কলকাতা ভ্রমণের দিনগুলো: পর্ব ২
ঢাকার আলো পেছনে পড়ে রইলো। জানালার ওপারে অন্ধকার গ্রাম; কোথাও আধাপাকা বাড়ি, কোথাও একফালি চায়ের দোকান, কোথাও রেললাইনের গা ঘেঁষে দাঁড়িয়ে থাকা নিঃশব্দ গাছ। দূরের আলো আর রেললাইনের ঝিকঝিক শব্দ মিলেমিশে এক অদ্ভুত অনুভূতি তৈরি করেছে। রাত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বেনাপোল এক্সপ্রেসও গতি বাড়ালো। মাঝে মাঝে মনে হচ্ছিলো, পুরো বগিটা কাঁপিয়ে অদৃশ্য কোনো শক্তি আমাদের সীমান্তের দিকে টেনে নিয়ে যাচ্ছে। ভেতরে বেশিরভাগ যাত্রী তখন ঘুমিয়ে। কেউ মাথা হেলিয়ে জানালায়, কেউ সিটের ওপর হাত গুটিয়ে। কেবল রেললাইনের ঝিকঝিক শব্দ আর দূরের হুইসেল জানান দিচ্ছে, যাত্রা এখনো চলছে। ঢাকা পেরিয়ে প্রথম বড় বিরতি ভাঙ্গা। কয়েক বছর আগেও ভাঙ্গা ছিল নিভৃত এক জনপদ। পদ্মা সেতুর পর সেই চিত্র পাল্টে গেছে। এখন দক্ষিণাঞ্চলের প্রবেশদ্বার বলা হয় এ এলাকাকে। গভীর রাতেও স্টেশন এলাকায় মানুষের আনাগোনা চোখে পড়লো। কেউ কাপড়ের ব্যাগ নিয়ে দাঁড়িয়ে, কেউ সবজির বস্তা নামাচ্ছেন। এ অঞ্চলের মানুষের প্রধান জীবিকা কৃষি। ধান, পাট, মাছ আর নদীকেন্দ্রিক ব্যবসা ঘিরেই তাদের জীবন। পদ্মার আশীর্বাদে মাটিও উর্বর। এখানকার মানুষ সহজ-সরল, তবে পরিশ্রমী। নদীর মতোই তাদের জীবনে ভাঙন আছে
ঢাকার আলো পেছনে পড়ে রইলো। জানালার ওপারে অন্ধকার গ্রাম; কোথাও আধাপাকা বাড়ি, কোথাও একফালি চায়ের দোকান, কোথাও রেললাইনের গা ঘেঁষে দাঁড়িয়ে থাকা নিঃশব্দ গাছ। দূরের আলো আর রেললাইনের ঝিকঝিক শব্দ মিলেমিশে এক অদ্ভুত অনুভূতি তৈরি করেছে।
রাত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বেনাপোল এক্সপ্রেসও গতি বাড়ালো। মাঝে মাঝে মনে হচ্ছিলো, পুরো বগিটা কাঁপিয়ে অদৃশ্য কোনো শক্তি আমাদের সীমান্তের দিকে টেনে নিয়ে যাচ্ছে। ভেতরে বেশিরভাগ যাত্রী তখন ঘুমিয়ে। কেউ মাথা হেলিয়ে জানালায়, কেউ সিটের ওপর হাত গুটিয়ে। কেবল রেললাইনের ঝিকঝিক শব্দ আর দূরের হুইসেল জানান দিচ্ছে, যাত্রা এখনো চলছে।
ঢাকা পেরিয়ে প্রথম বড় বিরতি ভাঙ্গা। কয়েক বছর আগেও ভাঙ্গা ছিল নিভৃত এক জনপদ। পদ্মা সেতুর পর সেই চিত্র পাল্টে গেছে। এখন দক্ষিণাঞ্চলের প্রবেশদ্বার বলা হয় এ এলাকাকে। গভীর রাতেও স্টেশন এলাকায় মানুষের আনাগোনা চোখে পড়লো। কেউ কাপড়ের ব্যাগ নিয়ে দাঁড়িয়ে, কেউ সবজির বস্তা নামাচ্ছেন।
এ অঞ্চলের মানুষের প্রধান জীবিকা কৃষি। ধান, পাট, মাছ আর নদীকেন্দ্রিক ব্যবসা ঘিরেই তাদের জীবন। পদ্মার আশীর্বাদে মাটিও উর্বর। এখানকার মানুষ সহজ-সরল, তবে পরিশ্রমী। নদীর মতোই তাদের জীবনে ভাঙন আছে, আবার গড়াও আছে।
ভাঙ্গা থেকে গুটিকয়েক যাত্রী তুলেই ছুটলো ট্রেন। ধীরে ধীরে রেলের চাকার গতি বাড়লো। মিনিট চল্লিশেক পর ফরিদপুরে স্টেশনে এসে বন্ধ হলো ট্রেনের ইঞ্চিন। জোর শোরগোলে ঘুমটা ভাঙলো। চোখ টেনে তোলা কষ্ট। স্টেশনের ব্যস্ততায় মধ্যরাতের বাতাসে ঘুম মিলিয়ে গেল।
ফরিদপুরে ঢুকতেই বাতাসে ভেসে এলো অন্যরকম এক গন্ধ। জনপদটির ইতিহাস বহু পুরোনো। একসময় নদীপথে বাণিজ্যের বড় কেন্দ্র ছিল অঞ্চলটি। এখানকার মানুষদের মধ্যে কৃষিকাজের পাশাপাশি ক্ষুদ্র ব্যবসা আর প্রবাস নির্ভরতা বেশি। গ্রামগুলোতে এখনো সন্ধ্যার পর চায়ের দোকানই আড্ডার প্রধান জায়গা। রাজনীতি থেকে ক্রিকেট, চায়ের চুমুকে সব আলোচনা সেখানেই।
প্রখ্যাত সুফি সাধক হযরত শাহ শেখ ফরিদউদ্দীনের নামানুসারে এ এলাকার নামকরণ করা হয়। মধ্যযুগে এটি ফতেহাবাদ নামে পরিচিত ছিল। বাংলা সুলতানি আমলে ফতেহাবাদ অঞ্চলটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ছিল। পরবর্তীতে ১৮১৫ সালে ব্রিটিশ শাসনামলে ফরিদপুর স্বতন্ত্র জেলা হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে।
ঊনবিংশ শতাব্দীতে হাজী শরীয়তুল্লাহর নেতৃত্বে ফরায়েজী আন্দোলন থেকে ব্রিটিশবিরোধী ও পাকিস্তান আমলের বিভিন্ন আন্দোলন এবং বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামে ফরিদপুরের অবদান অনস্বীকার্য। অম্বিকা চরণ মজুমদার, মৌলভী তমিজউদ্দিন খান এবং বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানসহ বহু জাতীয় নেতার স্মৃতিবিজড়িত এ জনপদ।
ফরিদপুর ছেড়ে ট্রেনের গন্তব্য পরের স্টেশন রাজবাড়ী। স্টেশনের কাছাকাছি পৌঁছতেই ট্রেনের গতি কমে এলো। সিগন্যাল। বিপরীত দিক থেকে একটা মালবাহী ট্রেন আসবে। কয়েক মিনিট অপেক্ষা করতে হবে। জানালার বাইরে লাল-সবুজ বাতির ঝলকানি। দূরের ছোট্ট বাজারে তখনো খোলা মুদি দোকান।
রাজবাড়ী মূলত নদীবিধৌত অঞ্চল। পদ্মা আর গড়াই নদীর প্রভাব এ অঞ্চলের জীবনযাত্রায় স্পষ্ট। এখানকার অধিকাংশ মানুষই কৃষি, মাছ শিকার আর পরিবহন ব্যবসার সঙ্গে জড়িত। গ্রামবাংলার পুরোনো সৌন্দর্য এখনো টিকে আছে এ অঞ্চলে।
ভৌগোলিক অবস্থান এবং ঐতিহাসিক গুরুত্বের কারণে বাংলাদেশের মানচিত্রে জেলাটির নিজস্ব ও স্বতন্ত্র মর্যাদা আছে। ধারণা করা হয়, লক্ষ্মীকোলের বিখ্যাত জমিদার নবাব আলী চৌধুরীর কাছ থেকে জমি কিনে রাজা সূর্য কুমার গুহ রায় এখানে একটি প্রাসাদ বা ‘রাজবাড়ী’ নির্মাণ করেছিলেন। ১৮৯০ সালে যখন এ অঞ্চলে রেললাইন ও স্টেশন স্থাপিত হয়; তখন রাজা সূর্য কুমারের নামানুসারে স্টেশনটির নাম রাখা হয় ‘রাজবাড়ী’।
খোকসা পেরোতে পেরোতেই রাত আরও গভীর হলো। কুষ্টিয়ার প্রবেশদ্বার বলা হয় এলাকাটাকে। শান্ত, নিরিবিলি এ জনপদের মানুষজন অনেকটাই সংস্কৃতিমনা। এখানকার মাটিতে লালনের গান যেমন ভেসে বেড়ায়; তেমনই গ্রামীণ জীবনের সরলতাও চোখে পড়ে। ধান, পাট, আখ আর তামাক চাষ এখানকার মানুষের বড় জীবিকা। অনেকে আবার ছোট ব্যবসা কিংবা বিদেশে কাজ করেও সংসার চালান।
কুষ্টিয়া কোর্ট স্টেশন অতিক্রম করতেই পাশের সিটের দুজনের সঙ্গে পরিচয়। ভাবভঙ্গিমা আর নানা জিজ্ঞাসাই মূলত তাদের সঙ্গে আমাকে কথা বলতে আগ্রহী করে তুলেছে। এত পথ নীরবতা ছিল। সেই রং বদলে গেল মুহূর্তেই।
ডানপাশের উঠতি তরুণকে জিজ্ঞেস করে বসলাম, ‘গন্তব্য কোথায়?’ প্রশ্ন শুনে বেশ অপ্রস্তুত হয়ে গেল। চোখের পলক ফেলে, গলার ঢোক চাপলো সে, তবে উত্তর এলো না। পাশে বসে থাকা বন্ধুর সঙ্গে কী ব্যাপারে জানি আলাপ করছে।
কিছুক্ষণ পর উত্তর এলো, ‘এই যাচ্ছি।’
‘বুঝেছি তো যাচ্ছেন, গন্তব্যটা কোথায়?’
‘কলকাতা যাচ্ছি।’
‘কি প্রথমবার, মনে তো হচ্ছে প্রথমবারই।’
মুচকি হেসে জবাব দিলো, ‘হ্যাঁ। আগে কখনো যাওয়া হয়নি।’ আমিও হেসে হেসে জানালাম গন্তব্য একই।
কথা বলতে বলতেই পরিচয় হলো। আসিফ বাংলা কলেজে পড়েন। পাশাপাশি ফ্রিল্যান্সিং করেন। গ্রাফিক ডিজাইন আর ভিডিও এডিটিংয়ের কাজ। বয়স কম হলেও আত্মবিশ্বাস আছে। অন্যজন মানে মাসুদ, নোয়াখালীতে পড়াশোনা করেন। কথাবার্তায় শান্ত স্বভাবের। মজা করে জানালেন, ‘এখনো বাবার কাঁধেই চলি।’
কথা এগোতে থাকলো। কলকাতা নিয়ে সবার মধ্যেই চাপা উত্তেজনা। ইউটিউবে দেখা রাস্তা, ট্রাম, কলেজ স্ট্রিট, নিউ মার্কেট, বিরিয়ানি, ভারতীয় ইমিগ্রেশন সব মিলিয়ে আমাদের আলোচনার শেষ নেই।
আসিফ জানালো, ‘ভাই, আমি ট্রামটা একবার হলেও দেখতে চাই।’
হেসে উত্তর দিলাম, ‘আমার ইচ্ছা তো অনেক, তালিকা করেছি। সিটি অব জয়ে নামার পর রহস্য উন্মোচন করবো।’
নোয়াখালীর মাসুদ নিশ্চুপ থাকলো। পরক্ষণেই জানালো, ‘আপনারা যা করেন করেন, আমি শুধু কলকাতার বিরিয়ানি খাবো।’ মাসুদের কথা শুনে বগির নিস্তব্ধতার মাঝেও আমরা তিনজন হেসে উঠলাম। অচেনা মানুষের সঙ্গে হঠাৎ তৈরি হওয়া বন্ধুত্বটা ভীষণ স্বস্তি দিচ্ছিলো। মনে হচ্ছিলো, সীমান্তের পথে অন্তত কিছুটা সঙ্গ তো পাওয়া গেল।
পোড়াদহ জংশনে এসে ট্রেন আবার থামলো। রাত তখন অনেক। সাড়ে তিনটার কাছাকাছি সময়। কিন্তু স্টেশনটা তখনো জেগে আছে। দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ রেল জংশন হওয়ায় এখান থেকে উত্তর ও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের অসংখ্য ট্রেন চলাচল করে। ফলে ক্রসিংও বেশি হয়। দূরে আরেকটা আন্তঃনগর ট্রেন দাঁড়িয়ে ছিল। রেলকর্মীরা হাতে লাল বাতি নিয়ে হাঁটছেন। সিগন্যাল বদলাচ্ছে। ইঞ্জিনের শব্দে পুরো এলাকা কেঁপে উঠছে।
পোড়াদহের মানুষদের জীবনের বড় অংশজুড়ে রেল। ব্যবসা-বাণিজ্য, পরিবহন, ছোট হোটেল, চায়ের দোকান সবকিছুই স্টেশনকেন্দ্রিক। বহু বছর ধরে এই জংশন ঘিরেই গড়ে উঠেছে জনপদ। এখানে দেশের নানা প্রান্তের মানুষের মিশ্রণ আছে। কেউ ব্যবসায়ী, কেউ শ্রমিক, কেউ রেলকর্মী। অবশ্য সময়ের ধারাপাতে জীবিকার তাগিদে অনেক কিছু বদলে গেছে। গ্রামের শান্ত মাটির ঘর থেকে বড় শহরগুলোতে আবাস গড়েছে তরুণরা।
আলমডাঙ্গা আর চুয়াডাঙ্গায় প্রবেশ করছে বেনাপোল এক্সপ্রেস। সঙ্গে রাতের গভীর অন্ধকারও ঠেলে নিয়ে যাচ্ছে। জানালার বাইরে চোখ রাখতেই বোঝা গেল পূর্ব আকাশের অন্ধকার ধীরে ধীরে কেটে যেতে শুরু করেছে। ভোরের আভাস মিলতে শুরু করেছে। মাঠের ওপর পাতলা কুয়াশা। দূরে কোথাও ফজরের প্রস্তুতি।
চুয়াডাঙ্গা মূলত কৃষিনির্ভর। ধান, ভুট্টা, গম আর পান চাষ হয় প্রচুর। সীমান্তবর্তী হওয়ায় অনেকের জীবিকা ছোটখাটো বাণিজ্যের সঙ্গেও জড়িত। এখানকার মানুষের কথাবার্তায় পশ্চিমাঞ্চলের আলাদা টান আছে। দর্শনায় উনিশ শতকের ত্রিশ দশকে ব্রিটিশদের হাতে গড়ে ওঠে কেরু অ্যান্ড কোং। ইংরেজদের দেশ ত্যাগের পর সেটি ধীরে ধীরে নানা হাত ঘুরে সরকারের প্রতিষ্ঠান হয়ে যায়।
বর্তমানে বাংলাদেশ চিনি ও খাদ্য শিল্প করপোরেশনের অধীনে আছে। চিনি, বিভিন্ন ব্র্যান্ডের বিদেশি মদ, স্পিরিট, ভিনেগার এবং জৈব সারের মতো পণ্য উৎপাদন করছেন তারা। তবে মদ বিক্রিতে বেশ সুনাম কুড়িয়েছে। এ পানীয় বিক্রি করেই গত কয়েক দশকে সোনালি যুগ অতিক্রম করছে এ পানীয় প্রতিষ্ঠান। শোনা যায়, ইদানিং বিদেশেও এ প্রতিষ্ঠানের প্রিমিয়াম মদের চাহিদা তৈরি হয়েছে।
ট্রেন ধীরে ধীরে দর্শনার দিকে এগোচ্ছে। শরীরে ক্লান্তি থাকলেও চোখে ঘুম নেই। মনে হচ্ছিলো, একটা অজানা সীমান্তের দিকে এগিয়ে যাচ্ছি। মনে হওয়াও তো স্বাভাবিক। এর আগে এ জনপদে আসিনি। মানুষ চিনি না। ট্রেনের আসনে বসে ইন্টারনেট ঘেটে কিছু বিষয় জানার চেষ্টা করেছি মাত্র। তবে বাস্তব অভিজ্ঞতা শূন্যের কোটায়।
ভোর সোয়া চারটার দিকে পৌঁছলাম দর্শনা হল্টে। ছোট একটা স্টেশন। খুব বেশি আনুষ্ঠানিকতা নেই। তবে গুরুত্ব আছে বেশ। কাঁধে ব্যাগ ঝুলিয়ে, লাগেজের চাকা ঘুরিয়ে ট্রেন থেকে নেমে এলাম। ট্রেন থেকে নামতেই ঠান্ডা বাতাস গায়ে এসে লাগলো। ঠিক সেই মুহূর্তে কাছের মসজিদ থেকে আজানের ধ্বনি ভেসে এলো। নিস্তব্ধ ভোরে সেই সুর পুরো স্টেশনজুড়ে ছড়িয়ে পড়লো।
কয়েক মুহূর্ত দাঁড়িয়ে রইলাম প্ল্যাটফর্মে। দূরে সিগন্যালের আলো জ্বলছে। কুয়াশার ভেতর দিয়ে বেনাপোল এক্সপ্রেস ধীরে ধীরে সামনে এগিয়ে গেল। বিকট শব্দ তুলে ট্রেনটা মিলিয়ে গেল অন্ধকার ভোরের ভেতর।
আমি দাঁড়িয়ে রইলাম সীমান্তঘেঁষা এক নতুন সকালের সামনে।
চলবে...
- আরও পড়ুন
কলকাতা ভ্রমণের দিনগুলো: পর্ব ১
এসইউ
What's Your Reaction?