবস্থা ও সম্পদের অন্যায্য ব্যবহার।
পুষ্টি সম্পর্কে প্রচলিত অনেক ধারণা বৈজ্ঞানিকভাবে সঠিক নয়। অতিরিক্ত প্রোটিনের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে বিভ্রান্তিকর প্রচার মানুষের মধ্যে অপ্রয়োজনীয় পুষ্টিপণ্যের চাহিদা সৃষ্টি করেছে। ফলে মানুষ, বিশেষ করে উন্নয়নশীল দেশের পরিবারগুলো, অপ্রয়োজনীয় খাদ্যপণ্যের পেছনে অর্থ ব্যয় করছে। সঠিক পুষ্টিজ্ঞান ও সচেতনতার মাধ্যমেই এ ধরনের বিভ্রান্তি দূর করা সম্ভব। অধ্যাপক ডোনাল্ড এস. ম্যাকলারেন গবেষণার মাধ্যমে প্রমাণ করেন যে, মানুষের প্রোটিনের চাহিদা নিয়ে অতিরঞ্জিত ধারণা সৃষ্টি করা হয়েছে। বৈজ্ঞানিক সত্য দীর্ঘদিন আড়ালে রাখা হয়েছে।
মানুষের সুস্বাস্থ্যের জন্য সুষম খাদ্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আলু ভিটামিন ‘সি’র ভালো উৎস এবং শিমে প্রচুর প্রোটিন থাকায় এগুলো পুষ্টিকর খাদ্য হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ। শিমের শেকড়ে থাকা বিশেষ জীবাণু বাতাস থেকে নাইট্রোজেন সংগ্রহ করে মাটির উর্বরতা বৃদ্ধি করে। পাশাপাশি গরু, ছাগল, ভেড়া, মুরগি ও ডিম থেকেও উল্লেখযোগ্য পরিমাণ প্রোটিন পাওয়া যায়। এখানে জাফরুল্লাহ চৌধুরী সবজির পুষ্টিগুণের গুরুত্ব তুলে ধরেছেন এবং চর্বির উচ্চ শক্তিমানের কথা উল্লেখ করেছেন। তিনি বলেন, ‘সবজি যে কেবল আমিষের উৎস তাই নয়, সবজি থেকে আমরা চর্বিও পাই। চর্বি, শর্করা বা আমিষের দ্বিগুণ শক্তি সরবরাহ করে।’ (জাফরুল্লাহ্ চৌধুরী, ২০০৯: ১২২)
লেখকের উদ্দেশ্য সবজির সামগ্রিক পুষ্টিগুণ সম্পর্কে সচেতনতা সৃষ্টি করা, পুষ্টি উপাদানের পরিমাণগত তুলনা করা নয়। কিছু সবজি ও শাকজাতীয় খাদ্যে অল্প পরিমাণে আমিষ ও চর্বি থাকে। এ ছাড়া তিনি বলেছেন, শরীরের জন্য চর্বিও অপরিহার্য। চর্বি দুই ধরনের; সম্পৃক্ত ও অসম্পৃক্ত। অসম্পৃক্ত চর্বি শরীরের বৃদ্ধি, কোষ ও স্নায়ুতন্ত্রের স্বাভাবিক কার্যক্রমে ফলপ্রসু ভূমিকা রাখে। সূর্যমুখী-সয়াবিন-বাদাম ও জলপাইয়ের তেলসহ বিভিন্ন উদ্ভিজ তেল এবং কিছু প্রাণিজ খাদ্য এ ধরনের চর্বির প্রধান উৎস। তাই সুষম খাদ্য গ্রহণের মাধ্যমে প্রোটিন, ভিটামিন ও স্বাস্থ্যকর চর্বির চাহিদা পূরণ করে সুস্থ থাকা সম্ভব।
প্রকৃতপক্ষে শক্তি অর্জনের জন্য সুষম ও পুষ্টিকর খাদ্যাভ্যাসই সবচেয়ে কার্যকর। তাই সচেতনভাবে খাদ্য নির্বাচন করা প্রয়োজন। ডা. জাফরুল্লাহ্ চৌধুরীর অর্ন্তভেদী পর্যবেক্ষণ ভোক্তা সচেতনতার দৃষ্টিকোণ থেকে প্রাসঙ্গিক। তবে সব পুষ্টিপণ্য বিভ্রান্তিকর নয়। অনেক পণ্য বৈজ্ঞানিক গবেষণা ও নির্দিষ্ট পুষ্টি-চাহিদার ভিত্তিতেও তৈরি হয়। তাই বৈজ্ঞানিক প্রমাণ ও ব্যক্তির পুষ্টিগত প্রয়োজন বিবেচনা করেই সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত।
জাফরুল্লাহ চৌধুরী এখানে দেখাতে চেয়েছেন বাংলাদেশের মতো পর্যাপ্ত সূর্যালোকপূর্ণ দেশে অধিকাংশ মানুষের জন্য ভিটামিন-ডি স্বাভাবিকভাবেই পাওয়া সম্ভব। তবে আমি মনে করি, মন্তব্যটি একটি নির্দিষ্ট সময়ের প্রেক্ষাপটে করা হয়েছে। বর্তমানে গবেষণায় দেখা যায়, পর্যাপ্ত সূর্যালোক থাকা সত্ত্বেও অনেক মানুষের ভিটামিন-ডি’র ঘাটতি থাকতে পারে; ফলে কিছু ক্ষেত্রে ভিটামিন-ডি ও ক্যালসিয়াম সংযোজন উপকারী হতে পারে। তাই এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণে ব্যক্তির স্বাস্থ্যগত অবস্থা ও চিকিৎসাবিজ্ঞানের সর্বশেষ তথ্য বিবেচনা করা উচিত।
তিনি পুষ্টি-সম্পর্কিত পণ্যের বিভ্রান্তিকর প্রচারণার সমালোচনা করেছেন। তিনি মনে করেন, বাস্তবে ‘মেডিসিনাল গ্লুকোজ’ নামে কোনো স্বীকৃত চিকিৎসাবৈজ্ঞানিক পরিভাষা নেই। গ্লুকোজে অপ্রয়োজনীয় উপাদান, যেমন ভিটামিন-ডি বা ক্যালসিয়াম মিশিয়ে সাধারণ মানুষের দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে ব্যবসায়িক লাভের চেষ্টা করা হয়। লেখক চিকিৎসাবিজ্ঞান ও বিশেষজ্ঞদের মতামতের আলোকে দেখিয়েছেন, অসুস্থতা দূর হওয়ার পর সাধারণ চিনি থেকেই প্রয়োজনীয় শক্তি পাওয়া সম্ভব।
ডা. জাফরুল্লাহ্ চৌধুরী বাংলাদেশের একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা, দুইবার স্বাধীনতা পদকে ভূষিত একজন মহামানব। যাঁর চিন্তা ও কর্মে সেঁটে আছে গ্রামবাংলার খেটে খাওয়া মানুষের জীবনব্যবস্থার উন্নয়নের অভিনব ছোঁয়া। গরিব–অসহায় বৃদ্ধদের সপ্তাহে একদিন গরুর মাংস দিয়ে ভাত খাওয়ানো, প্রতি সপ্তাহে একবার তাঁদের হাত-পায়ের নখ কাটা, গোসল করানো। অসহায় ভূমিহীন মানুষের পাশে বিনা স্বার্থে সেবকের মত থাকা; এসব তো আমাদের আদর্শ। আমরা যে আদর্শ ধারণ করতে গিয়েও পা পিছলে হোচট খাই। তিনিও যাপিত জীবনে কত-শত হোচট খেয়েছেন। তবু দেশকে ভালোবেসে দেশের মানুষের জন্য নীরবে নিভৃতে কাজ করে গেছেন। আবার সাধারণ মানুষের অধিকার আদায়ের প্রতিবাদের পাশাপাশি চিকিৎসা ও খাদ্যাভাসের প্রতিবাদ ছিল নান্দনিক। তাই আমরা বলতে পারি, ‘এক চুমুকে পকেট লোপাট’ বইটি রচনা করে মানুষের খাদ্যাভ্যাসকে সঠিক ও যথাযথ উপায়ে পরিচালনা করার পথ দেখিয়েছেন।
এসইউ
What's Your Reaction?


