কান্নার মঞ্চেই হাসিমুখে বিদায় মেসির?
ফুটবলের জাদুকর লিওনেল মেসিকে কখনোই যে কোনো সীমানায় আটকে রাখা যায় না—এবারের বিশ্বকাপেও তার প্রমাণ মিলছে। যদিও আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমগুলো বাস্তবতা বিশ্লেষণ করে জানাচ্ছে রোববারের নিউজার্সির ইস্ট রাদারফোর্ড স্টেডিয়ামে ৩৯ বছর বয়সী এ কিংবদন্তির আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের ইতি ঘটার এক প্রবল সম্ভাবনা আছে। সেইসঙ্গে আরও রোমাঞ্চকর ব্যাপার হলো, তার সম্ভাব্য এ বিদায়ী ম্যাচটি হতে যাচ্ছে এমন একটি দলের বিপক্ষে, যাদের হয়ে খেললে হয়তো তার ক্যারিয়ারের গল্পটা সম্পূর্ণ অন্যরকম হতে পারত। না বললেও চলে সেই দলটার নাম স্পেন! ২০০৫: বিস্ময়ের উত্থান গল্পটা শুরু হয়েছিল আজ থেকে প্রায় ২১ বছর আগে, ২০০৫ সালের শুরুতে কলম্বিয়ায় অনুষ্ঠিত দক্ষিণ আমেরিকান অনূর্ধ্ব-২০ চ্যাম্পিয়নশিপে। মাঠে নামলেন ১৭ বছরের এক ছোটখাটো গড়নের, ঝাঁকড়া চুলের বাঁ-পায়ের কিশোর। তাকে দেখে প্রথমটায় কোনো এলিট অ্যাথলিট মনে হয়নি। কিন্তু বল পায়ে পড়তেই সব হিসাব পাল্টে গেল। বল যেন আঠার মতো তার বাঁ-পায়ে লেগে থাকত। গোলপোস্ট থেকে ৪০ গজ দূরে দাঁড়িয়ে শুধু বল নিয়ে কারিকুরি দেখানো তার উদ্দেশ্য ছিল না। তার মধ্যে স্পেস বা জায়গা বোঝার এক অতিপ্রাকৃত ক্ষমতা ছিল। মাঠের ক
ফুটবলের জাদুকর লিওনেল মেসিকে কখনোই যে কোনো সীমানায় আটকে রাখা যায় না—এবারের বিশ্বকাপেও তার প্রমাণ মিলছে। যদিও আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমগুলো বাস্তবতা বিশ্লেষণ করে জানাচ্ছে রোববারের নিউজার্সির ইস্ট রাদারফোর্ড স্টেডিয়ামে ৩৯ বছর বয়সী এ কিংবদন্তির আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের ইতি ঘটার এক প্রবল সম্ভাবনা আছে। সেইসঙ্গে আরও রোমাঞ্চকর ব্যাপার হলো, তার সম্ভাব্য এ বিদায়ী ম্যাচটি হতে যাচ্ছে এমন একটি দলের বিপক্ষে, যাদের হয়ে খেললে হয়তো তার ক্যারিয়ারের গল্পটা সম্পূর্ণ অন্যরকম হতে পারত। না বললেও চলে সেই দলটার নাম স্পেন!
২০০৫: বিস্ময়ের উত্থান গল্পটা শুরু হয়েছিল আজ থেকে প্রায় ২১ বছর আগে, ২০০৫ সালের শুরুতে কলম্বিয়ায় অনুষ্ঠিত দক্ষিণ আমেরিকান অনূর্ধ্ব-২০ চ্যাম্পিয়নশিপে। মাঠে নামলেন ১৭ বছরের এক ছোটখাটো গড়নের, ঝাঁকড়া চুলের বাঁ-পায়ের কিশোর। তাকে দেখে প্রথমটায় কোনো এলিট অ্যাথলিট মনে হয়নি। কিন্তু বল পায়ে পড়তেই সব হিসাব পাল্টে গেল। বল যেন আঠার মতো তার বাঁ-পায়ে লেগে থাকত। গোলপোস্ট থেকে ৪০ গজ দূরে দাঁড়িয়ে শুধু বল নিয়ে কারিকুরি দেখানো তার উদ্দেশ্য ছিল না। তার মধ্যে স্পেস বা জায়গা বোঝার এক অতিপ্রাকৃত ক্ষমতা ছিল। মাঠের কোথায় এবং কখন আঘাত হানলে প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করা যাবে, তা তিনি সে বয়সেই নিখুঁতভাবে বুঝতেন। সেদিন সেখানে উপস্থিত সবাই বুঝতে পেরেছিলেন, এই ছেলেটি বিশেষ কিছু হতে যাচ্ছে। স্পেনের প্রস্তাব ও দুঃস্বপ্নের অভিষেক ১৩ বছর বয়স পর্যন্ত আর্জেন্টিনার রোজারিওতে বেড়ে ওঠা মেসি এরপর পাড়ি জমান বার্সেলোনায়। ২০০৫ সালের দিকে তিনি বিশ্ব ফুটবলে খুব একটা পরিচিত নাম ছিলেন না, এমনকি খোদ আর্জেন্টিনাতেও তাকে নিয়ে খুব বেশি মাতামাতি ছিল না। কিন্তু স্পেন তার প্রতিভা ঠিকই চিনেছিল এবং তাকে স্পেনের বয়সভিত্তিক জাতীয় দলের হয়ে খেলানোর জন্য জোর চেষ্টা চালাচ্ছিল। আর্জেন্টিনার ত্বরিত পদক্ষেপ স্পেনের এ আগ্রহ দেখেই আর্জেন্টিনা নড়েচড়ে বসে। তারা দ্রুত মেসিকে নিজেদের দলে ভেড়াতে উদ্যোগী হয়। অবশেষে ২০০৫ সালের ১৭ আগস্ট হাঙ্গেরির বিপক্ষে এক প্রীতি ম্যাচে জন্মভূমি আর্জেন্টিনার হয়ে তার অভিষেক হয়। তবে আক্ষেপের বিষয় হলো, মাঠে নামার এক মিনিটেরও কম সময়ের মধ্যে লাল কার্ড দেখে তাকে মাঠ ছাড়তে হয়েছিল! হতাশা ও সেই চেনা স্টেডিয়াম একসময় স্পেনকে না বেছে আর্জেন্টিনাকে বেছে নেওয়ার কারণে মেসিকে চরম কটাক্ষের শিকার হতে হয়েছিল। কারণ, ২০০৮ ও ২০১২ সালের ইউরো এবং ২০১০ সালের বিশ্বকাপ জিতে স্পেন তখন বিশ্ব ফুটবলে রাজত্ব করছে, আর আর্জেন্টিনা একের পর এক টুর্নামেন্টে ব্যর্থ হয়ে ধুঁকছে। সবচেয়ে আবেগঘন ব্যাপার হলো, আগামীকাল রোববার যে স্টেডিয়ামে (নিউজার্সির মেটলাইফ স্টেডিয়াম) ফাইনাল অনুষ্ঠিত হবে, ঠিক এক দশক আগে ২০১৬ সালে এই একই মাঠে চিলির কাছে কোপা আমেরিকার ফাইনালে হেরে কান্নায় ভেঙে পড়েছিলেন মেসি। হৃদয়বিদারক সেই হারের পর হতাশায় জাতীয় দল থেকেই অবসর নিয়েছিলেন তিনি। কিন্তু পরে আবার তিনি ফিরে এসেছেন, আর তার ফেরাতে ফুটবল বিশ্ব সমৃদ্ধ হয়েছে। গত পাঁচ বছরে দুটি কোপা আমেরিকা এবং চার বছর আগে কাতারে বিশ্বকাপ জিতে আর্জেন্টিনা তাদের দীর্ঘ শিরোপা-খরার অবসান ঘটিয়েছে।
গুরু-শিষ্যের লড়াই আগামীকাল রোববারের ফাইনালটি শুধু দুটি দলের লড়াই নয়, এটি দুই কোচের এক দারুণ পুনর্মিলনীও। প্রায় এক দশক আগে স্পেনে কোচিং ব্যাজ অর্জনের সময় আর্জেন্টিনার বর্তমান কোচ লিওনেল স্কালোনির অন্যতম শিক্ষক ছিলেন স্পেনের বর্তমান কোচ লুইস দে লা ফুয়েন্তে। এখন তারা একে অপরের বিপক্ষে ডাগআউটে দাঁড়াবেন। মেসি-আলভারেজকে আটকানোর ছক এক সাক্ষাৎকারে দে লা ফুয়েন্তে জানিয়েছিলেন, স্পেনের বাইরের কোনো খেলোয়াড়কে দলে নেওয়ার সুযোগ পেলে তিনি চোখ বন্ধ করে আর্জেন্টিনার জুলিয়ান আলভারেজকে বেছে নিতেন। ফাইনালে স্পেনের মূল লক্ষ্য থাকবে বলের দখল নিজেদের কাছে রেখে মেসি ও আলভারেজের যুগলবন্তিকে আটকে দেওয়া।
ভিন্ন ঘরানার ফুটবল ইংল্যান্ডের কোচ থমাস টুখেলের মতো অতি-রক্ষণাত্মক কৌশল (যাকে ‘ক্রসবারের সঙ্গে বাদুড়ের মতো ঝুলে থাকা’ বলে ব্যঙ্গ করেছেন অনেকে) স্পেন অবলম্বন করবে না। মঙ্গলবার সেমিফাইনালে কিলিয়ান এমবাপ্পের ফ্রান্সকে তারা ঠিক যেভাবে বলের অভাবে ভুগিয়েছিল, ফাইনালেও মেসিদের সঙ্গে তেমনটাই করতে চাইবে স্পেন। ফিনালিসিমা থেকে বিশ্বকাপ ফাইনাল ইউরোপ ও দক্ষিণ আমেরিকার চ্যাম্পিয়ন হিসেবে স্পেন ও আর্জেন্টিনার মধ্যে অনেক আগেই ‘ফিনালিসিমা’ ম্যাচটি অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা ছিল। গত মার্চে কাতারের দোহায় ম্যাচটি হওয়ার কথা থাকলেও মধ্যপ্রাচ্যের রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতার কারণে তা বাতিল হয়ে যায়। এরপর স্পেন ইউরোপের কোনো ভেন্যুর প্রস্তাব দেয়, আর আর্জেন্টিনা চায় ম্যাচটি বুয়েনস আয়ার্সে হোক। দুই দলের মতের অমিল এবং বিশ্বকাপ বাছাইপর্ব ও উয়েফা নেশনস লিগের ঠাসা সূচির কারণে ম্যাচটি আর আলোর মুখ দেখেনি। তবে নিয়তি হয়তো তাদের জন্য এ সবচেয়ে বড় মঞ্চটিই প্রস্তুত করে রেখেছিল! আগামীকাল রোববারের ফাইনাল তাই শুধু একটি ট্রফির লড়াই নয়, এটি এক জাদুকরের বর্ণাঢ্য ক্যারিয়ারের নিখুঁত বৃত্তপূরণ। যে স্পেনের হয়ে তার বিশ্বজয় করার সুযোগ ছিল, সেই স্পেনের বিপক্ষেই হয়তো শেষবারের মতো বিশ্বকাপের সোনালি ট্রফি উঁচিয়ে ধরতে মাঠে নামবেন লিওনেল মেসি।
What's Your Reaction?