একই দিনে চট্টগ্রামে দুই চাঞ্চল্যকর মামলার রায়

মাত্র কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে চট্টগ্রামের দুটি পৃথক আদালতে দুটি আলোচিত মামলার রায় ঘোষণা করা হয়েছে।  একদিকে নগরের ইপিজেড এলাকায় পাঁচ বছরের শিশু আলিনা ইসলাম আয়াতকে অপহরণের পর হত্যার ঘটনায় প্রধান আসামি আবীর আলীকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছেন আদালত।  অন্যদিকে বাকলিয়ায় সাড়ে তিন বছরের এক শিশুকে ধর্ষণের ঘটনায় মাত্র ৮ কার্যদিবসে বিচার শেষ করে একমাত্র আসামি মনির হোসেনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। একই দিনে দুটি ধর্ষণ মামলার দ্রুত ও দৃষ্টান্তমূলক রায়কে অপরাধ দমনে কঠোর বার্তা হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা। তবে এর পাশাপাশি চট্টগ্রামে শিশু নির্যাতনের সাম্প্রতিক প্রবণতা নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে। বুধবার (১৭ জুন) দুপুরে প্রথম রায়টি ঘোষণা করেন চট্টগ্রামের ষষ্ঠ অতিরিক্ত মহানগর দায়রা জজ আদালত। ২০২২ সালে আলোচিত শিশু আয়াত হত্যার ঘটনায় ৩৩ জন সাক্ষীর সাক্ষ্যগ্রহণ শেষে আদালত আসামি আবীর আলীকে মৃত্যুদণ্ড দেন। একইসঙ্গে ১ লাখ টাকা জরিমানা অনাদায়ে অতিরিক্ত কারাদণ্ড এবং মরদেহ গুম করার অপরাধে আরও ৫ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়। রাষ্ট্রপক্ষের কৌঁসুলি জালাল উদ্দিন বলেন, আদালত জরিমানার অর্থ ভুক্তভোগী পরিবারের কাছে দেওয়ার নির্দেশ দ

একই দিনে চট্টগ্রামে দুই চাঞ্চল্যকর মামলার রায়
মাত্র কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে চট্টগ্রামের দুটি পৃথক আদালতে দুটি আলোচিত মামলার রায় ঘোষণা করা হয়েছে।  একদিকে নগরের ইপিজেড এলাকায় পাঁচ বছরের শিশু আলিনা ইসলাম আয়াতকে অপহরণের পর হত্যার ঘটনায় প্রধান আসামি আবীর আলীকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছেন আদালত।  অন্যদিকে বাকলিয়ায় সাড়ে তিন বছরের এক শিশুকে ধর্ষণের ঘটনায় মাত্র ৮ কার্যদিবসে বিচার শেষ করে একমাত্র আসামি মনির হোসেনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। একই দিনে দুটি ধর্ষণ মামলার দ্রুত ও দৃষ্টান্তমূলক রায়কে অপরাধ দমনে কঠোর বার্তা হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা। তবে এর পাশাপাশি চট্টগ্রামে শিশু নির্যাতনের সাম্প্রতিক প্রবণতা নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে। বুধবার (১৭ জুন) দুপুরে প্রথম রায়টি ঘোষণা করেন চট্টগ্রামের ষষ্ঠ অতিরিক্ত মহানগর দায়রা জজ আদালত। ২০২২ সালে আলোচিত শিশু আয়াত হত্যার ঘটনায় ৩৩ জন সাক্ষীর সাক্ষ্যগ্রহণ শেষে আদালত আসামি আবীর আলীকে মৃত্যুদণ্ড দেন। একইসঙ্গে ১ লাখ টাকা জরিমানা অনাদায়ে অতিরিক্ত কারাদণ্ড এবং মরদেহ গুম করার অপরাধে আরও ৫ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়। রাষ্ট্রপক্ষের কৌঁসুলি জালাল উদ্দিন বলেন, আদালত জরিমানার অর্থ ভুক্তভোগী পরিবারের কাছে দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন। মামলার তদন্তে উঠে আসে, আবীর আলী ছিলেন শিশুটির বাসার ভাড়াটে। মুক্তিপণের উদ্দেশে অপহরণের পর পরিকল্পনা ভেস্তে গেলে শিশু আয়াতকে শ্বাসরোধে হত্যা করা হয় এবং পরে মরদেহ টুকরো করে বিভিন্ন স্থানে ফেলে দেওয়া হয়। রায় দেওয়ার সময় বিচারক তার পর্যবেক্ষণে বলেন, এই হত্যাকাণ্ডটি ছিল পূর্বপরিকল্পিত ও নিষ্ঠুর নৃশংস। বিদেশি অপরাধভিত্তিক টেলিভিশন শো দেখে অনুপ্রাণিত হয়ে আসামি যে জঘন্য অপরাধ করেছে, তা সমাজে তীব্র আতঙ্ক তৈরি করেছিল। রায় ঘোষণার পর নিহত শিশুর বাবা সোহেল রানা সন্তোষ প্রকাশ করে দ্রুত রায় কার্যকরের দাবি জানান। এদিকে এই রায়ের রেশ কাটতে না কাটতেই চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন শিশু সহিংসতা প্রতিরোধ ট্রাইব্যুনাল থেকে আসে দ্বিতীয় রায়টি। চলতি বছরের ২১ মে বাকলিয়ার চেয়ারম্যানঘাট এলাকায় সাড়ে তিন বছরের এক শিশুকে ধর্ষণের ঘটনার পর পুলিশ ও আদালতের নজিরবিহীন তৎপরতা দেখা যায়। গত ৪ জুন মামলার চার্জশিট দেওয়ার পর ৯ জুন অভিযোগ গঠন করে মাত্র ৬ কার্যদিবসে ১৮ জন সাক্ষীর সাক্ষ্যগ্রহণ শেষ করা হয়।  বুধবার ট্রাইব্যুনালের বিচারক সৈয়দা হাফসা ঝুমা একমাত্র আসামি মনির হোসেনকে যাবজ্জীবন সশ্রম কারাদণ্ডের আদেশ দেন। পাশাপাশি তাকে ৫০ হাজার টাকা জরিমানা ও অনাদায়ে আরও এক বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়। বিচার শুরু হওয়ার আট কার্যদিবসের মধ্যে ও মামলার মাত্র ২৬ দিনের মাথায় এ রায় ঘোষণা করেন আদালত। ওই ঘটনার দিন স্থানীয়দের ক্ষোভ ও পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষে সাংবাদিকসহ অন্তত ৩০ জন আহত এবং একটি পুলিশ ভ্যানে অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটেছিল। আদালত পর্যবেক্ষণে বলেন, শিশু ধর্ষণ মানবতার বিরুদ্ধে জঘন্যতম অপরাধ, যা শিশুর শারীরিক ও মানসিক বিকাশে স্থায়ী ক্ষতি করে। শিশু সহিংসতা প্রতিরোধ ট্রাইব্যুনাল চট্টগ্রামের সরকারি কৌঁসুলি মাহমুদুল আলম চৌধুরী মারুফ বলেন, বিচার শুরু হওয়ার মাত্র আট কার্যদিবসের মধ্যে শিশুধর্ষণ মামলার রায় ঘোষণা করা হয়েছে, যা একটি অনন্য দৃষ্টান্ত। তবে দুটি রায়ে স্বস্তি মিললেও চট্টগ্রামে কাটেনি শিশু নির্যাতনের মেঘ। চট্টগ্রাম আদালতের আইনজীবীরা বলছেন, বাকলিয়া ও ইপিজেডের মামলার রায় দ্রুত হলেও চট্টগ্রামের সামগ্রিক চিত্র এখনো বেশ উদ্বেগজনক। গত বছরের ৯ ডিসেম্বর ১০ বছরের এক শিশু ধর্ষণের শিকার হওয়ার পর দীর্ঘ তদন্ত শেষে ২০২৩ সালে অভিযুক্ত মোহন তালুকদারকে পলাতক দেখিয়ে আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হলেও তার চূড়ান্ত সুরাহা মেলেনি। এমনকি চলতি বছরের মে ও জুন মাসেই নগরে একের পর এক শিশু নির্যাতনের ঘটনা ঘটেছে। গত ২২ মে নগরের ডবলমুরিং ও বায়েজিদ বোস্তামী এলাকায় একই দিনে তিন শিশুকে ধর্ষণের চেষ্টার ঘটনা ঘটে। যার প্রতিবাদে স্থানীয়রা ক্ষুব্ধ হয়ে বেশ কয়েকটি হামলা ও ভাঙচুরের মাধ্যমে ক্ষোভ প্রকাশ করে। এরপর ৪ জুন চাকতাই এলাকা থেকে মানসিক ভারসাম্যহীন এক কিশোরীকে ধর্ষণের অভিযোগে জামাল নামের এক ব্যক্তিকে আটক করে পুলিশ।  এর মাত্র তিন দিন পর, হালিশহরের ছোটোপুল কাঁচাবাজার এলাকায় ৫ বছরের শিশুকে ধর্ষণের চেষ্টার অভিযোগে রুবেল নামের এক অটোরিকশাচালককে স্থানীয়রা আটকে পুলিশে সোপর্দ করে। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় ক্রিমিনোলজি অ্যান্ড পুলিশ সায়েন্স বিভাগের অ্যাসিস্ট্যান্ট প্রফেসর ও সাবেক চেয়ারম্যান সাখাওয়াত হোসেন বলেন, অপরাধের পুনরাবৃত্তি রোধে শাস্তির তীব্রতার চেয়ে শাস্তির নিশ্চয়তা এবং দ্রুততা অনেক বেশি কার্যকর ভূমিকা রাখে। চট্টগ্রামে একই দিনে দুটি চাঞ্চল্যকর মামলার রায় অপরাধীদের মনস্তত্ত্বে একটি বড় ধাক্কা দেবে। বিশেষ করে ইপিজেডের মামলায় আসামি যেভাবে অপরাধভিত্তিক টিভি শো দেখে উদ্বুদ্ধ হয়েছিল, তা আমাদের আধুনিক মিডিয়া প্রমোটেড ক্রাইম বা অনুকরণপ্রিয় অপরাধ প্রবণতার কথা মনে করিয়ে দেয়। যখন অপরাধীরা দেখে যে আধুনিক তদন্ত কৌশল যেমন পিবিআইর খণ্ডিত মরদেহ উদ্ধার এবং দ্রুত বিচারিক প্রক্রিয়ার কারণে পার পাওয়ার কোনো সুযোগ নেই, তখন সমাজে এক ধরনের অপরাধভীতি তৈরি হয়। তিনি আরও বলেন, পুলিশিং ব্যবস্থার আধুনিকায়ন, এলাকাভিত্তিক সিসিটিভি নজরদারি, দ্রুত ডিএনএ প্রোফাইলিং এবং পাড়ায় পাড়ায় সামাজিক সুরক্ষাবলয় তৈরি করা না গেলে এই মনস্তাত্ত্বিক অপরাধ প্রবণতা পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়। সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) চট্টগ্রাম জেলার সাধারণ সম্পাদক আইনজীবী আখতার কবির চৌধুরী বলেন, সাধারণত সাক্ষী সুরক্ষার অভাব, ভুক্তভোগী পরিবারের ওপর প্রভাবশালী মহলের ভয়ভীতি ও সামাজিক চাপ, পুলিশি তদন্তের দুর্বলতা, ডিএনএ রিপোর্ট পেতে দীর্ঘসূত্রতা এবং প্রসিকিউশনের গাফিলতির কারণে শিশু ধর্ষণ মামলার বিচার ব্যাহত হয়। সাক্ষীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে পুলিশের দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন না হওয়ায় অনেক মামলা দুর্বল হয়ে পড়ে। হুমকি ও সামাজিক বয়কটের কারণে অনেক পরিবার আপস করতে বাধ্য হয়।  তিনি বলেন, সীমিত ডিএনএ পরীক্ষার সক্ষমতার কারণে রিপোর্ট পেতে দীর্ঘ সময় লাগে, যা বিচার প্রক্রিয়াকে বিলম্বিত করে। এ ছাড়া তদন্তে অবহেলা, মেডিকেল পরীক্ষায় দেরি এবং বিশেষায়িত প্রশিক্ষণের অভাবও বিচার নিশ্চিত করার পথে বড় বাধা। সেই জায়গায় দাঁড়িয়ে, আজকের একদিনে স্বল্প সময়ে দুই মামলার এই রায় অনেকটাই বিচার ব্যবস্থার প্রতি সাধারণ মানুষের হারিয়ে যাওয়া আস্থা ফিরিয়ে আনবে এবং আইনি প্রক্রিয়াকে গতিশীল করতে এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে। চট্টগ্রাম জেলা ও দায়রা জজ আদালতের সিনিয়র আইনজীবী ও সাবেক জেলা পিপি অ্যাডভোকেট কফিল উদ্দিন চৌধুরী বলেন, একই দিনে দুটি চাঞ্চল্যকর ও স্পর্শকাতর মামলার রায় ঘোষণা আদালতের এক ঐতিহাসিক পদক্ষেপ। বিশেষ করে বাকলিয়ার মামলায় মাত্র ২৬ দিনের মাথায় রায় প্রমাণ করে যে, রাষ্ট্রপক্ষ, পুলিশ এবং আদালত আন্তরিক হলে আমাদের প্রচলিত আইনি কাঠামোতেই দ্রুততম সময়ে ভুক্তভোগীকে ন্যায়বিচার দেওয়া সম্ভব। এটি দেশের বিচার ব্যবস্থার ওপর জনগণের আস্থা বহুলাংশে বাড়িয়ে দেবে। তবে এই ধারাবাহিকতা যেন কেবল আলোচিত মামলাগুলোতেই সীমাবদ্ধ না থাকে, বরং প্রতিটি ঝুলে থাকা মামলার ক্ষেত্রেই এই দ্রুততা নিশ্চিত করা প্রয়োজন। বাংলাদেশ হিউম্যান রাইটস ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান অ্যাডভোকেট জিয়া হাবিব আহসান বলেন, আমরা এই রায়কে স্বাগত জানাই। কিন্তু আমাদের মনে রাখতে হবে, কেবল রায় দিলেই সমাজ থেকে শিশু নির্যাতন কমবে না, যদি না আমরা অপরাধের মূল কারণগুলো উৎপাটন করতে পারি। দ্রুত রায় হওয়ার পাশাপাশি অপরাধীদের সাজা যেন উচ্চ আদালতেও বহাল থাকে এবং তা দ্রুত কার্যকর হয়, সেটি নিশ্চিত করতে হবে। তা ছাড়া, স্থানীয় পর্যায়ে পুলিশ টহল ও সামাজিক প্রতিরোধ ব্যবস্থা জোরদার করা না গেলে শিশুদের জন্য নিরাপদ পরিবেশ গড়ে তোলা অসম্ভব।  

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow