‘এক মণ পেঁয়াজ বেচে এক কেজি মাংসও মেলে না’, বড় লোকসানে চাষিরা

ফরিদপুরে দর পতন হয়ে মাত্র ২০ টাকা কেজিতে বিক্রি হচ্ছে মসলা জাতীয় ফসল পেঁয়াজ। আর এ কারণে বড় ক্ষতির মুখে পড়েছেন উৎপাদনকারী চাষিরা। ১৫শ থেকে ১৮শ টাকা মণপ্রতি উৎপাদন খরচের ফসল ৮শ টাকা দরে বিক্রি করে তাদের মণপ্রতি হাজার টাকা লোকসান গুনতে হচ্ছে। পেঁয়াজ চাষিদের অভিযোগ, উৎপাদন মৌসুমে সার, ডিজেল, কীটনাশক, সেচ ও শ্রমিকের মজুরি কয়েকগুণ বেড়ে গেলেও পেঁয়াজের ন্যায্যমূল্য পাচ্ছেন না তারা। বাজারে প্রায় সব ধরনের নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বৃদ্ধি পেলেও পেঁয়াজের দাম দীর্ঘদিন ধরে নিম্নমুখী রয়েছে। এতে আগামী মৌসুমে অনেক কৃষক পেঁয়াজ চাষ থেকে মুখ ফিরিয়ে নিতে পারেন বলে আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। বুধবার (২৪ জুন) ফরিদপুর সদর উপজেলার মমিন খাঁর হাটে ৮শ থেকে ৯শ টাকা মণ (৪২ কেজি) দরে পেঁয়াজ বিক্রি হচ্ছে বলে জানিয়েছেন চাষি, বিক্রেতা ও বেপারীরা। ফরিদপুরের সালথা উপজেলার পেঁয়াজ চাষি আহম্মদ মাতুব্বর বলেন, এক বিঘা জমিতে পেঁয়াজ আবাদ করতে এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি খরচ হয়। বীজ, সার, শ্রমিক ও সেচ খরচ যোগ করলে লাভ তো দূরের কথা, মূলধনই উঠছে না। এক মণ পেঁয়াজ বিক্রি করে এখন এক কেজি গরুর মাংসও কেনা যায় না। এভাবে চলতে থাকলে আমরা চাষাবাদ

‘এক মণ পেঁয়াজ বেচে এক কেজি মাংসও মেলে না’, বড় লোকসানে চাষিরা

ফরিদপুরে দর পতন হয়ে মাত্র ২০ টাকা কেজিতে বিক্রি হচ্ছে মসলা জাতীয় ফসল পেঁয়াজ। আর এ কারণে বড় ক্ষতির মুখে পড়েছেন উৎপাদনকারী চাষিরা। ১৫শ থেকে ১৮শ টাকা মণপ্রতি উৎপাদন খরচের ফসল ৮শ টাকা দরে বিক্রি করে তাদের মণপ্রতি হাজার টাকা লোকসান গুনতে হচ্ছে।

পেঁয়াজ চাষিদের অভিযোগ, উৎপাদন মৌসুমে সার, ডিজেল, কীটনাশক, সেচ ও শ্রমিকের মজুরি কয়েকগুণ বেড়ে গেলেও পেঁয়াজের ন্যায্যমূল্য পাচ্ছেন না তারা। বাজারে প্রায় সব ধরনের নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বৃদ্ধি পেলেও পেঁয়াজের দাম দীর্ঘদিন ধরে নিম্নমুখী রয়েছে। এতে আগামী মৌসুমে অনেক কৃষক পেঁয়াজ চাষ থেকে মুখ ফিরিয়ে নিতে পারেন বলে আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।

বুধবার (২৪ জুন) ফরিদপুর সদর উপজেলার মমিন খাঁর হাটে ৮শ থেকে ৯শ টাকা মণ (৪২ কেজি) দরে পেঁয়াজ বিক্রি হচ্ছে বলে জানিয়েছেন চাষি, বিক্রেতা ও বেপারীরা।

ফরিদপুরের সালথা উপজেলার পেঁয়াজ চাষি আহম্মদ মাতুব্বর বলেন, এক বিঘা জমিতে পেঁয়াজ আবাদ করতে এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি খরচ হয়। বীজ, সার, শ্রমিক ও সেচ খরচ যোগ করলে লাভ তো দূরের কথা, মূলধনই উঠছে না। এক মণ পেঁয়াজ বিক্রি করে এখন এক কেজি গরুর মাংসও কেনা যায় না। এভাবে চলতে থাকলে আমরা চাষাবাদ ছেড়ে দিতে বাধ্য হবো।

ফরিদপুর সদর উপজেলার চরমাধবদিয়া ইউনিয়নের বালুদম ব্লকের করিম মাতুব্বরের পাড়ার চাষি সুজন মোল্লা বলেন, এ বছর ৪ বিঘা জমিতে পেঁয়াজ চাষাবাদ করে লক্ষাধিক টাকার লোকসান গুনতে হয়েছে। পেঁয়াজ লাগানোর সময়ে সরকারি দামে সার পাইনি, বস্তা প্রতি ৫/৭শ টাকা বেশি দামে কিনতে হয়েছে। কিন্তু পেঁয়াজ বিক্রির সময়ে আশানুরূপ দাম পাইনি। ফলে লোকসানে পড়তে হয়েছে।

সদর উপজেলার ঈশান গোপালপুর ব্লকের চাষি নাসির উদ্দীন মিয়া বলেন, উচ্চ মূল্যে সার কিনতে বাধ্য হয়েছি। শ্রমিক, চাষ, সেচ, বালাইনাশকসহ যাবতীয় খরচ ছিলো অনেক বেশি কিন্তু সেই তুলনায় পেঁয়াজ তোলার সময় দাম ছিলো কম। এ কারণে অনেকটা তখন বিক্রি না করে সংরক্ষণ করেছিলাম, কিন্তু বাজার দর এখন আরও কম। যা আমাদের মতো চাষিদের বড় ধরনের লোকসানে ফেলে দিয়েছে।

সালথা উপজেলার পাইকারি ক্রেতা সুজন মাতুীব্বর বলেন, পেঁয়াজের দাম কম হওয়ায় কৃষকদের পাশাপাশি আমাদেরও সমস্যায় পড়তে হচ্ছে। আমরা কম দামে কিনলেও অন্যান্য বাজারে বিক্রি করতে গিয়ে ভালো মূল্য পাওয়া যায় না। দাম কিছুটা বাড়লে কৃষক যেমন লাভবান হতেন, তেমনি ব্যবসায়ীরাও ব্যবসা সচল রাখতে পারতেন।

জেলার বোয়ালমারী উপজেলার কৃষক বক্কার মোল্যা বলেন, ফসল ফলাতে যে পরিমাণ পরিশ্রম ও অর্থ ব্যয় করতে হয়, সে তুলনায় বর্তমান বাজারদর খুবই হতাশাজনক। কৃষকরা বছরের পর বছর লোকসান গুনতে থাকলে এক সময় পেঁয়াজ উৎপাদন কমে যাবে। তখন আবার বাজারে সংকট তৈরি হবে।

নগরকান্দা উপজেলার কৃষক কবির শেখ বলেন, পেঁয়াজ সংরক্ষণের জন্য আমাদের পর্যাপ্ত হিমাগার বা আধুনিক গুদাম নেই। তাই বাধ্য হয়ে কম দামে বিক্রি করতে হচ্ছে। সংরক্ষণের সুযোগ থাকলে আমরা ভালো সময়ের অপেক্ষা করতে পারতাম।

ভাঙ্গা উপজেলার কৃষক হামজা মোল্যা বলেন, এখন বাজারে যা দাম, তাতে শ্রমিকের মজুরিও ওঠে না। অনেক কৃষক ঋণ নিয়ে চাষ করেছেন। তারা এখন কিস্তি পরিশোধ নিয়ে দুশ্চিন্তায় আছেন। সরকার যদি দ্রুত কোনো উদ্যোগ না নেয়, তাহলে কৃষকদের বড় ক্ষতির মুখে পড়তে হবে।

ফরিদপুর শহরের পাইকারি পেঁয়াজ ব্যবসায়ী শাহজাহান বেপারি বলেন, এ বছর উৎপাদন ভালো হয়েছে। পাশাপাশি বিভিন্ন জেলা থেকে বাজারে প্রচুর পেঁয়াজ আসছে। সরবরাহ বেশি হওয়ায় দাম কমে গেছে। তবে কৃষকদের স্বার্থ রক্ষায় বাজার ব্যবস্থাপনায় আরও কার্যকর উদ্যোগ প্রয়োজন।

কৃষি সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দেশের বাজারে চাহিদার তুলনায় উৎপাদন বেশি হওয়া এবং পর্যাপ্ত সংরক্ষণ ব্যবস্থার অভাবের কারণে প্রায় প্রতি বছরই পেঁয়াজের দাম উঠানামা করে। যখন দাম বেশি থাকে তখন ভোক্তারা ক্ষতিগ্রস্ত হন, আর যখন দাম কমে যায় তখন ক্ষতির মুখে পড়েন কৃষকরা।

ফরিদপুর কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক (ডিডি) কৃষিবিদ মো. শাহাদুজ্জামান বলেন, ফরিদপুরে প্রতিবছর উল্লেখযোগ্য পরিমাণ জমিতে পেঁয়াজের আবাদ হয় এবং কৃষকরা ভালো ফলনও পান। কিন্তু বাজারমূল্য নির্ধারণের বিষয়টি কৃষি বিভাগের হাতে নেই। আমরা কৃষকদের উৎপাদন বৃদ্ধির পাশাপাশি সংরক্ষণ ও বাজারজাতকরণ বিষয়ে পরামর্শ দিয়ে থাকি। সরকার কৃষকদের স্বার্থ রক্ষায় বিভিন্ন পর্যায়ে কাজ করছে। তবে, আমরা পেঁয়াজ সংরক্ষণের জন্য ২০২৪-২৫ অর্থ বছরে ১৪শ ৩০টি এয়ারফ্লো মেশিন পেঁয়াজ চাষিদের সরবরাহ করেছি। ২০২৬ সালে এখন পর্যন্ত ৭শ’টি বিতরণ করা হয়েছে। তবে এ বছরে ২৫শ এয়ারফ্লো মেশিন সরবরাহ করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

তিনি আরও বলেন, পেঁয়াজ সংরক্ষণ সুবিধা বাড়ানো গেলে কৃষকরা তাৎক্ষণিকভাবে কম দামে বিক্রি করতে বাধ্য হবেন না। ভবিষ্যতে এ বিষয়ে আরও প্রকল্প গ্রহণ করা হলে কৃষকরা উপকৃত হবেন বলে আমরা আশা করছি।

তবে এ বিষয়ে ফরিদপুর ৪ আসনের সংসদ সদস্য ও জাতীয়তাবাদী কৃষক দলের কেন্দ্রীয় কমিটির সাধারণ সম্পাদক শহিদুল ইসলাম বাবুল বলেন, পেঁয়াজের এই দর পতন খুবই দুঃখজনক। বিষয়টি নিয়ে আমি আজই (২৪ জুন) জাতীয় সংসদে কথা বলব। 

জেলা কৃষি বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, ফরিদপুর সদর, সালথা, নগরকান্দা, বোয়ালমারী, ভাঙ্গা, সদরপুর ও মধুখালী উপজেলায় ব্যাপকভাবে পেঁয়াজের আবাদ হয়ে থাকে। জেলার হাজার হাজার কৃষক প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে এই ফসলের ওপর নির্ভরশীল।

স্থানীয় কৃষকদের দাবি, কৃষিপণ্যের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করতে সরকারিভাবে পেঁয়াজ ক্রয়, আধুনিক সংরক্ষণাগার নির্মাণ এবং বাজারে মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য কমাতে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। অন্যথায় উৎপাদন ব্যয় বাড়তে থাকলেও লাভের মুখ না দেখায় কৃষকরা ধীরে ধীরে পেঁয়াজ চাষে আগ্রহ হারিয়ে ফেলবেন।

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow