কলকাতা ভ্রমণের দিনগুলো: পর্ব ৬
মেঘের ঘনঘটায় বিকেলের আকাশটা আচ্ছন্ন হয়ে গেল। বোধহয় বৃষ্টি হবে! দেরী করা যাবে না। দ্রুতই হাওড়া ব্রিজের দিকে ছুটতে হবে। তবে বিপত্তি আছে, পথ তো চেনা নেই। ভিক্টোরিয়া পার্কের শেষ সীমান্তে দাঁড়িয়ে আছে সাদা পোশাকের ট্রাফিক পুলিশ। তার দেখানো পথে কুইন্স ওয়ে ধরে ময়দানের সংযোগ সড়কের দিকে এগোচ্ছি। কিছুদূর এগোতেই নীল বাসের সারি দেখা গেল। বাসগুলোই হাওড়া স্টেশনে নিয়ে যাবে। ভাড়া ১৫ রুপি। গরমটা আরও বাড়লো। লোকাল বাস, একটা ফ্যানও নেই। সবার শরীরে ঘেমে ঘামে চুপচুপ। বাসে দুজন বয়োজ্যেষ্ঠ আছেন, তাদের নাজেহাল অবস্থা। ঘামে তাদের সাদা কুর্তি ভিজে গেছে। কলকাতার কর্মজীবী নারীরা হাতপাখার বাতাসে গরম আর দিনের ক্লান্তি দূর করছেন। গাড়িটা ছাড়লে শরীর জুড়াতো। কিন্তু গাড়ি এখনো অর্ধেক ফাঁকা। অবশ্য কন্ডাকটারের হাকডাকে কয়েক মুহূর্তেই বাস ভরে গেল। গাড়ির ইঞ্চিন চালু হলো। প্রণবানন্দ সরণি হয়ে ইন্দিরা গান্ধী সরণি অতিক্রম করে বাস থামলো এসপ্ল্যানেডে। এখানে কিছু যাত্রী নেমে গেল। বাস আবারও ছুটল। লালদিঘি পেরিয়ে নতুন হাওড়া ব্রিজ অ্যাপ্রোচ রোড ধরে বাসের গতি বাড়লো। বড়বাজারের কিছু যাত্রী নামিয়ে বাস উঠলো হাওড়া ব্রিজে। একদম স্টেশনের মুখোমুখি
মেঘের ঘনঘটায় বিকেলের আকাশটা আচ্ছন্ন হয়ে গেল। বোধহয় বৃষ্টি হবে! দেরী করা যাবে না। দ্রুতই হাওড়া ব্রিজের দিকে ছুটতে হবে। তবে বিপত্তি আছে, পথ তো চেনা নেই। ভিক্টোরিয়া পার্কের শেষ সীমান্তে দাঁড়িয়ে আছে সাদা পোশাকের ট্রাফিক পুলিশ। তার দেখানো পথে কুইন্স ওয়ে ধরে ময়দানের সংযোগ সড়কের দিকে এগোচ্ছি। কিছুদূর এগোতেই নীল বাসের সারি দেখা গেল। বাসগুলোই হাওড়া স্টেশনে নিয়ে যাবে। ভাড়া ১৫ রুপি।
গরমটা আরও বাড়লো। লোকাল বাস, একটা ফ্যানও নেই। সবার শরীরে ঘেমে ঘামে চুপচুপ। বাসে দুজন বয়োজ্যেষ্ঠ আছেন, তাদের নাজেহাল অবস্থা। ঘামে তাদের সাদা কুর্তি ভিজে গেছে। কলকাতার কর্মজীবী নারীরা হাতপাখার বাতাসে গরম আর দিনের ক্লান্তি দূর করছেন। গাড়িটা ছাড়লে শরীর জুড়াতো। কিন্তু গাড়ি এখনো অর্ধেক ফাঁকা। অবশ্য কন্ডাকটারের হাকডাকে কয়েক মুহূর্তেই বাস ভরে গেল।
গাড়ির ইঞ্চিন চালু হলো। প্রণবানন্দ সরণি হয়ে ইন্দিরা গান্ধী সরণি অতিক্রম করে বাস থামলো এসপ্ল্যানেডে। এখানে কিছু যাত্রী নেমে গেল। বাস আবারও ছুটল। লালদিঘি পেরিয়ে নতুন হাওড়া ব্রিজ অ্যাপ্রোচ রোড ধরে বাসের গতি বাড়লো। বড়বাজারের কিছু যাত্রী নামিয়ে বাস উঠলো হাওড়া ব্রিজে। একদম স্টেশনের মুখোমুখি এসে বাসের ইঞ্জিন বন্ধ হলো। এখানেই বাসের অধিকাংশ যাত্রী নেমে গেল। অর্ধেকের বেশি যাত্রী ছুটলেন হাওড়া স্টেশনে। গুটিকয়েক উল্টো পথে এসে হাওড়া ব্রিজের মুখে দাঁড়ালেন। আমিও তাদের একজন।
অঝোরে বৃষ্টি ঝরতে লাগলো। ব্রিজে আশ্রয় নেওয়ার মতো কোনো অবকাঠামো নেই। মাথা গোঁজার ঠাঁই হলো বন্ধ এক চায়ের দোকানে। ত্রিপলের নিচে ঠাসাঠাসি করে কয়েকজন আশ্রয় নিয়েছি। মাথাটা না ভিজলেও শরীরের অর্ধেক ভিজে গেছে। ঘাম ঝরানো গরমের তীব্রতা তো কিছুটা কমেছে। তাতেইবা কম কী!
বৃষ্টি থেমে গেল। হাওড়ার এ প্রান্তে দাঁড়িয়ে আছি। পুরো ব্রিজ ভিজেছে। গাড়িতে উঠলে পুরো ব্রিজটা দেখার সৌভাগ্য হবে না। সিদ্ধান্ত নিয়েছি পায়ে হেঁটেই অন্য প্রান্তে যাবো।

কলকাতা ভ্রমণের দিনগুলো: পর্ব ১
মাথা উঁচু করে ব্রিজের ওপরের দিকে তাকাতেই বোঝা গেল, ইস্পাতের তৈরি এক বিশাল কাঠামো আকাশজুড়ে দাঁড়িয়ে আছে। কলকাতার পরিচয়, বাংলার গর্ব এবং ভারতীয় প্রকৌশলের অনন্য বিস্ময়। ব্রিজটি এ জনপদের ইতিহাস, অর্থনীতি, সংস্কৃতি ও নগরজীবনের সঙ্গে এমনভাবে মিশে গেছে যে, একে বাদ দিয়ে কলকাতাকে কল্পনা করাই কঠিন।
ফুটপাত ধরে ধীরে ধীরে এগিয়ে যাচ্ছি। একপাশে ছুটে চলছে অসংখ্য গাড়ি, বাস আর ট্যাক্সি। তাদের চাকার শব্দে পুরো সেতু যেন গমগম করছে। অন্যপাশে সেতুর নিচে বয়ে চলেছে হুগলি নদী। বৃষ্টির পর নদীর জল আরও গাঢ় হয়ে উঠেছে। মাঝেমধ্যে ছোট ছোট নৌকা চোখে পড়ছে। দূরে নদীর বুক চিরে এগিয়ে যাচ্ছে ফেরি। আর ওপারে আলো ঝলমলে কলকাতা যেন অন্য জগৎ।
ঐতিহ্যের ধারক হাওড়া ব্রিজ দাঁড়িয়ে আছে হুগলি নদীর ওপর। হুগলি আসলে গঙ্গারই একটি শাখা, যা পশ্চিমবঙ্গের বুক চিরে বঙ্গোপসাগরের দিকে প্রবাহিত হয়েছে। নদীর পূর্ব তীরে কলকাতা আর পশ্চিম তীরে হাওড়া। এই দুই শহরকে একসূত্রে গেঁথে দিয়েছে হাওড়া ব্রিজ।
হাঁটতে হাঁটতে মাঝে মাঝেই থেমে নিচের দিকে তাকাচ্ছিলাম। নদীর বুক থেকে ভেসে আসছিল হর্নের শব্দ। আর মাথার ওপর দিয়ে অবিরাম ছুটে চলছিল যানবাহন। তখন মনে হচ্ছিলো, দুই শহরের প্রতিদিনের জীবনপ্রবাহ বহনকারী বিশাল ধমনিতে দাঁড়িয়ে আছি।
বর্তমান সেতুটি নির্মাণের আগে এখানে একটি ভাসমান পন্টুন ব্রিজ ছিল। উনিশ শতকের শেষভাগে সেটিই ছিল কলকাতা ও হাওড়ার প্রধান সংযোগ। কিন্তু জনসংখ্যা ও বাণিজ্য বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সেটি আর পর্যাপ্ত ছিল না। ফলে একটি স্থায়ী সেতু নির্মাণের পরিকল্পনা শুরু হয়।

কলকাতা ভ্রমণের দিনগুলো: পর্ব ২
দীর্ঘ পরিকল্পনা ও জরিপের পর ১৯৩০-এর দশকে বর্তমান হাওড়া ব্রিজের কাজ শুরু হয়। প্রায় ১৩ বছরের নির্মাণপর্ব শেষে ১৯৪৩ সালের ৩ ফেব্রুয়ারি যান চলাচলের জন্য সেতুটি খুলে দেওয়া হয়। পরে ১৯৬৫ সালে এর আনুষ্ঠানিক নাম রাখা হয় রবীন্দ্র সেতু। যদিও সাধারণ মানুষের কাছে এটি এখনো হাওড়া ব্রিজ নামেই বেশি পরিচিত।
ফুটপাতে মানুষের ভিড়ও কম নয়। কেউ দ্রুত হেঁটে গন্তব্যে ছুটছেন, কেউবা মোবাইলে কথা বলতে বলতে এগিয়ে চলছেন। কয়েকজন বিক্রেতা ডালায় করে ছোটখাটো পণ্য বিক্রি করছেন। প্রতিদিন হাজারো মানুষের পদচারণায় এ সেতু যেন কখনো বিশ্রাম নেয় না।
স্থাপত্যের দিক থেকে হাওড়া ব্রিজ পৃথিবীর অন্যতম বিখ্যাত ব্যালান্সড ক্যানটিলিভার সেতু। সাধারণ সেতুর মতো এর নিচে নদীর মাঝখানে কোনো স্তম্ভ নেই। হুগলি নদীর প্রবল স্রোত ও নরম তলদেশের কারণে প্রকৌশলীরা এমন নকশা বেছে নিয়েছিলেন, যাতে পুরো কাঠামো দুই তীরের বিশাল ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে থাকতে পারে। ফলে নদীপথে জাহাজ চলাচলেও কোনো বাধা সৃষ্টি হয় না।
হাওড়া সেতু সম্পর্কে আরও একটি বিস্ময়কর তথ্য হলো, এর নির্মাণে নাট-বল্টুর ব্যবহার ছিল খুবই সীমিত। বিশাল ইস্পাত কাঠামোগুলো রিভেটের মাধ্যমে সংযুক্ত করা হয়েছিল। নির্মাণে প্রায় ২৬ হাজার টন উচ্চমানের ইস্পাত ব্যবহৃত হয়, যার বড় অংশ সরবরাহ করেছিল টাটা স্টিল।
সেতুর মাঝামাঝি এসে একবার পেছন ফিরে তাকালাম। হাওড়া স্টেশনের বিশাল ভবন তখন কিছুটা দূরে সরে গেছে। সামনে কলকাতার আকাশরেখা ধীরে ধীরে স্পষ্ট হচ্ছে। বৃষ্টিভেজা বাতাসে চারপাশের দৃশ্য যেন আরও নির্মল লাগছিল। এই মুহূর্তে বুঝতে পারছিলাম, কেন কলকাতায় আসা প্রায় প্রতিটি পর্যটকের কাছে হাওড়া ব্রিজ অবধারিত গন্তব্য।

কলকাতা ভ্রমণের দিনগুলো: পর্ব ৩
হাওড়া ব্রিজ থেকে দক্ষিণে তাকালেই চোখে পড়ে বিদ্যাসাগর সেতু। আধুনিক ক্যাবল-স্টেইড নকশার সেতুটি যেন পুরোনো আর নতুন কলকাতার মধ্যে নান্দনিক সেতুবন্ধ তৈরি করেছে। আর উত্তরে রয়েছে বিবেকানন্দ সেতু ও নিবেদিতা সেতু। হুগলির বুকে দাঁড়িয়ে থাকা সেতুগুলো কলকাতার ক্রমবর্ধমান নগরজীবনের সাক্ষী।
সূর্য পশ্চিমে হেলে পড়ছিল। হুগলির পানিতে আলো-ছায়ার খেলা শুরু হয়েছে। নদীর বুকে প্রতিফলিত আলো আর দূরে সেতুগুলোর অবয়ব মিলিয়ে অপূর্ব দৃশ্য তৈরি করেছে। সন্ধ্যা নামতেই হোটেলে ফিরলাম। গায়ের কাপড় ছাড়িয়ে আরেক দফা গোসল করলাম। ব্যাগ থেকে জেকে রাওলিংয়ের হ্যারি পটার বের করে পড়তে শুরু করলাম।
রাত সাড়ে ১০টা। অচেনা নম্বর থেকে হোয়াটসঅ্যাপে ম্যাসেজ ঢুকলো।
‘কই আপনে, আইবেন না?’
‘আমি তো হোটেলে রেস্ট করছি।’
‘রাতের খাওন খাইছেন, নাকি আমগো লগে খাইবেন?’
‘আপনাদের অপেক্ষায় আছি। বের হয়ে চার রাস্তার মোড়ে আসুন, আমি আসছি।’
দুপুরের সাক্ষাতের পর এ রাতে আবারও সানির সঙ্গে যোগাযোগ হলো। হোটেল থেকে বের হচ্ছি। আমার হোটেল থেকে কিছুদূর হাঁটলেই চার রাস্তার মোড়। সেখানেই সানির সঙ্গে সাক্ষাৎ হবে। সঙ্গে যোগ দেবেন শাম্মি আপা।
চার রাস্তার মোড়ে আমিই সবার আগে এসেছি। কলিন স্ট্রিটের নিগার হোটেল থেকে আসবে সানি। আর শাম্মি আপা আসছেন ফ্রি স্কুল স্ট্রিটেল পুরোনো এক হোটেল থেকে। কিছুক্ষণের মধ্যেই আমরা একসঙ্গে হলাম। এরপর রাতের খাবার খেতে খালেক হোটেলে পৌঁছলাম। হোটেলের ভেতরে পা রাখার কোনো জায়গা নেই। প্রতিটি টেবিল পরিপূর্ণ। একেকটা টেবিলের পাশেই ভিড় জমিয়েছেন দুই-তিনটা দল। সুযোগ না পেয়ে বাইরে আসতে হলো।

কলকাতা ভ্রমণের দিনগুলো: পর্ব ৪
এ খাবার হোটেলে আসা অধিকাংশ পর্যটকই বাংলাদেশি। হোটেলের ক্যাশ টেবিলের ওপর ঢাকার বায়তুল মোকাররমের বড় একটা ছবি টানানো। শোনা যায়, এ হোটেল মালিকের বন্ধু ঢাকার বাসিন্দা। কারো কারো মতে, এটা স্রেফ প্রচার কৌশল। তবে যাই-ই হোক। মারকুইজ স্ট্রিট, বাংলাদেশি পর্যটক আর খালেক হোটেল যেন একই সুতোই বাঁধা পড়েছে।
প্রায় আধঘণ্টা পর সুযোগ এলো। টেবিল থেকে একদল না উঠতেই আরেকদলের তাড়াহুড়ো। আমাদেরও তাই-ই করতে হলো। মেন্যুতে সাদা ভাতের সঙ্গে গরুর কালা ভুনা, মগজ কিংবা খাসি। এখানে সবজি আর চিকেনের মূল্য খানিকটা বেশি। এ কারণে অধিকাংশ পর্যটকের পাতেই কালা ভুনার আধিপত্য। সারাদিনের ক্লান্তি ক্ষুধার জোর বাড়িয়েছিল। খালেক হোটেলের খাবারে শরীরে শক্তি ফিরলো।
রাতের খাবার শেষ করে চৌরঙ্গী লেনে আড্ডা বসালাম। আগামীকাল আমার প্ল্যান কী? জানতে চাইলেন সানি আর শাম্মি আপা। দ্বিতীয় দিনের পরিকল্পনা আগে থেকেই সাজানো ছিল। জোড়াসাঁকোর ঠাকুরবাড়ি, ইন্ডিয়ান কফি হাউজ, নিউ টাউনের মাদার ওয়াক্স মিউজিয়াম। কলকাতায় আসার পর থেকে এখনো ঘুরতে না পারা শাম্মি আপা খুশি হলেন, সানিও তাতে সায় দিলেন। ঠিক আছে তাহলে আগামীকাল একই জায়গায় দেখা হবে। আপাতত বিদায়।
চলবে...

কলকাতা ভ্রমণের দিনগুলো: পর্ব ৫
এসইউ
What's Your Reaction?