কনটেন্ট নির্মাণে নৈতিক আচরণবিধি কেন জরুরি

মুহাম্মদ শফিকুর রহমান বাংলাদেশে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ব্যবহারকারীর সংখ্যা দ্রুত বাড়ছে। ফেসবুক, ইউটিউব, টিকটক, ইনস্টাগ্রাম কিংবা অন্যান্য প্ল্যাটফর্মে প্রতিদিন হাজারো কনটেন্ট তৈরি ও প্রকাশ হচ্ছে। অনেক কনটেন্ট তথ্যসমৃদ্ধ, শিক্ষামূলক ও বিনোদনমূলক হলেও কিছু কনটেন্ট মিথ্যা তথ্য, বিভ্রান্তি, বিদ্বেষ, ব্যক্তিগত আক্রমণ কিংবা সামাজিক অস্থিরতার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। ফলে কনটেন্ট নির্মাতাদের দায়িত্বও আগের যে কোনো সময়ের চেয়ে অনেক বেড়েছে। প্রচলিত সংবাদমাধ্যমে সাংবাদিকদের জন্য নৈতিক নীতিমালা থাকলেও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কনটেন্ট নির্মাতাদের জন্য এমন কোনো সর্বজনস্বীকৃত নৈতিক আচরণবিধি এখনো প্রতিষ্ঠিত হয়নি। অথচ আজ একজন জনপ্রিয় কনটেন্ট ক্রিয়েটরের প্রভাব অনেক সময় একটি গণমাধ্যমের সমান বা তারও বেশি হতে পারে। তাই দায়িত্বশীল কনটেন্ট তৈরির জন্য একটি স্বেচ্ছাসেবী নৈতিক কাঠামো নিয়ে আলোচনা এখন অত্যন্ত প্রয়োজন। একজন দায়িত্বশীল কনটেন্ট নির্মাতার প্রথম দায়িত্ব হওয়া উচিত সত্য ও জনস্বার্থকে অগ্রাধিকার দেওয়া। কোনো তথ্য প্রকাশের আগে সম্ভব হলে একাধিক নির্ভরযোগ্য উৎস থেকে তা যাচাই করা জরুরি। মতামতকে তথ্য হিসেবে উপস্থাপন করা

কনটেন্ট নির্মাণে নৈতিক আচরণবিধি কেন জরুরি

মুহাম্মদ শফিকুর রহমান

বাংলাদেশে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ব্যবহারকারীর সংখ্যা দ্রুত বাড়ছে। ফেসবুক, ইউটিউব, টিকটক, ইনস্টাগ্রাম কিংবা অন্যান্য প্ল্যাটফর্মে প্রতিদিন হাজারো কনটেন্ট তৈরি ও প্রকাশ হচ্ছে। অনেক কনটেন্ট তথ্যসমৃদ্ধ, শিক্ষামূলক ও বিনোদনমূলক হলেও কিছু কনটেন্ট মিথ্যা তথ্য, বিভ্রান্তি, বিদ্বেষ, ব্যক্তিগত আক্রমণ কিংবা সামাজিক অস্থিরতার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। ফলে কনটেন্ট নির্মাতাদের দায়িত্বও আগের যে কোনো সময়ের চেয়ে অনেক বেড়েছে।

প্রচলিত সংবাদমাধ্যমে সাংবাদিকদের জন্য নৈতিক নীতিমালা থাকলেও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কনটেন্ট নির্মাতাদের জন্য এমন কোনো সর্বজনস্বীকৃত নৈতিক আচরণবিধি এখনো প্রতিষ্ঠিত হয়নি। অথচ আজ একজন জনপ্রিয় কনটেন্ট ক্রিয়েটরের প্রভাব অনেক সময় একটি গণমাধ্যমের সমান বা তারও বেশি হতে পারে। তাই দায়িত্বশীল কনটেন্ট তৈরির জন্য একটি স্বেচ্ছাসেবী নৈতিক কাঠামো নিয়ে আলোচনা এখন অত্যন্ত প্রয়োজন।

একজন দায়িত্বশীল কনটেন্ট নির্মাতার প্রথম দায়িত্ব হওয়া উচিত সত্য ও জনস্বার্থকে অগ্রাধিকার দেওয়া। কোনো তথ্য প্রকাশের আগে সম্ভব হলে একাধিক নির্ভরযোগ্য উৎস থেকে তা যাচাই করা জরুরি। মতামতকে তথ্য হিসেবে উপস্থাপন করা কিংবা অর্ধসত্য দিয়ে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করা শুধু অনৈতিকই নয়, এটি সমাজের জন্যও ক্ষতিকর।

ডিজিটাল যুগে ব্যক্তিগত গোপনীয়তা রক্ষা একটি বড় চ্যালেঞ্জ। কারো অনুমতি ছাড়া ব্যক্তিগত ছবি, ভিডিও বা তথ্য প্রকাশ করা উচিত নয়। বিশেষ করে শিশু, দুর্ঘটনায় আহত ব্যক্তি কিংবা শোকাহত পরিবারের ছবি বা ভিডিও প্রচারে সর্বোচ্চ সংবেদনশীলতা প্রয়োজন।

একইভাবে স্পন্সরড বা বিজ্ঞাপনভিত্তিক কনটেন্টের ক্ষেত্রেও স্বচ্ছতা অপরিহার্য। অর্থ বা অন্য কোনো সুবিধার বিনিময়ে তৈরি কনটেন্টকে স্পষ্টভাবে বিজ্ঞাপন হিসেবে উল্লেখ করা উচিত। দর্শকের আস্থা ধরে রাখতে এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

বর্তমানে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করে ছবি, ভিডিও ও কণ্ঠস্বর তৈরি করা সহজ হয়ে গেছে। তাই এআই-নির্ভর কনটেন্ট প্রকাশ করলে সেটি দর্শককে জানানো একটি দায়িত্বশীল আচরণ। এতে বিভ্রান্তি কমে এবং বিশ্বাসযোগ্যতা বাড়ে।

পাশাপাশি অন্যের লেখা, ছবি বা ভিডিও কপি না করা, প্রয়োজন হলে যথাযথ কৃতিত্ব দেওয়া এবং কপিরাইটকে সম্মান করা একজন পেশাদার কনটেন্ট নির্মাতার মৌলিক দায়িত্ব। ভিউ বাড়ানোর জন্য বিভ্রান্তিকর থাম্বনেইল বা শিরোনাম ব্যবহারও দীর্ঘমেয়াদে বিশ্বাসযোগ্যতা নষ্ট করে।

সামাজিক সম্প্রীতি রক্ষাও কনটেন্ট নির্মাতাদের বড় দায়িত্ব। ধর্ম, জাতি, ভাষা, লিঙ্গ বা অন্য কোনো পরিচয়কে কেন্দ্র করে বিদ্বেষ ছড়ানো, অপমানজনক ভাষা ব্যবহার কিংবা গুজব প্রচার শুধু সামাজিক ক্ষতিই করে না। অনেক সময় আইনি জটিলতাও সৃষ্টি করতে পারে। মতের ভিন্নতা থাকলেও তা যুক্তি ও শালীনতার সঙ্গে প্রকাশ করাই সভ্য সমাজের পরিচয়।

বাংলাদেশের সংবিধান, প্রচলিত আইন এবং দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের প্রতি শ্রদ্ধাশীল থেকে কনটেন্ট তৈরি করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। একই সঙ্গে বিচারাধীন বিষয়ে এমন কোনো মন্তব্য বা উপস্থাপন এড়িয়ে চলা উচিত, যা বিচারপ্রক্রিয়াকে প্রভাবিত করতে পারে।

খাদ্য, স্বাস্থ্য, ওষুধ কিংবা আর্থিক বিষয়ে কনটেন্ট তৈরি করা ব্যক্তিদের দায়িত্ব আরও বেশি। যাচাইহীন স্বাস্থ্যপরামর্শ, বিভ্রান্তিকর আর্থিক পরামর্শ বা অতিরঞ্জিত বিজ্ঞাপন মানুষের জীবন ও সম্পদের জন্য ঝুঁকির কারণ হতে পারে।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, কনটেন্ট নির্মাণকে কেবল ভিউ, লাইক বা আয়ের মাধ্যম হিসেবে না দেখে সামাজিক দায়িত্ব হিসেবেও বিবেচনা করা। কারণ একটি ভুল তথ্য মুহূর্তেই লাখো মানুষের কাছে পৌঁছে যেতে পারে, আবার একটি দায়িত্বশীল কনটেন্ট অসংখ্য মানুষের চিন্তা, জ্ঞান ও আচরণে ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে পারে।

প্রযুক্তির এই যুগে কনটেন্ট নির্মাতারা শুধু বিনোদনদাতা নন; তারা মতামত গঠনকারী, তথ্যবাহক এবং অনেক ক্ষেত্রে সমাজের অনানুষ্ঠানিক শিক্ষকও। তাই দায়িত্বশীল, সত্যনিষ্ঠ, মানবিক ও আইনসম্মত কনটেন্ট তৈরির সংস্কৃতি গড়ে তোলা এখন সময়ের অন্যতম বড় প্রয়োজন।

উল্লেখ্য, প্রস্তাবিত এই নৈতিক আচরণবিধি কোনো সরকারি আইন বা বাধ্যতামূলক বিধিমালা নয়। এটি দায়িত্বশীল কনটেন্ট নির্মাণে সচেতনতা বৃদ্ধি এবং নৈতিক চর্চাকে উৎসাহিত করার লক্ষ্যে একটি স্বেচ্ছাসেবী খসড়া কাঠামো। যদি কনটেন্ট নির্মাতারা স্বতঃস্ফূর্তভাবে এমন নীতিগুলো অনুসরণ করেন, তবে ডিজিটাল পরিসর হবে আরও নিরাপদ, বিশ্বাসযোগ্য এবং ইতিবাচক।

এসইউ

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow