এভারেস্টের গল্প হাতে ঘুঘুডাঙার পথে পথে

মো. আরিফ খান ইমার্জিং এবং রি-ইমার্জিং জুনোটিক ভাইরাসের গবেষক হিসেবে প্রতি বছরই আমাকে বায়োলজিক্যাল স্যাম্পল সংগ্রহের কাজে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে যেতে হয়। সেরকমই এক উদ্দেশ্যে এবার আমাদের টিম গিয়েছিল নওগাঁ। এ ধরনের ভ্রমণে গেলে আমি সাধারণত গল্পের বই পড়তে পছন্দ করি। ফিল্ডে আসার দুই দিন আগে আমার সহকর্মী ডা. প্রনেশ আমাকে একটি বই পড়তে দিলো—নাম ‘এভারেস্ট ও লোৎসে শিখরে’। লেখক আমাদের সুপরিচিত বাবর আলী। পেশায় ডাক্তার হলেও নেশায় তিনি নিজেকে পাহাড়ি মানুষ বলেই পরিচয় দেন। ২০২৪ সালে একই অভিযানে তিনি পৃথিবীর সর্বোচ্চ শৃঙ্গ মাউন্ট এভারেস্ট (৮,৮৪৮ মিটার) এবং চতুর্থ সর্বোচ্চ শৃঙ্গ মাউন্ট লোৎসের (৮,৫১৬ মিটার) চূড়ায় বাংলাদেশের লাল-সবুজ পতাকা উড়িয়েছেন। প্রনেশ নিজেও ক্লাইম্বিং করে। তার কাছ থেকেই ‘ভার্টিক্যাল ড্রিমার্স’ সম্পর্কে অনেকবার শুনেছি। তাই স্বাভাবিকভাবেই এই সফরে আমার ভ্রমণসঙ্গী হলো বাবর আলী ভাইয়ের এভারেস্ট ও লোৎসে অভিযানের গল্প। এ ধরনের অফিস-ভ্রমণের আরেকটি আনন্দের দিক হলো—দেশের নানা জায়গা দেখা, মানুষের জীবনযাত্রা জানা, আর স্থানীয় খাবারের স্বাদ নেওয়া; যদিও খাবার নিয়ে খুব বেশি পরীক্ষা-নিরীক্ষা আমার পছন্দ

এভারেস্টের গল্প হাতে ঘুঘুডাঙার পথে পথে

মো. আরিফ খান

ইমার্জিং এবং রি-ইমার্জিং জুনোটিক ভাইরাসের গবেষক হিসেবে প্রতি বছরই আমাকে বায়োলজিক্যাল স্যাম্পল সংগ্রহের কাজে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে যেতে হয়। সেরকমই এক উদ্দেশ্যে এবার আমাদের টিম গিয়েছিল নওগাঁ। এ ধরনের ভ্রমণে গেলে আমি সাধারণত গল্পের বই পড়তে পছন্দ করি। ফিল্ডে আসার দুই দিন আগে আমার সহকর্মী ডা. প্রনেশ আমাকে একটি বই পড়তে দিলো—নাম ‘এভারেস্ট ও লোৎসে শিখরে’। লেখক আমাদের সুপরিচিত বাবর আলী। পেশায় ডাক্তার হলেও নেশায় তিনি নিজেকে পাহাড়ি মানুষ বলেই পরিচয় দেন। ২০২৪ সালে একই অভিযানে তিনি পৃথিবীর সর্বোচ্চ শৃঙ্গ মাউন্ট এভারেস্ট (৮,৮৪৮ মিটার) এবং চতুর্থ সর্বোচ্চ শৃঙ্গ মাউন্ট লোৎসের (৮,৫১৬ মিটার) চূড়ায় বাংলাদেশের লাল-সবুজ পতাকা উড়িয়েছেন।

প্রনেশ নিজেও ক্লাইম্বিং করে। তার কাছ থেকেই ‘ভার্টিক্যাল ড্রিমার্স’ সম্পর্কে অনেকবার শুনেছি। তাই স্বাভাবিকভাবেই এই সফরে আমার ভ্রমণসঙ্গী হলো বাবর আলী ভাইয়ের এভারেস্ট ও লোৎসে অভিযানের গল্প। এ ধরনের অফিস-ভ্রমণের আরেকটি আনন্দের দিক হলো—দেশের নানা জায়গা দেখা, মানুষের জীবনযাত্রা জানা, আর স্থানীয় খাবারের স্বাদ নেওয়া; যদিও খাবার নিয়ে খুব বেশি পরীক্ষা-নিরীক্ষা আমার পছন্দ নয়।

এবার আমাদের আবাস ছিল নওগাঁ ডাকবাংলো। সন্ধ্যার দিকে পৌঁছে গেলাম সেখানে। ডাকবাংলোর কাছেই একটি জায়গার নাম ‘মুক্তির মোড়’। নওগাঁ এলেই আমি যেন মুক্তির আশায় এই মোড়ে যাই। সন্ধ্যায় এখানে হরেক রকমের নাস্তা পাওয়া যায়। মাগরিবের নামাজ পড়ে ডা. কায়সার ও ডা. ইনজামামকে নিয়ে হাঁটতে হাঁটতে গেলাম মুক্তির মোড়ে। নাস্তা শেষে এক কাপ লাল চা। সামাজিক মাধ্যমের যুগে চেক-ইন দেওয়া যেন অলিখিত নিয়ম—তাই চায়ের কাপের ছবি তুলে ফেসবুকে চেক-ইন দিলাম। সঙ্গে সঙ্গেই বন্ধু তালুকদার (ডা. মারুফ উল আলম) কমেন্ট করলো—‘ঘুঘুডাঙা ঘুরে আয়।’ নামটা খুব পরিচিত মনে হচ্ছিল না। পরে সে-ই জানালো—ওখানেই আছে গহের আলীর বিখ্যাত তালসাম্রাজ্য।

নওগাঁর মহাদেবপুর উপজেলার ভীমপুর ইউনিয়নের সেই তালসাম্রাজ্যের গল্প অনন্য। গহের আলী—এক সময়ের দিনমজুর, বার্ধক্যে ভিক্ষাই ছিল যার জীবিকা। কিন্তু তিনি টাকা নয়, চাইতেন তালের আঁটি। প্রতিদিন সেই আঁটি রাস্তার দুই পাশে পুঁতে দিতেন। বছরের পর বছর ধরে এভাবেই প্রায় ১৮ হাজার তালগাছ লাগিয়েছেন। তিনি বলতেন, ‘আমি বাঁচবো না, গাছগুলো বেঁচে থাকবে।’ তখনই মনে মনে ঠিক করলাম—এ সফরে জায়গাটা মিস করা যাবে না।

tour

১৭ জানুয়ারি দুপুরে কাজ শেষে আমরা ছাতড়া বাজারে খেতে গেলাম। আমার গ্রামের বাজারের তুলনায় বেশ বড়। গাড়ি থেকে নেমেই কয়েকজন খাবারের হোটেলের সন্ধানে চলে গেল। সবার পেটেই তখন ক্ষুধা চুঁইচুঁই করছে। গরম পেঁয়াজু, ভাত আর ‘ইংলিশ মুরগির’ তরকারি দিয়ে ক্ষুধা মেটালাম। নামটা আমার কাছে অদ্ভুত শোনালেও সঙ্গে থাকা ভেটেরিনারিয়ানরা নিশ্চিত করলো—খাওয়া যাবে। খাবার শেষে রওয়ানা দিলাম চন্দননগর গ্রামীণ এলাকায়, যেখানে সাঁওতালসহ বিভিন্ন আদিবাসী সম্প্রদায়ের বসবাস। মকর সংক্রান্তি উপলক্ষে সাঁওতালদের মাটির বাড়ির দেওয়ালে আঁকা আল্পনার একটি ভিডিও ভাইরাল হয়েছিল—সেই আল্পনা দেখার আগ্রহ থেকেই সেখানে যাওয়া।

ছাতড়া বাজার থেকে আনুমানিক দুই কিলোমিটার পথ। আদিবাসী জনগোষ্ঠীর নিজস্ব সংস্কৃতি, উৎসব, নৃত্য ও কৃষিনির্ভর জীবনধারা আমাকে বরাবরই টানে। স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানলাম, ছাতড়া বাজার ও আশেপাশের হাটগুলোতে হস্তশিল্প এবং আদিবাসী সম্প্রদায়ের তৈরি নানা জিনিসপত্র পাওয়া যায়। আমরা যে রাস্তা ধরে যাচ্ছিলাম, পথে কয়েকজন স্থানীয় ভ্যানচালকের সঙ্গে কথা বলে জানলাম—এদিকে তেমন আল্পনা আঁকা বাড়ি নেই। তাদের বেশিরভাগের বসবাস গোবিন্দপুর ও বুধুরিয়ার কাছাকাছি।

পথিমধ্যে হঠাৎ একটি বাড়ির দেওয়ালে গাড়ি থেকেই আল্পনা চোখে পড়ল। অগত্যা সেখানেই সবাই নেমে পড়লাম। অনিন্দ্য সুন্দর হাতের আল্পনায় মাটির দেওয়াল যেন এক অপূর্ব আবহ তৈরি করেছে। ঘুরে ঘুরে দু’চোখ ভরে দেখলাম, আর আমার পিক্সেল ক্যামেরায় বন্দি করার চেষ্টারও কমতি ছিল না। তবে সময় দ্রুত চলে যাচ্ছিল, কারণ আমাদের আসল গন্তব্য ছিল গহের আলীর সেই তালসাম্রাজ্য। তারপরই রওয়ানা দিলাম গহের আলীর তালসাম্রাজ্যের দিকে। যেতে যেতে রাস্তার দু’ধারে তালগাছের সংখ্যা ধীরে ধীরে বাড়তে লাগল। জীবনে এত তালগাছ একসঙ্গে কখনো দেখিনি। ছোটবেলায় গ্রামের বাড়িতে ভোরে উঠে তাল কুড়ানোর স্মৃতিগুলো মনে ভেসে উঠল। ভাবলাম—আমার মেয়েও কি এমন স্মৃতি পাবে? হতেও পারে যদি গহের আলীর মতো মহান কেউ আমাদের গ্রামেও এরকম তালগাছ লাগায়। যদিও আমাদের বাড়ির সামনের বড় রাস্তায় অনেকগুলো তালগাছ বড় হচ্ছে।

১৫-২০ মিনিট পর পৌঁছে গেলাম বহুল আকাঙ্ক্ষিত ঘুঘুডাঙায়। গাড়ি থেকে নামতেই চোখ জুড়িয়ে গেল। দিগন্তজোড়া তালগাছের সারি। একসময় যে পথ ছিল রোদে পুড়ে যাওয়া নির্জন, আজ তা সবুজ ছায়ায় ঢাকা। গাড়িতেই ইনজামাম বলছিল আনুমানিক ৭০০ মিটার তালগাছের সারি। বিকালের মৃদু রোদে গাছগুলো দেখতে আরও সুন্দর লাগছিল। গাছের নিচের অংশে সাদা-লাল রং করা। উপজেলা প্রশাসনের উদ্যোগে কিছু নান্দনিক কংক্রিটের বসার ব্যবস্থাও করা আছে আমাদের মতো পর্যটকদের সুবিধার কথা চিন্তা করে। আমরা একটু হাঁটলাম সবাই মিলে। আমাদের মতো ঢাকার লোকজন ছাড়াও নওগাঁ ও এর আশেপাশের এলাকা থেকেও অনেকেই এসেছেন মনে হলো। সবাই যে যার মতো ছবি তুলতে লাগলাম। আমাকেও ছবি তুলে দিলেন ডা. সুস্মিতা আপু, আমার অফিসের সিনিয়র সহকর্মী। আমরা দেখছিলাম, একটা কাপল ছবি তুলছিল; তাদের ছোট বাবুকে পাশে রেখে।

tour

গ্রামীণ এই পরিবেশেও দেখলাম কয়েকজন প্রফেশনাল ফটোগ্রাফার ছবি তুলে দিচ্ছেন। এক বাবা তার মেয়েকে ছবি তোলাচ্ছেন ওই প্রফেশনাল ফটোগ্রাফার দিয়ে। দেখে আমার মেয়ের কথা মনে হচ্ছিল।

সেই উঁচু তালগাছগুলোর ছায়ায় দাঁড়িয়ে মনে হলো—একজন নিস্ব মানুষও চাইলে পুরো একটি অঞ্চলের প্রকৃতি বদলে দিতে পারে। এই গাছগুলো শুধু বৃক্ষ নয়, গহের আলীর জীবন্ত স্মৃতি। ঘুঘুডাঙায় ভ্রমণে গিয়ে আমি এক নিঃশব্দ কিংবদন্তির কাজ নিজ চোখে দেখলাম। ঘুঘুডাঙা ছেড়ে ফিরতে মন চাইছিল না। কিন্তু পরের দিনই তো ঢাকায় ফিরতে হবে—সেই চেনা যান্ত্রিক কোলাহলে।

লেখক: গবেষণা কর্মকর্তা, মলিকুলার বায়োলজি, জুনোটিক ডিজিজ রিসার্চ প্রোগ্রাম, রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান (আইইডিসিআর)।

এসইউ

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow