কবিতায় জেগে ওঠা নতুন চর...
কবি মৃধা আলাউদ্দিনের কবিতাকে বলা যায় নতুন কাব্যের প্রয়াস। ‘উজানের’ অর্থাৎ বৈরীতার তিত-তিক্ততায় নদী যেমন মরে যায় তার সচলতা শীর্ণ হয়ে পড়ে, তার উচ্ছলতা উধাও হয়ে এক নদী যেমন হারায় দিশা তেমনি নানা প্রতিক‚লতা জীবনকে করে সীমিত, অর্থহীন কঙ্কাল মানুষ, আশাহীন এক ভবিষ্যতের; অর্থ ও বোধহীন করে জীর্ণ নদীর মতো এক অচেনা অস্তিত্ব। মৃধা একই সাথে প্রেম-ব্যথা, দ্রোহ ও রোমান্টিক ধারার কবি, তার কবিতায় অন্তর্গত এক প্রেমের বিবৃতিই বেশি মাত্রা আবেগায়িত হয়েছে কাব্যভাষার মোড়কে। সে কেবলই একটা গতানুগতিকতার মধ্যে সীমিত থাকেনি বরং অন্তর্মানসীর কষ্ট-দুঃখ-বেদনারাজিকে সমাজের যে সামাজিক অসঙ্গতিরই উপাদান থেকে সংক্রমিত এবং তা যে ভালোবাসাময় জীবনকে আর সহায়তা দেয় না, অর্থাৎ স্বাভাবিকতার মধ্যে যে অস্তিত্বকে নির্মাণ করে না কবির লেখায় মনোযোগ দিলে সেই সত্য দৃশ্যমান হয়ে ওঠে। ‘শুঁড়িখানার নরম দেহ, কাবাব ভুনা, আদিরসের নিষ্প্রয়োজন কান্নাভেজা জীবনে আজ আমার দেখি সবার আগে বিষ প্রয়োজন।’ কাব্যভাষায় এই তরুণ কবি ধীরে ধীরে যে পারঙ্গম হয়ে উঠেছে তা তার কবিতাই বলে দেয়। মৃধার নির্মাণ করা উপমা, উৎপ্রেক্ষা এবং বৈপরীত্যও অনেকখানি স্বতন্ত্র করেছে
কবি মৃধা আলাউদ্দিনের কবিতাকে বলা যায় নতুন কাব্যের প্রয়াস। ‘উজানের’ অর্থাৎ বৈরীতার তিত-তিক্ততায় নদী যেমন মরে যায় তার সচলতা শীর্ণ হয়ে পড়ে, তার উচ্ছলতা উধাও হয়ে এক নদী যেমন হারায় দিশা তেমনি নানা প্রতিক‚লতা জীবনকে করে সীমিত, অর্থহীন কঙ্কাল মানুষ, আশাহীন এক ভবিষ্যতের; অর্থ ও বোধহীন করে জীর্ণ নদীর মতো এক অচেনা অস্তিত্ব। মৃধা একই সাথে প্রেম-ব্যথা, দ্রোহ ও রোমান্টিক ধারার কবি, তার কবিতায় অন্তর্গত এক প্রেমের বিবৃতিই বেশি মাত্রা আবেগায়িত হয়েছে কাব্যভাষার মোড়কে। সে কেবলই একটা গতানুগতিকতার মধ্যে সীমিত থাকেনি বরং অন্তর্মানসীর কষ্ট-দুঃখ-বেদনারাজিকে সমাজের যে সামাজিক অসঙ্গতিরই উপাদান থেকে সংক্রমিত এবং তা যে ভালোবাসাময় জীবনকে আর সহায়তা দেয় না, অর্থাৎ স্বাভাবিকতার মধ্যে যে অস্তিত্বকে নির্মাণ করে না কবির লেখায় মনোযোগ দিলে সেই সত্য দৃশ্যমান হয়ে ওঠে।
‘শুঁড়িখানার নরম দেহ, কাবাব ভুনা, আদিরসের নিষ্প্রয়োজন
কান্নাভেজা জীবনে আজ আমার দেখি সবার আগে বিষ প্রয়োজন।’
কাব্যভাষায় এই তরুণ কবি ধীরে ধীরে যে পারঙ্গম হয়ে উঠেছে তা তার কবিতাই বলে দেয়। মৃধার নির্মাণ করা উপমা, উৎপ্রেক্ষা এবং বৈপরীত্যও অনেকখানি স্বতন্ত্র করেছে আমাদের। ‘বেহায়া বাতাস উড়াচ্ছে চুল’, ‘জলের বিছানা’, ‘পাথর প্রেমিক’, ‘অমীমাংসিত কোনো সৌন্দর্য’ ও ‘সামনের শীতে মানুষ রৌদ্র হয়’ ইত্যাদি নির্মাণ তার কল্পনাশক্তিকে চিহ্নিত এবং শনাক্তযোগ্য করে। মানুষের সকল কাজ সামাজিক এবং যৌথ। স্বতন্ত্রতার মধ্যেই যৌথ জীবনের স্বাতন্ত্র্যতা। ব্যক্তি এবং ব্যষ্টির যেমন দূরত্ব রয়েছে, রয়েছে নৈকট্যও। সকল সৃষ্টি স্বতন্ত্র ব্যক্তির কিন্তু সকল সৃষ্টির প্রয়োজনীয়তা সমাজের। সৃষ্টিতে অভিজ্ঞতা লাগে, অভিজ্ঞতা পূর্বজ এবং সামাজিক। এর মধ্য দিয়েই পরিবর্তনগুলো ঘটে এবং প্রতিটা পরিবর্তনে নতুনদের ভূমিকা থাকে খুব ছোট্ট, খুব সাধারণ কিন্তু এই সাধারণের মধ্য দিয়ে তরুণরা এমন কিছু উপাদানের সৃষ্টির করেন যা পূর্বকে আরও নতুন করে এবং দিক পরিবর্তনের যাত্রায় যুক্ত করে। সন্ধান দেয় জমিন বা নতুন চরের।
‘সামনের শীতে মানুষ রৌদ্র হবে’ বইটির কবিতাগুলো পড়ে আমার মনে হলো— এই তরুণ আগামীতে তার প্রকাশে এমন কিছু সংযোজন করবেন যা তাকে পরবর্তী সময়ের কবি বলে শনাক্তকরণে আর কোনো দ্বিধা থাকবে না। প্রস্তুতি পর্বে তার প্রকাশগুলো দিশাযুক্ত হয়ে বিষয় নির্বাচন ও রূপের সমন্বয়কে উজ্জ্বল করে তুলতে তেমনটা না পারলেও, কবিতার গঠনশৈলীতে তার স্বাতন্ত্র্য আছে। আছে ভাষা প্রয়োগের দারুণ দক্ষতা।
১. এসো আমরা চলে যাই / জনান্তিকে, রাস্তায়, / টর্নোডো, টাইফুন ছেড়ে / জৌলুসপূর্ণ রৌদ্দুরে...
২. তুমিতো আমার কাছে / আদি আয়নার মতো / সাত রং, ষড়ৈশ্বর্য।
এরকম আরো অনেক নির্মিত পঙ্ক্তি তার কবিতাগুলোতে রয়েছে। মৃধা কবি এবং কবিতার প্রস্তুতি পর্বে তার আন্তরিকতা আমাকে এই প্রতীতি দেয়, সে আগামীর উত্থানপর্বে দক্ষতার স্পষ্টতা তৈরিতে পারঙ্গম হবেন। তার কবিতায় জেগে ওঠা নতুন চরের ঘ্রাণ পাওয়া যায়। ...কবিতা মূলত বিষয় ও রূপের নির্মাণ যার ভেতর বহুর উপস্থিতি কবিতাকে পাঠক গ্রাহ্য করে। মৃধার কবিতায় সমাজের রোগশোক, ভালোবাসা ও রঙের বিমূর্ততার অনুষঙ্গগুলো শনাক্ত করা যায়। কবি মৃধা আলাউদ্দিনের জন্য আমাদের শুভ কামনা।
তুমি নদী হয়ে গ্যাছো
নদী ধুয়ে দ্যায় সবাইকে
নিয়ে যায় হিমাচল, নীলিগিরি
নায়েগ্রা, নীলাচল
অচেনা-অজানা দারুণ দিগন্তে—
নদী মৃতকে দ্যায় জীবন
মূককে দ্যায় প্রাণোচ্ছ¡ল
নির্ঝঞ্ঝাট, সন্ধ্যার ষড়ৈশ্বর্যে
সাবলীল-সুন্দর ভাষা।
আমাকে বারবার কাঁদিয়েছে নদী
বঞ্চিত করেছে তাবৎ ঐশ্বর্য
ভালোবাসা ও নুনের হাটবাজার থেকে;
বিমূর্ত রসায়নে ফেটে যায় এই দেহ—
আমি কেঁদে কেঁদে রাত্রিরে বর্ষার
পিরামিড অথবা তাজমহল হয়ে যাই,
যেনো কষ্টের পাহাড় গলে ঝলসে ওঠে আগুন।
নদী দেখলেই তোমাকে মনে পড়ে
উজানের আছাড়িপিছাড়ি তমস্যায়
তুমি নদী হয়ে গ্যাছো...
দ্য লাস্ট কিস
এসো আমরা চলে যাই
জনান্তিকে, রাস্তায়
টর্নেডো, টাইফুন ছেড়ে
জৌলুসপূর্ণ রৌদ্দুরে—
এসো আমরা বিশ্রাম করি
নৈশ নীড় ও বালাখানায়
বালিয়াড়ি পাড়ে—
ঘুমিয়ে শুনি পড়শির পদাবলি
অথবা চলো আমরা চলে যাই
বৈষ্ণবদের কাম-কলা পদাবলি ছেড়ে
রাস্তায়
রৌদ্দুরে...
এসো আমরা চুম্বন করি
হাতে
গালে,
নাভি-নিতম্বে
নিম্ননাভিমূলে—
চুম্বনের এই প্রেম অথবা মহাযুদ্ধ— মিলনের চেয়ে
বলো পৃথিবীতে দামি আর কি হতে পারে?
এসো আমরা চলে যাই বৈষ্ণবদের কাম-কলা
পড়শির পদাবলি ছেড়ে
রাস্তায়
রৌদ্দুরে...
সামনের শীতে মানুষ রৌদ্র হবে
মানুষ আর মানুষ থাকবে না
সামনের শীতে সে রৌদ্র হবে
ঝরনা হবে পৃথিবীর অর্ধেক।
২.
একদিন খাটাসও খর্ব হবে
থাকবে না খোয়া ওঠা খাল,
সরে যাবে ঘিচিমিছি, ঘিঞ্জি প্রতারক ঘাস
কাক, কাকের কর্কশ আওয়াজ
পুড়ে যাবে বেহায়া বাতাস, জবড়জং জীবাশ্ম
নষ্ট হওয়া নারী, ছেঁড়া নাও
নৌফেল—
৩.
নায়েগ্রার উত্তাল জলরাশি থেকে উঠে আসবে
আমাদের বারান্দায় রোদ...
সুউচ্চ মিনার থেকে আমরা শুনব আজান
এবং আলো আসবে আমাদের জরাজীর্ণ প্রাসাদে
যেনো পুড়ে যায় বেহায়া বাতাস
জবড়জং জড়ি ও জীবাশ্ম।
৪.
হে নদী! অশ্বারোহী আপেল
গাছের রৌদ্র ছেড়ে দেবো
এবঙ অভিন্ন ভ্রণ, খুলে যাবে খাল
খালের খোল,
খৈয়াম—
যেনো সামনের শীতে, শীত মানুষ রৌদ্র হয়
ঝরনা হয় পৃথিবীর অর্ধেক।
৫.
নায়েগ্রার উত্তাল জলরাশি থেকে উঠে আসবে
আমাদের বারান্দায় রোদ,
আমরা শুনব সুউচ্চ মিনার থেকে আলোর আজান...
খোয়া ওঠা অমাবস্যা রুগ্ণ রোড
খোয়া ওঠা অমাবস্যা রুগ্্ণ রোড
দুপাশে পুষ্টিহীন গাছ, ডাঙ্গা
কালিক মেশানো ন্যায্যমূল্যের বাতাস;
ছিন্ন বিদ্যুৎ—
এবঙ এখানে আমি একা হেঁটে যাই অন্ধ চোখে—
যাই কুয়াশার তাঁতে বোনা বিচ্ছেদের ভীষণ শরীরে
ছেঁড়া কার্পেট
খরস্রোতা যৌবনে।
প্রতিদিন ভুলে থাকি মর্ত্যরে মানুষ— আম-আপেল
জবড়জং এই জীবাশ্ম, জন্ম-জন্মের অলৌকিক আয়োজন।
রুটি, ভাত-কাপড়, জুতা-স্যান্ডেল; নাস্তার টেবিলে কিছুই পাই না
ভরা ফার্মেসির জানালায় ওঠে নষ্ট হওয়া নারী ও বৃষ্টি—
দাগী, দৃষ্টিহীন শীষের মতো লকলক করে চেয়ারম্যান
চেয়ারম্যানের চোরা চিন্ময় জিহবা...।
যেনো চোখে ভাসে খোয়া ওঠা অবাবস্যা রুগ্ণ রোড
আনন্দ-অশ্রু, ম্লান শিশির কণা— ভাঙে কুমারী মন
আর এইভাবে আর্তনাদ ওঠে অবহেলিত
পৃথিবীর পুষ্টিহীন পিঠে, ফসলের মাঠে, খালে-বিলে
কাশবনে—
এবঙ আমি একা এখানে হেঁটে যাই অন্ধ চোখে—
খোয়া ওঠা অমাবস্যা রুগণ রোড কালিক মেশানো পুষ্টিহীন গাছ-মাছ
রাত-রৌদ্র, পচা আম-আপেল সব আমারই থেকে যায়—
থেকে যায় অসহায়, আর্তনাদ ভেজা ভারবাহী বৃষ্টির মতো।
পৃথিবী বাড়ন্ত বৃক্ষ ও ঝরনা হবে
তোমরা নদীর জলে রৌদ্রের সার দাও
ঢেউ লাগাও মাটির মার্গণ মউলে
এবঙ দেখে নিঅ রাত্রিরে, একদিন
নদী ও মাটিরা গর্ভবতী হলে
মানুষ ফিরে পাবে কল্যাণময় কস্তুরি রাত...
তোমরা রেলের দৌড়ের সাথে পাল্লা দাও
পাল্লা দাও কোনো এক সগন হৃদয়হীন ঘড়ির কাঁটার সাথে
তোমরা পাল্লা দিলে গাছেরা ফিরে পাবে
বর্ণালী বরাঙ্গ বোধ ও জলের উত্তাল তরঙ্গ।
তোমরা আদ্র-কোমল ষড়ৈশ্বর্য শব্দের দিকে হাত বাড়াও
হাত বাড়াও সোনালি চাঁদ ও প্রজাপতির ডানার দিকে।
তোমরা হাত বাড়ালে বাতাসের সাথে উড়ে যাবে
সুরভিত প্রতারক পাপড়ির দীর্ঘশ্বাস
এক ষাড়যন্ত্রিক নদীর জীবন।
তোমরা আকাশে সূর্যের দিকে তাকাও
আমি সূর্যকে স্বর্ণের থালা বানিয়ে দিয়েছি
সূর্য থালা হলে তোমরা বাড়িতে বাড়ন্ত বৃক্ষ পাবে।
এবঙ এখন প্রতারক পাখি, পাখিদের ফিরে যাওয়ার কথা
পাখিরা ফিরে গেলে— আজই
আম্বর-মেশকে মেশানো পৃথিবী ঝরনা হবে।
জবড়জং জেলি ও জোছনার গান
কখনও কখনও রাগে রৌদ্রকে ফালা ফালা করি
রাত্রিরে আমূল খেয়ে ফেলি জোছনা
আম-আঁটি
জবড়জং-জেলি
জায়ফল, জাক্কুম বৃক্ষ—
এবঙ একদিন আসমান তেতে ওঠে ভয়ে, ভুরভুর ভাটির টানে
ভেঙে দুমড়ে-মুড়চে যায় সন্দল সাদা প্রতারক ঘোড়া;
চোখের চাবুক দিয়ে খেয়ে ফেলি সবটুকু নোনা জল
বন্যা-বন্যা
দূষিত পানি
খড়-কুটো-খড়—
আবার ঠান্ডা হয় রাগ-রৌদ্দুর, রোষাগ্নী— রোসমৎ
গাছেরা-মাছেরা, জায়ফল-জাক্কুম বৃক্ষ সরে যায় রাস্তায়...
সামনে থেকে সরে যায় মাকড়শার জালের মতো
তিমির কুয়াশা। ব্যথার রাত্রি।
ঝরাপাতার অসংক্ষিপ্ত ঘণীভূত মেঠোপথ যা আমাকে
বারবার সগন শিশিরের কাছে নিয়ে যায়।
এবং একদিন আমি উঠে আসি ষাড়যন্ত্রিক আমার জলের জীবন থেকে
আছড়েপড়া জোছনার মতো সুনসান প্রকৃতির কাছে।
আমার প্রতিজ্ঞার হাওর বা জলের কাছে।
এবঙ পৃথিবী তোমরা শোনো!
মানুষ আজীবন থেকে যায় মানুষ—
রাগে কখনও রৌদ্রকে ফালাফালা করি।
রাত্রিরে আমূল খেয়ে ফেলি জোছনা
আম-আঁটি জবড়জং জায়ফল জেলি—
এবঙ রাগে রৌদ্রকে কখনও কখনও ফালা ফালা করি।
উদ্ভ্রান্ত পাখি
উদ্ভ্রান্তের মতো শান্ত-সচ্ছল, ষড়ৈশ্বর্য পাখিটা কেবলই বলছিল
ভালোবাসি
ভালোবাসি আর ভালোবাসি...
এবঙ একদিন ভালোবাসার নামাবলি, নতুন টুলটুলে টোপর ও শিশিরের
অজস্র রঙিন রেশম গায়ে দিয়ে উড়ে গেল পাখিটা।
ভুল করে, রাতের আঁধারে চলে গেল দক্ষিণের চিরহরিৎ পাতা ঝরা প্রান্তরে।
উড়ে উড়ে অস্থির, এলোমেলো ও শ্রান্তরসে আবারো দিকভ্রান্ত হয়ে যাচ্ছিল পাখিটা...।
নদীর চারপাশ, আকাশের ওপারে নীলাকাশ
অদেখা ভুবনে ঘুরে ঘুরে সবুজ প্রান্তরে ফিরে এলো উদ্ভ্রান্ত পাখিটা।
সিদ্ধ পৃথিবীর জন্য পঙ্্ক্তি
একটি আলোময়, অলৌকিক হ্যাঙ্গারে
বিশাল ঝুল বারান্দায় অথবা সমমান সমুদ্রে
নীল সমুদ্রে আমি সিদ্ধ দেবো আজকের নিমজ্জিত সভ্যতা।
প্রতিটি স্বাস্থ্যকরদ্ভ্রা প্রজ্ঞাময় নুনের ফোঁটার মতো
সিদ্ধ হবে এই গ্রেনেড হামলা করা পৃথিবী।
পুঁজি আর সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে এই সিদ্ধ।
অবাক, অন্ধ ঈগলকে বোল শেখাবার জন্য এই সিদ্ধ।
আঁধার অথবা পোড়ো জমিতে ফুল ফোটাবার জন্য এই সিদ্ধ।
আমরা উদ্বেলিত উজ্জ্বল চাঁদ
আমার সামনের রৌদ্রগুলো এখন
দলজা নদীর মতো বেদনার্ত
প্রিয়তম বাংলাদেশ! তোমারও কী তাই?
আমার সামনের নদীগুলো পূর্ণিমা
চাঁদের মতো উজ্জ্বল
প্রিয়তম বাংলাদেশ! তোমারও কী তাই?
তবে কী আমরা পৃথিবীর পচা বমি অথবা গ্রেনেড
না, না, আমরা উদ্বেলিত চাঁদ-উজ্জ্বল মহানক্ষত্র।
উর্ধ্ব অট্টালিকার স্বাদ
আমি ভেঙে দেবো পৃথিবীর পরচর্চা
প্রথম নৌফেল
শয়তান সরোবর— কঠিন শিলা-সমুদ্র;
ভেঙে দেবো রুগ্্ণ রোদ মেশানো আজাজিল
আসমান
অ্যাবড়োথেবড়ো দজলা-ফোরাত—
শঙ্কাহত বিশ্বাস-অবিশ্বাসের ভাঙা সিঁড়ি
প্রবঞ্চনার ঢেউ ভেঙে তুলে আনবো দশাশ্ব রোদ
আর আজ, এখনই এ জিহ্বা দিয়ে উচ্চারণ করাবো
ঊর্ধ্ব—
ঊর্ধ্ব অট্টালিকার স্বাদ— সাদা কইতর—
‘ফাবি আইয়ি আলা রব্বিকুমা তুকাজ্জিবান’।
পালকির পোট্রেট
পয়লা ঝড়
জমির শেখের বাড়ির কোনো এক নিবিড় কোণে পড়ে
আছে একটা শ্রীহীন রুগ্্ণ পালকি এবঙ উলুধরা পায়ে
পেষা ময়ুরের কাঠ মূর্তি... নকশি পাটির ছেঁড়া
ছেঁড়া কিছু অংশ। বেড়া, ছাউনি আর টিন।
দোস্রা ঝড়
পালকির পাটাতনও ক্ষয়ে পড়ে আছে মাটিতে
ভেঙে গ্যাছে দু’টো পা; উলু খামছে ধরেছে সমস্ত
পালকিটাকে। ঠিক যেনো জল-ঝর জলোচ্ছাসের তাণ্ডবে
মাটি মানুষের এক অসম্ভব কঙ্কাল।
তেসরা ঝড়
উলু ধরা এই (হলদে হওয়া বোটার মতো) পালকিটাও
একদিন থাকবে না... থাকবো না
আমি তুমি শে— আমাদের সুন্দর পৃথিবী। যখন লাগবে
টান আত্মায়-আত্মায়, আনন্দ ও আয়নায়— চিন্তায়
চেতনায়... আসবে আজরাঈল।
কষ্টেসংক্রান্ত কাটলেট
ক.
আমি একটি পাটের দড়ি কাটবো;
যেনো বিছিন্ন করতে পারি
পৃথিবী থেকে পয়স্বিনী-প্রতারক প্রেম।
খ.
আমি সেই সাঁকো ভেঙে চুরমার করে দেবো
যা আমাকে বারবার পৌঁছে দ্যায়
পিলসুজ প্রতারক পাপড়ির কাছে।
গ.
এবঙ আমাকে একটা কারুকান্ত সুন্দর কাস্তে দাও
আমি মাতৃত্বের বন্ধনকে ছিন্ন করি—
আর কতই না বিচিত্র,
ঙ.
মাতৃত্বকে কেবল একটি কাস্তেই আহত করতে চায়।
একান্ত অভিলাষ
ওগো আমার আড়ষ্ট জিহ্বা !
মুসার মতো ক্রন্দন করো—
কেননা, আমার একান্ত অভিলাষ
আমি সন্ধ্যার সুন্দর সঙ্গীতে মত্ত থাকি।
একান্ত অভিলাষ-২
যাও, সামনের সাগর পাড়ি দাও।
আর ফিরো না পিছনে;
শে ব্যথিত নারীর আশ্বিন চোখ।
একান্ত অভিলাষ-৩
দ্বারবান কোনো ঠুনকো ভাঙার কাঁচ নয়;
সে বিরাট-বিশাল লৌহ দণ্ড
যে খুলে দ্যায় দরোজা
আকাশ আলোর
অফুরন্ত দীপ্ত ভোর...।
একান্ত অভিলাষ-৪
হে মধুর মলয়, বাতাস!
উড়ে যাও পারিজাত পুষ্পের বাগানে
নিয়ে এসো প্রজাপতি
মৃগনাভী ঘ্রাণ—
যা আমাকে বারবার অলৌকিক, উদ্বেলিত করে।
মৃধা আলাউদ্দিন। মাতা : ফুলবানু বেগম। পিতা : মৃত মোসলেম মৃধা। জন্ম : ০২.০২.১৯৭৮। জন্মস্থান : কাংশী, উজিরপুর, বরিশাল। কবি, কথাশিল্পী ও প্রাবন্ধিক। মৃধা নব্বই দশকের অন্যতম নিভৃত কবিদের অন্যতম একজন। লিখছেন গল্প, কবিতা, ছড়া ও সমালোচনা সাহিত্য। দেশের জাতীয় দৈনিক ও লিটলম্যাগে নিয়মিত তার লেখা ছাপা হচ্ছে। মৃধা একজন ছন্দ সচেতন নাগরিক কবি। তার কবিতায় উঠে এসেছে সমাজের কুসংস্কার, নীতিহীন-বিপ্রতীব সময়ের ছবি, নোংরা রাজনীতি এবং একই সাথে নিপুণ কারিগরের মতো মৃধা তার কবিতায় প্রেম, দ্রোহ ও ভালোবাসার গান গেয়েছেন। সমাজ বিনির্মাণের গাথা কবিকে আলাদা বৈশিষ্ট্য দান করেছে। কবির দোঁহাগুচ্ছ কাপলেটে পরিণত হয়েছে বলেই পাঠক সমাজের দৃঢ় বিশ্বাস। নিঃসন্দেহে বলা যায় সমালোচনা সাহিত্যে কবি তার নিজস্ব জায়গা তৈরি করে নিয়েছেন। কবি মৃধা আলাউদ্দিনের প্রথম কাব্যগ্রন্থ রৌদ্দুরে যায় মন (প্রকাশকাল : ২০০৫), রেলগাছ। ২. সামনের শীতে মানুষ রৌদ্র হবে (প্রকাশকাল : ২০২০), প্রকাশক : বার্নম এন্ড নোবল, নিউইয়র্ক। প্রকাশিতব্য গ্রন্থ : প্রজাপতি হয়ে গ্যাছে কোনো কোনো মাছ (কাব্যগ্রন্থ), জঙধরা পিনালকোড (গল্পগ্রন্থ), চড়ুইয়ের চিড়িপ চিড়িপ শব্দ (কিশোর কবিতা), শুঁড়িখানার নরম দেহ (দোঁহা কাব্যগ্রন্থ), অল্পকিছু বিষ প্রয়োজন (দোঁহা কাব্যগ্রন্থ), আল মাহমুদ ও অন্যান্য সন্দর্ভ প্রভৃতি। কবি মৃধা আলাউদ্দিন দুই ছেলে সন্তানের জনক। মৃধা শব্দশীলন সাহিত্য একাডেমির প্রতিষ্ঠাতা পরিচালক ও চেয়ারম্যান। পুরস্কার ও সম্মাননা : অতীশ দীপঙ্কর স্বর্ণপদক। বঙ্গভ‚মি সাহিত্য সম্মাননা, বঙ্গভ‚মি সাহিত্য পরিষদ। শীর্ষবিন্দু সাহিত্য পদক, শীর্ষবিন্দু লিটলম্যাগ। বঙ্গীয় মুসলিম সাহিত্য সমিতিপ্রাপ্ত ক্রেস্ট ও স্বর্ণপদক। সম্পাদনা : একটি কাব্যভাঁজ (লিটলম্যাগ প্রায় ১০টি সংখ্যা বের হয়ে অর্থাভাবে বন্ধ হয়ে গেছে লিটলম্যাগটি)। মৃধার সম্পাদনায় বের হয়েছে সিলেটের মরহুম কবি মিছবাহুল ইসলাম চৌধুরীর কবিতা ‘শেরশাহ’ (একটি মহাকাব্য)। কবি মৃধা আলাউদ্দিন বর্তমানে একটি জাতীয় দৈনিকে কর্মরত আছেন।
What's Your Reaction?