কর্মজীবনে বিরতির পর ফিরে আসা, আত্মবিশ্বাস পুনর্গঠনে এক নারীর গল্প

ক্যারিয়ারে একবার থেমে যাওয়া মানেই কি সব শেষ? বহু নারীর জীবনে এই প্রশ্নটি নিঃশব্দে ঘুরপাক খায়। পড়াশোনা শেষ, দক্ষতা আছে, অভিজ্ঞতাও কম নয়—তবু পারিবারিক দায়িত্ব, মাতৃত্ব, শারীরিক বা মানসিক চাপ কিংবা পরিস্থিতির চাপে কর্মজীবনে ছেদ পড়ে। সেই ছেদের পর আবার ফিরে আসার পথটি অনেক সময় হয়ে ওঠে ভয়, দ্বিধা ও আত্মবিশ্বাসহীনতায় ভরা। এই বাস্তবতায় নতুন করে আশার আলো দেখাচ্ছে ওয়াটারএইড বাংলাদেশের Women’s Returnship Programme। ওয়াটারএইড দীর্ঘদিন ধরে পানি, স্যানিটেশন ও হাইজিন (WASH) খাতে কাজের পাশাপাশি নারীর নেতৃত্ব, ক্ষমতায়ন ও কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে চলেছে।  এই উদ্যোগের মূল লক্ষ্য ক্যারিয়ারে বিরতিতে থাকা নারীদের মানসিক শক্তি ও আত্মবিশ্বাস ফিরিয়ে এনে তাদের আবার কর্মজীবনে ফিরিয়ে আনা। প্রশিক্ষণ, মেন্টরশিপ ও ফেলোশিপের মাধ্যমে অংশগ্রহণকারীদের দক্ষতা উন্নয়ন, আত্মপরিচয়ের পুনর্গঠন এবং নেতৃত্বের সক্ষমতা বাড়ানোর ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে এ উদ্যোগে।   এই উদ্যোগের একজন অংশগ্রহণকারী শায়লা ইয়াসমিন। তার গল্পটি আসলে হাজারো নারীর গল্প—যারা একসময় স্বপ্ন নিয়ে পথ চলেছিলেন, মাঝপথে ক্যারিয়ারে বিরত

কর্মজীবনে বিরতির পর ফিরে আসা, আত্মবিশ্বাস পুনর্গঠনে এক নারীর গল্প

ক্যারিয়ারে একবার থেমে যাওয়া মানেই কি সব শেষ? বহু নারীর জীবনে এই প্রশ্নটি নিঃশব্দে ঘুরপাক খায়। পড়াশোনা শেষ, দক্ষতা আছে, অভিজ্ঞতাও কম নয়—তবু পারিবারিক দায়িত্ব, মাতৃত্ব, শারীরিক বা মানসিক চাপ কিংবা পরিস্থিতির চাপে কর্মজীবনে ছেদ পড়ে। সেই ছেদের পর আবার ফিরে আসার পথটি অনেক সময় হয়ে ওঠে ভয়, দ্বিধা ও আত্মবিশ্বাসহীনতায় ভরা। এই বাস্তবতায় নতুন করে আশার আলো দেখাচ্ছে ওয়াটারএইড বাংলাদেশের Women’s Returnship Programme। ওয়াটারএইড দীর্ঘদিন ধরে পানি, স্যানিটেশন ও হাইজিন (WASH) খাতে কাজের পাশাপাশি নারীর নেতৃত্ব, ক্ষমতায়ন ও কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে চলেছে। 

এই উদ্যোগের মূল লক্ষ্য ক্যারিয়ারে বিরতিতে থাকা নারীদের মানসিক শক্তি ও আত্মবিশ্বাস ফিরিয়ে এনে তাদের আবার কর্মজীবনে ফিরিয়ে আনা। প্রশিক্ষণ, মেন্টরশিপ ও ফেলোশিপের মাধ্যমে অংশগ্রহণকারীদের দক্ষতা উন্নয়ন, আত্মপরিচয়ের পুনর্গঠন এবং নেতৃত্বের সক্ষমতা বাড়ানোর ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে এ উদ্যোগে।  

এই উদ্যোগের একজন অংশগ্রহণকারী শায়লা ইয়াসমিন। তার গল্পটি আসলে হাজারো নারীর গল্প—যারা একসময় স্বপ্ন নিয়ে পথ চলেছিলেন, মাঝপথে ক্যারিয়ারে বিরতি নিয়েছেন, আবার সাহস নিয়ে ফিরেছেন। 

শায়লা ইয়াসমিন মাস্টার্স শেষ করার আগে থেকেই বিভিন্ন সময়ে অনেক গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে নিয়োজিত ছিলেন। মাস্টার্স শেষ করার পর তিনি পরিপূর্ণভাবে ক্যারিয়ারে আত্মনিয়োগ করেন, যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো, জেন্ডার বেসড ভায়োলেন্স প্রোটেকশন এবং প্রিভেনশন, পলিসি অ্যাডভোকেসি অ্যান্ড জেন্ডার মেইনস্ট্রিমিং, প্রোজেক্ট অ্যান্ড প্রোগ্রাম ম্যানেজমেন্ট, ট্রেইনিং অ্যান্ড ক্যাপাসিটি বিল্ডিং, রিসার্চ অ্যান্ড অ্যানালাইসিস, স্টেকহোল্ডার এঙ্গেজমেন্ট, কমিউনিকেশন ও রিপোর্টিং  প্রভৃতি নিয়ে কাজ। পারিবারিক কারণে, সন্তানদের সময় দেবার জন্য শায়লার কর্মজীবনে বিরতি আসে। শায়লা বলেন, কর্মজীবনে বিরতির শুরুর দিকে আমি খুব আনন্দে  ছিলাম। কিন্তু ধীরে ধীরে আইডেনটিটি ক্রাইসিস হচ্ছিল। নিজের ওপর আস্থা ও বিশ্বাস কমে যাচ্ছিল। মনে হতো—আমি কি আবার ফিরতে পারব? 

এই ‘পারব না’ ভাবনাটাই সবচেয়ে বড় বাধা হয়ে দাঁড়ায় অনেক নারীর জীবনে। শায়লাও এরকম একটা অবস্থার ভিতরে দিয়েই যাচ্ছিলেন। শারীরিক ও মানসিক চাপ, সমাজের অদৃশ্য প্রশ্ন আর নিজের ভেতরের দ্বিধা সব কিছুকে তুচ্ছ করে তিনি মনস্থির করেন তাকে ফিরতে হবে। ঠিক এই সময়েই তিনি জানতে পারেন ওয়াটারএইডের প্রোগ্রামটি সম্পর্কে। তিনি সিদ্ধান্ত নেন এখানে অংশ নেয়ার যা বদলে দেয় তার যাত্রাপথ। তিনি প্রশিক্ষণে আবেদন করেন এবং নির্বাচিত হন। প্রশিক্ষণের প্রথম দিকেই শায়লা অনুভব করেন, এটি শুধু দক্ষতা উন্নয়নের জন্য কোনো প্রশিক্ষণ নয় - এটি নিজেকে নতুন করে আবিষ্কারের একটি মানসিক রূপান্তরের প্রক্রিয়া।

এ প্রশিক্ষণ আমাকে সবচেয়ে বেশি সাহায্য করেছে মানসিকভাবে, বলেন শায়লা। আমি শিখেছি কীভাবে নিজের ওপর আবার বিশ্বাস রাখতে হয়, কীভাবে নিজের সক্ষমতাকে নতুনভাবে দেখতে হয়। প্রশিক্ষণে যোগাযোগ দক্ষতা, সিদ্ধান্ত গ্রহণ, আত্মপ্রকাশ, দলগত কাজ এবং আত্মবিশ্বাস গড়ে তোলার মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোতে জোর দেওয়া হয়। পাশাপাশি অংশগ্রহণকারীরা নিজেদের অভিজ্ঞতা ভাগাভাগি করার সুযোগ পান, যা তাদের একে অন্যের শক্তি ও অনুপ্রেরণায় পরিণত হতে সাহায্য করে।

প্রশিক্ষণকালীন সময়ে ওয়াটারএইডের প্রকল্প সমন্বয়ক নুসরাত আনোয়োরের একটি কথা শায়লার মনে গভীরভাবে দাগ কাটে। তিনি বলেন, আবেদন করা মানেই চাকরি পাওয়া নয়; আবেদন করার মধ্য দিয়েই একজন নিজের শক্তি ও দুর্বলতার জায়গাগুলো বুঝতে পারেন, নিজের নেটওয়ার্ক তৈরি করেন এবং নিজেকে নতুন করে গড়ে তোলার সুযোগ পান। এই উপলব্ধি শায়লার ইন্টারভিউভীতি, দ্বিধা, সিদ্ধান্তহীনতা এবং আত্মসংকোচ কাটাতে বড় ভূমিকা রাখে। পরবর্তীতে তিনি ওয়াটারএইডের একজন ফেলো হিসাবে যোগদান করেন।

ফেলোশিপ শেষে শায়লা নিজের মধ্যে একটি স্পষ্ট পরিবর্তন লক্ষ্য করেন। তিনি বলেন, ক্যারিয়ারে বিরতির কারণে আমার আত্মবিশ্বাসে যে ঘাটতি তৈরি হয়েছিল, এই প্রোগ্রাম সেটি পূরণ করতে সত্যিই সাহায্য করেছে। এখন আমি জানি যে আমি পারি এবং আমি সক্ষম। এ যাত্রায় পরিবারের সমর্থনও ছিল গুরুত্বপূর্ণ।

শায়লা জানান, তার স্বামী ও পরিবার সবসময় তার পাশে ছিলেন, যা তার ফিরে আসার পথকে অনেক সহজ করেছে। 

ওয়াটারএইড বাংলাদেশের Women’s Returnship Programme শুধু একজন শায়লার গল্প নয়। এই প্রোগ্রামের মাধ্যমে আরও অনেক নারী নিজেদের ভেতরের ভয় কাটিয়ে আবার পেশাগত জীবনে ফিরছেন। কেউ নতুন দক্ষতা শিখছেন, কেউ দীর্ঘদিনের বিরতির পর প্রথম ইন্টারভিউ দিচ্ছেন, কেউ আবার নতুন করে স্বপ্ন দেখতে শুরু করেছেন। এই উদ্যোগ প্রমাণ করে, নারীদের পিছিয়ে পড়ার কারণ তাদের অক্ষমতা নয় বরং সুযোগের অভাব। সঠিক দিকনির্দেশনা, সহানুভূতিশীল পরিবেশ এবং প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ পেলে নারীরা আবারও আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে এগিয়ে যেতে পারেন।

শায়লা ইয়াসমিনের ভাষায়, এটি শুধু একটি প্রশিক্ষণ নয়, এটি আমার জীবনের জন্য একটি নতুন সূচনা।

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow