ওয়ার্কলোড নয়, আতঙ্ক! নাহিদ রানাকে খেলানোর আসল কারণেই উঠছে বড় প্রশ্ন

২০০৩ সালের পর ২০২৬! মাঝে কেটে গেছে ২৩ বছর। প্রায় দুই যুগ অপেক্ষার পর অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে টেস্ট খেলার সুযোগ পেয়েছে বাংলাদেশ। ২১ বছরের ক্যারিয়ারে এবারই প্রথম অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে টেস্ট খেলবেন মুশফিকুর রহিম। এত আকাঙ্খিত টেস্ট ম্যাচ খেলতে যাওয়ার আগে উচ্ছ্বসিত বাংলাদেশ দলের এখন পূর্ণ প্রস্তুতিতে মনোযোগী হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু সিরিজ শুরুর আগেই বাংলাদেশ নিজের সবচেয়ে বড় ক্ষতিটা নিজেই ডেকে আনলো! একটি প্রশ্নবিদ্ধ সিদ্ধান্ত শুধু দলের পরিকল্পনাই এলোমেলো করেনি, অস্ট্রেলিয়া সফরের আগেই সবচেয়ে বড় অস্ত্রটিকেই হারিয়ে ফেললো। চোটের কারণে বোলিং আক্রমণের প্রধান অস্ত্র নাহিদ রানা পুরো সিরিজ থেকেই ছিটকে গেছেন। দলের অন্যতম প্রধান ব্যাটার লিটন কুমার দাসও প্রথম টেস্টে থাকছেন না। দ্বিতীয় টেস্টে খেলার সম্ভাবনা থাকলেও সেটিও নির্ভর করছে তার পুনর্বাসন ও ফিটনেসের ওপর। একই অবস্থা আরেক পেসার শরিফুল ইসলামের ক্ষেত্রেও। বাংলাদেশ ক্রিকেটে সাবেক অধিনায়ক মাশরাফি বিন মর্তুজাকে নিয়ে নানা আক্ষেপ আছে। সবচেয়ে বড় আক্ষেপ, তাকে অতি ব্যবহার করে নষ্ট করে ফেলা। মাশরাফির পর যত পেসারই এসেছেন, সবাইকে নিয়েই এই আলোচনা হয়েছে। কিন্তু টিম ম্যানেজ

ওয়ার্কলোড নয়, আতঙ্ক! নাহিদ রানাকে খেলানোর আসল কারণেই উঠছে বড় প্রশ্ন

২০০৩ সালের পর ২০২৬! মাঝে কেটে গেছে ২৩ বছর। প্রায় দুই যুগ অপেক্ষার পর অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে টেস্ট খেলার সুযোগ পেয়েছে বাংলাদেশ। ২১ বছরের ক্যারিয়ারে এবারই প্রথম অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে টেস্ট খেলবেন মুশফিকুর রহিম। এত আকাঙ্খিত টেস্ট ম্যাচ খেলতে যাওয়ার আগে উচ্ছ্বসিত বাংলাদেশ দলের এখন পূর্ণ প্রস্তুতিতে মনোযোগী হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু সিরিজ শুরুর আগেই বাংলাদেশ নিজের সবচেয়ে বড় ক্ষতিটা নিজেই ডেকে আনলো!

একটি প্রশ্নবিদ্ধ সিদ্ধান্ত শুধু দলের পরিকল্পনাই এলোমেলো করেনি, অস্ট্রেলিয়া সফরের আগেই সবচেয়ে বড় অস্ত্রটিকেই হারিয়ে ফেললো। চোটের কারণে বোলিং আক্রমণের প্রধান অস্ত্র নাহিদ রানা পুরো সিরিজ থেকেই ছিটকে গেছেন। দলের অন্যতম প্রধান ব্যাটার লিটন কুমার দাসও প্রথম টেস্টে থাকছেন না। দ্বিতীয় টেস্টে খেলার সম্ভাবনা থাকলেও সেটিও নির্ভর করছে তার পুনর্বাসন ও ফিটনেসের ওপর। একই অবস্থা আরেক পেসার শরিফুল ইসলামের ক্ষেত্রেও।

বাংলাদেশ ক্রিকেটে সাবেক অধিনায়ক মাশরাফি বিন মর্তুজাকে নিয়ে নানা আক্ষেপ আছে। সবচেয়ে বড় আক্ষেপ, তাকে অতি ব্যবহার করে নষ্ট করে ফেলা। মাশরাফির পর যত পেসারই এসেছেন, সবাইকে নিয়েই এই আলোচনা হয়েছে। কিন্তু টিম ম্যানেজম্যান্ট কি একটুও সতর্ক হওয়ার কথা ভেবেছে?

বিশ্বক্রিকেটে নাহিদ রানার উত্থান দেখে বড় বড় ক্রিকেটবোদ্ধা বলছিলেন, ‘রত্নের যত্ন নিও।’ কিন্তু বাংলাদেশ দলের নীতি-নির্ধারকের কানে কি সেই আকুতি পৌঁছেছিল?

jagonews

অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে ঐতিহাসিক টেস্ট সিরিজের আগে ২৩ বছর বয়সী নাহিদ রানাকে ঘিরে নেওয়া সিদ্ধান্ত এখন নানা প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। কোন যুক্তিতে নাহিদ রানাকে টি-টোয়েন্টিতে খেলানো হলো? দুই বছর পরের টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের জন্য কি এখনই জীবন-মরণ লড়াই ছিল? নাকি কয়েকটি ম্যাচ জিততেই সব দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা বিসর্জন দেওয়া হলো?

জিম্বাবুয়ে সফরে এবার এক টেস্ট ও সমান ৩টি করে ওয়ানডে ও টি-টোয়েন্টি খেলেছে বাংলাদেশ। টেস্টে না খেললেও ওয়ানডে সিরিজের প্রথম দুই ম্যাচেই ছিলেন নাহিদ রানা। ছিলেন টি-টোয়েন্টি সিরিজের প্রথম দুই ম্যাচেও। দ্বিতীয় ম্যাচেই মূলত চোটে পড়েন তিনি।

ওয়ানডে বিশ্বকাপ বিবেচনায় এখন সব সিরিজই গুরুত্বপূর্ণ, সেটা না হয় মানা গেলো। কিন্তু টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের পরের আসর তো আরও দুই বছর পর। প্রত্যেকটা দল, এমনকি বাংলাদেশও এখন ওয়ানডে বিশ্বকাপে সামনে রেখেই সব পরিকল্পনা সাজাচ্ছে। অন্তত মুখে তো সেটাই বলে আসছেন খেলোয়াড় থেকে কর্মকর্তারা। অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষেও টি-টোয়েন্টি সিরিজে তাকে খেলানো হয়েছে।

তাহলে প্রশ্ন ওঠে, ওয়ানডে বিশ্বকাপকে অগ্রাধিকার দেওয়ার কথা বললেও দলের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পেসার নাহিদ রানাকে কেন টি-টোয়েন্টি সিরিজেও খেলানো হলো? প্রতিপক্ষকে বড় ভেবেই কি পরিকল্পনা বদলে গেল, নাকি দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার চেয়ে তাৎক্ষণিক ফলকেই বেশি গুরুত্ব দেওয়া হলো?

jago

বাংলাদেশ যখনই ভালো দল হয়ে ওঠা শুরু হয়েছে, তখনই যেন জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে দলের বিপক্ষে হারলে সবার মাথা খারাপ হয়ে যায়! হ্যাঁ, তুলনামূলক কম শক্তিশালী দলের বিপক্ষে হারলে অস্থিরতা আসবেই। তবে সেটা নীতি-নির্ধারকদের মধ্যে আসলেই যত গন্ডগোল হয়ে যায়! সেটাই হয়েছে জিম্বাবুয়ে সফরে। টেস্টের পর ওয়ানডে সিরিজ হারে রীতিমত অস্থির হয়ে উঠেছিলেন নীতিনির্ধারকরা। যে কারণে রানাকে ওয়ানডের পর টি-টোয়েন্টিতেও টানা দুই ম্যাচ খেলানোর সিদ্ধান্ত নেন তারা।

বাংলাদেশ ক্রিকেটের সবচেয়ে বড় সমস্যাগুলোর একটি, এখানেই। জিম্বাবুয়ের কাছে একটি সিরিজ হারলেই পরিকল্পনা উধাও হয়ে যায়। তখন দীর্ঘমেয়াদি ভাবনা নয়, শুরু হয় তাৎক্ষণিক আতঙ্কে সিদ্ধান্ত নেওয়ার সংস্কৃতি। এই মানসিকতা থেকেই সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হয়েছে বাংলাদেশের ক্রিকেটের।

টিম ম্যানেজমেন্টের একজন সদস্য জাগো নিউজের সঙ্গে আলাপকালে এমন স্বীকারোক্তিই দিয়েছেন! গত কয়েক বছর ধরে পেসকারদের ওয়ার্কলোড নিয়ে নানা কথা হয়। বিসিবি থেকেও কড়া নির্দেশ দেওয়া আছে। জিম্বাবুয়ে সফরে টেস্ট খেলেননি বলেই সাদা বলের সিরিজে খেলানো হয়েছে এমন যুক্তিই দিচ্ছিলেন ওই সদস্য। তবে শেষ পর্যন্ত স্বীকার করেই ফেলেন, জিম্বাবুয়েতে টানা হারেই তারা রানাকে খেলিয়েছেন।

তিনি বলছিলেন, ‘নাহিদ রানা তো টেস্ট খেলে নাই, তাই এটা ওয়ার্কলোড না। ওয়ার্কলোড নিয়ে কোনো প্রবলেম ছিল না আমাদের সাথে।’ তাহলে টি-টোয়েন্টি যে দুটো খেলেছেন, ওইটা কি খেলার দরকার ছিল? যেহেতু সামনে টেস্ট ছিল।

এমন প্রশ্নে ওই সদস্য বলেন, ‘যেহেতু নাহিদ রানা টেস্ট খেলে নাই এবং শেষ ওয়ানডেতেও বিশ্রামে ছিল। গেম টাইমের (ম্যাচ অনুশীলন) জন্য না আসলে, পরিস্থিতিটাই ওরকম ছিল আমরা হেরে যাচ্ছিলাম তো...।’

jago

অর্থাৎ নাহিদকে খেলানো হয়েছিল কোনো দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা থেকে নয়, বরং সিরিজ হারার আতঙ্কে। এটাই সবচেয়ে উদ্বেগজনক। অথচ আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে পরিকল্পনা দিয়ে দল চলে, আতঙ্ক দিয়ে নয়। জিম্বাবুয়েতে একটা ব্যর্থ সফরের শেষটা প্রলেপ দিতে গিয়ে অস্ট্রেলিয়া সিরিজের রংটাই কেড়ে নেওয়া হলো।

টিম ম্যানেজমেন্টের ওই সদস্যের এই স্বীকারোক্তিই আসলে বাংলাদেশ ক্রিকেটে অনেক কিছু চোখে আঙুল দেখিয়ে দেয়। এই যে দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনায় স্থির থাকতে না পারা, এর পিছনে এই প্যানিক করাটাও বড় কারণ। অথচ অস্ট্রেলিয়া বাংলাদেশে এসে ওয়ানডে সিরিজ হেরেছে। কিন্তু তাদের যে দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা তাতে কিন্তু কোনো ব্যাঘাত ঘটতে দেয়নি।

নাহিদ রানার ওয়ার্কলোড নিয়ে সমস্যা ছিল না-এটা টিম ম্যানেজমেন্টের ব্যাখ্যা। কিন্তু প্রশ্নটা ওয়ার্কলোডের নয়, পরিকল্পনার। অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে দুই যুগ পরের ঐতিহাসিক টেস্ট সিরিজের আগে দলের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পেসারকে একটি টি-টোয়েন্টি সিরিজে খেলানোর প্রয়োজনীয়তা কতটা ছিল, সেই প্রশ্নের উত্তরই এখন খুঁজছে বাংলাদেশ ক্রিকেট। কারণ শেষ পর্যন্ত একটা অগুরুত্বপূর্ণ সিরিজ জেতার বদলে হারাতে হয়েছে দলের সবচেয়ে বড় অস্ত্রকেও। সেটাও অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে ঐতিহাসিক টেস্ট সিরিজের আগে!

আধুনিক ক্রিকেটে প্রতিটি বড় দল তাদের ফাস্ট বোলারদের বিনিয়োগ হিসেবে দেখে। প্রয়োজন না হলে খেলায় না, কারণ তারা জানে একজন ফাস্ট বোলারের মূল্য একটি দ্বিপাক্ষিক টি-টোয়েন্টি সিরিজের চেয়েও অনেক বেশি। বাংলাদেশ কি সেই শিক্ষা এখনো নিতে পারেনি? যদি না পারে, তাহলে ভবিষ্যতে আরও অনেক নাহিদ রানাকে এভাবেই হারানোর ঝুঁকি থেকে যাবে। আর তখন দায় এড়ানোর সুযোগ থাকবে না কারও।

এসকেডি/এমএমআর

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow