ঐতিহ্যের সাক্ষী গৌরীপুর লজ এখন ব্যাংকের গেস্ট হাউজ

ময়মনসিংহ শহরের জুবিলী রোড এলাকায় ব্রহ্মপুত্র নদের তীরে অবস্থিত প্রায় দুই শতাব্দী প্রাচীন ঐতিহাসিক স্থাপনা ‘গৌরীপুর লজ’। দীর্ঘদিন ধরে সোনালী ব্যাংকের কর্মকর্তাদের গেস্ট হাউজ হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে স্থাপনাটি। অথচ ঐতিহ্যবাহী এই স্থাপনাটি এখনো প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন হিসেবে তালিকাভুক্ত হয়নি। ফলে এর সংরক্ষণ ও ভবিষ্যৎ নিয়ে স্থানীয় ইতিহাস-সচেতন মানুষ, গবেষক ও সংস্কৃতিপ্রেমীদের মধ্যে উদ্বেগ বাড়ছে। দোতলা এই ভবনটি কাঠ ও ঢেউটিন দিয়ে নির্মিত। ভবনের কাঠের দেওয়াল, দরজা-জানালা, পাথর বসানো মেঝে, মজবুত স্তম্ভ, বারান্দার নান্দনিক খিলান এবং চীনা কারিগরদের নির্মাণশৈলীর ছাপ এখনো অতীত ঐতিহ্যের সাক্ষ্য বহন করছে। ব্যতিক্রমধর্মী স্থাপত্যশৈলীর কারণে ভবনটি দর্শনার্থীদের কাছেও বিশেষ আকর্ষণের কেন্দ্র। ইতিহাসবিদদের তথ্য অনুযায়ী, গৌরীপুর জমিদার পরিবারের সদস্য ব্রজেন্দ্র কিশোর রায় চৌধুরী ১৮২৮ সালে ভবনটি নির্মাণ করেন। দেশ বিভাগের পর ১৯৪৭ সালে এটি ন্যাশনাল ব্যাংক অব পাকিস্তানের শাখা কার্যালয় হিসেবে ব্যবহৃত হতে থাকে। স্বাধীনতার পর ১৯৮৫ সাল পর্যন্ত এখানে সোনালী ব্যাংকের শাখা কার্যক্রম পরিচালিত হয়। পরবর্তীতে ব্যাংকের নতু

ঐতিহ্যের সাক্ষী গৌরীপুর লজ এখন ব্যাংকের গেস্ট হাউজ

ময়মনসিংহ শহরের জুবিলী রোড এলাকায় ব্রহ্মপুত্র নদের তীরে অবস্থিত প্রায় দুই শতাব্দী প্রাচীন ঐতিহাসিক স্থাপনা ‘গৌরীপুর লজ’। দীর্ঘদিন ধরে সোনালী ব্যাংকের কর্মকর্তাদের গেস্ট হাউজ হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে স্থাপনাটি। অথচ ঐতিহ্যবাহী এই স্থাপনাটি এখনো প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন হিসেবে তালিকাভুক্ত হয়নি। ফলে এর সংরক্ষণ ও ভবিষ্যৎ নিয়ে স্থানীয় ইতিহাস-সচেতন মানুষ, গবেষক ও সংস্কৃতিপ্রেমীদের মধ্যে উদ্বেগ বাড়ছে।

দোতলা এই ভবনটি কাঠ ও ঢেউটিন দিয়ে নির্মিত। ভবনের কাঠের দেওয়াল, দরজা-জানালা, পাথর বসানো মেঝে, মজবুত স্তম্ভ, বারান্দার নান্দনিক খিলান এবং চীনা কারিগরদের নির্মাণশৈলীর ছাপ এখনো অতীত ঐতিহ্যের সাক্ষ্য বহন করছে। ব্যতিক্রমধর্মী স্থাপত্যশৈলীর কারণে ভবনটি দর্শনার্থীদের কাছেও বিশেষ আকর্ষণের কেন্দ্র।

ইতিহাসবিদদের তথ্য অনুযায়ী, গৌরীপুর জমিদার পরিবারের সদস্য ব্রজেন্দ্র কিশোর রায় চৌধুরী ১৮২৮ সালে ভবনটি নির্মাণ করেন। দেশ বিভাগের পর ১৯৪৭ সালে এটি ন্যাশনাল ব্যাংক অব পাকিস্তানের শাখা কার্যালয় হিসেবে ব্যবহৃত হতে থাকে। স্বাধীনতার পর ১৯৮৫ সাল পর্যন্ত এখানে সোনালী ব্যাংকের শাখা কার্যক্রম পরিচালিত হয়। পরবর্তীতে ব্যাংকের নতুন ভবন নির্মিত হলে ঐতিহাসিক এই স্থাপনাটি প্রায় পরিত্যক্ত হয়ে পড়ে।

ঐতিহ্যের সাক্ষী গৌরীপুর লজ এখন ব্যাংকের গেস্ট হাউজ

বর্তমানে ভবনের নিচতলার চারটি কক্ষ গুদামঘর হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। অপরদিকে কাঠের তৈরি দোতলার পাঁচটি কক্ষ সোনালী ব্যাংকের কর্মকর্তাদের গেস্ট হাউজ হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। সেখানে প্রয়োজন অনুযায়ী রান্নার ব্যবস্থাও রয়েছে।

বিশিষ্ট সমাজকর্মী আলী ইউসুফ ঐতিহাসিক এই ভবনকে গেস্ট হাউজ ও রান্নাঘর হিসেবে ব্যবহারের সমালোচনা করে বলেন, এটি অপ্রয়োজনীয়, অনভিপ্রেত ও ঝুঁকিপূর্ণ। তার মতে, গৌরীপুর লজ এ অঞ্চলের একটি গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক নিদর্শন। এর ঐতিহাসিক গুরুত্ব ও স্থাপত্য সৌন্দর্য ক্ষুণ্ন হওয়ার পাশাপাশি ভবনটি ধীরে ধীরে ক্ষয়প্রাপ্ত হওয়ার আশঙ্কাও তৈরি হয়েছে।

ঐতিহ্যের সাক্ষী গৌরীপুর লজ এখন ব্যাংকের গেস্ট হাউজ

তিনি অভিযোগ করেন, দেশ-বিদেশের দর্শনার্থী, গবেষক ও ইতিহাস-অনুরাগীরা অনেক সময়ই ভবনটিতে প্রবেশের সুযোগ পান না। সোনালী ব্যাংকের কর্মকর্তাদের জন্য বিকল্প আবাসনের ব্যবস্থা করে ভবনটি জনসাধারণের জন্য উন্মুক্ত করার দাবি জানান তিনি। একই সঙ্গে অতীত ঐতিহ্য ও স্থাপত্য ইতিহাসের অংশ হিসেবে ভবনটি সংরক্ষণের প্রয়োজনীয়তার কথাও উল্লেখ করেন।

প্রত্নতত্ত্ব অনুরাগী সজল কোরাইশী বলেন, ব্রজেন্দ্র কিশোর রায় চৌধুরী ছিলেন শাস্ত্রীয় সংগীতের অন্যতম পৃষ্ঠপোষক। তার আমন্ত্রণে উপমহাদেশের বহু খ্যাতিমান শিল্পী গৌরীপুর লজে সংগীত পরিবেশন করেছেন। তাদের মধ্যে ছিলেন ওস্তাদ এনায়েত খান, ওস্তাদ মোহাম্মদ আলী খান, ওস্তাদ ওয়াজির খান, ওস্তাদ হাফিজ আলী খান এবং ওস্তাদ মোহাম্মদ দবির খানসহ আরও অনেকে।

ঐতিহ্যের সাক্ষী গৌরীপুর লজ এখন ব্যাংকের গেস্ট হাউজ

এদিকে গৌরীপুর লজকে গেস্ট হাউস হিসেবে ব্যবহার বন্ধের দাবিতে গত ৯ জুন সোনালী ব্যাংকের ময়মনসিংহ অঞ্চলের মহাব্যবস্থাপকের কাছে স্মারকলিপি দিয়েছে পুরাকীর্তি সুরক্ষা কমিটি, ময়মনসিংহ অঞ্চল।

সংগঠনটির সদস্য সচিব ইমতিয়াজ আহমেদ তানসেন বলেন, ভবনটি যথাযথভাবে সংরক্ষণ ও রক্ষণাবেক্ষণের উদ্যোগ নেওয়া জরুরি, যাতে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম এই ঐতিহাসিক ঐতিহ্য সম্পর্কে জানতে পারে।

ঐতিহ্যের সাক্ষী গৌরীপুর লজ এখন ব্যাংকের গেস্ট হাউজ

তবে সোনালী ব্যাংকের ময়মনসিংহ অঞ্চলের মহাব্যবস্থাপক মো. জসিম উদ্দিন দাবি করেন, গৌরীপুর লজ ব্যাংকের নিজস্ব সম্পত্তি এবং প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের চেয়েও ভালোভাবে ব্যাংক এটি সংরক্ষণ করছে।

ভবনটির বর্তমান ব্যবহার সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, এটি গেস্ট হাউজ হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে এবং প্রয়োজন হলে সেখানে রান্নাও করা হয়। এতে ভবনের কোনো ক্ষতির আশঙ্কা নেই বলেও দাবি করেন তিনি।

প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের (ঢাকা ও ময়মনসিংহ বিভাগ) ফিল্ড অফিসার সাবিনা ইয়াসমিন জানান, গৌরীপুর লজ এখনও অধিদপ্তরের তালিকাভুক্ত হয়নি। তবে চলতি বছর ময়মনসিংহ অঞ্চলের প্রত্নতাত্ত্বিক স্থাপনাগুলোর জরিপ প্রতিবেদনে এটি অন্তর্ভুক্ত করে অনুমোদনের জন্য সংশ্লিষ্ট দপ্তরে পাঠানো হয়েছে।

এ বিষয়ে ময়মনসিংহের জেলা প্রশাসক মো. সাইফুর রহমান বলেন, গৌরীপুর লজের স্বার্থে বিষয়টি খতিয়ে দেখা হবে।

এফএ/জেআইএম

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow