কাতারে অমরত্বের পরও কেন এই বিশ্বকাপে মেসি?
২০২২ সালের ১৮ অক্টোবর, কাতারের লুসাইল স্টেডিয়াম। দীর্ঘ অপেক্ষা, একের পর এক ব্যর্থতা আর বঞ্চনার অবসান ঘটিয়ে অধরা বিশ্বকাপ ট্রফি জিতেছিলেন আর্জেন্টিনার অধিনায়ক লিওনেল আন্দ্রেস মেসি। ‘অমরত্বের প্রত্যাশা নেই নেই কোন দাবি দাওয়া, এই নশ্বর জীবনের মানে শুধু তোমাকে চাওয়া’ তখন হয়তো মেসির মনে পৃথিবীর অন্য কোনো ভাষায় কবির সুমনের এই গানটিই বাজছিল। ১৮ ক্যারেটের সোনা দিয়ে বানানো ৬ কেজির সোনালী ট্রফিটাই হয়তো মেসিকে অমরত্ব এনে দিয়েছিল। একই সঙ্গে উচ্চারিত হচ্ছেন সর্বকালের সেরা কে, এই প্রশ্নেও তখন থেকেই একমাত্র উত্তর মেসি। জোরালো সম্ভাবনাও ছিল আন্তর্জাতিক ফুটবলকে বিদায় জানাবেন মেসি। কিন্তু না, তেমন কিছু হয়নি ৪ বছরের ব্যবধান আরও একটি বিশ্বকাপ দোরগোড়ায়, আর তাতে আর্জেন্টিনার নেতৃত্বের ভার সেই মেসির কাঁধেই। অলিম্পিকের সঙ্গে ফুটবল বিশ্বকাপেও অনেকে ‘গ্রেটেস্ট শো অন দ্য আর্থ’ বলে অভিহিত করেন। প্রতি আসরের অন্তত কয়েক মাস আগে থেকেই সমর্থকদের মধ্যে বিশ্বকাপ উন্মাদনা শুরু হয়ে যায়। তবে এবার কি ব্যতিক্রম কিছু চোখে পড়ছে? হয়তো। ডিফেন্ডিং চ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনার সমর্থকদের যেন বিশ্বকাপের ‘সেই’ আবেগ ছুঁয়ে যাচ্ছে না। অনেক
২০২২ সালের ১৮ অক্টোবর, কাতারের লুসাইল স্টেডিয়াম। দীর্ঘ অপেক্ষা, একের পর এক ব্যর্থতা আর বঞ্চনার অবসান ঘটিয়ে অধরা বিশ্বকাপ ট্রফি জিতেছিলেন আর্জেন্টিনার অধিনায়ক লিওনেল আন্দ্রেস মেসি। ‘অমরত্বের প্রত্যাশা নেই নেই কোন দাবি দাওয়া, এই নশ্বর জীবনের মানে শুধু তোমাকে চাওয়া’ তখন হয়তো মেসির মনে পৃথিবীর অন্য কোনো ভাষায় কবির সুমনের এই গানটিই বাজছিল।
১৮ ক্যারেটের সোনা দিয়ে বানানো ৬ কেজির সোনালী ট্রফিটাই হয়তো মেসিকে অমরত্ব এনে দিয়েছিল। একই সঙ্গে উচ্চারিত হচ্ছেন সর্বকালের সেরা কে, এই প্রশ্নেও তখন থেকেই একমাত্র উত্তর মেসি। জোরালো সম্ভাবনাও ছিল আন্তর্জাতিক ফুটবলকে বিদায় জানাবেন মেসি। কিন্তু না, তেমন কিছু হয়নি ৪ বছরের ব্যবধান আরও একটি বিশ্বকাপ দোরগোড়ায়, আর তাতে আর্জেন্টিনার নেতৃত্বের ভার সেই মেসির কাঁধেই।
অলিম্পিকের সঙ্গে ফুটবল বিশ্বকাপেও অনেকে ‘গ্রেটেস্ট শো অন দ্য আর্থ’ বলে অভিহিত করেন। প্রতি আসরের অন্তত কয়েক মাস আগে থেকেই সমর্থকদের মধ্যে বিশ্বকাপ উন্মাদনা শুরু হয়ে যায়। তবে এবার কি ব্যতিক্রম কিছু চোখে পড়ছে? হয়তো। ডিফেন্ডিং চ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনার সমর্থকদের যেন বিশ্বকাপের ‘সেই’ আবেগ ছুঁয়ে যাচ্ছে না। অনেকেই হেলায় ঘুরছেন। জিজ্ঞাসা করলে বলে দিচ্ছেন ১৮ ডিসেম্বরই তাদের জীবনের সকল চাওয়া পাওয়া পূর্ণ হয়ে গেছে। অন্তত বিশ্বককাপ থেকে তাদের আর চাওয়া নেই! অথচ বর্তমান চ্যাম্পিয়ন হিসেবে তাদের উন্মাদনাটা বাকিদের চেয়ে বেশিই হওয়ার কথা।
২০২২ এর আগে আর্জেন্টিনার সবশেষ বিশ্বকাপ জিতেছিল ১৯৮৬ সালে। তখন আর্জেন্টিনাকে বিশ্বকাপ জিততে দেখা সমর্থকদের এখন খুব বেশি হয়তো বেঁচেও নেই। ফলে মেসি অমরত্বের আগে প্রায় সব আর্জেন্টিনা সমর্থকদেরই শুনতে হতো, ‘জন্মের পর আর্জেন্টিনাকে বিশ্বকাপ জিততে দেখেছ?’ এমনকি ফুটবলে সব জেতার পরও বিশ্বকাপ কেন অধরা থাকছে মেসির এ নিয়েও হতো ট্রল। তবে ২০২২ সালের ১৮ ডিসেম্বর সবকিছুর জবাব পেয়ে গেছে আর্জেন্টিনা সমর্থকরা। এ কারণেই কি এবার উন্মাদনা কম, চাওয়া কম! হয়তো!
দীর্ঘদিন ধরে কাম্য কিছু না পেতে পেতে যখন কেউ হঠাৎ করে সেটি পেয়ে যায়, তখন তার ভেতরে এক অদ্ভুত প্রশান্তি জন্ম নেয়। অপেক্ষা, আক্ষেপ আর অপূর্ণতার যে ভার বছরের পর বছর বয়ে বেড়াতে হয়, কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্য অর্জনের পর সেটি যেন এক মুহূর্তেই মিলিয়ে যায়। তখন আর নতুন করে চাওয়ার কিছু থাকে না, থাকে শুধু প্রাপ্তির তৃপ্তি। নিজেকে পূর্ণ মনে হয়। অনুভূত হয় জীবনের সবচেয়ে বড় স্বপ্নটি ছুঁয়ে ফেলা গেছে।
আর্জেন্টিনা সমর্থকদের অনুভূতিটাও অনেকটা তেমনই। ১৯৮৬ সালের পর প্রজন্মের পর প্রজন্মের অপেক্ষা ছিল কেবল সোনালি ওই ট্রফিটার জন্য। এই অপেক্ষার পথে ছিল অসংখ্য হৃদয়ভাঙা গল্প— ১৯৯০-এর ফাইনাল হার, ২০০৬-এর কোয়ার্টার ফাইনালের হতাশা, ২০১৪ সালের ফাইনালে জার্মানির কাছে পরাজয়, আর পরপর কয়েকটি কোপা আমেরিকার ব্যর্থতা। প্রতিবারই স্বপ্নের খুব কাছে গিয়েও ফিরে আসতে হয়েছে। বিশেষ করে লিওনেল মেসির মতো একজন ফুটবল জাদুকরকে বিশ্বকাপ হাতে দেখতে না পারার আক্ষেপ আর্জেন্টিনা সমর্থকদের বুকে ছিল সবচেয়ে বড় ক্ষত।
অবশেষে ২০২২ সালের ১৮ ডিসেম্বর সেই ক্ষত মুছে যায়। কাতারের লুসাইল স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিত ফাইনালে টাইব্রেকারে ফ্রান্সকে হারিয়ে বিশ্বকাপ জয়ের মধ্য দিয়ে আর্জেন্টিনা শুধু একটি ট্রফিই জেতেনি, তারা জিতেছিল কয়েক দশকের অপেক্ষা, হতাশা আর অপূর্ণতার বিরুদ্ধে লড়াই করে। সেদিনের পর থেকে অনেক আর্জেন্টিনা সমর্থকের কাছে ফুটবল আর শুধুই জেতা-হারার খেলা নয়; বরং পূর্ণতার এক গল্প।
তাই আজ আর্জেন্টিনা হারলে কষ্ট হয়, জিতলে আনন্দ হয়, কিন্তু সেই অনুভূতির গভীরতা আর আগের মতো নয়। কারণ সবচেয়ে বড় স্বপ্নটি যে ইতোমধ্যেই পূরণ হয়ে গেছে। বিশ্বকাপ জয়ের সেই রাত তাদের ফুটবল-জীবনের শূন্যস্থান ভরে দিয়েছে। এখন তারা ম্যাচ দেখে উত্তেজিত হয়, দলের জন্য চিৎকার করে, নতুন শিরোপার আশা করে, কিন্তু ভেতরে ভেতরে জানে- যে স্বপ্নের জন্য এতদিন অপেক্ষা ছিল, সেটি তো ২০২২ সালের ১৮ ডিসেম্বরই সত্যি হয়ে গেছে।
সেই কারণেই হয়তো আর্জেন্টিনা সমর্থকদের আবেগে এখন এক ধরনের তৃপ্তির ছাপ দেখা যায়। তাদের আর কিছু প্রমাণ করার নেই, আর কোনো অপূর্ণতার বোঝা নেই। বিশ্বকাপের সেই সোনালি রাত তাদের ফুটবল-প্রেমকে এক অন্যরকম পরিণতির জায়গায় পৌঁছে দিয়েছে।
যেখানে সমর্থকদেরই এমন অবস্থা, সেখানে মেসি কেনো আরও একটা বিশ্বকাপ খেলছেন! এমন কৌতূহল থাকতেই পারে। ২০২২২ সালের ১৮ ডিসেম্বরের অন্যতম বিষ্ময়কর ছিল মেসির অবসর না নেওয়া। মেসির মতো ফুটবল জাদুকরকে মাঠে মানুষ আজীবনই দেখতে চাইবে। তবে সব আবেগ একপাশে ঠেলেও সবকিছুর নির্দিষ্ট মেয়াদ আছে। যেখানে পরম আরাধ্য বিশ্বকাপ জেতা হয়ে গেছে তবু কেনো মেসি পরের বিশ্বকাপ খেলছেন! ফুটবল প্রেমীদের জন্য মেসিকে মাঠে দেখার মতো লোভনীয় জিনিস কম থাকলেও এই কৌতূহল থাকেই।
যেখানে নিন্দুকেরা ওঁত পেতে আছে, এই বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনা বা মেসি কেউ পা হড়কালেও ট্রলের ঢালি নিয়ে বসবে। গত কয়েক বিশ্বকাপের ইতিহাসও যে বিপক্ষে, চ্যাম্পিয়ন হয়ে পরের আসরে প্রথম রাউন্ডে বিদায়! স্পেন, জার্মানি এর শিকার হয়ে গেছে। যদিও গত আসরেই ফ্রান্স এই ধারা বদলেছে ফাইনাল খেলে। তারপরও মেসি চাইলেন না সেফ জোনে থাকতে, চিনি চ্যালেঞ্জ নিলেন ঠিকই।
মেসির বয়স এখন ৩৯ ছুঁইছুঁই। ফুটবল ইতিহাসে খুব কম খেলোয়াড়ই এমন পর্যায়ে এসে এখনও বিশ্বকাপের কেন্দ্রীয় চরিত্র হয়ে থাকতে পেরেছেন। আর্জেন্টিনার সংবাদমাধ্যমে সম্প্রতি লিওনেল স্কালোনির কিছু মন্তব্য চোখে পড়ল। তিনি সরাসরি কিছু বলেননি, কিন্তু মেসির সামনে যেন নতুন কিছু লক্ষ্য এঁকে দিয়েছেন।
স্কালোনি বলেছেন, মেসির ষষ্ঠ বিশ্বকাপ খেলাটা তাকে অবাক করে না। বরং অবাক লাগে জাতীয় দলের হয়ে তার ট্রফির সংখ্যা মাত্র চারটি দেখে। বিশ্বকাপ, দুটি কোপা আমেরিকা আর ফিনালিসিমা—সব মিলিয়ে চারটি শিরোপা। কথাটা শুনতে মজার, কিন্তু এর মধ্যে একটা সূক্ষ্ণবার্তাও আছে। যেন কোচ এখনও মেসির সামনে নতুন কিছু দেখছেন। আবার আলোচনায় এসেছে এক হাজার গোলের মাইলফলকও। ফুটবলের ইতিহাসে যা এখনও বিরল এক অর্জন।
এই জায়গায় এসে মনে পড়ে ‘ফরেস্ট গাম্প’-এর কথা। সিনেমার ফরেস্ট গাম্প কোনো রেকর্ড গড়ার জন্য দৌঁড়ায়নি। শুরুতে তিনি দৌড়েছিলেন প্রয়োজন থেকে। পরে দৌড়টাই তার জীবনের অংশ হয়ে যায়। একসময় সে আমেরিকার এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তে ছুটে যায়, শুধু কারণ সে দৌড়াতে চেয়েছিল।
মেসির গল্পটাও যেন এখন তেমন। তার আর কিছু প্রমাণ করার নেই। ২০২২ সালের ১৮ ডিসেম্বরের পর আর্জেন্টিনা সমর্থকদেরও খুব বেশি কিছু চাওয়ার ছিল না। যে স্বপ্নের জন্য প্রজন্মের পর প্রজন্ম অপেক্ষা করেছে, সেটি পূরণ হয়ে গেছে কাতারের সেই রাতে। কিন্তু কিছু মানুষ আছেন, যাদের গল্প কোনো ট্রফি জয়ের পর শেষ হয় না। তাদের জন্য অর্জন গন্তব্য নয়, যাত্রার একটা অংশ মাত্র।
হয়তো মেসিও এখন সেই জায়গায় দাড়িয়ে আছেন। বিশ্বকাপ জয়ের পরও তিনি খেলছেন। নতুন কোনো অপূর্ণতার জন্য নয়, বরং খেলার প্রতি ভালোবাসা, প্রতিযোগিতার প্রতি টান আর ইতিহাসকে আরও একটু নিজের করে নেওয়ার তাড়নায়। স্কালোনিও তাই হয়তো নতুন কোনো স্বপ্ন দেখাচ্ছেন না। শুধু সামনে আরেকটা মাইলফলক বসিয়ে দিচ্ছেন। যেন মেসির দৌঁড়টা চলতে থাকে। ফরেস্ট গাম্পের পাশে যেমন একসময় শোনা গিয়েছিল, ‘রান, ফরেস্ট, রান!’ তেমনি আর্জেন্টিনার ডাগআউট থেকেও যেন ভেসে আসছে একই ডাক— ‘দৌড়াও, লিও। দৌড়াও। গল্পটা এখনও শেষ হয়নি।’
এসকেডি/আইএন
What's Your Reaction?