কলকাতা ভ্রমণের দিনগুলো: পর্ব ৪
দুপুরটা পুরোপুরি জেগে উঠেছে। স্টেশনের অদূরে হাজার হাজার মানুষের পদচারণা, তাতে যেন শিয়ালদহ চলমান নগরী। মনে হচ্ছে কলকাতার স্পন্দিত হৃদপিণ্ডের ওপর দাঁড়িয়ে আছি। কিছুদূর এগোতেই ট্যাক্সিচালকদের একরকম প্রতিযোগিতা শুরু হলো। একসঙ্গে দু’তিনজন ডাকাডাকি শুরু করেছে। ‘এই যে দাদাবাবু কোথায় যাবে?’ এমন প্রশ্নে কিছুক্ষণ নীরব থাকতে হলো। নিশ্চুপ থেকেই কলকাতার ভাষার টান ধরার চেষ্টা করলাম। আপনি বলবো নাকি তুমি। এখানে তো তুমিটাই চলে। বয়স যাই-ই হোক। এ শহরে তুমির বাইরে অন্যকিছু ঠিক জমে না। ‘বলছি কি, বেশিদূর তো যাবো না?’ ‘আহা, যাবে কোথায় সেটা তো বলবে?’‘যাবো বলতে মারকুইজ স্ট্রিট।’‘এই যে বললে ব্যস, তো চলো না।’ ‘কত নেবে?’ ‘দেড়শ রুপি দিবে, একটানে নামিয়ে দোবো।’‘না এত দিতে পারবো না, ১০০ রুপি হলে নামিয়ে দিতে পারো।’‘এত কমে কেউ নিবে না তোমাকে দাদাবাবু, ঠিক আছে আর ২০ রুপি দিও। আর কম হবে না বললাম।’‘না, এতে হলে চল? নয়তো অন্যটা দেখছি।’আমার গো-ধরা ভাবটা কেউ পাত্তাই দিলো না। কী করার? আর কাউকে জিজ্ঞেসও করা হলো না। স্টেশন থেকে কিছুদূরেই একটা বড় সড়ক দেখা যাচ্ছে। সে পথ দিয়েই সব গাড়ির যাতায়াত হচ্ছে। এগোতে থাকলাম। শিয়ালদহ স্টেশনের স
দুপুরটা পুরোপুরি জেগে উঠেছে। স্টেশনের অদূরে হাজার হাজার মানুষের পদচারণা, তাতে যেন শিয়ালদহ চলমান নগরী। মনে হচ্ছে কলকাতার স্পন্দিত হৃদপিণ্ডের ওপর দাঁড়িয়ে আছি। কিছুদূর এগোতেই ট্যাক্সিচালকদের একরকম প্রতিযোগিতা শুরু হলো। একসঙ্গে দু’তিনজন ডাকাডাকি শুরু করেছে।
‘এই যে দাদাবাবু কোথায় যাবে?’ এমন প্রশ্নে কিছুক্ষণ নীরব থাকতে হলো। নিশ্চুপ থেকেই কলকাতার ভাষার টান ধরার চেষ্টা করলাম। আপনি বলবো নাকি তুমি। এখানে তো তুমিটাই চলে। বয়স যাই-ই হোক। এ শহরে তুমির বাইরে অন্যকিছু ঠিক জমে না।
‘বলছি কি, বেশিদূর তো যাবো না?’
‘আহা, যাবে কোথায় সেটা তো বলবে?’
‘যাবো বলতে মারকুইজ স্ট্রিট।’
‘এই যে বললে ব্যস, তো চলো না।’
‘কত নেবে?’
‘দেড়শ রুপি দিবে, একটানে নামিয়ে দোবো।’
‘না এত দিতে পারবো না, ১০০ রুপি হলে নামিয়ে দিতে পারো।’
‘এত কমে কেউ নিবে না তোমাকে দাদাবাবু, ঠিক আছে আর ২০ রুপি দিও। আর কম হবে না বললাম।’
‘না, এতে হলে চল? নয়তো অন্যটা দেখছি।’
আমার গো-ধরা ভাবটা কেউ পাত্তাই দিলো না। কী করার? আর কাউকে জিজ্ঞেসও করা হলো না। স্টেশন থেকে কিছুদূরেই একটা বড় সড়ক দেখা যাচ্ছে। সে পথ দিয়েই সব গাড়ির যাতায়াত হচ্ছে। এগোতে থাকলাম।
শিয়ালদহ স্টেশনের সামনেই গড়ে উঠেছে নতুন মেট্রো স্টেশন। ভূগর্ভস্থ এই স্টেশন এখন কলকাতার পূর্ব-পশ্চিম মেট্রো করিডরের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। রেলস্টেশন আর মেট্রোকে যুক্ত করেছে বিশেষ পথচারী সংযোগপথ। পাশেই মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে বিদ্যাপতি সেতু। এটা অবশ্য সবাই শিয়ালদহ ফ্লাইওভার নামেই চেনে। এই উড়ালসড়কের নিচ দিয়ে অবিরাম ছুটছে বাস, ট্যাক্সি আর মানুষের স্রোত।
স্টেশনের পূর্বদিকে স্থান পেয়েছে বিআর সিং হাসপাতাল। ব্রিটিশ আমলে ছোট্ট রেলওয়ে স্বাস্থ্যকেন্দ্র হিসেবে যাত্রা শুরু হয়েছিল। কিন্তু আজ এটি ভারতের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ রেলওয়ে হাসপাতাল। প্রায় এক শতাব্দীর ইতিহাস যেন দেয়ালজুড়ে লেখা রয়েছে।
স্টেশন পেরিয়ে পরীক্ষিত রায় লেনের এপাশে দাঁড়িয়ে আছি। রাস্তার ঠিক ওপাশেই নীলরতন সরকার মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল। কলকাতাবাসী সংক্ষেপে বলে এনআরএস। উনিশ শতকের শেষভাগে প্রতিষ্ঠিত হাসপাতালটি বাংলার চিকিৎসা শিক্ষারও এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। এই প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে বাংলাদেশ মিশে আছে। অবশ্য সেটা অন্যভাবে।
এনআরএস হাসপাতালের প্রাচীর ঘেঁষে মহাত্মা গান্ধী ও শেখ মুজিবুর রহমানের ম্যুরাল জায়গা পেয়েছে। ২০২৩ সালের মার্চ মাসে সাদা ধবধবে আবক্ষ ভাস্কর্যগুলো উন্মোচন করা হয়। তখন থেকেই ম্যুরাল দুটি শিয়ালদহ স্টেশনের দিকে মুখ করে আছে। শ্বেতশুভ্র মূর্তি দুটি ফাইবারের তৈরি। এ কারণে সেগুলো দিনের বেলায় যতটা না দৃষ্টিনন্দন লাগে, রাতের মায়াবী আলোতে ততটাই অপূর্ব সুন্দর দেখায়।
শিয়ালদহ থেকে উত্তর-পূর্ব দিকে গড়ে উঠেছে রাজাবাজার। রাস্তার দুই পাশে পুরোনো বাড়ি, দোকান আর মানুষের অবিরাম আনাগোনা। কিছুদূর এগোলেই রাজাবাজার সায়েন্স কলেজ। ১৯১৪ সালে প্রতিষ্ঠিত এই প্রতিষ্ঠান একসময় ভারতীয় বিজ্ঞানচর্চার অন্যতম কেন্দ্র ছিল। এখানকার করিডোরে হেঁটেছেন বহু খ্যাতিমান বিজ্ঞানী।
অবশ্য ইংরেজ আমলে শিয়ালদহ স্টেশনের আশেপাশের এলাকাটি অপেক্ষাকৃত অনুন্নত ও জলাভূমি বেষ্টিত গ্রামীণ জনপদের বেশিকিছু ছিল না। শিয়ালডিহি বা শেয়ালের আস্তানা থেকে শিয়ালদহ নামকরণ। যা পরবর্তীতে ধীরে ধীরে একটি ব্যস্ততম ঔপনিবেশিক বাণিজ্যিক ও পরিবহন কেন্দ্রে রূপান্তরিত হয়। পূর্ববঙ্গ মানে দেশভাগের আগে বাংলাদেশ থেকে পাট, চাল ও চা পরিবহনের জন্য রেললাইন স্থাপনের পর শিয়ালদহের অবকাঠামোগত ব্যাপক উন্নতি ঘটে।
পরীক্ষিত রায় লেনে বাসের অপেক্ষায় আছি। অধিকাংশ বাসেই যাত্রীদের ভিড়। চেষ্টা করেও বাসগুলোতে ওঠা গেল না। নিঃসঙ্গ হয়ে পড়েছি। খুব একা লাগছে। কিছু চেনা নেই, জানা নেই। কোথায় গিয়ে উঠবো, তার জো নেই। হারিয়ে যাবার ভয় তো কাজ করছেই।
এসব ভাবতে ভাবতেই গেদে স্থলবন্দরের সেই দলের সঙ্গে আরেকবার দেখা হলো। তাদের গন্তব্যও মারকুইজ স্ট্রিট। প্রাণে দোলা লাগল। নিজ থেকেই কাছে এগিয়ে গেলাম।
‘ভাই চিনেছেন?’
দলের একজন হাসতে হাসতে জানালেন, ‘হ্যাঁ হ্যাঁ, মনে আছে। কোথায় যাচ্ছেন?’
‘মারকুইজ স্ট্রিট।’
‘থাকবেন কোথায়?’
‘এখনো জানি না! কোনো কিছু ঠিক করে আসিনি।’
‘আমরা তো আয়াত গেস্ট হাউজে উঠবো। আগেও কয়েকবার এসেছি, আমরা সেখানেই উঠি।’
‘আমাকে নিয়ে নেন। আমি কিছুই চিনি না!’
‘চলেন দেখি কী হয়?’
এই বলেই সবাই ধর্মতলার বাসে চেপে বসলাম। কন্ডাক্টর হাতে দুইটা ছোট্ট রঙিন কাগজের টিকিট ধরিয়ে দিলেন। একটা যাত্রীর, অন্যটা লাগেজের। যাত্রী হিসেবে ১০ রুপি। আর লাগেজ ভাড়া ৫ রুপি। টিকিটের আকার মনে ধরেছে। জ্যাম ঠেলে আমাদের ধর্মতলা বাসট্যান্ডে নামিয়ে দেওয়া হলো। সেখান থেকে পায়ে হেটেই নিউ মার্কেট, কলিন স্ট্রিট, মারকুইজ স্ট্রিট পেরিয়ে কলিন লেনে আসতে হলো। এখানেই আয়াত গেস্ট হাউজ।
কলিন লেন ও এর আশপাশের জনপদ আজকের কলকাতার এক ভিন্ন জগত। ব্রিটিশ আমলে নিউ মার্কেটকে ঘিরে ইউরোপীয় ব্যবসা-বাণিজ্য সম্প্রসারণের সময় এই অঞ্চলের বিকাশ শুরু হয়। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে রাস্তার দুই পাশে গড়ে ওঠে বোর্ডিং হাউজ, ছোট হোটেল, রেস্তোরাঁ, ট্রাভেল এজেন্সি আর বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান। কিন্তু গত দুই দশকে এলাকাটির চরিত্রে নতুন পরিবর্তন এসেছে।
বাংলাদেশ থেকে চিকিৎসা, কেনাকাটা, ব্যবসা কিংবা ভ্রমণের উদ্দেশ্যে আসা মানুষের পদচারণায় মারকুইজ স্ট্রিট, কলিন স্ট্রিট ও কলিন লেন কার্যত এক ক্ষুদ্র বাংলাদেশি পর্যটকপল্লিতে পরিণত হয়েছে।
সকালে বের হলে কানে ভেসে আসে ঢাকা, চট্টগ্রাম, খুলনা কিংবা সিলেটের আঞ্চলিক ভাষা। হোটেলের রিসেপশন থেকে শুরু করে রেস্টুরেন্টের মেন্যু, মানি এক্সচেঞ্জ, ট্রাভেল এজেন্সি কিংবা সিম কার্ডের দোকান, সবখানেই বাংলাদেশি অতিথিদের কথা মাথায় রেখে সেবা সাজানো হয়েছে। স্থানীয়দের অনেকেই বাংলা বললেও পর্যটকদের সুবিধার জন্য বাংলাদেশের শব্দচয়ন ও উচ্চারণও রপ্ত করে ফেলেছেন।
এলাকার অধিকাংশ হোটেল ছোট ও মাঝারি মানের। কয়েকশ রুপি থেকে শুরু করে কয়েক হাজার রুপির কক্ষও পাওয়া যায়। বছরের প্রায় সব সময়ই এসব হোটেলে বাংলাদেশি পর্যটকদের ভিড় লেগে থাকে। বিশেষ করে চিকিৎসাসেবা নিতে আসা রোগী ও তাদের স্বজনদের কাছে এই জনপদ অনেকটা অস্থায়ী ঠিকানার মতো। এ কারণে এই অঞ্চলকে মিনি বাংলাদেশ বলা হয়।
যে দলের সঙ্গে এসেছি তারা চারজন। এসি আছে এমন বড় একটা রুম নিলেন। দুই বেডে চারজন থাকবেন। আমাকে নিয়ে কোনো ভাবনা নেই। কয়েকবার জিজ্ঞেস করেও কোনো সাড়াশব্দ পাওয়া গেল না। মনে হচ্ছে কেন আমি এই শহরে এসেছি? মনের মধ্যে এক ঘৃণাবোধ জন্মালো।
নিজেই গেস্ট হাউজের ম্যানেজারের সঙ্গে কথা বলা শুরু করলাম। দাদা, আমাকে একটা থাকার জন্য সিঙ্গেল রুম দাও। শুরুতে রাজি না তারা। কয়েকবার অনুরোধ করে তাদের মন গলাতে পারলাম। আমাকে নিয়ে যাওয়া হলো কর্নারের এক কক্ষে। ছোট্ট রুম, এখানেও এসি আছে। তবে শৈাচাগার থেকে পানি চুইয়ে চুইয়ে আসে। এই অবস্থায় রুচির সংকট হলো।
এই অবস্থায় থাকবো কিভাবে? এটা কোনোভাবে পরিষ্কার করানো যায় না! ম্যানেজার স্ট্রেট জানিয়ে দিলেন-থাকতে হলে, ৭০০ রুপি দিতে হবে। ৪০০ রুপি থেকে ৫৫০ রুপি পর্যন্ত উঠেছিলাম। কিন্তু রাজি হলো না ম্যানেজার। তার কথা, থাকতে হলে এই দামেই থাকতে হবে। কী করার? বেরিয়ে এলাম।
কলিন লেনে এক মুসলমানের ট্রাভেল এজেন্সি আছে। পেছনে থাই দিয়ে একটা অফিস কক্ষ বানিয়েছে। আর সামনেই টেবিল আর টুল পেতে সিম বেচাকেনা করেন। আসার পথে তার সঙ্গে একবার কথা হয়েছিল। যে রুমে ব্যাগ-লাগেজ রেখে এসে তোমার কাছ থেকে সিম কিনবো। কিন্তু রুমের মান অনুযায়ী তা হয়ে ওঠেনি।
নিরুপায় হয়ে তার কাছে ছুটতে হলো। সামনে দাঁড়িয়ে বললাম-রুম পাচ্ছি না। তোমার সাহায্য লাগবে। সঙ্গে সঙ্গে আমাকে একটি পাঁচতলা হোটেলের সন্ধান দিলেন। লক্করঝক্কর লিফটের কেচি গেট বন্ধ করে সুইচে চেপে হোটেলে এলাম। তবে হোটেলের যে মান, এর চেয়ে ভালো পথেই রাত কাটিয়ে দেওয়া। মুরগির খোপের চেয়ে একটু বড় বড় রুম। পাতলা পারটেক্স বোর্ডের দেওয়ালে সব কক্ষ আলাদা করা হয়েছে। আর মাথার উপরে ঘুরছে ছোটছোট বৈদ্যুতিক পাখা।
এই পরিবেশ দেখে কাউকে কিছু না জানিয়েই নিঃশব্দে বেরিয়ে গেলাম। হোটেল থেকে কিছুদূর এগোতেই পাশ থেকে কেউ একজন বললেন, রুম লাগবে রুম। বাপাশে মাথা ঘোরাতেই দেখলাম মাঝারি গরনের এক যুবক। পায়ে জুতা নেই। হাতে চুম্বক নিয়ে খেলছে।
কাছে এগিয়ে গিয়ে বললাম, থাকা যাবে এমন ভালো রুম হবে? বললো হবে, আমার সাথে এসো। সরু এক গলি দিয়ে আমাকে ছোট্ট এক হোটেলে নেওয়া হলো।
সিঁড়ির ঘরের নিচে অফিস কক্ষ। সেখানে চেয়ার পেতে আসলাম নামের বিশালদেহীর এক মুসলিম যুবক বসা। অফিস কক্ষজুড়েই আজমির শরীফের সবুজ গম্বুজের ছবি, ইসলামিক নিদর্শনের ছবি সঙ্গে আরবি অক্ষরের ক্যালিওগ্রাফি। তার সঙ্গে পরিচয় হতেই জানানো হলো-ছোট্ট রুম আছে দিতে হবে ৬০০ রুপি। দরকষাকষির এক পর্যায়ে ৪০০ রুপিতে রাজি হলেন। তিনদিন থাকব। অ্যাডভ্যান্সড হিসেবে নিলেন ৫০০ রুপি। বাকি অর্থ দিনে দিনে নিয়ে নেবেন। এক্সট্রা সার্ভিস বলতে পাওয়া যাবে ওয়াইফাইয়ের সুবিধা।
অবশেষে মাথা গোঁজার ঠাঁই হলো। লম্বায় ৭ হাত, প্রস্থে সাড়ে তিন হাতের মতো রুমের আকার। রুমে প্রবেশ করেই ব্যাগ মাটিতে আছড়ে ফেললাম। হা-পা ছেড়ে দিয়ে বিছানায় শুয়ে পড়লাম। কিন্তু ঘড়ির কাঁটা বিশ্রামের সুযোগটা কেড়ে নিলো। লাগেজ থেকে চাদর বরে করে বিছানা সাজাতে হলো।
শরীর থেকে ময়লা কাপড় ছেড়ে শৌচাগারে ঢুকেছি। শৌচাগারে একটা ট্যাপ ছোট্ট বালতি আর কমোড। সেই কমোডের ফ্লাশ ঠিকঠাক কাজ করে না। প্রাকৃতিক কাজ সেরে বালতি দিয়ে কমোডের অভ্যন্তরে পরিষ্কার করতে হয়। শৌচাগার এতটাই ছোট যে গোসলের সময় শরীরটাও ঠিকভাবে ঘোরানো কঠিন। তবু সেখানেই স্বস্তি খুঁজতে হলো।
শরীরে কয়েক জগ পানি ঢেলেই দ্রুতই প্রস্তুত হতে হলো। আড়াইটা বেজে গেছে। হাতে আছে কয়েকঘণ্টা। একে তো বেলা ডোবার ভয়, অন্যদিকে বৃষ্টি নামার শঙ্কা। টাইম ম্যানেজমেন্ট করতে গড়মিল হলে আজকের দিনটা জলে যাবে।
পরিকল্পনা অনুযায়ী, আজকের মধ্যে ভিক্টোরিয়া পার্ক, হাওড়া ব্রিজ আর ইডেন গার্ডেনে যাবো। আর রাতের আড্ডা হবে নিউ মার্কেট এলাকায়। সেই পরিকল্পনা মাথায় গুঁজে তড়িঘড়ি করে বের হয়েছি। শুরুতেই সিমের দোকানে গেলাম। বাংলাদেশ থেকে জেনে এসেছিলাম এয়ারটেল সিম দেড়শ রুপি হলেই কেনা যাবে। কিন্তু বাস্তবতা একদম উল্টো।
একটা সিমের মূল্যই ৩২০ রুপি চাওয়া হলো। শেষ পর্যন্ত তিনশ রুপিতে ঠেকেছিল দোকানি। কিন্তু দামের কারণে মোবাইলে আর ভারতীয় সিম ভরা হলো। অচেনা শহরে এটা কতবড় চ্যালেঞ্জ সেটা তো হারে টের পাওয়া যাবে। নিরুপায় হয়ে আবার হোটেলে ফিরলাম। ম্যাপ থেকে প্রতিটা সড়কের স্ক্রিনশট নিয়ে রাখলাম। সঙ্গে একটা অফলাইন ম্যাপ ইনস্টল করে নিলাম। এটাই বিপদের বন্ধু হবে।
হোটেল থেকে বেরিয়ে এলাম চারমাথা মোড়ে। মারকুইজ স্ট্রিট ও কলিন স্ট্রিটের মিলন হয়েছে এখানে। মারকুইজ স্ট্রিট থেকে বা দিকে ঘুরে ফ্রি স্কুল স্ট্রিটের পথে রওয়ানা হয়েছি। এসময় সুমন হোটেলের উল্টোপাশে শুকনা গড়নের এক যুবকের সঙ্গে সাক্ষাৎ। কখনো কোথাও দেখা হয়নি, কথা হয়নি। অপরিচিত বলতে যা বোঝায়, তাই-ই। কথায় কথায় পরিচয় হলো।
বাংলাদেশের টঙ্গী থেকে এসেছেন। নাম সানি। বয়স ৩৩ বা ৩৪ হবে। মাঝেমধ্যেই কলকাতা আসেন। কাপড়, চকলেট আর মসলার ব্যবসা করেন। কথা শুরু হওয়ার পর থেকে তার মুখের হাসি বন্ধ হয়নি। বোধহয় কতদীর্ঘ পরিচয়। আমার কাছেও কলকাতার সিম নেই, সানির কাছেও। পরে আবার কোথায় ও কখন দেখা হবে আমাদের? সানি জানালো রাত ১১টায় আবদুল খালেক হোটেলে।
খাবার হোটেলটা কোথায় চেনা নেই? প্রশ্ন করতেই সানি জানালেন, অপেক্ষা করুন। শাম্মি আপা এলে একসঙ্গে হোটেলে যাবো। ১০-১৫ মিনিটের আলাপেই ব্যক্তিগত, পারিবারিক, পেশা ও রাজনৈতিক পরিচয় আদান-প্রদান হলো। এরমধ্যে শাম্মি আপা হাজির।
শাম্মি আপা, সুপ্রিমকোর্টের আইনজীবী। অতিরিক্ত ওজনের কারণে শারীরিক জটিলতায় ভুগছেন। কলকাতায় ভালো চিকিৎসা নিতে এসেছেন। তার সঙ্গে পরিচয় হলো। সানির সঙ্গে আরও কয়েকদিন আগেই পরিচয় হয়েছে।
এদিকে বেলা পড়ে যাচ্ছে। ওদের দুজনকে জানালাম-আমার কলকাতা আসার উদ্দেশ্যই ঘুরে বেড়ানো। দেরি হচ্ছে, ভিক্টোরিয়া পার্কে যাবো। আপনারা চাইলে জয়েন করতে পারেন। দুপুরের খাবারের অজুহাতে তারা এড়িয়ে গেলেন। কিন্তু কথা দিলেন পরের ট্রিপগুলো একসঙ্গে হবে।
তাদের সঙ্গে শেষ কথা হলো, রাতে দেখা হচ্ছে!
চলবে...
- আরও পড়ুন
কলকাতা ভ্রমণের দিনগুলো: পর্ব ১
কলকাতা ভ্রমণের দিনগুলো: পর্ব ২
কলকাতা ভ্রমণের দিনগুলো: পর্ব ৩
এসইউ
What's Your Reaction?