হঠাৎ এমন একটা কাণ্ড ঘটে গিয়েছিল, যা অনুমানও করতে পারেনি কেউ। রাতারাতি চারদিকে চাউর হয়ে গিয়েছিল। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী থেকে শুরু করে সরকারের উচ্চ মহলের ঘুম হারাম হয়ে যায় মুহূর্তে। সতেরো’শ শতকের আঁকা চিত্রকর্মটির গাণিতিক মূল্য মাপকাঠিতে বিচার করা অসম্ভব। তবে তাতে যে দেশের সম্মান জড়িত রয়েছে! রাস্তার মোড়ে মোড়ে গাড়ি দাঁড় করিয়ে তল্লাশি চলে। নৌবন্দর, স্থলবন্দর, বিমানবন্দরসহ সকল জায়গা ছিল কড়া নজরদারিতে।
কে করতে পারে এমন দুঃসাহসিক কাজ? কোনো আন্তর্জাতিক পাচারকারী চক্র এতে নিশ্চয়ই জড়িত ছিল। না হলে এমন একটা দুর্লভ চিত্রকর্ম কিছুতেই হাফিস করতে পারে না সাধারণ চোরেরা। জল রঙে আঁকা চিত্রকর্মটি কে এঁকেছিল তা নিয়ে চলছিল বিস্তর গবেষণা। শিল্পীর নাম জানা না গেলেও ছবিটা যে অতি প্রাচীন তা দেখে সহজেই অনুমান করা যায়। বিরোধী দল থেকে শুরু পরিবেশবাদী সংগঠনসহ বিভিন্ন সামাজিক- রাজনৈতিক সংগঠন সরকারের বিরুদ্ধে সরব হয়ে উঠেছিল। টিভি খুললেই টকশো’তে বিশিষ্ট নাগরিকবৃন্দের রুক্ষ প্রতিক্রিয়া।
সরকার যথাসাধ্য চেষ্টা করে চিত্রকর্মটি উদ্ধারের। খরগোশের পিঠে ভর করে এক মাস পেরিয়ে গেলেও কোনো কুলকিনারা করতে পারে না। এ কারণে ছেঁচড়া চোর-ডাকাতদের অবস্থা ত্রাহি ত্রাহি; তাদের জীবন উষ্ঠাগত। এ ক্রান্তিকাল সহজে কাটবে বলে বলে মনে হয় না। যতদিন পর্যন্ত চিত্রকর্মটি উদ্ধার না হবে ততদিন এ সমস্যা থেকে উত্তরণের কোনো উপায় তাদের জানা ছিল না।
পুলিশ শেষপর্যন্ত একটা ক্লু পেয়েছিল। সে সূত্র জানান দেয় জয়তীর নাম। চুরির সাথে নাকি জয়তীও জড়িত! সকালে ক্যান্টিনে সংবাদপত্র দেখে আমি শুধু বিস্মিতই হইনি, হতবাকও হয়েছিলাম। কেন করলো জয়তী এমন কাজ? তাছাড়া তার সাথে আমার চেনা-জানা যথেষ্ট। অসম্ভব! একদম অসম্ভব! ও কখনো করতে পারেনা এমন বিশ্রী অপরাধ। আমার আবেগ- অনুভূতি রাষ্ট্রযন্ত্রের কাছে কোনো কাজেই আসবে না। আইন তার নিজস্ব গতিতে চলবে। কাছের বন্ধু হবার সুবাদে পুলিশ আমাকে ধরে নিয়ে যত প্রকার নির্যাতন করার দরকার তা করেছিল! তারপর একদিন অর্ধমৃত অবস্থায় ছেড়েও দেয়। আমি যখন জানিই না তখন তাদের কী বলবো? পুলিশ— রাষ্ট্রের সকল অভিযান ব্যর্থ। জয়তীকে কোথাও খুঁজে পাওয়া যায় না। কোথায় গেল সে? হাওয়া হয়ে গেল নাতো? নাকি তাকে দিয়ে যারা এই কাজটি করিয়েছে তারা জয়তীর কোনো ক্ষতি করেছে? বিভিন্ন প্রশ্ন এবং উত্তর সবার মনের মাঝে ঘুরপাক খেতে থাকে। আজ এখানে তো কাল সেখানে। সকল অভিযান ব্যর্থ।
এরই মাাঝে কেটে যায় বহুদিন। কোনো খোঁজ হয়নি চিত্রকর্মটির। আস্তে আস্তে পুরানো গল্প অতীত হয়ে কালের গর্ভে হারিয়ে যায়।
জয়তীকে শেষবার যখন দেখা গিয়েছিল তখন ছিল শ্রাবণের শেষ। তুজো তুজো মেঘ-রোদ্দুরের খুনসুটি আর গুড়ি গুড়ি বৃষ্টিস্নাত সময়ের লুকোচুরিতে তার সাথে দেখা। চুরির বোঝা মাথায় নিয়ে আলো-আঁধারে কাটছিল তার দিন। অনাকাঙ্ক্ষিত সময়ে অন্ধকার হয়ে যাওয়া গোধূলী বিকেলে ল্যাম্পপোস্টের নিচে পাবলিক বাসের জন্যে অপেক্ষায় ছিলাম। হঠাৎ দেখি একটি রিকশা এসে আমার পাশে দাঁড়ায়। সামনে টাঙানো পর্দা উঁচু করে বলে, ‘আকাশের অবস্থা ভীষণ খারাপ; এখানে দাঁড়িয়ে আছো যে?’
আমি জয়তীকে দেখতে মোটেও প্রস্তুত ছিলাম না। বললাম, ‘জয়তী! কোথায় ছিলে এই কয়দিন? এদিকে তো কত কিছু ঘটে যাচ্ছে।’
নিজের কষ্ট আমাকে বুঝতে না দিয়ে বলল, ‘তোমাদের মাঝেইতো আছি।’
‘তা ঠিক; তাই বলে....’
আমার কথা শেষ করতে না দিয়ে বলল, ‘চললাম, হয়তো কোন একদিন তোমার সাথে আবার দেখা হবে।’
‘কোথায় যাচ্ছো তুমি?’
জয়তী ক্ষণেক নিশ্চুপ থেকে বলে, ‘কেউ কি তার নিজের ইচ্ছায় যেতে পারে? সময়ই তাকে নিয়ে যায় কালের গহ্বরে।’
সেদিন আর কী কথা হয়েছিল তা ঠিক মনে পড়ে না। তবে তার শেষ কথাটি আমার কানে বাজে, ‘শ্রাবণের অঝোর ধারায় আমাকে হারিয়ে ফেলো না।’ কেন, কোন কথার পরিপ্রেক্ষিতে কথাটা বলেছিল তা আজ মনে নেই। বহু বছর পিছনে ফেলে আসলেও ভুলতে পারিনি এই কথাটি।
আমি তখন সবেমাত্র ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা বিভাগে ভর্তি হয়েছি। ঢাকা আমার কাছে একেবারে নতুন। একটু আধটু আঁকাআঁকির সুবাদে এবং ভালোবাসার মোহে বলা চলে আমি এই বিভাগে সুযোগ পেয়েছিলাম। তাছাড়া এই বিভাগে খুব বেশি আবেদন জমা পড়ে না। এদিক দিয়ে আমাকে ভাগ্যবানই বলতে হয়। পরিবার থেকে যে সম্পূর্ণ সাপোর্ট ছিল তা বলবো না। বাবার ইচ্ছে আমি ইঞ্জিনিয়ার হবো আর মা চাইতেন প্রফেসর। অথচ সেই ছেলেবেলা থেকে আমার মনের মাঝে বসত করে শিল্পী সত্তা। যে কারণে আমি পারিনি আমার আত্মস্থটাকে জলাঞ্জলি দিতে।
বরিশালে তিন দিনব্যাপী চিত্র প্রদর্শনী শেষে যখন ঢাকার উদ্দেশ্যে রওনা দিই তখন রাত নয়টা। ভালোভাবে গাড়ি চালালে বোধকরি পাঁচ/ছয় ঘণ্টায় পৌঁছে যাবো এটা একপ্রকার নিশ্চিত। গাড়িতে আমি, হেলাল আর গাড়ির ড্রাইভার মজনু। হেলাল আমার সহকারী। সবসময় পিছন পিছন আঠার মতো লেগে থাকে। আর ড্রাইভার মজনু? সেতো বহুদিন থেকে আমার গাড়ি চালাচ্ছে। গাড়ির বয়স আর ওর ড্রাইভারির বয়স একই। এই গাড়ি দিয়েই ড্রাইভারি শেখা। গাড়ি যেমন লক্কড়-ঝক্কড় মজনুর বাহ্যিক অবয়বটা ঠিক তেমনি। তবে মনটা একদম পরিষ্কার। তা হলে এত বছর এক জায়গায় থাকা সবসময় সহজ হয় না।
শ্রাবণ মাস। মেঘ-বৃষ্টির দোলাচলে বাংলার প্রকৃতি। ফর্সা আকাশ কখন যে মেঘে ঢেকে যায় কিছুই বলা যায় না। গাড়ি চলছে তার নিজস্ব গতিতে। নিয়মকে শ্রদ্ধা জানিয়ে আকাশ অন্ধকারে ছেয়ে যায়। সড়কের দু’পাশের বাড়িগুলোর আলো মুহূর্তেই নিভে চারপাশ অন্ধকার। ঝড় শুরু হয়েছে দেখে হেলাল বলল, ‘দাদা, আমার মনে হয় নিরাপদ জায়গা দেখে কোথাও একটু দাঁড়াই। বিপদ আসতে সময় লাগে না।’
আমি ওর কথায় গুরুত্ব না দিয়ে ড্রাইভারকে বললাম, ‘তুই সাবধানে সামনের দিকে অগ্রসর হ।’
ঝড়ের সাথে যুদ্ধ করে গাড়ি চলতে থাকে। কোন দিকে যাচ্ছি কিংবা সঠিক রাস্তায় যাচ্ছি কিনা বুঝতে পারছি না। তাছাড়া গাড়ির ব্যাটারি শক্তি কমে গেছে অনেকদিন আগেই। ইচ্ছে করে ঠিক করিনি। এমনিতে গাড়ির অবস্থার সাথে একেবারে মানানসই আছে ব্যাটারিটা। আজকাল আলো ঠিকমতো তার গতি প্রয়োগ করতে পারে না। তবুও ড্রাইভার হন্তদন্ত হয়ে গাড়ি চালিয়েই যাচ্ছে; যেন আর কিছুক্ষণ হলে আমরা পৌঁছে যাবো বাড়িতে!
সামনে যে আমাদের জন্যে এক মহাবিপদ অপেক্ষায় ছিল তা ঘুণাক্ষরেও টের পাইনি। ঝড়ের তাণ্ডবে রাস্তার ওপরে অনেকগুলো গাছ ভেঙে পড়ে আছে। আমরাতো যারপরনাই হতাশ। সড়ক বিভাগ কাল দিনের বেলা গাছ না সরালে আমাদের যাবার সম্ভাবনা নেই। অনুষ্ঠানের কারণে মোবাইলে কারো চার্জ দেওয়া হয়নি। সে কারণে মোবাইলগুলো শক্তির অভাবে বন্ধ হয়ে গেছে। কোথায় বর্তমানে অবস্থান করছি তা বোঝার উপায় নেই। না হলে গুগল ম্যাপই আমাদের সাহায্য করতো। হেলাল বলল, ‘দাদা, আমরা তখন যদি একটা জায়গায় দাঁড়াতাম তাহলে এই অবস্থার মুখোমুখি হতে হতো না।’
আমি ওর বোকামি ভরা কথার উত্তর না দিয়ে পারলাম না। বললাম, ‘তুইতো আসলেই পাগল আছিস। যদি সেখানে দাঁড়াতাম তাহলে এখানকার গাছগুলো কী ভাঙতো না?’
‘তা ঠিক; তবে এই অজানা- অচেনা জঙ্গলের মধ্যে থাকতে হতো না। তাছাড়া....’
‘তাছাড়া কী?’ আমি বললাম।
‘দাদা, আমি ঢাকা-বরিশাল অনেকবার গিয়েছি; আজ কেন জানি এই রাস্তা অচেনা মনে হচ্ছে।’
মজনু বলল, ‘হেলাল ভাই ঠিকই বলেছে স্যার; আমার কাছে কিন্তু নতুন ঠেকছে। আপনাকে নিয়েতো অনেকবার ঢাকা-বরিশাল করেছি।’
‘দাদা, তুমি কী দেখেছো, এই রাস্তাটা সরু এক লেনের!’ বলল হেলাল।
আমি বললাম, ‘আমি যে ভাবিনি তা নয়। মনে হয় আমরা ভুল পথে এসে পড়েছি।’
ঝড়ের তাণ্ডব থেমে গেছে গেলেও ছিটেফোঁটা বৃষ্টি তখনো পড়ছে। তবে বিদ্যুৎ চমকাচ্ছে সমানে। বললাম, ‘চল আমরা ফিরে যাই। মজনু গাড়ি পিছনের দিকে ঘোরা।’
আমার কথামতো মজনু গাড়ি পিছনে ঘুরিয়ে সামনে এগুতেই পনের/বিশ হাত দূরে মড়মড় করে বড় বড় তিনটি গাছ রাস্তার ওপর ভেঙে পড়ে। কী ভূতুড়ে কাণ্ডরে বাবা। ঝড়-বাতাস কিচ্ছু নেই অথচ গাছ ভেঙে পড়ে! হেলাল আর মজনু ভয়ে একেবারে অস্থির। তারা সমানে কাঁপতে থাকে। আমি যে ভয় পাইনি তা বলবো না। ভয়ে আমার অবস্থা খারাপ হলেও মুখে সেটা প্রকাশ করতে পারি না। পাছে ওরা আবার কী ভাবে!
এই ভূতুড়ে কাণ্ডকে কীভাবে মূল্যায়ন করবো বুঝতে পারছি না। নিশ্চয়ই ভূত আছে। না হলে এমন অবস্থা কেন হবে? এদিকে গাড়ির তেল ফুরিয়ে আসছে। ব্যাটারিটাও অপেক্ষাকৃত অনেক দুর্বল। চারদিকে ঘুটঘুটে অন্ধকার। সব মিলিয়ে এক অন্যরকম সময় শুরু হয়েছে আমাদের জীবনে।
মাঝে মাঝে দু’পাশের জঙ্গল থেকে রাতজাগা পশুপাখির ডাক ভেসে আসছে। অজান্তেই আমার গায়ের পশম দাঁড়িয়ে গেছে। হেলাল বলল, ‘দাদা, আমি কি নেমে একটু আশপাশ দেখে আসবো, ধারের কাছে কোথাও কোনো বসতি আছে কিনা?’
‘যাবি কীভাবে? অন্ধকার চারদিক। কোথায় কী আছে না আছে....’
‘আমার ব্যাগে ছোট্ট একটা টর্চলাইট আছে।’ হেলাল কথাটা শেষ করে ব্যাগ থেকে লাইটটা বের করে সামনে আলো ফেলতেই পিচঢালা রাস্তা চকচক করে ওঠে।
বললাম, ‘যা। মজনুকে সাথে নিয়ে যা। আমি গাড়ির ভেতরে বসলাম।’
হেলাল আর মজনু গাড়ি থেকে নেমে টর্চ মারতে মারতে সামনের দিকে অগ্রসর হয়। আমি গাড়ির ভেতরে বসে থাকি অজানা ভয়-অজানা শঙ্কায়।
অনেকক্ষণ পার হলেও মজনু আর হেলালের ফিরে আসার নাম নেই। একদিকে ভয়-শঙ্কা আর অন্যদিকে বাড়ি ফেরার তাগিদ। রাত জাগা পশুরা গাড়ির এদিক-ওদিক ছোটাছুটি করছে। কিছুক্ষণ আগে শেয়ালের মতো একটি প্রাণী এসে গাড়ির সামনে ক্ষণেক দাঁড়িয়ে থেকে আপনমনে জঙ্গলের মধ্যে ঢুকে পড়ে। সে আমাকে দেখেছিল কিনা জানি না। কী যেন একটা দৌঁড়ে এসে গাড়িতে ধাক্কা খেয়ে মুহূর্তে উঠে আবারো জঙ্গলের মধ্যে হাফিস হয়ে যায়। মিনিচ পাঁচেক পরে এক ঝাঁক কালো বিড়াল মৌন মিছিল করতে করতে রাস্তা পার হয়। তারা আমার কিংবা গাড়িটার দিকে ভ্রুক্ষেপও করে না।
ওদের আসার কোনো লক্ষণ না দেখে বুকে সাহস নিয়ে গাড়ি থেকে নেমে এদিক-ওদিক তাকাতে থাকি। আকাশে তখনো বিদ্যুৎ চমকাচ্ছে। হঠাৎ সামনে একটি মনুষ্য ছায়া আসতে দেখে মনে সাহসের সঞ্চার হয়। সময়ের সাথে স্পষ্ট হয়ে উঠছে ছায়ামূর্তিটা। শুভ্র সাদা শাড়ি পরা একজন মহিলা আসছে এ পথ দিয়ে! ভূতপ্রেত বলে কিছু হয় না এমন অলীক বিশ্বাস আজীবন বুকের মাঝে পোষণ করলেও আজ সেই ভূতপ্রেতের ভয়ে আমার সমস্ত শরীর ভারী হয়ে আসে। নিজেকে এত ভারী আগে কোনোদিন লাগেনি। নিঝুম রাতে জনমানবহীন এই পথে একজন মহিলা! আমি মনে মনে সৃষ্টিকর্তাকে স্মরণ করতে থাকি। রাস্তার ওপর পড়ে থাকা গাছকে উপেক্ষা করে সে আমার সম্মুখে এসে দাঁড়ায়। আমার সমস্ত শরীর কাঁপতে থাকে। দাঁতে দাঁত চেপে কিছু একটা বলতে যেয়েও বলতে পারি না। মুখ ভয়ে আড়ষ্ট হয়ে আসে। অনেক চেষ্টা করেও মুখ থেকে কোন শব্দ বের করতে পারি না।
আমার অবস্থা বুঝতে পেরে মহিলাটি বলল, ‘আপনি নিশ্চয়ই কোনো সমস্যায় পড়েছেন।’
আমি মুখ থেকে তখনো কোনো শব্দ বের করতে পারছি না। তবে কেমন যেন এক অতি পরিচিত শব্দ প্রতিশব্দ হয়ে বারবার আমার কানে ফিরে আসছে।
এতক্ষণ নিচের দিকে তাকিয়েছিলাম। কণ্ঠস্বর আমাকে তার মুখের দিকে তাকাতে অভয় দেয়। আকাশের বিদ্যুৎ চমকানি চলছে সমানে। আলোর ঝলকে চোখে চোখ পড়তেই চমকে উঠি। জয়তী! আমিতো বিস্ময়ে হতবাক। আমি কী সত্যিই জেগে আছি? নাকি....। ঘোর কাটতে সময় লাগে। সত্যিই তো এ জয়তী। কতবছর পর দেখলাম। অন্তত চল্লিশ বছরতো হবেই। বয়সের একটি ক্রান্তিলগ্নে এসে পড়েছি আমি। অথচ জয়তী! সেতো একই আছে। সেই বিশ্ববিদ্যালয়ের সময়ের মতো। শুধু পরনে আটপৌঢ়ে শাড়ির বদলে শুভ্র সাদা শাড়ি আর চোখেমুখে তার বিষণ্নতার ফাগুন। আমি ঠিক বুঝতে পারছি না, কী ভাববো আর কী ভাববো না। যে জয়তীকে খুঁজতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, গোয়েন্দা তৎপরতা সব ব্যর্থ হয়েছিল সে সময়! যাকে খুঁজতে সমগ্র দেশের ভিতটাই নড়ে গিয়েছিল। সেই জয়তী আমার সামনে! জয়তী অন্তর্ধান রহস্য রহস্যই রয়ে গিয়েছিল! এ কী সেই জয়তী? নিজেকে বারবার প্রশ্ন করতে থাকি। আমি নির্বাক চেয়ে আছি তার দিকে। মুখ থেকে তখনো কোনো শব্দ বের হয় না। তাছাড়া দেখে মনে হয় চল্লিশ বছর আগের জয়তীর বয়স সেই একই জায়গায় স্থির হয়ে আছে। সেটা কীভাবে? বয়য়ের ছাঁপ তার ওপর পড়েনি কেন? আমি সাত পাঁচ ভাবতে ভাবতে ভাবনার মাঝে ডুবে যাই। নীরবতা ভেঙে সে বলল, ‘আমি যদি ভুল না করি তাহলে তুমি অরিন্দম। রাইট?’
বিস্ময়ের ঘোর কাটিয়ে বললাম, ‘হ্যাঁ, কিন্তু...?’
মলিন মুখে মৃদু হাসির রেখা ফুটিয়ে বলল, ‘আমাকে চিনতে পারছো না?’
‘না।’
‘সত্যি?’
আমি সম্মতিসূচক মাথা ঝাঁকাই।
বলল, ‘আমি জানি তুমি আমাকে চিনতে পেরেছো। তারপরও যখন তোমার মনের সাথে টানাপোড়েন তখন বলছি, আমি জয়তী।’
‘কিন্তু...।’
‘সব কিন্তুর হিসাব মেলে না অরিন্দম।’
এককালে জয়তীকে নিয়ে স্বপ্নের জাল বুনেছিলাম তা অস্বীকার করবো না। তবে তা শুধু হৃদয়ের গভীরে সীমাবদ্ধ ছিল। ও যে আমাকে ভালোবাসতো না তা নয়; তবে আমরা ভালোবেসে সংসারে থিতু হয় পড়বো এমনটি ভাবিনি কখনো। ভালোবাসা মানেই সংসার, এমন অলীক বিশ্বাস আমাদের মনের ভেতরে ছিল না। সে কারণে জয়তীর প্রতি আমার ভালোবাসা আজো আছে সেই আগের মতো। প্রতি ক্ষণে মনে পড়ে তার কথা— অসমাপ্ত সকল স্মৃতি। তবে আজ তাকে সাদা শাড়িতে দেখে বুকের ভেতরটা মোঁচড় দিয়ে ওঠে। তাহলে কী......?
আমার ভাবনাকে থমকে দিয়ে জয়তী প্রশ্ন করলো, ‘তুমি এখানে এই অবস্থায় কেন?’
‘ঝড় বৃষ্টিতে আটকে গেছি। সামনে-পিছনের গাছগুলো আমাদের সাথে খেলা খেলেছে।’
‘তুমি এদিকে?’ আমি প্রশ্ন করলাম।
‘আমার বাড়ি ঐ সামনে। চলো ঝড়ের রাতটুকু থেকে কাল সকালেই চলে যেও।’
‘আমার সাথে আরো দু’জন লোক আছে; তারা গেছে আশপাশে লোকালয় আছে কিনা দেখতে। ওরা ফিরুক তারপর দেখছি।’
‘তারা হয়তো আমাদের বাড়িতে গিয়ে পৌঁছেছে ইতোমধ্যে। তুমি চলো, প্রয়োজনে রাস্তা থেকে তাদের সাথে নিয়ে যাবো।’
আমি আগে পাছে না ভেবে জয়তীর সাথে তার বাড়ির দিকে রওনা দিই। হঠাৎ কেন জানি মন থেকে সকল ভয় উবে গেল। ঘুটঘুটে অন্ধকার রাত হলেও আকাশের এই খেয়ালিপনায় পথ চলতে মোটেও কষ্ট হয় না। জয়তী সামনে আমি তার পথ অনুসরণ করে পিছনে পিছনে চলেছি। এভাবে কতক্ষণ চলেছি জানি না। এই লম্বা সময় তার সাথে আমার খুব বেশি বাক্য বিনিময় হয় না। তাকে একটি প্রশ্ন করলে সে বার বার এড়িয়ে যায়। বলে ‘বাড়িতে চলো সব জানতে পারবে।’ এক অজানা রহস্যের অন্তর্জালে নিজেকে হারিয়ে ফেলছি। যাহোক, উদ্বেগ আর উৎকণ্ঠা নিয়ে জয়তীর পিছন পিছন এক বিশাল রাজপ্রাসাদের সিংহ দরজার সামনে উপস্থিত হই। গেটের সামনে লেখা ‘স্বর্ণ কুঠির।’ ইয়া গোঁফওয়ালা দুইজন দারোয়ান গেট খুলে দিয়ে লম্বা একটা সালাম ঠুকে দিলো। আমরা ভেতরে প্রবেশ করি। চারদিকে ঝা চকচকে বাড়িটা দেখেই বোঝা যায়, বেশ পুরানো। জঙ্গলের মধ্যে এমন একটা বাড়ি আছে তা অনুমান করা দুরূহ ব্যাপার।
জয়তী আমাকে একেবারে অন্দর মহলে নিয়ে যায়। এখানে জৌলুসের কোনো কমতি নেই। ঝাড়বাতি, মার্বেল পাথরের কারুকাজ, দামি কার্পেট আর চকচকে সমস্ত আসবাবপত্রে মুগ্ধ না হয়ে পারার উপায় নেই।
রাজকীয় খাবারের টেবিলের সামনে আমাকে নিয়ে বসায়। কী নেই সেই টেবিলে! জয়তী লোভনীয় খাবারগুলো আমার পাতে তুলে দেয় পরম মমতায়। ক্ষণেক ফিরে যাই ফেলে আসা মরিচাধরা দিনগুলোতে। কোনো পরিবর্তন নেই ওর মাঝে। আমি তৃপ্তি সহকারে খাওয়া শেষ করি।
এখানে কে কে থাকে? এমন প্রশ্ন ঠোঁটের আগায় আসলেও আমি অদৃশ্য কারণে তা চেপে যাই। তাছাড়া এত বড় প্রাসাদ; দাসদাসিতে পূর্ণ অথচ কারো ভেতরে তেমন হৃদ্যতা দেখতে পাই না। তাদের চেহারায় কেন যেন একটা অন্যরকম ভাব। যা স্বাভাবিক জীবনে লক্ষ করিনি কারো মাঝে। কেমন যেন একপ্রকার মলিনতা-বিষণ্নতায় ডুবে আছে তারা। হয়তো রাজপ্রাসাদের নিয়মই এমন; নিজেকে সান্ত্বনা দিই।
আমি জয়তীকে বললাম, ‘এমন গহিন জঙ্গলের মাঝে এত বড় রাজপ্রাসাদ! এখানে কে কে থাকে? তুমি নিশ্চয়ই...’
আমার কথা শেষ না হতেই জয়তী বলল, ‘তোমাদের ওই সভ্য সমাজ থেকে দূরে থাকাটাই ভালো নয় কি? আর তোমার মনের মাঝে যে প্রশ্নগুলো বারবার উঁকি দিচ্ছে তা এক্ষুনি উন্মুক্ত করে দিচ্ছি। চলো আমার সাথে।’ বলে চেয়ার থেকে উঠে দাঁড়ায় জয়তী।
সামনের দিকে হাঁটতে শুরু করলে আমি তার পিছু নিই। বড় একটা হলরুমের সামনে যেয়ে দাঁড়ায়। ‘ভেতরে চলো।’ বলে সে দরজা খুলে রুমের ভেতরে প্রবেশ করে। ভেতরে ঢুকেই আমার চক্ষু চড়কগাছ! এ যে একটা সত্যিকারের মিউজিয়াম! যার চারপাশে দেয়ালে টাঙানো শত শত দুর্লভ চিত্রকর্ম! আমি বিস্ময়ভরা চোখে চারপাশ দেখতে দেখতে একটা ছবির দিকে আমার দৃষ্টি আটকে যায়। মনের অজান্তেই বলে উঠলাম— ‘এ তো সেই ছবি; যে ছবি আজ থেকে চল্লিশ বছর আগে সারা দেশ কাঁপিয়ে দিয়েছিল! যার জন্যে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর চোখের ঘুম হারাম হয়ে গিয়েছিল। যারা সন্দেহের তালিকায় ছিল তাদের সবাইকে খুন হতে হয়েছিল!’
সেই সিরিয়াল খুনের নেপথ্যে কে বা কারা ছিল তা আজও অজানা। এত বছর পেরিয়ে গেলেও কোনো ক্লু বের করতে পারেনি পুলিশ। একসময় কালের গহ্বরে হারিয়ে গেছে সেই দুর্লভ চিত্রকর্ম আর সিরিয়াল খুনের রহস্য।
আমি বিস্ময়ভরা চোখ নিয়ে এগিয়ে যাই সামনে। ‘একটা শেয়াল মায়াভরা চোখে তাকিয়ে আছে অনেকগুলো মানুষের দিকে। আর সেই মানুষগুলোর চোখ আটকে আছে এক থলি আঙুরের সাথে।’ একটা বিদঘুটে ছবি। কী তার মোহ! হঠাৎ করে শেয়ালটার চোখে মুখে আনন্দের ছাপ ফুটে ওঠে। আর মানুষগুলো বিষণ্নতায় ডুবে যায়। মনে হয় ছবিটা বহুদিন আমার অপেক্ষায় ছিল।
আমার মুখের ভাব বুঝতে পেরে জয়তী বলল, ‘এই ছবিটার কথা ভাবছো তো?’
বললাম, ‘বলো কী ভাববো না! যে ছবি নিয়ে এতকিছু— এত হিস্টরি, এত নাটক, এত যবনিকা! আর সেই ছবিটা আমার সম্মুখে!’
‘হ্যাঁ তুমি ঠিকই বলেছো।’
‘তাহলে সবার অনুমান ঠিক?’
‘তুমিও আমাকে...।’ জয়তীর চোখে-মুখে এক প্রকার হতাশা ফুটে ওঠে।
‘তার মানে তুমি?’ আমার মুখের কথা কেড়ে নিয়ে জয়তী বলল, ‘দুনিয়ার সবাই বিশ্বাস করলেও তুমি বিশ্বাস করবে না এ বিশ্বাস আমার ছিল। কিন্তু আজ...’
‘তুমি আমাকে ভুল বুঝো না। আমি কখনো বিশ্বাস করিনি, তুমি এমন কাজ করতে পারো।’
‘তবে?’
‘কেন তুমি সেদিন হারিয়ে গিয়েছিলে?’
‘হারিয়ে গিয়েছিলাম! তুমি যথার্থই বলেছো।’ অট্ট হাসিতে ফেটে পড়ে জয়তী। সে হাসি রাতের নিস্তব্ধতা কাটিয়ে দূর থেকে অলিক বিশ্বাসে ফিরে আসে।
নিজেকে বড় বোকা মনে হয়। বললাম, ‘আমি কি অযাচিত কিছু বলেছি?’
আমার প্রশ্নের কোনো উত্তর না দিয়ে হেসেই চলেছে অনাবরত। বললাম, ‘আমার উৎকণ্ঠা আর বাড়িও না। দয়া করে খুলে বলো আসল সত্যিটা। সারা দেশবাসী জানে সেদিন পেইন্টিংটা তুমিই চুরি করেছিলে। তাছাড়া বেশ কয়েকটি সূত্র তোমার দিকেই ইঙ্গিত করেছিল।’
হাসি থামায় জয়তী। ‘ইশারা-ইঙ্গিত!’
‘দেখো পৃথিবীতে মা-বাবার পর যদি কাউকে ভালোবাসি সে হলো তুমি। সেই তোমার সম্পর্কে কেউ খারাপ বললে আমার সহ্য হবেনা এটাই স্বাভাবিক। আসলে তোমার নিরুদ্দেশ, পেইন্টিং চুরি, মিউজিয়ামের দরজায় তোমার হাতের ছাপ, সাত জন বিশিষ্ট ব্যবসায়ীর করুণ মৃত্যু; সবকিছুই তোমার দিকেই ইঙ্গিত করেছিল সেদিন।’
‘তোমার কী আমার ওপর বিশ্বাস নেই?’
‘বিশ্বাস আর তোমাকে ভালোবাসি বলে আমাকে পুলিশ ধরে নিয়ে বিভিন্ন মেয়াদে এক মাস রিমান্ডে রেখেছিল। পুলিশি ডিকশনারির সকল অকথ্য অত্যাচার আমার ওপর করা হয়েছিল সেদিন।’
‘আমি জানি।’
‘তুমি জানো!’ বিস্ময়ে হতবাক আমি।
‘আমি সব জানি। কোনো কিছুই আমার অজানা নয়।’
‘তাহলে তুমি আমার সাথে দেখা করলে না কেন? অন্তত যেকোনো মাধ্যমে আমাকে একটা সংবাদ দিতে পারতে।’
‘ইচ্ছে করলেও সবকিছু সবসময় হয়ে ওঠে না।’
‘তাই বলে এত বছর...!’
‘তোমার কাছে হয়তো অনেকটা সময়।’ বলল জয়তী।
আমি জয়তীকে প্রশ্ন করি, ‘আমার কাছে মানে? অবশ্য একদিক দিয়ে তুমি ঠিকই বলেছো, তোমার বয়সই বলে দিচ্ছে, সময় এখানে থমকে আছে।’
জয়তী কোনো কথা বলে না। তার মুখ দেখে বোঝা যায় সে কী যেন ভাবছে। আমি নীরবতা ভাঙিয়ে বললাম, ‘এত বড় রাজ বাড়ি, অথচ তেমন কাউকেতো দেখছি না? তোমার স্বামী-সন্তান...’
আমার কথার উত্তর না দিয়ে বলল, ‘আসলে এখানে খুব বেশি লোক থাকে না। যে যার কাজে বাইরে আছে।’
‘তোমার স্বামী-সন্তান এখানে থাকে নিশ্চয়ই।’
আমার কথার উত্তর না দিয়ে বলল, ‘তুমিতো চিরকুমারই রয়ে গেলে। সংসার করতে পারতে।’
‘আমি শ্রাবণের অঝোর ধারায় তোমাকে হারাতে পারবো না বলে ও পথে আর হাঁটা হয়নি।’
‘আমি অনুভব করি তোমার সমুদ্র সত্তা। আমি যে নিরুপায়।’ জয়তীর চোখেমুখে বিষণ্নতার মাত্রা বেড়ে যায় মুহূর্তে।
এতক্ষণ ঘুরে ঘুরে ছবিগুলো দেখছিলাম। হলরুমের প্রত্যেকটি ছবি অসাধারণ। দক্ষিণ দেয়ালে টাঙানো বেশ ক’টি সিরিজ চিত্রকর্মের দিকে নজর যায় আমার। ছবিগুলো জয়তীর আঁকানো। বললাম, ‘এই ছবিগুলো..।’
‘কেন খারাপ হয়েছে?’
আমি কিছু না ভেবেই বললাম, ‘তুমি এগুলো কেন এঁকেছো?’
জয়তী ত্বরিত উত্তর দেয়। ‘ঐ যে, কথায় আছে— ছবি মনের কথা বলে— ছবি হৃদয়ের কথা বলে।’
‘এ কথা আমি না বুঝলে আর কে বুঝবে।’
‘তোমার প্রদর্শনীর খবর কী? ভালোইতো সাড়া পেয়েছো তাই না? তাছাড়া তুমিতো নামকরা চিত্রশিল্পী। চারদিকে তোমার নামডাক’
আমিতো হতবাক। আমার চিত্র প্রদর্শনী চলছে, সেখানে গিয়েছিলাম এ খবরটা জয়তী জানলো কীভাবে? জানার অবশ্য অনেক মাধ্যম আছে। টেলিভিশন, ইন্টারনেট, মোবাইল আরো কত কী। কিন্তু এখানে আধুনিকতার তেমন কিছু চোখে পড়ছে না। রাজবাড়ির সামনে গাড়ির বদলে ঘোড়ার গাড়ি রাখা দেখলাম! ভাবনাকে জলাঞ্জলি দিয়ে বললাম, ‘ছবিগুলো দেখে আমার সত্যিই খারাপ লাগছে।’
‘কোন ছবি?’
‘এই যে, তোমার এই বীভৎসতার বহিঃপ্রকাশ।’
‘শিল্পীদের মুখে এসব মানায় না। তারা সত্য, সুন্দর তুলে আনে তুলির ডগায়।’
এতক্ষণ ভুলে গিয়েছিলাম হেলাল আর মজনুর কথা। বললাম, ‘আমার সাথের দু’জন এখানে এসেছে কিনা জানা হলো না।’
জয়তী হরি কাকা বলে ডাক দিতেই বয়সের ভারে নূব্জ্য একজন বৃদ্ধ সামনে এসে দাঁড়ায়। বলল, ‘বল মা কিছু বলবে?’
‘অচেনা কেউ কী এসেছে এখানে?’
‘না তো মা।’
‘দু’জন লোক আসতে পারে। তাদের অতিথিশালায় রেখে আমাকে খবর দিও।’
জয়তীর কথায় আমি ঠিক ভরসা পেলাম না। মনে হলো হয়তো তারা আমাকে খোঁজাখুজি শুরু করেছে ইতোমধ্যে। আমার সেখানে ফেরত যাওয়া দরকার। বললাম, ‘অনেকক্ষণতো হলো, এবার আমাকে গাড়ির ওখানে যেতে হবে। হেলাল আর মজনু হয়তো এতক্ষণ খুঁজতে শুরু করেছে।’
‘এক্ষুনি যাবে? রাতটা শেষ করে যেতে পারতে। তাছাড়া সকাল হলো বলে....।’
‘থাক জয়তী। আমি যাই, তুমি ভালো থেকো। ও হ্যাঁ, তুমি কিন্তু জানালে না পেইন্টিং রহস্য?’
জয়তী টেবিলের ওপর রাখা একটা পুরানো খাম নিয়ে আমার হাতে দিয়ে বলল, ‘এটা রাখো। বাড়িতে যেয়ে নিরিবিলি পড়ে দেখো। আশাকরি এর ভেতরে সব উত্তর পাবে। আর হ্যাঁ, ঐ সতেরো’শ শতকের পেইন্টিং-এর সাথে আমার পেইন্টিংগুলো তুমি নিয়ে যাও, ওগুলো তোমার জন্যে।’
চল্লিশ বছর আগের হারানো দুর্লভ চিত্রকর্ম আমার হাতে তুলে দিতে চাওয়ায় আমি খুশি হই। সরকারের সম্পত্তি সরকারের কাছে ফিরিয়ে দিয়ে সুনাগরিক হিসাবে অসামান্য অবদান রাখবো ভেবে গর্বে বুক ভরে ওঠে। নিজের জন্যে প্রিয় মানুষের আঁকা চিত্রকর্ম! আমি মনে মনে শিহরিত-পুলকিত। তবে ছবিগুলো সাইজে বড় হওয়ায় নিয়ে যাবার সমস্যা হবে ভেবে বললাম, ‘এতগুলো ছবি নেবো কীভাবে?’
‘ও নিয়ে তুমি ভেবো না। স্বর্ণ কুঠিরের লোক তোমার গাড়িতে উঠিয়ে দিয়ে আসবে। তুমি শুধু ছবিগুলোর সঠিক মর্যাদা দিও। আর ঐ ছবিটা মিউজিয়ামে ফেরত দিও।’
‘কিন্তু...’
‘কিন্তু শব্দ এখানে করো না। সব কিন্তুর উত্তর তুমি পেয়ে যাবে। ভালো থেকো।’
মন অনেক কিছু ভাবলেও বাস্তবতা মেনেই চলতে হয়। আমরা কেউই তার ব্যতিক্রম নই। মন আরো কিছুসময় প্রিয় মানুষের কাছে থাকার আকুতি জানালেও কখনো সখনো সম্ভব হয় না। মনের সাথে একপ্রকার যুদ্ধ করে জয়তীর থেকে বিদায় নিয়ে গাড়ির দিকে রওনা দিলাম। আমার সাথে কয়েকজন বাহক ছবিগুলো বহন করে নিয়ে চলেছে।
রাস্তায় এসে দেখি হেলাল আর মজনু গাড়ির ভেতরে ঘুমিয়ে। গাড়ির পিছনের ডালা খুলে আমি সাবধানে নিজ হাতে পেইন্টিংগুলো তার ভেতরে সাজিয়ে রাখলাম। চিত্রকর্ম বাহকেরা আমি হেলাল আর মজনুকে ডাক দিয়ে সামনে পিছনে তাকিয়ে দেখি রাস্তার ওপর ভাঙা গাছগুলো নেই! একদম পরিষ্কার। এখানে যে কিছুক্ষণ আগে বেশ কয়েকটি গাছ ভেঙে পড়েছিল তার চিহ্নমাত্র নেই! মজনু আর হেলাল তড়িঘড়ি উঠে পড়ে। আমাকে দেখে তারা যেন হাফ ছেড়ে বাঁচে। বললাম, ‘মজনু রাস্তা একদম ফাঁকা। গাড়ি স্ট্যার্ট দাও।’ রাস্তার অবস্থা দেখে তারাও অবাক।
আমরা যখন ঢাকায় পৌঁছাই তখন সকাল দশটা। গোসল সেরে একটা সংক্ষিপ্ত ঘুম দিয়ে খামটা হাতে তুলে নিলাম। খামের ভেতর কী আছে তা এখনও পর্যন্ত জানি না। তবে বিশেষ কিছু যে আছে তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। আমার আর তর সইছিল না। বাড়িতে পৌঁছেই খুলতে চেয়েছিলাম কিন্তু শরীর আমাকে একটুকুও সময় দেয় না। যে কারণে একটু ঘুমিয়ে নিতে হয়েছিল। যাহোক, এক মোহনীয় মৌনতায় খামের মুখ ছিঁড়ে তার ভেতর থেকে কাগজটা বের করে সম্মুখে মেলে ধরলাম। তাতে লেখা—
‘অরিন্দম,
যে কথাগুলোর উত্তর তুমি বারংবার আমার কাছে জানতে চেয়েছো সেটা তোমার কাছে স্বীকার না করে পারছি না। প্রথমেই বলে রাখি, আমি জানতাম তুমি এই ঝড়বৃষ্টির রাতে এই পথ দিয়ে আসবে। যে কারণে আমিই তোমাকে আটকেছি।’
আমি ক্ষণেক থামলাম। আনমনে নিজেকে প্রশ্ন করলাম, আমার ঐ পথ দিয়ে যাবার কথা ও কীভাবে জানলো? তাছাড়া আমাকে আটকানো অর্থ কী? আর এটা লিখলোই বা কখন? আস্তে আস্তে আমার শরীরের পশমগুলো গতকাল রাতের মতো সোজা হয়ে উঠছে। অজানা আতঙ্কে কাঁপতে শুরু করে ইতোমধ্যে। মনে সাহস নিয়ে আবারো পড়া শুরু করলাম।
‘এই দুর্লভ পেইন্টিং আমি চুরি করিনি— করতে পারি না। চুরির বিষয়টি আমি জেনে ফেলেছিলাম বলে, ওরা আমাকে এখানে এই বাড়িতে এনে অসম্ভব নির্যাতন করে। একসময় জীবনের কাছে হার মেনে নিজেকে সঁপে দিই মৃত্যুর মুখে।’
আমি আঁতকে উঠি। ইতোমধ্যে চোখ জলে ভরে উঠেছে। চশমা খুলে রুমাল দিয়ে চোখ মুছি। চোখ আমার বাধ মানে না। সকল বাধা উপেক্ষা করে দু’ফোঁটা অশ্রু গড়িয়ে পড়ে চিঠির ওপর। কালক্ষেপণ না করে নিস্তব্ধতা আমাকে ঘিরে ধরে অক্টোপাসের মতো।
‘তোমাকে পুলিশ ধরে নিয়ে নির্যাতন করেছিল, আমি জানতাম। কিছুই করার ছিল না সেদিন। আমিতো ততদিন পরপারে। আর হ্যাঁ, ঐ সাতজনকে আমিই মেরেছিলাম। যার জন্যে এতকিছু সেই দুর্লভ পেইন্টিংটা বিদেশিদের কাছে বিক্রির ষড়যন্ত্র চলছিল। আমি তা হতে দিইনি। নিজের কাছে এনে রেখেছিলাম। তোমার হাতে তুলে দেবো বলে আমি বহুবছর অপেক্ষায় ছিলাম। আজ তার অবসান হলো ।’
আমি ভয়কে জয় করার আপ্রাণ চেষ্টা করছি এই ভেবে যে, জয়তী আমার ভালো বন্ধু। তাই বলে একটা অশরীরী আত্মা! যে কিনা গত চল্লিশ বছর ধরে অপেক্ষায় ছিল আমার! তার সাথে সময় কাটানো, খাওয়া-দাওয়া, চোখাচোখি, বাক্য বিনিময়! মুহূর্তে আমার শরীর ভারী হয়ে উঠে। কথা বলার শক্তিটুকুও হারিয়ে ফেলি। হেলালকে ডাকতে গিয়ে দেখি আমার মুখ থেকে স্বর বের হচ্ছে না।
আধুনিক পৃথিবীতে বসবাস করলেও কিছু প্রশ্নের উত্তর কখনো মেলে না। গতরাতে ঘটে যাওয়া ঘটনা কে বিশ্বাস করবে? না সমাজ— না রাষ্ট্র। নাকি আমি কোনোদিন বিশ্বাস করাতে পারবো? এভাবেই হয়তো বিশ্বাস- অবিশ্বাসের দোলাচলে আমাদের বন্দি হয়ে কাটাতে হবে ভালোবাসার চাদর জড়ানো অসমাপ্ত জীবন।