বন্দরের কারণে কর্ণফুলী নদীকে বাংলাদেশের অর্থনীতির হৃদপিণ্ড বলা হয়। কর্ণফুলী নদীর তীরে গড়ে উঠেছে দেশের পেট্রোলিয়াম জ্বালানি পরিশোধন ও মজুতের মূল নেটওয়ার্ক। বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) বিপণনকারী তিন অঙ্গ প্রতিষ্ঠানের ডিপো থেকে সারাদেশে এ নেটওয়ার্ক বিস্তৃত।
কর্ণফুলী নদী থেকে শুরু করে পুরো নেটওয়ার্কে জ্বালানি তেল চুরির বিষয়ে জাতীয় নিরাপত্তা গোয়েন্দা (এনএসআই) প্রতিবেদন নিয়ে নড়েচড়ে বসে জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ। পুরো ঘটনা তদন্তে একজন অতিরিক্ত সচিবের নেতৃত্বে গঠন করা হয় উচ্চ পর্যায়ের কমিটি। কমিটির তদন্তে সিস্টেম লসের নামে তেল চুরির বিষয়টি উঠে আসে। এসব চুরি বন্ধে ১২টি সুপারিশ করেছে কমিটি। এরই মধ্যে জ্বালানি সচিবের কাছে তাদের প্রতিবেদনও জমা দিয়েছে তদন্ত কমিটি।
এ বিষয়ে ‘সাগর থেকে ডাঙায় ধাপে ধাপে জ্বালানি তেল চুরি’ শীর্ষক একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে জাগো নিউজ। এ প্রতিবেদন প্রকাশের পর বিষয়টি নিয়ে সব মহলে আলোচনা তৈরি হয়।
বিপিসি ও জ্বালানি বিভাগ সূত্রে জানা যায়, চলতি বছরের ২৮ এপ্রিল চট্টগ্রাম মহানগরের পদ্মা, মেঘনা ও যমুনা অয়েল ডিপোতে দুর্নীতি ও কর্ণফুলী নদীতে সিন্ডিকেটের মাধ্যমে তেল চুরি সম্পর্কিত একটি গোয়েন্দা প্রতিবেদনের বিষয়ে ব্যবস্থা নিতে জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের সচিবকে চিঠি দেয় জাতীয় নিরাপত্তা গোয়েন্দা (এনএসআই)। এর পরিপ্রেক্ষিতে গত ৪ মে জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের অতিরিক্ত সচিব মো. রফিকুল আলমকে আহ্বায়ক, উপসচিব (পরিকল্পনা) দেওয়ান মোহাম্মদ তাজুল ইসলামকে সদস্য সচিব এবং বিপিসির পরিচালক (বিপণন) মোহাম্মদ আবদুল কাদেরকে সদস্য করে তিন সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করে জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ।
চট্টগ্রামে পদ্মা মেঘনা যমুনা অয়েলের প্রধান ডিপোকেন্দ্রিক কর্ণফুলী নদী ও পরিবহনকালে তেল চুরির বিষয়ে আমরা তদন্ত করে প্রতিবেদন জ্বালানি সচিব বরাবর জমা দিয়েছি। এতে আমরা কিছু সুপারিশের কথা উল্লেখ করেছি।- তদন্ত কমিটির সদস্য সচিব দেওয়ান মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম
পরে ৬ মে বিপিসির মহাব্যবস্থাপক (অর্থ) মুহাম্মদ মোরশেদ হোসাইন আজাদ ও মহাব্যবস্থাপক (বণ্টন ও বিপণন) মোহাম্মদ জাহিদ হোসাইনকে কমিটিতে সদস্য হিসেবে কো-অপ্ট করা হয়। পরে প্রায় ২০ দিনের বেশি তদন্ত শেষে গত ২৯ মে তদন্ত প্রতিবেদন তৈরি করেন পাঁচ সদস্যের কমিটি। ২৯ মে কমিটি প্রতিবেদন প্রস্তুত করলেও প্রায় দেড় মাসের বেশি সময় পরে গত ২২ জুলাই জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের সচিবের কাছে প্রতিবেদনটি জমা দেওয়া হয়। কমিটির সদস্য সচিব ওই প্রতিবেদন জমা দেন।
প্রতিবেদনে জ্বালানি তেলের চুরি ও অনিয়ম রোধে ১২টি সুপারিশ করা হয়। এরপরে তদন্ত কমিটির সুপারিশ বাস্তবায়নে ১৩ আগস্ট বিপিসি চেয়ারম্যানকে চিঠি দেয় জ্বালানি বিভাগ। এর পরিপ্রেক্ষিতে তদন্ত কমিটির সুপারিশ বাস্তবায়নে গত সোমবার ২৫ আগস্ট তিন বিপণনকারী প্রতিষ্ঠান পদ্মা অয়েল, মেঘনা পেট্রোলিয়াম, যমুনা অয়েলের ব্যবস্থাপনা পরিচালকদের এবং অংশীদারি অঙ্গ প্রতিষ্ঠান স্ট্যান্ডার্ড এশিয়াটিক অয়েল কোম্পানি লিমিটেডের (এসএওসিএল) প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তাকে চিঠি দেয় বিপিসিরি ঊর্ধ্বতন মহাব্যবস্থাপক (বাণিজ্য ও অপারেশন্স) মণি লাল দাশ।
- আরও পড়ুন
বেসরকারিতে ঝুঁকছে জ্বালানি খাত, একক নিয়ন্ত্রণ হারাবে বিপিসি
জাহাজ থেকে প্রতিদিন হাজার লিটার তেল চুরি
৯৫৫ কোটি টাকা বকেয়া আদায়ে গলদঘর্ম তিতাস-কর্ণফুলী গ্যাস
এ বিষয়ে কথা হলে তদন্ত কমিটির সদস্য সচিব দেওয়ান মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম জাগো নিউজকে বলেন, ‘চট্টগ্রামে পদ্মা মেঘনা যমুনা অয়েলের প্রধান ডিপোকেন্দ্রিক কর্ণফুলী নদী ও পরিবহনকালে তেল চুরির বিষয়ে আমরা তদন্ত করে প্রতিবেদন জ্বালানি সচিব বরাবর জমা দিয়েছি। এতে আমরা কিছু সুপারিশের কথা উল্লেখ করেছি।’
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বিপণন কোম্পানির এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, ‘জ্বালানি বিভাগের তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনটি পদ্মা, মেঘনা ও যমুনা অয়েলের ব্যবস্থাপনা পরিচালকের বরাবর পাঠানো হয়েছে। আমাদের কাছে প্রতিবেদনটি এসেছে। এখানে যে ১২ সুপারিশ করা হয়েছে, এর মধ্যে অন্যতম এসপিএম ও চট্টগ্রাম-ঢাকা পেট্রোলিয়াম পাইপলাইনকে কার্যকর করা সুপারিশ রয়েছে। এরই মধ্যে চট্টগ্রাম-ঢাকা পেট্রোলিয়াম পাইপলাইনে তেল পরিবহন শুরু হয়েছে, পাশাপাশি আগামী কয়েক মাসের মধ্যে এসপিএম চালু হয়ে যাবে। তাছাড়া ডিপোগুলোর অটোমেশন প্রক্রিয়াও শুরু হয়েছে। এগুলো বাস্তবায়ন হলে তেল চুরি কিংবা সিস্টেম লস নিয়ে আর কোনো সমালোচনা থাকবে না।’
জাগো নিউজের হাতে আসা ওই প্রতিবেদনে এনএসআইয়ের প্রতিবেদনে উল্লেখিত অভিযোগের সত্যতা পাওয়ার কথা উল্লেখ করা হয়। এতে আমদানি ও বিপণন, বেসরকারি পর্যায়ে খোলা বাজারে আসা তেলের উৎস এবং কোম্পানিগুলোর প্রধান স্থাপনা থেকে সারাদেশে ডিস্ট্রিবিউশনে তেল চুরি ও অনিয়মের বিষয় উল্লেখ করা হয়।
আমদানি ও বিপণনের ক্ষেত্রে মাদার ও ফিডার ভেসেল পর্যন্ত শূন্য দশমিক ৩ শতাংশ, লাইটারের মাধ্যমে রিসিভিং পয়েন্ট পর্যন্ত শূন্য দশমিক ২ শতাংশ মিলে শূন্য দশমিক ৫ শতাংশ গ্রহণযোগ্য সিস্টেম লস নির্ধারিত রয়েছে। বাস্তবে এত সিস্টেম লস হয় না বলে তদন্ত কমিটি প্রমাণ পায়।
বেসরকারি পর্যায়ে খোলা বাজারে আসা তেলের উৎসের ক্ষেত্রে চট্টগ্রামের শিপব্রেকিং ইয়ার্ডগুলোতে আমদানি করে আনা স্ক্র্যাপ ভেসেল করে অবৈধভাবে কালোবাজারের তেল ভর্তি করে আনা হয়। পরে এসব তেল খোলাবাজারে বিক্রি করা হয়। পাশাপাশি চট্টগ্রাম বন্দরকেন্দ্রিক বিদেশি জাহাজ থেকে চোরাইভাবে তেল বিক্রি হয় বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।
অন্যদিকে কোম্পানিগুলোর প্রধান স্থাপনা থেকে সারাদেশে ডিস্ট্রিবিউশনের ক্ষেত্রে নদীপথে তেল পরিবহনে সর্বোচ্চ সিস্টেম লস অ্যাভারেজ শূন্য দশমিক ২ শতাংশ নির্ধারিত থাকলেও প্রকৃতপক্ষে এত সিস্টেম লস হয় না। তেল পরিবহনের সময় এসব তেল সরানো হয় বলে তদন্ত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।
চুরি অনিয়ম রোধে ১২ সুপারিশ
(ক) মাদার ভেসেল থেকে মেইন ইনস্টলেশনে তেল পরিবহন ও মেইন ইনস্টলেশন থেকে কোম্পানিগুলোর ডিপোতে তেল পরিবহনের ক্ষেত্রে ট্রানজেকশন লস/সিস্টেম লস বাস্তবতার নিরিখে যৌক্তিকভাবে পুনঃনির্ধারণ করতে হবে। এক্ষেত্রে আলাদা সুপারিশ জ্বালানি পরিবহন নির্বাচনের সময় সর্বোচ্চ পারফরম্যান্স প্রস্তাবকারীকে ওয়েটেজ দেওয়া যেতে পারে।
(খ) মাদার ভেসেল থেকে মেইন ইনস্টলেশনে তেল পরিবহন ও তেল বিপণন কোম্পানির মেইন ইনস্টলেশন থেকে ঢাকা পর্যন্ত তেল পরিবহনের ক্ষেত্রে লাইটারেজ জাহাজের পরিবর্তে সিঙ্গেলপয়েন্ট মুরিং (এসপিএম) প্রকল্পের মাধ্যমে স্থাপিত কক্সবাজার-চট্টগ্রাম এবং ‘চট্টগ্রাম থেকে ঢাকা পর্যন্ত পাইপলাইনে জ্বালানি তেল পরিবহন’ শীর্ষক প্রকল্পের মাধ্যমে স্থাপিত চট্টগ্রাম-ঢাকা পাইপলাইনের মাধ্যমে তেল সরবরাহ দ্রুত শুরু করতে হবে।
(গ) মেইন ইনস্টলেশন থেকে তেল বিতরণের ক্ষেত্রে ম্যানুয়াল পদ্ধতিতে ‘ডিপ রড’ পদ্ধতির তেল পরিমাপের পরিবর্তে ‘কাস্টডি ট্রান্সফার ফ্লো মিটার’ এর মাধ্যমে অটোমেটেড পদ্ধতিতে তেল পরিমাপ করতে হবে। বিপিসি ও তেল বিপণন কোম্পানিগুলোর কার্যক্রমকে দ্রুত অটোমেশন করতে হবে।
(ঘ) অবৈধ জ্বালানি প্রবেশ বন্ধ করার জন্য নদী ও সাগরে ম্যাজিস্ট্রেট, পুলিশ, নৌবাহিনী, কোস্টগার্ডসহ বিভিন্ন বাহিনীর মোবাইল কোর্ট পরিচালনা ও অভিযান বাড়নো যেতে পারে।
(ঙ) রেল কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সমন্বয় করে রেলইঞ্জিন বাড়ানো এবং ট্রানজিট টাইম কমানোর উদ্যোগ নিতে হবে।
(চ) পেট্রোলপাম্প ও খুচরা বিক্রয় কেন্দ্রে নিয়মিত মনিটর করা ও মোবাইল কোর্টের অভিযান বাড়ানোর মাধ্যমে তেল বিপণন কারসাজির সঙ্গে যুক্ত ডিলার/বিক্রেতাকে উপযুক্ত শাস্তি দিতে হবে এবং প্রয়োজনে লাইসেন্স বাতিল করতে হবে।
ছ) বেসরকারি রিফাইনারিগুলো নিয়মিত মনিটর করতে হবে যাতে নিম্নমানের ক্রুড রিফাইন করতে না পারে। এছাড়া, বেসরকারি কোম্পানিগুলোর বিপিসি ছাড়া অন্যত্র তেল বিপণন বন্ধে মনিটরিং অভিযান জোরদার করতে হবে।
(জ) ট্যাংকলরি, লাইটারেজ জাহাজ ও রেলওয়ে ওয়াগনে তেল বিতরণের ক্ষেত্রে ড্যাশবোর্ডের মাধ্যমে রিয়েল টাইম মনিটর করতে হবে এবং নিয়মিতভাবে ইন্সপেকশন ও ফিজিক্যাল ভেরিফিকেশন করতে হবে।
(ঝ) বিপিসি জ্বালানি তেল পরিবহন মাধ্যমগুলোকে (ট্যাংকলরি, ট্যাংকার ও রেলওয়াগন) ডিজিটাল লকিং সিস্টেমের আওতায় আনার উদ্যোগ নিতে পারে।
(ঞ) জ্বালানি তেল বিপণন কোম্পানিগুলোর মেইন ইনস্টলেশইনের তেলের মান এবং ডিপোর তেলের মান একই রাখার স্বার্থে মেইন, ইনস্টলেশনের তেলের মান ও ডিপোর তেলের মান নিয়মিত পরীক্ষা করে দেখতে হবে।
(ট) জ্বালানি তেল বিপণন কোম্পানিগুলোর ডিপো থেকে ট্যাংকলরির মাধ্যমে তেল পরিবহনের সময় বিএসটিআইয়ের কেলিব্রেশন অনুযায়ী তেল পরিমাপ নিশ্চিত করতে হবে।
(ঠ) পেট্রোল পাম্পে ভোক্তা পর্যায়ে জ্বালানি তেলের সঠিক মাপ নিশ্চিতকল্পে সব পেট্রোল পাম্পে একই মানের এবং একই স্পেসিফিকেশনের অয়েল ডিসপেঞ্জিং মেশিন ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে। তাছাড়া, অয়েল ডিসপেঞ্জিং মেশিনের মনিটরে তেলের পরিমাণ সমন্বয় করার সিস্টেম/কি-বোর্ড বাইরে না রেখে ভিতরে রাখতে হবে।
এমডিআইএইচ/এএসএ/জেআইএম